দীপক বেরার গল্প


ফাটল

যাদবপুর এলাকায় একটা ফ্ল্যাটে একা থাকে জয়তী। আজ সারাদিন ধরে মনটা ভাল নেই তার। শনিবার কলেজ থেকে ফিরে চা খেতে খেতে জয়দীপকে ঘিরে জীবনের পুরনো কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তার। কলেজ লাইফে জয়দীপের সঙ্গে তার প্রেমপর্বের কতকিছু ঘটনা, কত রোমান্টিক সংলাপ, জয়দীপের প্রেরণায় কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তারপর বিয়ের পিঁড়িতে বসা। নতুন জীবনের শুরু, কত স্বপ্ন, কত আশা, দাম্পত্যজীবনের অন্তরঙ্গতার কিছু সুখের মুহূর্ত, ফেলে আসা জীবনের নানান ঘটনার কথা। একে একে সব মনে পড়ে যায় জয়তীর। ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। আজ খুব একটা খিদে নেই। তাই তাড়াতাড়ি করে সামান্য কিছু ডিনারের ব্যবস্থা করে ফেলে। তারপর একটু টিভি দেখতে বসে। চ্যানেল ঘুরিয়েই চলে, কোনও চ্যানেলের কোনও প্রোগ্রামই যেন মনে ধরে না জয়তীর। রাত হয়, কোনরকমে ডিনার সেরে গা এলিয়ে দেয় বিছানায়। কিন্তু, ভাবনার রেশ চলতেই থাকে। অনেক রাত অবধি ঘুম আসে না জয়তীর। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করে। অতীতের নানা স্মৃতি মনের মধ্যে শুধু ঘুরে ফিরে আসে। আজ, বিষাদ-বিষণ্ণতারা কুরে কুরে খায় জয়তীকে। আজকের দিনটি একটি বিশেষ চিহ্নিত দিন জয়তীর জীবনে। বিশেষ দিন না বলে, বিশেষ খারাপ একটা দিন বলাটাই বোধ হয় শ্রেয়। কারণ, আজকের দিনটি জয়তীর দাম্পত্যজীবন কে ভেঙে দু-টুকরো করে দিয়েছিল। আজ ১৪ই সেপ্টেম্বর, ঠিক এক বছর আগে গত বছরের এই ১৪ই সেপ্টেম্বরের দিনটিতে জয়তী আর জয়দীপের ডিভোর্স,.... বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছিল। এই ঘটনা কে কেন্দ্র করে হঠাৎই জয়তীর জীবনটা কেমন করে যেন একেবারে তছনছ, এলোমেলো হয়ে গেল। আজ, জীবনে বিরাট শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতা নিয়ে বেঁচে থাকা। একটা অর্থহীন জীবন নিয়ে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকা! কোথা দিয়ে কেমন করে যে সময় পেরিয়ে যায়, কিছুতেই বোঝা যায় না। কিভাবে একটা একটা করে দিন পেরিয়ে একটা পুরো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল, জয়তী বুঝতেই পারে নি। আজকের এই বিশেষ তারিখটা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অতীতের সেইসব বর্ণময় দিনগুলোর কিছু ঘটনা-প্রবাহে। বিষাদ-বিষন্নতার কালো অন্ধকার জয়তীকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলে। 

জয়দীপ, জয়তী ও সৌমেন তিনজন একই কলেজের একই ক্লাসে পড়ত। তিনজনেরই ছিল একই সাবজেক্ট, ইকোনমিক্স অনার্স। তবে, তাদের মধ্যে জয়দীপ ছিল পড়াশোনাতে বেশ ভাল, একেবারে স্কলার বলতে যা বোঝায়। তাছাড়া, পড়াশোনার ব্যাপারে জয়দীপের ছিল ভীষণ সিরিয়াসনেস, যা জয়তীকে আকর্ষণ করত ভীষণ রকম। জয়দীপ ছিল জয়তীর পড়াশোনার প্রেরণা। 
তারপর, ওরা তিনজন অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্স করে। পরবর্তীকালে পি. এইচ. ডি করে তিনজনেই কলেজের লেকচারার পদে চাকরি পায়। দীর্ঘ সময় ধরে অদম্য জেদ, ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় ওদের তিনবন্ধুকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর বুনিয়াদ গড়ে দেয়। 

ওদের তিনজনের মধ্যে ছিল খুব বোঝাপড়া ও অপার বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ত্রিকোণ প্রেম। "এক ফুল, দো মালী"... সমস্যা টা এখানেই। জয়দীপ ও সৌমেন দু'জনেই জয়তী কে খুব ভালোবাসে। কিন্তু, জয়তীর মনের গভীরে জয়দীপই জায়গা করে নিয়েছিল পাকাপাকি ভাবে। দু'জনের মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে অনেকদিন হল। জয়তী ও জয়দীপ দু'জনে প্রেমসাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে অনেকটা দূর পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। তিনজনের মধ্যে এত বোঝাপড়া সত্ত্বেও জয়তী সেকথা সৌমেনকে বলতে পারেনি। প্রেমের ব্যাপারে মানুষ বোধ হয় বন্ধুত্বকে এড়িয়ে কোথাও যেন নিজেকে একটু আড়াল করে, একটু স্বার্থপর হয়। তার একেবারে নিজস্ব, একান্ত ব্যক্তিগত জায়গাটির ক্ষেত্রে একটুখানি গোপনীয়তা অবলম্বন করে থাকে। তাই সৌমেনকে ফাঁকি দিয়ে জয়তী জয়দীপের বুকে ধরা দেয়। 
এদিকে সৌমেন এসবের কিছুই জানে না। কিন্তু, ওদের দু'জনের হাবভাবে সৌমেনের কিছুটা সন্দেহ হয়। তাই, একদিন মনের মধ্যে কিছুটা উৎকন্ঠা অথচ সাহস নিয়ে সে জয়তীকে বিয়ের জন্য প্রপোজটা করে বসে। বন্ধুর কাছ থেকে আচমকা এই প্রস্তাবে জয়তী একটুখানি অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সৌমেনকে যে কী বলবে, বা বিষয়টা কিভাবে সামাল দেওয়া যায় তার উপায় ভাবতে থাকে। জয়তীর এই নীরবতায় সৌমেনের উৎকন্ঠা আরও বেড়ে যায়। জয়তীর এই নীরবতা, তার প্রস্তাব এর পক্ষে না বিপক্ষে, সায় নাকি প্রত্যাখ্যান বুঝতে পারেনা সৌমেন। বেশ কিছুদিন ধরেই দু'জনের হাবভাবে ওদের সম্পর্কের ব্যাপারটা আন্দাজ করতে বুদ্ধিমান সৌমেনের যদিও খুব একটা অসুবিধে হয়নি, তবুও জয়তীর কাছ থেকে সে নিজে জানতে চায় আসল কথাটা। শেষ পর্যন্ত জয়তীও বুকে সাহস নিয়ে তার আর জয়দীপের ভালোবাসার সম্পর্কের ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেয় সৌমেনকে এবং আরও জানায় সৌমেন তার খুব কাছের এক পরম বন্ধু। সঙ্গে সঙ্গে জয়তী এও বলে যে, আজকের এই ঘটনায় তাদের পরস্পরের সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্কে যেন কোনওরকম ছেদ না পড়ে। সৌমেন জয়তীর এই ভণিতাহীন অথচ স্পষ্টবাদিতায় দুঃখ পেলেও খুশি হয়। সেদিন মনের মধ্যে একটা চরম ব্যর্থতার হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে সৌমেন বাড়ি ফিরে এসেছিল। 

পরবর্তীকালে, বন্ধুত্বের খাতিরে সৌমেন নিজের মনকে ধীরে ধীরে শান্ত করার চেষ্টা করে। শেষপর্যন্ত আস্তে আস্তে জয়তীর আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ, সৌমেন ভাল করেই জানে, জোর করে আর যা কিছুই পাওয়া যাক না কেন, প্রেম-ভালোবাসা জিনিসটা কখনোই পাওয়া যায় না। 

তারপর দিন-ক্ষণ মেনে একদিন বেশ ধুমধাম করেই ওদের বিয়েটা সুসম্পন্ন হয়েছিল।
বিয়ের পর জয়তী খুব সুখেই ছিল, বেশ ভালই কাটছিল জয়দীপ ও জয়তীর দাম্পত্যজীবন। কাল হল, হঠাৎ করে আমেরিকাতে জয়দীপের গবেষণার সুযোগটা পাওয়া। জয়তীকে ছেড়ে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার ব্যাপারে সায় ছিল না জয়তীর। কিন্তু, সামনে কেরিয়ারের লোভনীয় হাতছানি! জীবনের এতবড় সুযোগ জয়দীপ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায়নি। তাই, একদিন গবেষণার নির্ঘন্ট অনুযায়ী যথাসময়ে জয়দীপ গবেষণার উদ্দেশ্যে সুদূর আমেরিকা পাড়ি দেয়। এরপর থেকেই তাল টা কাটতে শুরু করে। প্রথম প্রথম নিয়ম করে জয়তীকে ফোন করত জয়দীপ। কিছুদিনের পর যোগাযোগটা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে শুরু করে। তারপর একসময় জয়দীপ, জয়তীর সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধই করে দেয়। জয়তী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। নিজের এবং জয়দীপের বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব মারফত জয়তী অনেক চেষ্টা করে জয়দীপের সঙ্গে যোগাযোগ করার। কিন্তু, কোনও ফল হয়নি। জয়তী খুব ভেঙে পড়ে, খুব কষ্ট পায়। পরস্পর ভালোবেসে ওরা বিয়ে করেছিল। জয়দীপের এমন ব্যবহার সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। জয়তীর হৃদয় ভাঙে, আশা-ভরসা, স্বপ্ন, সংসার সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তারপর বেশ কিছুদিন পর এক বন্ধু মারফত জয়তী জানতে পারে জয়দীপ অজন্তা নামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে, ভালোবাসে ওকে। আমেরিকাতে একসাথেই দু'জনে গবেষণার কাজে রয়েছে। মেয়েটির বাবা নাকি বড়সড় সরকারি আমলা। ওরা দিল্লিতেই সেটলড্। দিল্লিবাসী বাঙালি পরিবারের মেয়ে অজন্তা। 

জয়দীপের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও, ওর মনের মধ্যে কোথাও জয়দীপের জন্য একটু জায়গা ছিল। কিন্তু, এই কথা জানার পর জয়তীর মনের মধ্যে জয়দীপের প্রতি তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণা জন্মায়। জয়তী আর একটুও দেরি করেনি। এক উকিলের সাথে কথা বলে 'মিউচুয়াল ডিভোর্স' এর জন্য ফাইল করে। ওদের বিয়ের প্রায় এক বছরের ব্যবধানে ওদের সব সম্পর্কের অবসান ঘটে, জয়তী-জয়দীপের ডিভোর্স হয়ে যায়। আজ বিবাহ-বিচ্ছেদের দিনে জয়তীর মনের কোণের স্মৃতিগুলো আনাগোনা করছিল। পুরনো ক্ষতে আঘাতের মত বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। একটা দাম্পত্যজীবন, একটা নতুন সংসার এর শুরুতে মনের মধ্যে কতবড় একটা জায়গা তৈরি হয়। অথচ, কী আশ্চর্য! আজ আর কারুর মনে কারুর জন্য এতটুকু জায়গা নেই। সময়ের ব্যবধানে কতকিছু কেমন করে বদলে যায়! 

আজ, জীবনের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে এসে জয়তীর জীবনের গতি একটা নতুন বাঁক নেয়। পুরনো বন্ধু সৌমেনের সাথে আবার নতুন করে সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়। 

জয়তী-জয়দীপের বিয়ের কিছুদিন পর সৌমেন বিয়ে করেছিল বিপাশাকে। মামাতো এক দিদির নেগোশিয়েশনে সৌমেনের বিয়েটা হয়েছিল বেশ প্রতিপত্তিশালী এক বড় ব্যবসায়ী লোকের মেয়ে বিপাশার সাথে। অচিরেই সৌমেন টের পায় বড়লোকের  মেয়েকে বিয়ে করার ফল কী হতে পারে! বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীর একটার পর একটা বায়না রাখতে রাখতে হিমশিম খেয়ে যায় সৌমেন। 
বিয়ের পর বাসরঘরে বিপাশা সৌমেনের কাছে দাবি করে বসে, তাদের হনিমুনে সে কিন্তু সিঙ্গাপুরে যেতে চায়, একেবারে নাছোড়বান্দা। বিপাশা বলে, তাদের দাম্পত্যজীবনের শুরুতে সৌমেনের কাছে স্ত্রী হিসেবে তার এটাই প্রথম চাওয়া। তার এই দাবিটুকু সৌমেনে কে মানতেই হবে। সেন্টিমেন্টাল ইস্যু, একেবারে মোক্ষম অস্ত্র! বিপাশা সৌমেনকে প্রমিস করতে বলে। শুনেই ঘাবড়ে যায় সৌমেন, একেবারে মাথায় হাত! সদ্য চাকরির সামান্য জমানো টাকার পুঁজি নিয়ে কোনোরকমে বিয়েটা করছে সে। এরপর রিসেপশন, কলেজের বন্ধুবান্ধব, অন্যান্য প্রিয়জনদের জন্যে পার্টি দেওয়া, কতকিছু খরচের বহর পর পর লাইন দিয়ে রয়েছে। তারপর আছে প্রতি মাসে ফ্ল্যাটের লোনের 'ই এম আই'। এরপর হনিমুনে সিঙ্গাপুর যাওয়া মানে তো ব্যাপক খরচ! সৌমেন বিপাশাকে খুব করে রিকোয়েস্ট করে, ইন্ডিয়ার মধ্যে যেখানে ইচ্ছে সে হনিমুনে যেতে রাজি আছে, কিন্তু, সিঙ্গাপুরে যেতে সে একেবারেই অপারগ। এরপর বিপাশার সাথে অনেক ঝামেলা, মনোমালিন্যের পর শেষ পর্যন্ত সৌমেন বিপাশা কে নিয়ে কোনোরকমে গোয়াতে হনিমুনটা সেরেছিল। 

বিয়ের প্রথম দিন থেকেই এভাবে দু'জনের মধ্যে ঝামেলার সূত্রপাত। আজ পর্যন্ত একটার পর একটা সেই ঝামেলা যেন লেগেই রয়েছে। সৌমেনের জীবনটা আজ একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে! আজকাল কোনকিছুই যেন সৌমেনের আর ভাল লাগেনা। এই সমস্ত দাম্পত্য কলহ, নানান ঝামেলা, সাংসারিক অশান্তি সৌমেন-বিপাশার সম্পর্কের মাঝে যেন একটা দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, দু'জনের সম্পর্কে অনেকখানি দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে। 

বেশ কিছুদিন ধরেই সৌমেনের সঙ্গে জয়তীর নতুনভাবে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিপাশার সঙ্গে ঝামেলা হলেই সৌমেন ফোন করে তার এককালের অতি প্রিয় বন্ধু জয়তীর কাছে ছুটে আসে। তার কাছে একটু ছায়া পেতে চায়, পরম আশ্রয় পেতে চায়। বুকের উত্তপ্ত মরুভূমিতে যেন বৃষ্টির শীতল অনুভূতি পেতে জয়তীর কাছে সে ছুটে ছুটে আসে বারবার।

আশ্চর্যজনক ভাবে, পরিস্থিতি অনুযায়ী ঘটনা পরম্পরা, যোগাযোগ, সুযোগ সবকিছুই কেমন করে যেন ঠিকঠাক ভাবে একেবারে সাজানো গোছানো হয়ে জীবনের সামনে একটা মনভোলানো উপহার হিসেবে এসে দাঁড়ায়। হাতছানি দেয়, দুর্বল অসহায় মানুষদের প্রভাবিত করে, প্রলুব্ধ করে! জয়তী, সৌমেনরাও এর ব্যতিক্রম নয়। সৌমেন জানে জয়তীর নিঃসঙ্গতার কথা, জয়তীও সৌমেনের কাছে শুনেছে সৌমেনের সঙ্গে বিপাশার মানসিক দূরত্বের কথা। দু'জনের পরিস্থিতি আজ পরস্পরকে আরও কাছাকাছি এনে দেয়। 

রাতভর স্মৃতিকাতরতায় কাতরাতে কাতরাতে
শেষরাতে কখন যে ঘুম এসে গিয়েছিল জয়তী বুঝতেই পারেনি। পরের দিন সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। ফোনের রিং-টোন এর আওয়াজে ঘুম ভাঙে জয়তীর। ঘুম যেন কিছুতেই ভাঙতেই চায় না। ঘুম জড়ানো আবেশে কোনরকমে ফোনটা রিসিভ করে। 'হ্যালো' বলতেই ফোনের ওপার থেকে সৌমেন বলে, "আর পারছি না জয়তী, এত অশান্তি আর নিতে পারছি না। এবার বোধ হয় বিপাশাকে ডিভোর্স দিতে হবে। আজ একবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই, তোমার কোনও অসুবিধে নেই তো?" 
ঘুমের আবেশ তখনও কাটেনি জয়তীর। হাই তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে প্রায় আটটা বাজে। আজ রবিবার, তাই ভেবেছিল আর একটু পড়ে পড়ে ঘুমোবে সে। কিন্তু, সেটা আর হয়ে উঠল না। ওদিকে ফোনের ওপার থেকে সৌমেন বলেই চলেছে, "হ্যালো, হ্যালো জয়তী, শুনতে পাচ্ছো? একটিবার আমি যেতে চাই তোমার কাছে, আজ তোমার সাথে আমার দেখা করাটা ভীষণ জরুরী"। 
জয়তী একটু ভেবে নিয়ে বলে, "ঠিক আছে, বাড়িতে আছি, চলে এসো".. 
"থ্যাঙ্কস ডিয়ার, ঠিক বারোটা নাগাদ আসছি".. সৌমেন ওপার থেকে বলে। 
জয়তী জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা ঠিক আছে, তা এখানে এসে লাঞ্চ করবে তো? "
"হ্যাঁ, অবশ্যই। আরে, সেইজন্যেই তো সকাল সকাল তোমার ঘুম ভাঙিয়ে ফোন টা করলাম। আরে কী যে বলি, তোমাকে বলতে তো আর অসুবিধে নেই। সকাল থেকেই ঝগড়ার শুরু, ফালতু কথা নিয়ে অনর্থক সব ঝামেলা করল। কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ করে ব্যাগে কিছু জামা-কাপড় ভরে নিয়ে বিপাশা বাপের বাড়ি চলে গেল। তুমিই বল, কোনও মানে হয়? ঠিক আছে, এলে সব কথা হবে".. বলে ফোনটা কাটে সৌমেন। 

জয়তী বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। কিচেনে গিয়ে চায়ের জল বসায়। তারপর, রান্নাঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। জয়তীর যাদবপুরের এই ফ্ল্যাটের এদিকটায় খুব একটা বাড়িঘর এখনও সেভাবে গজিয়ে ওঠেনি। তাই জয়তীর রান্নাঘরের বারান্দায় দাঁড়ালে অনেকটা দূর পর্যন্ত চোখ চলে যায়। সেই দূরের দিগন্তে চোখ মেলে তাকিয়ে সৌমেনের সঙ্গে নিজের নতুন রিলেশনের কথাটা ভাবতে থাকে জয়তী। কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো ব্যাপারটা! বিপাশার সাথে ঝগড়াঝাটি হলেই, আজকাল প্রায়শই সৌমেন এসে হানা দিচ্ছে ওর ফ্ল্যাটে। ও একটা দুরন্ত ঝড় নিয়ে আসে যেন, আর সেই ঝড় সামাল দিতে হয় জয়তীকে। বিপাশা এখনও জানে না ব্যাপারটা, জানতে পারলে, আবার একটা অশান্তি না সৃষ্টি হয়! এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে চায়ের জলের শোঁ শোঁ শব্দে জয়তীর সম্বিত ফেরে। দৌড়ে গিয়ে ওভেনের বার্ণার অফ করে। 
চা খেতে খেতে মালতী মাসি এসে পড়ে। মাসি কে লাঞ্চের মেনু বাতলে দিয়ে ফ্রিজ থেকে ইলিশ মাছ বের করে রাখতে বলে জয়তী। সৌমেন ইলিশ মাছ খেতে খুব ভালোবাসে। ইলিশের মেনু ছাড়া অন্যান্য মেনুগুলো মালতী মাসিকে রান্না করে ফেলতে বলে। কারণ, ইলিশ মাছটা জয়তী নিজেই রান্না করতে চায় সৌমেনের জন্য। জয়তীর রান্নার হাতটাও বেশ ভাল। স্পেশাল রান্নার কোনও রেসিপি বানানো তার হবি। 
মালতি মাসি চলে যাওয়ার পর জয়তী খুব মন দিয়ে যত্ন করে ইলিশ ভাপাটা বানায়। রান্নার বেশ সুন্দর একটা স্মেল বেরোয়, রান্নাটা নিশ্চয়ই ভালই হয়েছে, মনে মনে ভাবে জয়তী। রান্নার শেষে সব খাবারদাবার এবং প্লেট, বোল, স্পুন সবকিছু ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখে। এরপর বাথরুমে গিয়ে খুব ভাল করে অনেকক্ষণ ধরে চান করে। চান করে বেরিয়ে এসে দামি পারফিউম, ডিও স্প্রে করে নেয় সারা গায়ে। ভাল দেখে নতুন একটা হাউজকোট পরে। আজ অনেকদিন পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে জয়তী। জয়দীপকে বিয়ে করার পর ঠিক যেমন টা করত। নিজের বর্তমান সৌন্দর্যে সে যেন সন্তুষ্ট হতে পারে না। মুখমণ্ডলে একটু যেন বয়সের ছাপ লক্ষ্য করে! নাঃ, অনেকদিন নিজেকে মেনটেন করা হয়নি। নিজের কেয়ারলেসের ফলেই এটা হয়েছে। মেয়েদের একটু-আধটু রূপচর্চা রাখতেই হয়। কালকে তাকে মাস্ট একবার পার্লারে যেতেই হবে। নিজেকে একটুখানি সুন্দর করে তুলবার পরিকল্পনা করে ফেলে জয়তী। তার বয়স যে পঁয়ত্রিশ ছাড়িয়েছে, তা যেন কিছুতেই ধরা না পড়ে সৌমেনের কাছে। 

এইসব ভাবতে ভাবতে জয়তী ঘরের মধ্যে সৌমেনের অপেক্ষায় পায়চারি করতে থাকে। এদিকে, জয়দীপের সঙ্গে দাম্পত্যজীবনের পুরনো কথাগুলো ফের একবার মনে পড়ে যায়। এতদিন জয়দীপ ছাড়া কোনওদিনের জন্য কোনও পরপুরুষ কে নিজের মনে স্থান দেয়নি জয়তী। আজ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জীবনের দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় পুরনো বন্ধু সৌমেন একটু একটু করে জায়গা করে নিয়েছে ওর মনে। সৌমেন কে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সে। বিপাশাকে কি সৌমেন ডিভোর্স দেবে? সাত-পাঁচ এইসব ভাবনার জট তৈরি হয় জয়তীর মনে। 
এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ বাইরে বাইকের আওয়াজ পায় জয়তী, বুঝে যায়, নিশ্চয়ই সৌমেন এসে গেছে। ঘরের বারান্দা থেকে কমপ্লেক্সের নিচটা দেখা যায়। তাই, ছুটে বারান্দায় গিয়ে নিচে তাকায় সে। হ্যাঁ, তার অনুমানই ঠিক। দেখতে পায় সৌমেন বাইকটা গ্যারেজ করে হেলমেট টা হাতে নিয়ে কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সৌমেন ফ্ল্যাটের সামনে হাজির হয়। জয়তী আগেভাগেই দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল সৌমেন কে রিসেপশনের জন্য। দরজার কাছে আসতেই সৌমেনের হাত ধরে ওকে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে জয়তী। হেলমেট টা টেবিলে রাখে সৌমেন। জয়তী লক্ষ করে বেশ উদ্ভ্রান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে সৌমেন কে... হয়তো বা, বিপাশার সঙ্গে ঝগড়ার জেরে! 

জয়তী সৌমেন কে জয়দীপের পাজামা-পাঞ্জাবি দিয়ে সৌমেন কে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে বলে। সৌমেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বলে, " বাপরে, কোনোরকমে পরলাম".. আসলে, জয়দীপের তুলনায় সৌমেনের চেহারা বেশ ভাল, তাই পাজামাটা কোনওরকমে ফিট করলেও পাঞ্জাবিটা ঠিক মত ফিট করেনি। বোতামগুলো সে কিছুতেই আটকাতে পারেনি। তাই সৌমেনের বুকের অনেকটা অংশই জামার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে। 
জয়তী সৌমেনের দিকে তাকায়, অনেকদিন বাদে তার সারাশরীরে একটা শিরশিরানি অনুভূতি খেলে যায়। সেটা লুকোতে সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যায়। একট পরে সৌমেনের জন্য কোল্ড-ড্রিঙ্কস নিয়ে আসে। 
জয়তীর হাত থেকে সৌমেন কোল্ড-ড্রিঙ্কস এর গ্লাসটা নিয়ে বেশ তৃপ্তি করে পান করে। এখন সে একটুখানি আরাম বোধ করে। নিজেকে অনেকটাই ফ্রেশ লাগে। মনের অশান্তি কিছুটা সামলে নিয়ে সৌমেন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। জয়তী কে বলে, "আরে খেতে দাও জয়তী, ভীষণ খিদে পেয়েছে".. 
"চল চল, খাওয়ার রেডি,".. জয়তী মুচকি হেসে বলে। 
সৌমেন দুষ্টু হাসি হেসে এগিয়ে যায় জয়তীর দিকে। ইঙ্গিত ধরতে পেরে ছিটকে সরে যায় জয়তী, বলে, "এয় এখন নয়, ..আগে খেয়ে নাও".. 
হাসতে হাসতে দু'জনে ডাইনিং টেবিলের দিকে যায়। সৌমেন কে খেতে বসিয়ে জয়তী খুব যত্ন করে সৌমেনের পাতে খাওয়ার পরিবেশন করে। সৌমেন জয়তী কেও একসাথে খেতে বসতে বলে। 
জয়তী বলে, "ঠিক আছে, আগে তুমি তো খাও, তারপর আমি বসছি".. 
সৌমেন খেতে খেতে বলে, "সত্যিই ইলিশের রেসিপি টা এক্সেলেন্ট্ হয়েছে, দারুণ! দিস ইজ মাই ফেভারিট রেসিপি!" 
"আরে, সেই জন্যেই তো এটা বানালাম".., জয়তী বলে। 
"ওহ্, থ্যাংকস, জয়তী। সত্যি, কত খেয়াল থাকে তোমার, তুমি কতখানি মনে রেখেছ আমাকে! ".. 
" থাক থাক এর জন্য আর থ্যাংকস দিতে হবে না",.. লজ্জা পেয়ে জয়তী উত্তর দেয়। 
"বিপাশা যদি এরকম একটু আধটু বুঝত আমাকে!".. বেশ ক্ষোভের সঙ্গে সৌমেন কথাটা বলে। 
জয়তী কোনও কথা না বলে চুপ করে থাকে। 
সৌমেনের পাতে আর একটা মাছ তুলে দেয়।" "আরে কী করছ? দিওনা দিওনা, আর দিওনা। এমনিতেই অনেক আইটেম, এগুলোই শেষ করতে পারব কিনা কে জানে"..., সৌমেন বলে। 
"আরে খুব পারবে, খাওতো".. জয়তী সৌমেন কে বলে। 
সৌমেন খাওয়া শেষ করে বলে, "আজ অনেকদিন পর প্রাণ ভরে খেলাম। এত যত্ন করে একমাত্র মা ছাড়া কেউ আমাকে খাওয়ায়নি। জয়তী, থ্যাংক ইউ ওয়ানস্ এগেইন"...সৌমেন জয়তীর উদ্দেশ্যে বলে। 
"ওরে বাবা হয়েছে...হয়েছে,কী এমন খাওয়ালাম!ওঃ, সৌমেন,তুমি এমন করছ না! সত্যি, আমার খুব লজ্জা করছে"...জয়তী খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বলে। 
যাইহোক,এবার জয়তী খেতে বসে। 
সৌমেন হাত মুখ ধুয়ে সোফায় বসে জয়তীর সঙ্গে গল্প করতে থাকে। ইতিমধ্যে জয়তীও খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে সৌমেনের পাশে সোফায় এসে বসে। কিছুক্ষণ গল্প করার পর জয়তী সৌমেন কে বলে, " চল এবার একটু রেস্ট নিয়ে নাও".. এই বলে জয়তী সৌমেন কে নিয়ে বেডরুমে আসে। 

আজ, দু'জনে একসঙ্গে ঘুমায়। 
কিন্তু, দু'জনের কারুরই ঘুম আসেনা কিছুতেই। দু'জনেই ছটফট করতে থাকে। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর শুধু পাশ ফিরে শোয় দু'জনে। এমন সময় আচমকাই সৌমেন জয়তীর হাত ধরে কাছে টেনে নেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় জয়তী আঁতকে ওঠে। শরীরে বিদ্যুৎ ঝলকের মত একটা শিহরণ খেলে যায়। ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় সৌমেন যে ঝড় নিয়ে এসেছিল এবং অনেক কষ্টে সামলে নিয়েছিল, বুকের ভেতর সেই ঝড় আবার ওঠে। দু'হাতে জড়িয়ে ধরে জয়তী কে। ধীরে ধীরে বুকের ঝড় কালবৈশাখীর রূপ নেয়। মুহূর্তের মধ্যে জয়তী কে একেবারে বেসামাল করে লণ্ডভণ্ড করে দেয়! কিছুক্ষণ পর সৌমেনের ঝড় যখন থামে, তখন পরিবেশ একেবারে থমথমে, দু'জনেই চুপচাপ... 
জয়তী মনে মনে ভাবে, আজ সৌমেন তার বুকে যে ঝড় তুলল, তেমন একটা দামাল ঝড় জয়দীপ কোনওদিনই তার বুকে জাগিয়ে তুলতে পারেনি। 

কিছুক্ষণ চুপ থাকতে থাকতে দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎ জয়তীর ঘুম ভাঙে, ঘড়িতে দেখে পাঁচটা বাজে। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গিয়ে চান করে ফ্রেশ হয়। বেরিয়ে এসে হাউজকোট টা চেঞ্জ করে শালোয়ার কামিজ পরে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে চা বানায়। চা হয়ে গেলে সৌমেন কে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। সৌমেন ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ে। নিজের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে লজ্জা পায়। নিজের জামাকাপড়গুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে আসে। 

দু'জনে একসাথে বসে চা খায়। 
সৌমেন বলে, "আর পারছি না, বুঝলে জয়তী। দিনের পর দিন এত অশান্তি আর ভাল লাগে না, দিনের পর দিন ওর বায়না রাখতে গিয়ে ফতুর হয়ে যাচ্ছি। জানো জয়তী, আজকাল কাউকে ও রেয়াত করে না, বাইরের লোকজনের সামনেও অশান্তি করতে ওর একটুও বাধে না"... 
জয়তী সৌমেনের মাথায় হাত রেখে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে। 
জয়তী বলে, "আজকে থেকে যাও সৌমেন".., জয়তী সৌমেন কে একটু টোকা দিয়ে বাজিয়ে দেখে। 
সৌমেন চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, "সে ইচ্ছে কি আমারও করে না? কিন্তু, বিপাশা যদি রাতে বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসে? তখন কিন্তু সব গন্ডগোল হয়ে যাবে, ও সব জেনে ফেলবে"... জয়তী লক্ষ করে সৌমেনের চোখে মুখে একটা আতঙ্কের ছাপ! 
জয়তী জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি বিপাশা কে ডিভোর্স দেবে?" 
সৌমেন একটু ইতস্তত হয়ে বলে, " না মানে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আর একটু ভাবতে হবে, ঠিক এই মুহূর্তে একটু অসুবিধে আছে।"
অন্য কোনও মেয়ে হলে চেপে ধরত। কিন্তু, জয়তী সেই ধরণের মেয়ে নয়। কারণ, সে জানে, জোর করে কোনও কাজ হাসিল করা যায় না, যা জয়দীপের সঙ্গে থেকে ও হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। তাই আর কথা বাড়াল না। 

এমন সময় সৌমেনের ফোন বেজে ওঠে, দেখে বিপাশার ফোন। ভয়ে ভয়ে ফোন টা ধরে সৌমেন বলে, "হ্যাঁ, বল বিপাশা".. 
বিপাশা জিজ্ঞেস করে, "তুমি কোথায়?".. 
উত্তরে সৌমেন বলে, "হ্যাঁ, এইত একটু বাজারে বেরিয়েছি"... 
"ও আচ্ছা, ভাল হয়েছে। তাহলে, তোমাকে হোয়াটস্অ্যাপ করে দিচ্ছি, কিছু জিনিস কেনার আছে। ওগুলো কিনে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো"... বলেই বিপাশা সৌমেনের উত্তর না নিয়েই ফোন টা কেটে দেয়। 
সৌমেন বুঝতে পারে বিপাশা এখনও কতখানি রেগে আছে। 
সৌমেন তাড়াতাড়ি হেলমেট টা হাতে তুলে নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয়। জয়তী আর আটকায় না। সৌমেন জয়তী কে টা-টা করে দ্রুত বেরিয়ে যায় জয়তীর ফ্ল্যাট থেকে। জয়তী সৌমেনের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিজের ফাঁকা ফ্ল্যাটে ফিরে আসে। 

নিজেকে আবার নিঃসঙ্গ, একাকী লাগে জয়তীর। কিচ্ছু ভাল লাগছে না, আলো নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। ঘন্টা খানেক কেটে যায় এইভাবে। জয়তী এবার উঠে গিয়ে ঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে রাতের কোলকাতা শহরের আলোর রোশনাই। কিন্তু, তার মনের ভেতরটা শুধু জমাট অন্ধকার! 

জয়তী ভাবতে থাকে সৌমেনের কথা, বিপাশার কথা। যে সৌমেন কিছুক্ষণ আগে তার সাথে একই বিছানায় কাটাল, সেই সৌমেন বাড়ি ফিরে গিয়ে হয়ত বিপাশাকে বুকে টেনে নেবে। অথচ, বিপাশা কিছুই জানবে না। বিপাশার প্রতি তার রাগ হয় না, বরং তার হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হয়। পুরুষমানুষ কী চায় বিপাশার মত মেয়েরা জানে না। একাকী নিঃসঙ্গ মানুষেরা ঘুরে বেড়ায় একটু পার্থিব সুখের আশায়। তারা সম্পর্কের ফাটল খুঁজে বেড়ায়। সেই ফাটল দিয়ে তারা ঢুকে পড়ে কৌশলে। ঠিক যেমন করে জয়দীপ-জয়তীর ফাটল দিয়ে ঢুকেছে সৌমেন। আর সৌমেন-বিপাশার ফাটল দিয়ে দিয়ে ঢুকে পড়েছে জয়তী। এ যেন প্রাকৃতিক নিয়ম,এই নিয়ম বয়ে চলেছে আবহমানকাল... 

জয়তী ভেবে চলে,---
সময়ের ব্যবধানে,ঘাত-প্রতিঘাতে সম্পর্কের মধ্যে সৃষ্টি হয় ফাটল।আর,সেই ফাটল দিয়ে গলে যায় জল,..নাকি ঘোলাজল,..নাকি পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা হিমশীতল ঝরনার জল,হয়তো জানেনা সবাই এ জলের রহস্যের সন্ধান! 
শুধু,একটা অ্যামিবা থেকে আর একটা অ্যামিবার জন্মের মত এক সম্পর্কের ফাটল দিয়ে আর একটা সম্পর্ক গজিয়ে ওঠে কত স্বচ্ছন্দে,কী অনায়াস ভাবে...!

জয়তী ভাবে আর মিটিমিটি হাসে,..ভাবে আর হাসে...! 

   সাহিত্যিক দীপক বেরা
   হরিদেবপুর, টালিগঞ্জ, কলকাতা



















0 Comments