সুজিত রেজের নিবন্ধ


এই কথাটি মনে রেখো

বছরে শতখানেক নাটক দেখার সুযোগ অতি সৌভাগ্যের। নিশ্চিতরূপে অধমের মস্তকে ভরত-অ্যারিস্টটলের আশীর্বাদ।গুচ্ছেন নাটক দেখার নেপথ্য কারণ---"বাড়ির পাশে আরশিনগর" (রবীন্দ্রভবন)।কাঁকতালেই বলা যায়। ইচ্ছে হলে নাট্যবিরতিতে বৌয়ের হাতের চা-পানও সম্ভব। তাছাড়াও,নাটক দেখায় আমার কোনও বাছবিচার নেই। বড়-মেজো- সেজো-ন' সব দলেরই প্রযোজনায় হাজির হই।
আর নাটকের প্রতি প্যাশন যে তীব্র ;সেই ছোটবেলা থেকেই---যে'দিন ফুলকাকার রূপান্তর ও পরিচালনায় বঙ্কিমের " কপালকুণ্ডলা "-য় মা কালীর ভূমিকায় মঞ্চে উঠেছিলাম।তখন আমি ক্লাস টুয়ের ছাত্র।মেক্আপ করার পর আয়নায় রক্তাক্ত লোলজিহ্বা (দন্ত পিষ্ট টিনের পাত ) ও কালিবরণ দেখে কাপড়ে-চোপড়ে হয়েছিল।সেইদিন থেকেই---

মন মোর নাটকের সঙ্গী 
উড়ে চলে দিগ্‌দিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম॥

মন মোর হংসবলাকার পাখায় যায় উড়ে
ক্বচিৎ ক্বচিৎ চকিত তড়িত-আলোকে।
ঝঞ্জনমঞ্জীর বাজায় ঝঞ্ঝা রুদ্র আনন্দে।
কলকল কলমন্দ্রে নির্ঝরিণী
ডাক দেয় প্রলয়-আহ্বানে॥

বায়ু বহে পূর্বসমুদ্র হতে
উচ্ছল ছলো-ছলো তটিনীতরঙ্গে।
মন মোর ধায় তারি মত্ত প্রবাহে
তাল-তমাল-অরণ্যে
ক্ষুব্ধ শাখার আন্দোলনে॥

নাটক দেখতে গিয়ে কখনও চমকাই,কখনও দুঃখ পাই। নাট্যদলগুলির প্রযোজনার মান শেয়ার বাজারের সেনসেক্স-এর মতো ওঠানামা করে।শিল্পের স্বভাব বোধহয় তাই-ই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি হতাশ হই দর্শকের মান ও নগণ্য উপস্থিতি দেখে।কোনো কোনো দলের কল-শো দেখতে ভিড় উপচে পড়ে;আবার, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি আয়োজিত নাট্যোৎসবে ওই দলেরই,একই নাটক দেখার জন্য দর্শকদের মধ্যে কোনও উৎসাহ থাকে না,প্রবেশ অবাধ থাকলেও। হয়ত কল-শোর আয়োজন করে স্থানীয় কোনও সংস্থা বা সংগঠন;তাদের প্রচার ও কানাকানি প্রভাব ফেলে। 

চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় দর্শকদের একাধিক শ্রেণি চিহ্নিত করা যায। প্রথমত ,জাম্বু-দর্শক।নতুন বিয়ের পশালা-শালি-মাসশাশুড়ি- পিসশ্বশুর সহ সদলবলে নাটক দেখা। বিরতিতে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও,দু'হাতের মুঠোয় মোবাইলের সঙ্গে পাঁচ-ছ প্যাকেট ঘটি ভাজা নিয়ে,গলদঘর্ম দেহে জামাইবাবুর এন্ট্রি। দশ মিনিটের মধ্যে এক্সিটের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে বধূটির বিরহিনী হয়ে ওঠার মহড়াও চলে এই অবকাশেই।  সিনেমার বদলে নাটক বেছে নিয়ে নিজের রুচিবোধের প্রমাণ রাখার তাগিদও থাকে  জামাইবাবুর ষোলো আনা। 

দ্বিতীয়ত,হুজুগে- দর্শক। নাটক হচ্ছে,যাওয়া যাক। এঁদের অনেকেই,নাট্যবিরতিতে হিসি করতে গিয়ে আর ফিল্ডিং করতে পছন্দ করেন না। এঁদের সংলাপপ্রীতি তারিফ-যোগ্য। তবে শোনার চেয়ে বলার দিকে অতিমাত্রিক ঝোঁক। গম্ভীর ট্র্যাজেডিকে এঁরা অনায়াসে কমেডিতে রূপান্তরিত করে নেয়। ফলে, নিয়তির তাড়নায় ট্র্যাজিক নায়কের পৌরুষ যখন ভুলুণ্ঠিত,পাশের সিটের দর্শকের চোখ ছলছল,এঁরা তখন 'হেসে খলখল' । তালি দেওয়ার জন্য এঁদের হস্তযুগল সদাই উচাটন। 


তৃতীয়ত,মোবাইল-দর্শক।আমৃত্যু মোবাইলে চোখ রাখার ধনুক ভাঙা পণ এঁদের। নাটক শুরুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এঁরা বন্ধুদের হাঁড়ির খবর নিতে ব্যস্ত।ওল খেয়ে গলা কত ডিগ্রিতে কুটকুট করেছিল,বৌয়ের সর্দিতে বেলাডোনা কেন কাজ করছে না---নাটক তো শুরু হয়নি বলে নেওয়া যেতেই পারে।থার্ড বেল বাজার পর, ঘোষক যখন বলেন,অনুগ্রহ করে আপনার মোবাইল নিষ্ক্রিয় করে রাখুন, এঁরা শুধু 'বয়েই গেছে ' বলে না , কাঁচা খিস্তিও মারে। অভিনয়ের মাঝপথে এঁদের মোবাইল বেজে ওঠে: 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে '। প্রসঙ্গক্রমে, দুটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নেওয়া যেতে পারে।দুটিই চাঁটি মারার ঘটনা। চন্দননগর রবীন্দ্রভবনে নান্দীকারের      'অজ্ঞাতবাস '-এর অভিনয় চলাকালীন,এক দর্শকের মোবাইল বেজে উঠলে,রুদ্রপ্রসাদবাবু বিরক্ত হয়ে সাময়িক অভিনয় বন্ধ করে দেন। নাট্যবিরতির পরের অভিনয়ে ওই দর্শকেরই মোবাইল আবার জেগে ওঠে : 'মার ঝাড়ু মার ঝাড়ূ মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় কর '। পাশের দর্শক চার অক্ষরের কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলে ওঠেন: 'ঝাড়ু মেরে তোকেই হল থেকে বিদেয় করে দেব'।ঠিক তৎক্ষণাৎ,তাঁর বুকপকেটে আলো জ্বলে ওঠে। গান বেজে ওঠে :' তোমার হল শুরু আমার হল সারা '। এরপর শুধু  চাঁটি - চাঁটি-চড়চাপাটি। দ্বিতীয় চাঁটির ঘটনার সাক্ষী হলুম এই জানুয়ারিতেই। প্রথামাফিক থার্ড বেল বাজল। দর্শকদের উদ্দেশে মোবাইল নিষ্ক্রিয় করার অনুরোধ জানানো হল। ড্রপ সিন নড়ছে--- সরবে-সরবে করছে। মোবাইল বেজে উঠল। না কোনও গান নয় , বিএসএনএল মার্কা রিং টোন। ক্রি-ক্রি-ক্রি-----ং। একজন বয়স্কার গলা পাওয়া গেল :" যা বাবাঃ ! কোথায় রাখলাম রে ফোনটা "। একজন সহদর্শক বেশ জোরে চেঁচিয়ে বললেন :"বন্ধ করুন। অভদ্র "। ততক্ষণ বেশ কয়েকবার রিং হয়ে সুকণ্ঠী জানিয়ে দিলেন : দ্য পারসন য়ু আর কলিং , ইজ্ নট আনসারিং। আবার রিং---ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন। পাশের দর্শককে বললেন :" দেখুন তো , ডিসপ্লেতে কার নাম---আমি চোখে ভালো দেখি না "। ততক্ষণে তাঁর মাথায় চাঁটি পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বুঝে যাই নাটকও শুরু হয়ে গেছে।

চতুর্থত,সহৃদয়-দর্শক। এঁরা চান আগের তিন শ্রেণির দর্শকের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশাধিকার বন্ধ হোক। ভিড়ের সংসর্গে উপভোগ-বিব্রত হতে চান না তাই ।এঁরা  কিউবদ্ধ হয়ে হলে প্রবেশে সঙ্কোচ বোধ করেন।এঁরা যে নাট্যপরিধিতে স্বতন্ত্র গ্রহের জীব,তা তাঁদের চলন-ধরণ-করণ-গড়ন থেকে বোঝা যায়।এঁরা নগদ বিদায়ে প্রবেশপত্র গ্রহণে গড়িমসি করেন। নাট্যদলগুলির আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার প্রত্যাশায় তীর্থের কাকের মতো বসে থাকেন। নাট্য আকাদেমির সদস্য তো হলে কেল্লা ফতে ! নাটক শুরুর আগে ও সমাপ্তির পর সাজঘরে ঢুঁ মারেন। নাট্যবিরতিতে সিগরেটের ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে নাট্যার্ধ নিয়ে কচুকাটা করেন। পরার্ধে পরিণতির সম্ভাবনা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন। এঁরা মনে করে থাকেন,শিশির-শম্ভু-অজিতেশের পরে বাংলা নাট্য কলাবৌ। ঘোমটা তুলবে কে---কবে---জানার জন্য গণেশের দ্বারস্থ হয়ে লাভ নেই।এঁদের চলভাষ রুদ্ধ ,কটাক্ষ শুদ্ধ ,কথন দুর্বোধ্য।

এবার ছুঁচো গেলার পালা। পাশে বিসলারি রাখতেই হল। আমার আবার গলায় লকগেট। কখনও খাদ্যনালি , কখনও শ্বাসনালি খোলে  আবার অচানক বন্ধও হয়। তখন পিঠে -পেটে প্রেসার দিতে হয়। " পিঠে খেলে পেটে সয় '----প্রবচন উদ্ভবের  কারণ বুঝি এখন। ছুঁচো কেত্তন করতে - করতে কেমন পারা ভারত-নাট্যম দেখাবে ভগাই জানে। কেন না,প্রশ্ন ওঠা তো স্বাভাবিক  আমি  কোন শ্রেণির দর্শক।তার উত্তর না- দিয়ে শঙ্খ বাজানোই বুদ্ধিমানের কাজ  : 

তোমার কোনো ভিত্তি নেই 
তোমার কোনো শীর্ষ নেই                        
             কেবল তক্ষক
তোমার কোনো উৎস নেই
তোমার কোনো ক্ষান্তি নেই
               কেবল ছন্দ 
তোমার কোনো মিথ্যা  নেই
তোমার কোনো সত্য নেই
               কেবল দংশন
তোমার কোনো দৃষ্টি নেই
তোমার কোনো শ্রুতি নেই
                 কেবল সত্তা

তক্ষক প্রজাতির বলেই বিষ ঢালতে ইচ্ছে করে। তবে আমার ছোবল নেই। বিষ ঢেলে মেলে পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। পত্রিকা সম্পাদক বিষ জেনেও তা ধারণ করেন। পত্রিকার কয়েকটা পাতা নীল হয়ে যায়। নীল রং আমার খুব পছন্দের। অবশ্য সাদা নয়। সাদা কেউ নেই আর। এমনকী আমার বিধবা পিসিমার শাড়িটিও সাদা নয়। কেমন যেন হলদেটে ভাব। ময়লা বসতে বসতে, কাচতে কাচতে...। যাই হোক কাজের কথায় ফিরি।

একতরফা দর্শকদের অঙ্কুশবিদ্ধ করা সমীচীন নয়। নাটকের দর্শক হ্রাসের জন্য নাট্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের দায়ও কিছু কম নয়।
প্রথমত, বর্তমানে বাংলা নাটকের প্রযোজনার মান একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দু'একটি ছাড়া বাকিগুলি পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়। আবার উচ্চ মানের একটি প্রযোজনা উপহার দেওয়ার পর , সেই দলেরই পরবর্তী প্রযোজনার মুখ থুবড়ে পড়ার একাধিক উদাহরণ দেওয়া যায়। অর্থাৎ কোনও ধারাবাহিকতা নেই। এর ফলে দর্শক গাঁটের পয়সা খরচ করে হলে ঢুকতে ইতস্তত করছে। ঝুঁকি নেওয়ারও সাহস পাচ্ছে না। ফলে, নাটক দেখতে যাওয়ার আগে কানাকানি ও জানাজানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এবং এক্ষেত্রে ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা, কানাকানি যাঁরা করছে , তাঁদের মধ্যে জাম্বু-দর্শক কিংবা হুজুগে- দর্শকের সংখ্যাই বেশি। তাঁরা ' রবীন্দ্রসদন বা আকাদেমিতে নাটক দেখেছি ' , এই কথাটি বলবার জন্য চায়ের দোকানে তুফান তোলে।বন্ধুদের মজলিশে,কর্মস্থলে ফাটায়। ফাটাতে গিয়ে নাট্যদল -নাটক অপেক্ষা সিরিয়াল-খেকো অভিনেতা- অভিনেত্রীর নাম জপ করে। বারুদের মতো তা ছড়িয়ে পড়ে। রসিক দর্শকদের অধিকাংশই মৌনীবাবা হওয়ার ফলে,ভালো প্রযোজনা সেই তিমিরে অবগুন্ঠন খুলতে পারে না। আর জানাজানির জগতে বেশির ভাগ দলই ব্রাত্য। জানাজানির মাধ্যম রূপে সরকার পোষিত দু'দুটি পত্রিকা আছে। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি ও গ্রুপ থিয়েটার। কিন্তু তার পাতা দখলে যোগ্যতা অপেক্ষা রাজনীতি প্রধান মানদণ্ড রূপে বিবেচিত হয়। আর গণমাধ্যমগুলি নৈর্বক্তিক নয। স্বজনপোষণ মাত্রাতিরিক্ত। তাই চাঁদ মনসার কিসসার কাছে আরশিনগর ভেঙে পড়ে।

নাট্যদলের  নানা সীমাবদ্ধতার জন্যই নাট্য-প্রযোজনার মান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছুঁতে পারছে না। প্রথমেই চোখে পড়ে, অধিকাংশ দলেরই অর্থনৈতিক অবস্থা তথৈবচ। পান্তা ফুরোয় নুন আসে না। একটি উচ্চ মানের প্রযোজনার বাস্তব রূপদানে , প্রয়োজনীয় উপাদান -উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে,নাটক-নির্বাচনে খামতি লক্ষ করা যাচ্ছে। হাতের কাছে যা আছে,তা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার বদভ্যাস তৈরি হচ্ছে। মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জার রাশ টেনে ধরতে হচ্ছে। সবকিছুই প্রতীকি বলে চালিয়ে দেওয়ার চালাকি ধরা পড়ে যাচ্ছে। মোটামুটি ভদ্রভাবে নাটকটা করা যায় , এমন নাট্যশালা নির্বাচন আর্থিক কারণেই সম্ভব হচ্ছে না। গ্রাম-গঞ্জ-মফসসলের মানুষের কাছে একটি ভালো প্রযোজনা নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক প্রতিবন্ধকতাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। তাই কল-শো বন্ধ হতে বসেছে। ভালো নাটক দেখার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ভালো প্রযোজনার প্রচারের জন্য  বিজ্ঞাপনেরও প্রয়োজন। আর্থিক কারণেই নাট্যদলগুলি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম দূর ছাড় , সাধারণ মাধ্যমগুলিও ব্যবহার করতে পারছে না। কষ্ট করে কোনোরকমে দু'একবার বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্ভব হলেও ,আর্থিক সঙ্গতির কথা ভেবে অচিরেই ইতি টানতে হচ্ছে। স্বাবলম্বিতা না থাকায় সরকারের মুখ চেয়ে দিন গুনতে হচ্ছে। সময়ের অহেতুক অপচয় হচ্ছে। সরকারও উদার ও মহৎ দৃষ্টি নিয়ে বিষয়টি ভাবছে না। দু'একটি পেটোয়া দলকে কিঞ্চিৎ সাহায্য করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকছে।

ভালো প্রযোজনার জন্য চাই ভালো নাটক। ভালো নাটকের অভাব বড্ড বেশি চোখে পড়ছে। তার কারণ এককথায় বলা যায়, ভালো নাটককারের অভাব। কিন্তু এটুকু বললেই সব কথা বলা হয় না। অনেকটাই ফাঁক থেকে যায়। তুলনামূলকভাবে নাটক রচনা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে যে দুরূহ ,তা সংখ্যাতত্ত্বের সাহায্যে সহজেই প্রমাণ করা যায়। দু'চারটে কবিতা লেখেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জীবনঅভিজ্ঞতার গদ্যান্তরে কথাসাহিত্যের ভারও কিছু কম নয়। লিটল ম্যাগ সম্পাদকদের স্বল্প পরিসরে একাধিক লেখকদের স্থান দেওয়ার অভিসন্ধিতে অণু-পরমাণু গল্পের জোয়ার নেমেছে বঙ্গোপসাগরে। কিন্তু নাটক রচনায় এগিয়ে আসার লোকজনের বড়ই অভাব। অ্যারিস্টটল নাটকের পাঠ্যগুণ স্বীকার করলেও,মঞ্চপাটায় নাটক না কাচলে ময়লা যায় না। তার জন্য নাট্যপরিচালকদের পিছনে তৈলমর্দনে অনেকেরই অনীহা। আবার , মঞ্চসফল না হলে মুদ্রণসৌভাগ্য লাভ করা যায় না। ছোট পত্রিকা সহ কর্পোরেট পত্রিকাগুলিও নাটক ছাপার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না।
স্বাভাবিকভাবেই নাটক লেখার ইচ্ছে মনের ভিতর চাগিয়ে ওঠে না। ভালো নাটকের অভাব বোধ করে বহু নাট্যদলের কর্ণধার নাটক লিখতে শুরু করে। তাতে হিতে বিপরীতই হয়। কেননা, নিজের দলের শক্তি ও দুর্বলতায় নাটকের লেজ-ধড়-মুড়ো বিন্যাসের প্রবণতা চেপে বসে। দলে অভিনেত্রীর অভাব থাকলে নাট্যকাহিনি পুরুষমুখী হতে শুরু করে।উল্টোটাও হয়। দলে উচ্চমানের অভিনেতা বা অভিনেত্রী থাকলে ওয়ান ম্যান শো-এ পরিণত হয়। বিশেষ করে কর্ণধার পরিচালক ও প্রধান অভিনেতা হলে বিপত্তি আরও বাড়ে। নাটক ও নাট্যের মারপ্যাঁচে পাখি খাঁচাছাড়া হয়। 

ভালো নাটকের অভাবের আর এক কারণ,দিনকে দিন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত নাটককারের উটপাখি হয়ে যাওয়া। টিভি সিরিয়ালের ঠমক- গমক- ঝলকের গোলোকধাঁধায়, ভালো নাটক লেখার ক্ষমতা যাঁদের আছে, তাঁরা পড়েছেন বোকা বাক্সের খপ্পরে। অর্থও এখানে পরমার্থের কাজ করছে। ভালো নাটকের অভাবের আরও একটি কারণ,বর্তমান নাটককারেরা ভীরু, কাপুরুষ, সরকারের পদলেহনে অভ্যস্থ। ঝুঁকি নেওয়ার সাহস তাঁদের নেই। কালজয়ী নাটকগুলির দিকে নজর দিলে স্পষ্ট হয়,সমাজবীক্ষণ-পর্যালোচন-সমালোচনমূলক বিষয়ের গুরুত্ব। অথচ একুশ শতকে বাংলা নাটকে সমাজ উপেক্ষিত। সমাজ বলতে মেকি সমাজের নাট্যচিত্র বলতে চাইছি না। খগেনবাবুর মেয়ের সঙ্গে নগেনবাবুর ছেলের বিয়ের টানাপোড়েন আর যাই হোক, নাটকের বিষয় হতে পারে না। আমাদের চাই সেই সমাজ যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্কট- সংঘাত-সংগ্রাম বড়ো হয়ে দেখা দেয়। কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা বা সমালোচনার অভিমুখিনতা ছাড়াই মানুষের বেঁচে থাকার অসহায়তার গল্প বলাই যায় । এই ধরণের নাটকের সঙ্গে মানুষ একাত্ম হয় সার্বিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলার সমাজ-পরিবার সবই রাজনীতির ঘেরাটোপে বন্দী। ফলে, সমাজদর্পণ এহ বাহ্য। কেননা, দর্পণে তাদের মুখ ভাসবেই। এবং যেহেতু ঠগ-জোচ্চোর-ফেরেব্বাবাজ-তোলাবাজ-খুনি-ধর্ষক-প্রতারক-ভণ্ড রাজনৈতিক প্রতিনিধির সংখ্যাই বেশি, তাদের কীর্তিকলাপ নাটকে ফুটবেই। বিপরীত প্রতিক্রিয়ার ভারবহনক্ষমতা নাটককারদের নেই। তাদের কোনও গোষ্ঠী নেই। সংগঠন নেই। বন্ধুবান্ধবের দল বিপদ বুঝে সরে পড়বে। পাড়াপ্রতিবেশী মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে। দারা-পুত্র-পরিবার সমঝোতার পরামর্শই দেবে।খাল কেটে কুমির আনার জন্য গঞ্জনা। তাই জ্যান্ত নাটক লেখায় বিরত সকলেই। পরিবর্তে মধ্যবিত্তের বেয়াকুল রোমান্স, ফিচেল তদন্ত, লিবিডোর লীলা, মনখামারের আবর্জনা, শিরদাঁড়ার কাঁপনজ্বর, পুতুলপুতুলখেলা, চলছে-চলবে-হচ্ছে-হবের খেলা-মেলার মৃত মহোৎসব।

নাটকের নাট্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কুশীলবদের। গভীর শূন্যতা নেমে এসেছে সেখানে। তার প্রধান কারণ, আর্থিক নিরাপত্তার বালাই নেই। সিরিয়ালে মৃত সৈনিকও কিছু টাকা পায়। মফসসল শহর বা গ্রাম-গঞ্জে অভিনয়-জীবন বেছে নেওয়ার জন্য অনেকেই পস্তায়। তাই নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীর দেখা নেই। এক প্রবীণ অভিনেতা তোবড়া গাল নিয়েই বিল্বমঙ্গলের ভূমিকায়, মঞ্চের  চিন্তামণি তার মেয়ের বয়সী।বড্ড বেমানান লাগলেও তেতো বড়ির মতো আমাদের তাই-ই গিলতে হয়।আর এক অভিনেত্রী মেদবাহুল্যে মঞ্চে নড়াচড়ায় স্বচ্ছন্দ না হলেও, নান্দী থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করে কী যে প্রমাণ করতে চাইছেন, বোঝা দুষ্কর। এর জন্য তাদের কাঠগড়ায় তোলাও সমীচীন নয়। নতুন ছেলেমেয়ে কই। মোবাইল-খেকো নতুন প্রজন্ম বাস্তব অভিজ্ঞতা- শূন্য ঘাটের মড়াকাঠ। পরিবারের সঙ্গেও সংযোগ ছিন্ন তারের মতো ঝুলে। মায়ের হাসি-খুশি-সর্দিকাশি-জ্বরের খবর তখনই তারা পায় যখন কেউ বলে। পাড়ার ভেতরে চলনবলন বেপাড়ার অনাহুত চিত্তের বোহেমিয়ান ছোকরার মতো।আগুন লাগলে পিঠ ফিরে শোয়। সমাজ কারে কয় জানে না।সভ্যতা-ভব্যতার ধার ধারে না। নিশ্চিন্তে গুটিপোকাজীবন লালনপালন করার ফলে প্রজাপতি হয়ে ওঠার আকুতি দেখা যায় না। আপন হতে বাহির হয়ে  বাইরে না দাঁড়ালে অভিনয় সম্ভব নয়।বিশেষ করে মঞ্চে। জীবনের আসল রূপকে নকল করে আসলের মতো করে তোলার কাজটি অত সহজ নয়। 

তাছাড়াও এই প্রজন্ম মহৎ আদর্শ বিচ্যুত, ভূতগ্রস্থ।সুস্থ সংস্কৃতি নিবেদিত যৌবনপ্রাণের বড়ই অভাব। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় কারণে বাঙালির সংস্কৃতিচর্চায় ধরেছে ঘুণ। অর্কেস্ট্রা-ডিজে কালচারের অসুস্থ বৈভবে উঠেছে নাভিশ্বাস।পাড়ার পুজো থেকে বিয়েবাড়ি, কলেজের নবীনবরণ সহ বাৎসরিক নানা অনুষ্ঠানে পরিযায়ী পাখির আগমন। উৎকট ব্রজ্যে দূষণের মাত্রা সীমাহীন। সংস্কৃতি দূষিত হলে মানুষের বৌদ্ধিক-আধ্যাত্মিক- মানসিক বিকাশ এবং মৌলিক চিন্তন মুখ থুবড়ে পড়ে। জগতের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ এলেও যোগ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না কিংবা যোগ দিলেও অঞ্জলি পেতে গ্রহণের মানসিকতা থাকে না। 

বিষ ঢালা শেষ।আর বিষ নেই। জমতে সময় লাগবে। তাছাড়া আমার বিষ দাঁতে নেই , আছে জিভে। অনেকদিন জিভ ছুলিনি। স্বাদগ্রন্থিগুলো বুজে গেছে। 

 সাহিত্যিক সুজিত রেজ
                         চুঁচুড়া, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ




0 Comments