
উত্তরাধিকার
নীল রঙের পেনটাকে এমন ভাবে আঁকড়ে ধরলেন সুলোচনাদেবী,যেন এই পেনটা হাতে থাকলে সব যুদ্ধ জিতে যাবেন তিনি। এই পেনটা যে তার হাতে তুলে দিয়েছে, তার ইচ্ছা শক্তি যেন তরী হয়ে তাকে এই পরীক্ষাসাগর পার করে দেবে। প্রশ্নপত্র আর উত্তরপত্র দুটোই দেওয়া হয়ে গেছে পরীক্ষার্থীদের।নানা বয়সের পরীক্ষার্থীরা নিঃশব্দে লেখা শুরু করে দিয়েছে । পাখা- ঘোরার শব্দ,কাগজের শব্দ,আর একটু আধটু ফিসফাস ;এই সব ছাপিয়ে তিনি শুনতে পাচ্ছেন তার হৃদপিন্ডের প্রবল শব্দ।আজ যার জন্য তিনি এই পরীক্ষাকেন্দ্রে সে কি এখনো বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছে ...এই লড়াইটা যে তারও। সুলোচনা দেবী একবার চোখ বন্ধ করে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করার মতো ইমনের মুখটা মনে করেন তারপর উত্তরপত্রে নীল পেনের আঁচড় কাটেন।
সুলোচনাদেবী উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর শমীন্দ্রনাথের বাড়ি থেকে যখন বিয়ের প্রস্তাব আসলো,এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা।কিন্তু তখন আপাদমস্তক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়া সুলোচনাদেবীর দুচোখে স্বপ্ন বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক হবেন। কিন্তু তার মতামত কেউ জানতে চাইল না।বেনারসি আর গহনার সাজে নতুন বউ হয়ে চোখের জল মুছে তিনি পা রাখলেন শমীন্দ্রনাথের সংসারে। লক্ষ্মীমন্ত বউ হয়ে স্বামী- শ্বশুর-শাশুড়ি- দেওর -পুত্র নিয়ে সংসারের কাজের ভিড়ে মনের অতলে ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন বাংলা সাহিত্যে স্নাতক হওয়ার স্বপ্নকে। শমীন্দ্রনাথ বউকে মাঝে মাঝে গল্পের বই কিনে এনে দিতেন আর বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সাত রাজার ধন মানিক পাওয়ার খুশি দেখতেন।
সময়ের সাথে সাথে সংসার ছোট হতে থাকলো। একদিন শমীন্দ্রনাথও চলে গেলেন।একমাত্র ছেলে বাপ্পাকে নিয়ে মা ছেলের ছোট সংসারে বাপ্পা একদিন বউ করে আনল মা-মরা ইমনকে। কালো রোগা সাধারণ চেহারার মেয়েটাকে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই মেয়েটা জাদু জানে ।বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সে আবিষ্কার করে ফেলল শাশুড়িমা'র ত্রিশ বছরের ঘুমন্ত স্বপ্নটাকে। তারপর শুরু হল তার অত্যাশ্চর্য জাদু প্রদর্শনী।মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে কলেজ স্ট্রিটের শতদল কোচিং সেন্টার ...যোগাড় হয়ে গেল প্রাইভেটে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশুনোর নিয়মাবলী, সেইমতো সব কাজও হয়ে গেল ইমনের জাদুমন্ত্রে। সুলোচনাদেবী হতভম্ব হয়ে অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে দেখেন এই কর্মকাণ্ড।
তারপর আত্মীয় - প্রতিবেশী সবার ব্যঙ্গ সমালোচনা হাসাহাসি উপেক্ষা করে চলল ইমনের সাধনা ।ইমনের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সুলোচনাদেবীর সমস্ত অবিশ্বাস লজ্জা ভয় আস্তে আস্তে হয়ে উঠলো পিছনে ফেলে আসা স্বপ্নকে সত্যি করার প্রবল ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস। কৈশোরের উৎসাহ নিয়ে রাত জেগে পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করলেন সুলোচনা দেবী।তাঁর জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিদ্যাসাগরের জীবনের উপর ডক্টরেট করা ইমনের ঈশ্বর বিদ্যাসাগর।সেই ঈশ্বরের হার- না- মানা জীবনযুদ্ধের কথা বলে অনুপ্রাণিত করে সে শাশুড়িমা'কে। সুলোচনাদেবীর ঠাকুর আর ইমনের ঈশ্বরের হাত ধরে শুরু হয় সাধনা...আঁধার থেকে আলোর জগতে যাত্রাপথের যুগ যুগান্তের উত্তরাধিকারের সাধনা...।
সেই সাধনার পরীক্ষা আজ ।এই পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢোকার মুখেই রয়েছে বিদ্যাসাগরের প্রস্তর মূর্তি। নিজের অজান্তেই সুলোচনাদেবী দুই হাত ঠেকিয়েছেন কপালে। তারপর ইমনের দেওয়া নীল পেনটা নিয়ে ঢুকেছেন পরীক্ষাহলে।
খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এলেন সুলোচনাদেবী। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন,ইমন দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যাসাগরের মূর্তির পাদদেশে।রোদে চকচক করছে তার মুখ ।ইমনের সাথে মূর্তির মুখের আদলে কোথায় যেন একটা মিল দেখতে পাচ্ছেন সুলোচনাদেবী। মহাজীবনের উত্তরাধিকার বহতা নদীর মত বয়ে চলে ...ছুঁয়ে যায় গতানুগতিক জীবনের তটভূমি ...তাতে নতুন বীজ বপন করে চলে আশ্চর্য জাদুমন্ত্রে...।



0 Comments