
উত্তরণ
প্রথম পর্ব
কদিন ধরে শুধু ভেবেছে শ্রীজিতা।যতো ভেবেছে ততোই অস্থিরতা বেড়ে গেছে।মনের অবসাদে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে।শেষ পর্যন্ত সেলফোনটা নিয়ে নম্বরটা টিপেই দিলো।ফোনের ওপ্রান্তে রিং শুরু হলো। কিন্তু,তার হাত ঘেমে যাচ্ছে কেন ! ভাবতে ভাবতেই ওপ্রান্ত থেকে গভীর কণ্ঠ ভেসে এলো--' hello? '
মুহূর্তের জন্যে শ্রীজিতার মনে হলো ফোনটা কেটে দেয়।আবার-' hello,কে? কথা বলছেন না কেন ? কাকে চাইছেন ?'
শ্রীজিতা---' তোমাকে প্রীতম, তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। দেখা হওয়াটা আমার বড়ো দরকার। '
প্রীতম---- ' কিন্তূ ,আমিতো আপনাকে তেমন ভাবে জানিনা। অপরিচিতা আপনি।কি এমন দরকার ?'
শ্রীজিতা যেন মরমে মরে গেল।নিজের ওপর নিজের
কদিন ধরে শুধু ভেবেছে শ্রীজিতা।যতো ভেবেছে ততোই অস্থিরতা বেড়ে গেছে।মনের অবসাদে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে।শেষ পর্যন্ত সেলফোনটা নিয়ে নম্বরটা টিপেই দিলো।ফোনের ওপ্রান্তে রিং শুরু হলো। কিন্তু,তার হাত ঘেমে যাচ্ছে কেন ! ভাবতে ভাবতেই ওপ্রান্ত থেকে গভীর কণ্ঠ ভেসে এলো--' hello? '
মুহূর্তের জন্যে শ্রীজিতার মনে হলো ফোনটা কেটে দেয়।আবার-' hello,কে? কথা বলছেন না কেন ? কাকে চাইছেন ?'
শ্রীজিতা---' তোমাকে প্রীতম, তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। দেখা হওয়াটা আমার বড়ো দরকার। '
প্রীতম---- ' কিন্তূ ,আমিতো আপনাকে তেমন ভাবে জানিনা। অপরিচিতা আপনি।কি এমন দরকার ?'
শ্রীজিতা যেন মরমে মরে গেল।নিজের ওপর নিজের
ই বিরক্ত লাগছিল। সেই বিরক্তিতে তার কণ্ঠস্বর কি একটু কঠিন হলো ?
--- হ্যাঁ, দরকার তো একটু আছেই আর তাইতো ফোন।
--- কিন্তু আমি তো এখন খুব ই ব্যস্ত।
--- ব্যস্ততার মধ্যেও আধঘন্টা সময় বার করা যায়।শ্রীজিতার কথায় একটু জেদ প্রকাশ পেল।
--- যদি তোমার অসুবিধে থাকে তাহলে আমি নাহয় তোমার সাথে গিয়ে দেখা করি।ফোনের ওপ্রান্তে প্রীতম এবার একটু থমকে গেল।প্রথমে ভেবে পেলনা কি বলবে।তারপর বললো
--- ঠিক আছে। কোথায় দেখা করতে চান ?
শ্রীজিতা জবাব দিলো--- রাস্তায় বা কোনো পাবলিক প্লেসে নিশ্চয় নয়।যদি তোমার আপত্তি বা অসুবিধে না থাকে তাহলে আমার বাড়ির ঠিকানা এবং ডিরেকশন দিয়ে দিচ্ছি।
--- ঠিক আছে, সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ আসছি।বলেই আবার জানতে চাইলো, কিন্তু আপনার বাড়ির লোক, তাদের কোনো প্রশ্ন হবে না ?
শ্রীজিতা--- সেটা আমার ব্যাপার।আর শ্রীজিতা মিত্র ড্রয়িং রুমে কার সাথে বসে কথা বলছে,সে ব্যাপারে কেউ কৌতুহল প্রকাশ করার সাহস দেখাবে না।
University র lecturer শ্রীজিতা মিত্রর কাছে অনেকেই আসে নানা প্রয়োজনে।
প্রীতমের মনে হলো এবার একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।আর যাই হোক একজন লেকচারার ভদ্রসম্মত
--- হ্যাঁ, দরকার তো একটু আছেই আর তাইতো ফোন।
--- কিন্তু আমি তো এখন খুব ই ব্যস্ত।
--- ব্যস্ততার মধ্যেও আধঘন্টা সময় বার করা যায়।শ্রীজিতার কথায় একটু জেদ প্রকাশ পেল।
--- যদি তোমার অসুবিধে থাকে তাহলে আমি নাহয় তোমার সাথে গিয়ে দেখা করি।ফোনের ওপ্রান্তে প্রীতম এবার একটু থমকে গেল।প্রথমে ভেবে পেলনা কি বলবে।তারপর বললো
--- ঠিক আছে। কোথায় দেখা করতে চান ?
শ্রীজিতা জবাব দিলো--- রাস্তায় বা কোনো পাবলিক প্লেসে নিশ্চয় নয়।যদি তোমার আপত্তি বা অসুবিধে না থাকে তাহলে আমার বাড়ির ঠিকানা এবং ডিরেকশন দিয়ে দিচ্ছি।
--- ঠিক আছে, সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ আসছি।বলেই আবার জানতে চাইলো, কিন্তু আপনার বাড়ির লোক, তাদের কোনো প্রশ্ন হবে না ?
শ্রীজিতা--- সেটা আমার ব্যাপার।আর শ্রীজিতা মিত্র ড্রয়িং রুমে কার সাথে বসে কথা বলছে,সে ব্যাপারে কেউ কৌতুহল প্রকাশ করার সাহস দেখাবে না।
University র lecturer শ্রীজিতা মিত্রর কাছে অনেকেই আসে নানা প্রয়োজনে।
প্রীতমের মনে হলো এবার একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।আর যাই হোক একজন লেকচারার ভদ্রসম্মত
মানুষ ই হবেন।তার বিরক্তি অনেকটাই কেটে গেল, সেখানে কৌতুহল তৈরি হলো।
বিকেলে সে বেড়িয়ে পড়লো বাইকটা নিয়ে।
শ্রাবণের সন্ধ্যা একটু তাড়াতাড়ি আসে।কাজের মেয়ে আরতি চারদিকের আলোগুলো জ্বালিয়ে দিলো।
শ্রীজিতার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, সুঠাম, মেদহীন চেহারা, ফর্সা ,সুন্দর মুখশ্রী।পরনে কালো পাড় বাসন্তী ডুড়ে শাড়ি, কপালে কালো টিপ,নিটোল দুটি হাতে সোনার বাংলা,গলায় সরু একটি চেন। কাঁধ অবধি ছাঁটা চুলে,বলা যায় রীতিমত সুন্দরী।অনেক লোকের ভীড়েও সহজেই চোখে পড়ে।এই বয়সেও অনেক যুবতীর ঈর্ষা র কারণ হয়ে ওঠে।
প্রীতম দক্ষিণাপণের সামনে পৌঁছে গেল পনেরো মিনিটে। ঠিক উল্টোদিকের বড়ো রাস্তাটাই দেবেন ঠাকুর রোড।বাইকটা এসে থামলো সতেরো নম্বর বাড়ির সামনে। আগেকার দিনের পুরোনো বাড়ি,সামনে বাগান,লাল সুরকি ফেলা পথ।
বেল বাজার সাথে সাথেই দরজা খুলল আরতি,ভিতরে নিয়ে এসে বসার ঘরে বসালো। প্রীতম সোফায় বসে ঘরের চারদিকে দেখতে লাগলো। আগেকার দিনের ঘর, আধুনিক ফ্ল্যাটের দুটো ঘরের থেকেও বড়ো, লাল রঙের মেঝে।ঘরের সবকিছু রুচি সম্মত ভাবে সাজানো এবং সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া।
প্রীতমের ভালো লাগাটা একটু অন্যভাবে এলো।।ভাবতে ভাবতেই মাঝের দরজাটার পর্দা সরিয়ে যিনি এসে দাঁড়ালেন,তাকে দেখে প্রীতম অভিভূত ও বিস্মিত হলো।ব্যাক্তিত্বময়ী এক রমণী র এমন প্রবেশে সে যেন উঠে দাঁড়ানোর ভদ্রতাটাও ভুলে গেল।তারপর সম্বিত পেয়ে উঠে দাঁড়ালো।
শ্রীজিতা একটু ভারি অথচ কোমল কণ্ঠে তাকে বসতে বললো।বসার পর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙে প্রীতম ই প্রথম বলে উঠলো --- আপনি আসতে বলেছিলেন---------
শ্রীজিতার গলায় কান্না আটকে আসছে কেন? সকাল থেকে নেওয়া প্রস্তুতি এমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন ? সে যেন একটা পুতুলের মতো বসে থাকলো তারপর বাইরে থেকে আরতির ' দিদি ' ডাক শুনে সম্বিত ফিরে পেল।
বিকেলে সে বেড়িয়ে পড়লো বাইকটা নিয়ে।
শ্রাবণের সন্ধ্যা একটু তাড়াতাড়ি আসে।কাজের মেয়ে আরতি চারদিকের আলোগুলো জ্বালিয়ে দিলো।
শ্রীজিতার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, সুঠাম, মেদহীন চেহারা, ফর্সা ,সুন্দর মুখশ্রী।পরনে কালো পাড় বাসন্তী ডুড়ে শাড়ি, কপালে কালো টিপ,নিটোল দুটি হাতে সোনার বাংলা,গলায় সরু একটি চেন। কাঁধ অবধি ছাঁটা চুলে,বলা যায় রীতিমত সুন্দরী।অনেক লোকের ভীড়েও সহজেই চোখে পড়ে।এই বয়সেও অনেক যুবতীর ঈর্ষা র কারণ হয়ে ওঠে।
প্রীতম দক্ষিণাপণের সামনে পৌঁছে গেল পনেরো মিনিটে। ঠিক উল্টোদিকের বড়ো রাস্তাটাই দেবেন ঠাকুর রোড।বাইকটা এসে থামলো সতেরো নম্বর বাড়ির সামনে। আগেকার দিনের পুরোনো বাড়ি,সামনে বাগান,লাল সুরকি ফেলা পথ।
বেল বাজার সাথে সাথেই দরজা খুলল আরতি,ভিতরে নিয়ে এসে বসার ঘরে বসালো। প্রীতম সোফায় বসে ঘরের চারদিকে দেখতে লাগলো। আগেকার দিনের ঘর, আধুনিক ফ্ল্যাটের দুটো ঘরের থেকেও বড়ো, লাল রঙের মেঝে।ঘরের সবকিছু রুচি সম্মত ভাবে সাজানো এবং সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া।
প্রীতমের ভালো লাগাটা একটু অন্যভাবে এলো।।ভাবতে ভাবতেই মাঝের দরজাটার পর্দা সরিয়ে যিনি এসে দাঁড়ালেন,তাকে দেখে প্রীতম অভিভূত ও বিস্মিত হলো।ব্যাক্তিত্বময়ী এক রমণী র এমন প্রবেশে সে যেন উঠে দাঁড়ানোর ভদ্রতাটাও ভুলে গেল।তারপর সম্বিত পেয়ে উঠে দাঁড়ালো।
শ্রীজিতা একটু ভারি অথচ কোমল কণ্ঠে তাকে বসতে বললো।বসার পর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙে প্রীতম ই প্রথম বলে উঠলো --- আপনি আসতে বলেছিলেন---------
শ্রীজিতার গলায় কান্না আটকে আসছে কেন? সকাল থেকে নেওয়া প্রস্তুতি এমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন ? সে যেন একটা পুতুলের মতো বসে থাকলো তারপর বাইরে থেকে আরতির ' দিদি ' ডাক শুনে সম্বিত ফিরে পেল।
২য় পর্ব
শ্রীজিতা আরতিকে চা এর কথা বলে এসে বসলো।না,এবার আর সময় নিল না,আচমকা ই প্রীতমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
--- তোমার কাছে আমি এত ব্রাত্য কেন ? কেন ই বা এত রাগ আমার ওপর ? ফোনে তুমি আমাকে বলেছো---- আমি অচেনা, অজানা একজন সিনিয়র অপরিচিতা মহিলা।চেন না যখন এত কথা আমার সম্বন্ধে বললে কি করে ? বোঝা যাচ্ছিল যে,এর পূর্বে দুজনের ভিতরে কিছু অসঙ্গত কথাবার্তা হয়েছে।
প্রীতমের মুখে কোনো কথা নেই।
এরমধ্যে আরতি খাবারের ট্রে আর চা নিয়ে ভিতরে এসেছে।অতিথি আপ্যায়নে তার কোনো ত্রুটি নেই। খুব ছোট বেলা থেকেই সে তার মায়ের সাথে এবাড়িতে এসেছে। হঠাৎ মা মারা যেতে অনাথ মেয়েটিকে শ্রীজিতার বাবা ই মানুষ করেছেন।এমনকি ক্লাস এইট পর্যন্ত সে পড়াশোনা করেছে।শ্রীজিতার বাবা দেবরঞ্জনের কাছে আরতি ও ছিল মেয়ের মতো।
এবাড়ির আদব কায়দা তার সব ই জানা।শ্রীজিতার মন সে আয়নার মতো পড়তে পারে।তাই মাঝের গোল পাথরের টেবিলের ওপর সব সাজিয়ে রাখতে রাখতে তার চোখ শ্রীজিতাকে পড়ে নিল।
ভীষনই ব্যতিক্রমী মনে হলো তার, শ্রীজিতার মেঘ থমথমে মুখখানা।তার মনে হলো কিছু একটা অন্যরকম ঘটে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুদে অধ্যাপিকা,যার সামনে ছাত্র ছাত্রী রাচোখ তুলে কথা বলতে পারেনা,তার মুখ হঠাৎ কেন এত অভিমান ভারাক্রান্ত।সব সাজিয়ে দিয়ে আরতি বেড়িয়ে গেল একটু চিন্তিত মনে।
---- শ্রীজিতা চায়ের কাপ টা প্রীতমকে এগিয়ে দিয়ে বলল--- চা খাও।
গলার স্বরে যেন একটু মৃদু কম্পন মনে হলো প্রীতমের।চা এর কাপটা হাতে নিতে নিতে সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই শ্রীজিতা বলে উঠলো,যেন কতকটা আপন মনেই
---- তোমার সাথে আমার পরিচয় টা অবশ্য দু একটা হালকা ছেঁড়া কথার মাধ্যমে এবং তার দূত ছিল এই ফোনটা।
প্রথম থেকেই তোমার মুখোমুখি হবার ইচ্ছা আমার ছিল না।আমি ভেবেছিলাম থাক না একটা ছায়াময়, কল্পনার সম্পর্ক। তুমি নাহয় নাইবা দেখলে আমায় বাস্তবের মাটিতে। বন্ধুত্ব ই বলো আর ভালোলাগার আবেগের সম্পর্ক ই বলো, সেভাবেই থাকতো। আমি তো ষোড়শী নয়,বা সদ্য কলেজে পড়া তরুনী ও নয়।সে বয়স তো কবেই পার করে এসেছি দুজন। তাছাড়া তোমার পরিবার আছে ,সন্তান ও আছে নিশ্চয়ই।কেন ই বা আমি তাদের সান্নিধ্য থেকে সরিয়ে আনবো।সেটা বড়ো অধর্ম হবে। আমার আভিজাত্যের অহঙ্কার আমাকে এত নীচে নামতেই দেবে না। কিন্তু আমার ভাগ্য। আমাকেই ডাক দিতে হলো প্রথমে।বসতে হলো তোমার মুখোমুখি।নিজের মুখে বলতে হলো--- অনেক কঠিন লড়াই জিতে আসা শ্রীজিতা মিত্র,নিজের সঙ্গে লড়াই এ নিজের কাছে পরাজিত
স্পষ্টতই শ্রীজিতার গলায় স্বর কেঁপে গেল,চোখে জল এসে গেল।
বিব্রত প্রীতম বুঝে উঠতে পারছিল না,কি উত্তর সে দেবে।
---- তুমি তো বলে ছিলে জীবন মানে তোমার কাছে একটা তামাশা। সেই তামাশা র নিশানা কি আমি হলাম ?
শ্রীজিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
প্রীতম কথাগুলোর কোনো জবাব ই দিতে পারলো না।তার কি কিছুই বলার নেই ? সে জানতো ফোনের মাধ্যমে আলাপ হলেও শ্রীজিতার মনে তার প্রতি এক নিরুচ্চারিত ভালোবাসা আছে। অস্বীকার করতে পারে না নিজের গোপন অনুভূতিকে ও।
৩য় পর্ব
শ্রীজিতা আরতিকে চা এর কথা বলে এসে বসলো।না,এবার আর সময় নিল না,আচমকা ই প্রীতমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
--- তোমার কাছে আমি এত ব্রাত্য কেন ? কেন ই বা এত রাগ আমার ওপর ? ফোনে তুমি আমাকে বলেছো---- আমি অচেনা, অজানা একজন সিনিয়র অপরিচিতা মহিলা।চেন না যখন এত কথা আমার সম্বন্ধে বললে কি করে ? বোঝা যাচ্ছিল যে,এর পূর্বে দুজনের ভিতরে কিছু অসঙ্গত কথাবার্তা হয়েছে।
প্রীতমের মুখে কোনো কথা নেই।
এরমধ্যে আরতি খাবারের ট্রে আর চা নিয়ে ভিতরে এসেছে।অতিথি আপ্যায়নে তার কোনো ত্রুটি নেই। খুব ছোট বেলা থেকেই সে তার মায়ের সাথে এবাড়িতে এসেছে। হঠাৎ মা মারা যেতে অনাথ মেয়েটিকে শ্রীজিতার বাবা ই মানুষ করেছেন।এমনকি ক্লাস এইট পর্যন্ত সে পড়াশোনা করেছে।শ্রীজিতার বাবা দেবরঞ্জনের কাছে আরতি ও ছিল মেয়ের মতো।
এবাড়ির আদব কায়দা তার সব ই জানা।শ্রীজিতার মন সে আয়নার মতো পড়তে পারে।তাই মাঝের গোল পাথরের টেবিলের ওপর সব সাজিয়ে রাখতে রাখতে তার চোখ শ্রীজিতাকে পড়ে নিল।
ভীষনই ব্যতিক্রমী মনে হলো তার, শ্রীজিতার মেঘ থমথমে মুখখানা।তার মনে হলো কিছু একটা অন্যরকম ঘটে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুদে অধ্যাপিকা,যার সামনে ছাত্র ছাত্রী রাচোখ তুলে কথা বলতে পারেনা,তার মুখ হঠাৎ কেন এত অভিমান ভারাক্রান্ত।সব সাজিয়ে দিয়ে আরতি বেড়িয়ে গেল একটু চিন্তিত মনে।
---- শ্রীজিতা চায়ের কাপ টা প্রীতমকে এগিয়ে দিয়ে বলল--- চা খাও।
গলার স্বরে যেন একটু মৃদু কম্পন মনে হলো প্রীতমের।চা এর কাপটা হাতে নিতে নিতে সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই শ্রীজিতা বলে উঠলো,যেন কতকটা আপন মনেই
---- তোমার সাথে আমার পরিচয় টা অবশ্য দু একটা হালকা ছেঁড়া কথার মাধ্যমে এবং তার দূত ছিল এই ফোনটা।
প্রথম থেকেই তোমার মুখোমুখি হবার ইচ্ছা আমার ছিল না।আমি ভেবেছিলাম থাক না একটা ছায়াময়, কল্পনার সম্পর্ক। তুমি নাহয় নাইবা দেখলে আমায় বাস্তবের মাটিতে। বন্ধুত্ব ই বলো আর ভালোলাগার আবেগের সম্পর্ক ই বলো, সেভাবেই থাকতো। আমি তো ষোড়শী নয়,বা সদ্য কলেজে পড়া তরুনী ও নয়।সে বয়স তো কবেই পার করে এসেছি দুজন। তাছাড়া তোমার পরিবার আছে ,সন্তান ও আছে নিশ্চয়ই।কেন ই বা আমি তাদের সান্নিধ্য থেকে সরিয়ে আনবো।সেটা বড়ো অধর্ম হবে। আমার আভিজাত্যের অহঙ্কার আমাকে এত নীচে নামতেই দেবে না। কিন্তু আমার ভাগ্য। আমাকেই ডাক দিতে হলো প্রথমে।বসতে হলো তোমার মুখোমুখি।নিজের মুখে বলতে হলো--- অনেক কঠিন লড়াই জিতে আসা শ্রীজিতা মিত্র,নিজের সঙ্গে লড়াই এ নিজের কাছে পরাজিত
স্পষ্টতই শ্রীজিতার গলায় স্বর কেঁপে গেল,চোখে জল এসে গেল।
বিব্রত প্রীতম বুঝে উঠতে পারছিল না,কি উত্তর সে দেবে।
---- তুমি তো বলে ছিলে জীবন মানে তোমার কাছে একটা তামাশা। সেই তামাশা র নিশানা কি আমি হলাম ?
শ্রীজিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
প্রীতম কথাগুলোর কোনো জবাব ই দিতে পারলো না।তার কি কিছুই বলার নেই ? সে জানতো ফোনের মাধ্যমে আলাপ হলেও শ্রীজিতার মনে তার প্রতি এক নিরুচ্চারিত ভালোবাসা আছে। অস্বীকার করতে পারে না নিজের গোপন অনুভূতিকে ও।
৩য় পর্ব
প্রীতম রায়--- ভালো বংশের ছেলে। মধ্যবয়স্ক জীবনের এক ছন্নছাড়া, দিকভ্রান্ত পুরুষমানুষ। জীবনের সুখ-দুঃখ হতাশা- হাহাকারে অভিঞ্জ, ক্লান্ত শ্রান্ত একটা মানুষ। সুঠাম চেহারা, গভীর সুরেলা কণ্ঠস্বর আর চোখদুটো মায়াময় স্বপ্ন জড়ানো।মা কে নিয়ে তার পারিবারিক জীবন যাপন,যেটা শ্রীজিতা সাম্প্রতিক কালে জেনেছিল এবং তখন থেকেই প্রীতম কে ফোন করার কথা ভেবেছিল।সে নিজের স্বাধীন পেশায় যুক্ত।
জীবনটাকে সে তামাশা হিসেবেই দেখে।শ্রীজিতার সাথে আলাপকালে সেই ছোট,ছোট কথার তামাশা দিয়েই শুরু হয়েছিল।যার শেষটা শ্রীজিতার কাছে তামাশা থাকলোনা, পরিবর্তে গভীর ভালোলাগায় রূপান্তরিত হয়ে গেল।
সে সম্বন্ধে প্রীতম যে একেবারে অন্ধকারে ছিল, একথা বললে ভুল হবে।তার ও মনের কোণে কোথাও তো একটু দাগ কেটেছিল। তবু সে সেটা গ্রাহ্য করেনি।হয়তো পছন্দটা তার জীবনের সাথে খাপ খাবে না তাই ভেবেছিল।আর যেটা ভেবেছিল সেটা হলো ' বয়স ' ।তার কেন যে মনে হয়েছিল মহিলা অনেক বয়স্ক।আজ নিজেই শ্রীজিতার মুখোমুখি হয়ে সে বিব্রত বোধ করছে।
কিন্তু শ্রীজিতার ঝড়ের মতো অভিযোগের বাতাসে সে দাঁড়াতে পারছে না।
শ্রীজিতা মেনে নিতে পারছিল না প্রীতমের এমন নীরব থাকা।তার মনে হলো প্রীতম তার স্বভাব বশতঃ ই উত্তর দিচ্ছে না। রাগে দুঃখে অভিমানে তার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল।
তবু নিজেকে সংযত করে সে বললো
---- তুমি তো কোনো কথাই বললে না। হয়তো তোমার কিছু বলার নেই।অবশ্য বলার দায়বদ্ধতা ও নেই।তবু। আমার একটা জবাব দরকার ছিল।কারণ ভালোলাগার কল্পনায় অনেক দিন কেটে গেছে,এখন আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চাই।
পিছু হঠতে ,হঠতে আমি একটা গভীর অন্ধকার খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি, ফিরে যাবার কোনো পথ ই নেই।
এবার প্রীতম যেন একটু সচেতন হলো। তার কানে ' কঠিন সিদ্ধান্ত ' কথাটা বিশেষ ভাবে বাজলো।সে যেন একটা অজানা আশঙ্কায় সচকিত হলো।জিঞ্জাসা করল
---- আপনি ঠিক কি ভাবছেন বা বলতে চাইছেন, প্লিজ আমাকে খুলে বলুন।
আসলে প্রীতমের মনে হলো --- একহাত দূরে বসে থাকা এই মহিলার হাতটা নিজের হাতে নেয়।বুঝিয়ে দেয় যে,তার মনেও অনেক দোলাচল আছে।সে ও এই সম্পর্ক টা এক কথায় সরিয়ে দিতে পারছে না।সে এই প্রথম একটু অস্থির হয়ে উঠলো।
কিন্তু শ্রীজিতা আর কিছুই বলতে চাইলো না। বাবা মারা যাওয়ার পর এত দীর্ঘ সময় এই একাকিত্ব তাকে যেন পাগল করে দিচ্ছিল,তার ওপর ছিল পারিবারিক অশান্তির তাড়না সে এমন কাউকে পাশে পেতে চাইছিল যার সাথে সে সব ভাবনা ভাগ করে নিতে পারে,এমন কেউ যাকে বিশ্বাস করে নিজের সবকিছু সমর্পন করে দেয়া যায়।শ্রীজিতা নিজের জীবনের উত্তরণ চাইছিল।তাই নিজের স্বকীয়তা ভুলে প্রীতম কে ডাক দিয়েছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো ,বড়ো বেশি নিজেকে খুলে দিয়েছে।মনের রাশ এবারে টেনে ধরা দরকার।আর তাই আচমকা বলে উঠলো
----- যাক তোমার অনেকটা সময় আমি নষ্ট করে দিলাম।সরি,ভেরি সরি। কিছু মনে কোরোনা।
এরপরে বসে থাকা একজন ভদ্রলোকের কাছে বেশ দৃষ্টিকটু,তবুও প্রীতম যেন মরিয়া হয়ে বললো
---- সিদ্ধান্ত টা তো বললেন না?
শ্রীজিতা চুপ,যেন কতো ক্লান্ত,বিধ্বস্ত।অন্তত,ওকে দেখে তাই মনে হচ্ছে।
অগত্যা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রীতম কে উঠে দাঁড়াতে হলো।
সেই সময় শ্রীজিতার হঠাৎ কিছু মনে পড়তে, প্রীতম কে একটু দাঁড়াতে বলে ভিতরে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে বার হয়ে প্রীতমের দিকে সেটা বাড়িয়ে ধরে বললো
---- তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা , হয়তোবা শেষ দেখাও। আমার বাড়ি এসেছো ,সেটা তো শূন্য হাতে হতে পারে না। তাই একগোছা ফুল অন্তত থাক।
এবার প্রীতম আর আবেগকে দমাতে পারলো না।গোলাপটা নিল সাথে হাতটাও ধরলো।এক ই সাথে বলে উঠলো
---- আমার অনুরোধ, কঠিন সিদ্ধান্ত যেন তেমন কিছু না হয়।
শ্রীজিতা দাঁড়িয়ে থাকলো যেন নিস্পন্দ কিছু। প্রীতমের হাতের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা হাত তিরতির করে কাঁপছে।হাতটা ছাড়িয়ে নেবার শক্তি ও সে হারিয়ে ফেলেছে।এই সময় রবারের মতো নরম হয়ে আসা তার পা যেন বিদ্রোহ করে বসলো।সে পড়ে যাচ্ছিল,হয়তো যেত ই যদি না প্রীতমের হাতদুটো তাকে ধরে ফেলতো। প্রীতমের হাত থেকে ফুলের গোছাটা দরজার পাশের একটা ছোট পিতলের টেবিলে ঝনঝন শব্দ করে পড়তেই আরতি এসে পড়েছিল।শ্রীজিতার দিকে এগোনোর আগেই প্রীতম অনায়াসে তাকে তুলে নিয়ে আরতিকে বলল
---- এনাকে শুইয়ে দিতে হবে।
আরতি প্রীতম কে বেডরুমে নিয়ে গেল,শ্রীজিতাকে শুইয়ে,তার মুখে জল ছিটিয়ে দিতে দিতে বলতে যাচ্ছিল পরিবারের ডাক্তার কে কল দিতে,এমনসময় শ্রীজিতা চোখ খুলে চারদিকে তাকালো এমন ভাবে,যেন সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে, চিরপরিচিত ঘরটাকে যেন বুঝে উঠতে পারছে না।
প্রীতম হাতটা ধরেই বসে থাকলো এমন ভাবে যেন এই হাতটা সে কোনো মূল্যে ই ছাড়বে না
মিনিট কুড়ির মধ্যেই পারিবারিক ডাক্তার বোস এসে গেলেন এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তি কে শ্রীজিতা র পাশে হাত ধরে বসে থাকতে দেখে অবাক হলেন।
৪র্থ পর্ব
ডাক্তার রমেন বসু শ্রীজিতা দের বহু বছরের পারিবারিক ডাক্তার।শ্রীজিতা তাকে ডাক্তার কাকু বলে।
বহুকাল তিনি এই পরিবারটিকে দেখে আসছেন।শ্রীজিতাকে জন্মাতে দেখেছেন। ডাক্তারের বাইরেও তিনি শ্রীজিতা র বাবার বন্ধু হিসেবে ও এবাড়িতে এসেছেন।তাই শ্রীজিতা কে পরীক্ষা করে তিনি আরতিকে প্রশ্ন করলেন,
---কতদিন ধরে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে না?
জবাবে আরতি বললো
---- ,মাস দুয়েক হলো দিদি ঠিকমতো খায় না বিশেষ কথাও বলে না।সবসময় মনমরা হয়ে থাকে।দিদির মত মানুষকে সে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও পারে না।
ডাক্তার বসু বললেন---- না খাওয়ায় কারনে সে ভিতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।একটু রক্তশূন্যতা ও দেখা যাচ্ছে।
তিনি প্রয়োজন মতো ওষুধ পত্র লিখে দিলেন, আরতিকে তার খাওয়াদাওয়া র ওপর নজর রাখতে বললেন এবং একটু আনন্দে থাকতে বললেন।তারপর বার হবার জন্যে উঠে দাঁড়ালেন।আরতি তার ব্যাগটা নিয়ে পিছনে গেল।
ডাক্তার বসু ঘরের বাইরে বার হয়ে আরতিকে কিছু বলার জন্যে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ালেন কিন্তু শেষপর্যন্ত না বলেই চলে গেলেন।
যেতে যেতে অনেক কথাই ডাক্তার এর মনে ভীড় করে এলো।শ্রীজিতা কে তিনি জন্ম থেকেই দেখছেন।সে একটু স্বল্পভাষী।দেখতে সুন্দরী হওয়া স্বত্বেও কলেজে পড়াকালীন সময়ে প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কিত ব্যাপারে বেশ উদাসীন ছিল।ফলে এ সম্পর্কে তার বিশেষ ধ্যানধারণা নেই। পড়াশোনায় বরাবরই ভালো।এটা নিয়ে থাকতেই বেশী ভালোবাসে।এইসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদে আসীন হতে তাকে কোনো বাধা পেতে হয়নি।
অল্প বয়সেই মাতৃহারা মেয়েকে দেবরঞ্জন খুব যত্নেই মানুষ করেছেন। কিন্তু বিয়ে করার প্রবল অনিচ্ছা থাকায় মেয়েকে জোর করেন নি। তাছাড়া মেয়েও বাবাকে একা রেখে পরের বাড়ীতে বধূ হতে চায়নি।এই সব কারণে বিয়েটাও হয়নি।
এদিকে ঘরের মধ্যে প্রীতমের সামনেই শুয়ে শ্রীজিতা ও কতকটা বিব্রত ও অসহায় হয়ে ভাবছিল,এই বয়সে এসে সে যে এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে এমন একজনকে মনে মনে ভালোবেসে ফেলবে সেকথা সে কখনো চিন্তাও করেনি। বাবাকেও হারিয়ে সে যেন কেমন অসহায় হয়ে পড়েছিল ।মনকে বশে রাখতে না পেরে অবশেষে, লাজলজ্জার মাথা খেয়ে আজ প্রীতম কে ফোনটা করে ফেলেছিল হঠাৎ।এটা তার একদমই স্বভাব বিরুদ্ধ।
প্রীতম যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে আরতিকে বললো---- ওষুধ টা এনে দিয়ে যাই? আরতি ও কি ভেবে ' না ' করলো না।
ওষুধ এনে বেডসাইড টেবিলে র ওপর রেখে বলল -- এবার আমি যাই।কাল এসে খোঁজ নেবো।
যদিও সেই মুহূর্তে তার যাবার ইচ্ছে একটুও ছিল না।তবু সে ভদ্রলোক, থাকাটাও উচিত মনে হলো না। প্রীতম ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। আরতি ও একটু এগিয়ে দেবার জন্যে পা বাড়াতেই পিছনে আঁচলে টান পড়ল।শ্রীজিতা তাকে বললো--- ফুলের গোছাটা বসার ঘরে পড়ে আছে যেন দিয়ে দেয়।
বাইক স্টার্ট নিতে নিতেই আরতি দ্রুত পায়ে ফুলটা নিয়ে এসে বললো--- এটা ফেলে যাচ্ছেন।
প্রীতম একটু হেসে ফুলটা নিয়ে বাইকে করে বেড়িয়ে গেল।
ঠিক সেই সময়ে বাড়ির অন্য মহলে দোতলা র ঘরের একটা জানলা বন্ধ হবার শব্দে আরতি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো।শরিকি বাড়ির মেজ তরফের জানলা।তার মনটা শ্রীজিতা র জন্য একটু আশঙ্কিত হয়ে উঠলো।
বহুকাল তিনি এই পরিবারটিকে দেখে আসছেন।শ্রীজিতাকে জন্মাতে দেখেছেন। ডাক্তারের বাইরেও তিনি শ্রীজিতা র বাবার বন্ধু হিসেবে ও এবাড়িতে এসেছেন।তাই শ্রীজিতা কে পরীক্ষা করে তিনি আরতিকে প্রশ্ন করলেন,
---কতদিন ধরে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে না?
জবাবে আরতি বললো
---- ,মাস দুয়েক হলো দিদি ঠিকমতো খায় না বিশেষ কথাও বলে না।সবসময় মনমরা হয়ে থাকে।দিদির মত মানুষকে সে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও পারে না।
ডাক্তার বসু বললেন---- না খাওয়ায় কারনে সে ভিতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।একটু রক্তশূন্যতা ও দেখা যাচ্ছে।
তিনি প্রয়োজন মতো ওষুধ পত্র লিখে দিলেন, আরতিকে তার খাওয়াদাওয়া র ওপর নজর রাখতে বললেন এবং একটু আনন্দে থাকতে বললেন।তারপর বার হবার জন্যে উঠে দাঁড়ালেন।আরতি তার ব্যাগটা নিয়ে পিছনে গেল।
ডাক্তার বসু ঘরের বাইরে বার হয়ে আরতিকে কিছু বলার জন্যে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ালেন কিন্তু শেষপর্যন্ত না বলেই চলে গেলেন।
যেতে যেতে অনেক কথাই ডাক্তার এর মনে ভীড় করে এলো।শ্রীজিতা কে তিনি জন্ম থেকেই দেখছেন।সে একটু স্বল্পভাষী।দেখতে সুন্দরী হওয়া স্বত্বেও কলেজে পড়াকালীন সময়ে প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কিত ব্যাপারে বেশ উদাসীন ছিল।ফলে এ সম্পর্কে তার বিশেষ ধ্যানধারণা নেই। পড়াশোনায় বরাবরই ভালো।এটা নিয়ে থাকতেই বেশী ভালোবাসে।এইসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদে আসীন হতে তাকে কোনো বাধা পেতে হয়নি।
অল্প বয়সেই মাতৃহারা মেয়েকে দেবরঞ্জন খুব যত্নেই মানুষ করেছেন। কিন্তু বিয়ে করার প্রবল অনিচ্ছা থাকায় মেয়েকে জোর করেন নি। তাছাড়া মেয়েও বাবাকে একা রেখে পরের বাড়ীতে বধূ হতে চায়নি।এই সব কারণে বিয়েটাও হয়নি।
এদিকে ঘরের মধ্যে প্রীতমের সামনেই শুয়ে শ্রীজিতা ও কতকটা বিব্রত ও অসহায় হয়ে ভাবছিল,এই বয়সে এসে সে যে এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে এমন একজনকে মনে মনে ভালোবেসে ফেলবে সেকথা সে কখনো চিন্তাও করেনি। বাবাকেও হারিয়ে সে যেন কেমন অসহায় হয়ে পড়েছিল ।মনকে বশে রাখতে না পেরে অবশেষে, লাজলজ্জার মাথা খেয়ে আজ প্রীতম কে ফোনটা করে ফেলেছিল হঠাৎ।এটা তার একদমই স্বভাব বিরুদ্ধ।
প্রীতম যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে আরতিকে বললো---- ওষুধ টা এনে দিয়ে যাই? আরতি ও কি ভেবে ' না ' করলো না।
ওষুধ এনে বেডসাইড টেবিলে র ওপর রেখে বলল -- এবার আমি যাই।কাল এসে খোঁজ নেবো।
যদিও সেই মুহূর্তে তার যাবার ইচ্ছে একটুও ছিল না।তবু সে ভদ্রলোক, থাকাটাও উচিত মনে হলো না। প্রীতম ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। আরতি ও একটু এগিয়ে দেবার জন্যে পা বাড়াতেই পিছনে আঁচলে টান পড়ল।শ্রীজিতা তাকে বললো--- ফুলের গোছাটা বসার ঘরে পড়ে আছে যেন দিয়ে দেয়।
বাইক স্টার্ট নিতে নিতেই আরতি দ্রুত পায়ে ফুলটা নিয়ে এসে বললো--- এটা ফেলে যাচ্ছেন।
প্রীতম একটু হেসে ফুলটা নিয়ে বাইকে করে বেড়িয়ে গেল।
ঠিক সেই সময়ে বাড়ির অন্য মহলে দোতলা র ঘরের একটা জানলা বন্ধ হবার শব্দে আরতি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো।শরিকি বাড়ির মেজ তরফের জানলা।তার মনটা শ্রীজিতা র জন্য একটু আশঙ্কিত হয়ে উঠলো।
৫ম পর্ব
এই মিত্তির বাড়ির একটা ইতিহাস আছে।অবশ্য ইতিহাস না বলে উপাখ্যান বললেও হয়।বাড়িটা তিন মহলা।বহু বছর আগে ঢাকুরিয়া লেক তৈরী হবার সুবাদে ইঞ্জিনিয়ার কালীপ্রসন্ন রায় এই দশকাঠা জমিটা কিনে বাড়ি করেছিলেন এবং তৈরি হয়ে যাবার পর যৌতুক হিসেবে কন্যা চন্দ্রমুখী ও জামাতা সুধীরঞ্জন মিত্রকে উইল মোতাবেক দিয়ে যান।
মেয়ে সুন্দরী ছিল,তাই যুগ অনুসারে মেয়ের বসবাসের জন্য পিছনে মহলটা বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু আদরিনী কন্যার পছন্দ ছিল বাগান সমেত সামনের মহলটি।তাই সামনের মহলটি তে মেয়েজামাই থাকার মতো সব সুবিধা সম্বলিত করে দেন।নিজে ইঞ্জিনিয়ার হবার কারণে প্রতিটি মহল আধুনিক পরিকাঠামোয় তৈরি হয়।
চন্দ্রমুখীর এক কন্যা ও তিন পুত্র।যথাসময়ে তাদের বিবাহ দেন এবং কয়েকবছর কাটাবার পর ইহলোক ত্যাগকরেন। পিতৃদেব অবিবাহিত ছোট পুত্রকে নিয়ে থাকেন।যুগধর্ম মেনে প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্র বধূরাদুজনেই শ্বশুর ও অবিবাহিত দেওরের ' বোঝা ' ব ইতে ' অক্ষম ' হওয়ায়,বাকি দুই মহল দুই পুত্রকে শুধুমাত্র বসবাস করার অনুমতি দিয়ে,প্রথম মহলটি ছোট পুত্র দেবরঞ্জনকে পাকাপোক্ত ভাবে আইন অনুযায়ী উইল করে দেন।
বাড়িতে বাপ আর ছেলের সংসার। সংসার ধর্ম চালনা করার জন্য একজন মহিলার প্রয়োজন। এবার বৃদ্ধ সুধীরঞ্জন তার ছোট ছেলের বিয়ে দেবার জন্যে উঠেপড়ে লাগলেন।দেবরঞ্জনের বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। বিয়ের বয়স তার অনেক দিনই হয়েছে।শহরের বেশ নামকরা ফৌজদারি উকিল সে, হাইকোর্ট এ প্র্যাকটিস। এতদিন বিয়ের ব্যাপারে সে উদাসীন ছিল।অবশ্য তার কিছু কারণ ও ছিল। বাড়িতে দুই দাদা বৌদির কলহ,বাবা মায়ের প্রতি দুর্ব্যবহার,অর্থ সামর্থ নিয়ে মতান্তর,কটুভাষন তার মনে বিবাহ জনিত ভয় ও মহিলাদের প্রতি বিরক্তি বোধ তৈরি করেছিল এবং কিছুটা আতঙ্কিত ও করেছিল।
কিন্তু এবার সুধীরঞ্জন পুত্রের কোনো আপত্তি শুনলেন না। সংসার এ একজন গৃহিণী র প্রয়োজন ছাড়াও ছেলের ও একজন জীবনসঙ্গিনী দরকার ছিল।তার বয়স বাড়ছে, জীবন সূর্য অস্ত যাবার আগেই ছেলেকে একজন যোগ্য সঙ্গীর হাতে তুলে দিতে চান তিনি। বিশেষতঃ,বড়ো ও মেজ দুই ছেলে--- প্রভাতরঞ্জন ও শিবরঞ্জনকে তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না।তারা যেমন অর্থ পিশাচ, পরশ্রীকাতর লোভী,তার ওপর বাগান সমেত প্রথম মহলটি ছোট ছেলে কে উইল করে দেওয়ায় অপর দুই পুত্রের কাছে সমালোচনার পাত্র হয়েছেন।কারণ অপর মহল দুটি দুই ছেলেদের শুধু বসবাসের অধিকার দিয়েছেন।এই নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব বরাবর ই রয়ে গেছে।
দেবরঞ্জনের বিয়ে সম্পন্ন হলো। স্ত্রী রাখী সুন্দরী, শিক্ষিতা, অভিজাত।সুখে চলতে লাগলো সুধীরঞ্জনের সংসার।এর মধ্যে এক নতুন অতিথির আগমন ঘটেছে সংসারে।দেবরঞ্জন ও রাখীর একটি ফুটফুটে কন্যা।দাদু তার নাম রেখেছেন শ্রীজিতা, শ্রীজিতা মিত্র।
যথাসময়ে শ্রীজিতা স্কুলে যেতে শুরু করল। নামকরা মিশনারী স্কুল।সে যখন ক্লাস সেভেনে, বার্ধক্য জনিত নানা জটিলতায় সুধীরঞ্জন মারা গেলেন।
এই মিত্তির বাড়ির একটা ইতিহাস আছে।অবশ্য ইতিহাস না বলে উপাখ্যান বললেও হয়।বাড়িটা তিন মহলা।বহু বছর আগে ঢাকুরিয়া লেক তৈরী হবার সুবাদে ইঞ্জিনিয়ার কালীপ্রসন্ন রায় এই দশকাঠা জমিটা কিনে বাড়ি করেছিলেন এবং তৈরি হয়ে যাবার পর যৌতুক হিসেবে কন্যা চন্দ্রমুখী ও জামাতা সুধীরঞ্জন মিত্রকে উইল মোতাবেক দিয়ে যান।
মেয়ে সুন্দরী ছিল,তাই যুগ অনুসারে মেয়ের বসবাসের জন্য পিছনে মহলটা বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু আদরিনী কন্যার পছন্দ ছিল বাগান সমেত সামনের মহলটি।তাই সামনের মহলটি তে মেয়েজামাই থাকার মতো সব সুবিধা সম্বলিত করে দেন।নিজে ইঞ্জিনিয়ার হবার কারণে প্রতিটি মহল আধুনিক পরিকাঠামোয় তৈরি হয়।
চন্দ্রমুখীর এক কন্যা ও তিন পুত্র।যথাসময়ে তাদের বিবাহ দেন এবং কয়েকবছর কাটাবার পর ইহলোক ত্যাগকরেন। পিতৃদেব অবিবাহিত ছোট পুত্রকে নিয়ে থাকেন।যুগধর্ম মেনে প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্র বধূরাদুজনেই শ্বশুর ও অবিবাহিত দেওরের ' বোঝা ' ব ইতে ' অক্ষম ' হওয়ায়,বাকি দুই মহল দুই পুত্রকে শুধুমাত্র বসবাস করার অনুমতি দিয়ে,প্রথম মহলটি ছোট পুত্র দেবরঞ্জনকে পাকাপোক্ত ভাবে আইন অনুযায়ী উইল করে দেন।
বাড়িতে বাপ আর ছেলের সংসার। সংসার ধর্ম চালনা করার জন্য একজন মহিলার প্রয়োজন। এবার বৃদ্ধ সুধীরঞ্জন তার ছোট ছেলের বিয়ে দেবার জন্যে উঠেপড়ে লাগলেন।দেবরঞ্জনের বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। বিয়ের বয়স তার অনেক দিনই হয়েছে।শহরের বেশ নামকরা ফৌজদারি উকিল সে, হাইকোর্ট এ প্র্যাকটিস। এতদিন বিয়ের ব্যাপারে সে উদাসীন ছিল।অবশ্য তার কিছু কারণ ও ছিল। বাড়িতে দুই দাদা বৌদির কলহ,বাবা মায়ের প্রতি দুর্ব্যবহার,অর্থ সামর্থ নিয়ে মতান্তর,কটুভাষন তার মনে বিবাহ জনিত ভয় ও মহিলাদের প্রতি বিরক্তি বোধ তৈরি করেছিল এবং কিছুটা আতঙ্কিত ও করেছিল।
কিন্তু এবার সুধীরঞ্জন পুত্রের কোনো আপত্তি শুনলেন না। সংসার এ একজন গৃহিণী র প্রয়োজন ছাড়াও ছেলের ও একজন জীবনসঙ্গিনী দরকার ছিল।তার বয়স বাড়ছে, জীবন সূর্য অস্ত যাবার আগেই ছেলেকে একজন যোগ্য সঙ্গীর হাতে তুলে দিতে চান তিনি। বিশেষতঃ,বড়ো ও মেজ দুই ছেলে--- প্রভাতরঞ্জন ও শিবরঞ্জনকে তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না।তারা যেমন অর্থ পিশাচ, পরশ্রীকাতর লোভী,তার ওপর বাগান সমেত প্রথম মহলটি ছোট ছেলে কে উইল করে দেওয়ায় অপর দুই পুত্রের কাছে সমালোচনার পাত্র হয়েছেন।কারণ অপর মহল দুটি দুই ছেলেদের শুধু বসবাসের অধিকার দিয়েছেন।এই নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব বরাবর ই রয়ে গেছে।
দেবরঞ্জনের বিয়ে সম্পন্ন হলো। স্ত্রী রাখী সুন্দরী, শিক্ষিতা, অভিজাত।সুখে চলতে লাগলো সুধীরঞ্জনের সংসার।এর মধ্যে এক নতুন অতিথির আগমন ঘটেছে সংসারে।দেবরঞ্জন ও রাখীর একটি ফুটফুটে কন্যা।দাদু তার নাম রেখেছেন শ্রীজিতা, শ্রীজিতা মিত্র।
যথাসময়ে শ্রীজিতা স্কুলে যেতে শুরু করল। নামকরা মিশনারী স্কুল।সে যখন ক্লাস সেভেনে, বার্ধক্য জনিত নানা জটিলতায় সুধীরঞ্জন মারা গেলেন।
৬ষ্ঠ পর্ব
এইবার শুরু হলো সংসারের নানা জটিলতার মারপ্যাঁচ। বড়ো দুই ভাই তো ছিলই,এবার বোন শীলা এসে যোগ দিল। তিনজন মিলে একসাথে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা ও বিব্রত করতে লাগলো দেবরঞ্জন দের।শ্রীজিতা যখন স্কুলের শেষ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক তখনই অবস্থা এত চরমে উঠলো যে তার মা রাখী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন।দেবরঞ্জন বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেন এবং থানা-পুলিশ,আইন-আদালত ইত্যাদি তে তাদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠলো।
এর মধ্যেই শ্রীজিতা র পরীক্ষা হয়ে গেল।দেবরঞ্জন নিজে হাইকোর্টের উকিল ছিলেন বলে আইনি প্যাঁচে অপরপক্ষ বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারছিল না।
কিন্তু মেজভাই শিবরঞ্জনের অকালকুষ্মাণ্ড ছেলের মাস্তানি ও সমাজবিরোধী দের সাথে খাতির থাকার কারণে অন্যভাবে তারা উৎপাত চালাতে লাগলো। সবথেকে বেশি বিপাকে পড়লো আরতি।তার রাস্তাঘাটে একা চলাফেরা বন্ধ করলেন দেবরঞ্জন।
এই সব গোলমালের মধ্যেই শ্রীজিতার পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।দেখা গেল খুবই ভালো ফল করেছে সে। প্রেসিডেন্সি কলেজে অনায়াসে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হয়েগেলো। পরিবারে বহুদিন বাদে একটু খুশির হাওয়া। কিন্তু আচমকা দুর্যোগ নেমে এলো।রাখী মারা গেলেন।দেবরঞ্জনের জীবনে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো।
এই সময়ে আরতি শক্তহাতে সংসারের হাল ধরেছিল।আরতি শ্রীজিতার থেকে প্রায় আট ,নয় বছরের বড়ো।
এবারে অন্যপক্ষ আরতিকে জড়িয়ে দেবরঞ্জনের নামে কেচ্ছা রটাতে শুরু করলো।সে হলো আরেক জ্বালা।
এই অসহনীয় অবস্থায় আরতি খুব দৃঢ় মনোবল দেখিয়েছিল। সে ছোট থেকেই দেবরঞ্জনকে কাকামশায় বলে সম্বোধন করে এসেছে। তাই দেবরঞ্জনের অবস্থা দেখে একদিন অত্যন্ত কঠিন ভাবে বললো
--- কাকামশায়,তুমি একদম এসব কথায় কান দিও না।আমিও এদের খুব ভালো করে চিনি।কদিন বাদে নিজেরাই চুপ করে যাবে। আমি দিদিকে দেখবো। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি কোথাও যাবো না।
এইটুকু মেয়ের কথায় দেবরঞ্জন খুব লজ্জা পেলেন, কিন্তু নিশ্চিন্ত ও হলেন।
শ্রীজিতাকে অবলম্বন করেই যেন মনে জোর আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। যদিও তার শরীরেও ভাঙ্গন ধরতে শুরু করেছিল।
রাখীর অসুস্থতার সময় থেকেই ডাক্তার রমেন বসু তাদের সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।সব রকম অসুবিধে তেই তিনি দেবরঞ্জনের পাশে থেকেছেন। তাই সেদিন প্রীতমকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু একটা কাজের মেয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলাটা শোভনীয় হবে না মনে করেই কিছু বলেন নি।
আরতি বুঝতে পারলো ব্যাপারটা শুধু জানলা বন্ধেই থেমে থাকবে না।ফলে যা হবার তাই হলো, বরং প্রকাশ টা একটু বেশি হলো।
পরদিন একটু বেলায় শ্রীজিতার মেজজেঠি,শিবরঞ্জনের স্ত্রী বিনতা ভীষণ উদ্বিগ্ন মুখে এসে হাজির হলো।--- কি এমন হলো, ডাক্তার এসেছিল কেন,ঐ ছেলেটা কে ইত্যাদি প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। বুদ্ধিমতী আরতি যথাসম্ভব তৎপরতায় ব্যাপার টি তখনকার মতো সামাল দিলেও,বুঝতে পারছিলো এটা হবে শুরু।কারণ প্রীতম তো আজকেও আসবে।
কৌতুহল নিরসন হলে তখনকার মতো বিনতা চলে গেল।যাবার আগে অনেক দরদের প্রলেপ লাগিয়ে বলে গেল---- আমরা তো আছি,ওর আপনজন।কোনো দরকার হলে আমাদের বলবি।ও তো আমাদের ই মেয়ে।
আরতি প্রমাদ গুণলো।সে জানে শ্রীজিতা বিয়ে না করায় সবথেকে খুশি এই আপনার জনেরা।কারণ দেবরঞ্জনের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে এই মহলটা তাদের হাতে আসবে।যদি না শ্রীজিতা কোনো পাকাপোক্ত দলিল বানায়।এই কারণে শ্রীজিতা র প্রতি তাদের উদাসীন থাকা সম্ভব ছিল না।যে কোনো ভাবেই হোক শ্রীজিতার আপনজন হয়ে থাকতেই হবে।
পিসি শীলা তো ধরেই নিয়েছিল যে দুই দাদার দখলে যখন দুটো মহল আছে,এই মহলটা তার ই প্রাপ্য।
এইবার শুরু হলো সংসারের নানা জটিলতার মারপ্যাঁচ। বড়ো দুই ভাই তো ছিলই,এবার বোন শীলা এসে যোগ দিল। তিনজন মিলে একসাথে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা ও বিব্রত করতে লাগলো দেবরঞ্জন দের।শ্রীজিতা যখন স্কুলের শেষ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক তখনই অবস্থা এত চরমে উঠলো যে তার মা রাখী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন।দেবরঞ্জন বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেন এবং থানা-পুলিশ,আইন-আদালত ইত্যাদি তে তাদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠলো।
এর মধ্যেই শ্রীজিতা র পরীক্ষা হয়ে গেল।দেবরঞ্জন নিজে হাইকোর্টের উকিল ছিলেন বলে আইনি প্যাঁচে অপরপক্ষ বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারছিল না।
কিন্তু মেজভাই শিবরঞ্জনের অকালকুষ্মাণ্ড ছেলের মাস্তানি ও সমাজবিরোধী দের সাথে খাতির থাকার কারণে অন্যভাবে তারা উৎপাত চালাতে লাগলো। সবথেকে বেশি বিপাকে পড়লো আরতি।তার রাস্তাঘাটে একা চলাফেরা বন্ধ করলেন দেবরঞ্জন।
এই সব গোলমালের মধ্যেই শ্রীজিতার পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।দেখা গেল খুবই ভালো ফল করেছে সে। প্রেসিডেন্সি কলেজে অনায়াসে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হয়েগেলো। পরিবারে বহুদিন বাদে একটু খুশির হাওয়া। কিন্তু আচমকা দুর্যোগ নেমে এলো।রাখী মারা গেলেন।দেবরঞ্জনের জীবনে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো।
এই সময়ে আরতি শক্তহাতে সংসারের হাল ধরেছিল।আরতি শ্রীজিতার থেকে প্রায় আট ,নয় বছরের বড়ো।
এবারে অন্যপক্ষ আরতিকে জড়িয়ে দেবরঞ্জনের নামে কেচ্ছা রটাতে শুরু করলো।সে হলো আরেক জ্বালা।
এই অসহনীয় অবস্থায় আরতি খুব দৃঢ় মনোবল দেখিয়েছিল। সে ছোট থেকেই দেবরঞ্জনকে কাকামশায় বলে সম্বোধন করে এসেছে। তাই দেবরঞ্জনের অবস্থা দেখে একদিন অত্যন্ত কঠিন ভাবে বললো
--- কাকামশায়,তুমি একদম এসব কথায় কান দিও না।আমিও এদের খুব ভালো করে চিনি।কদিন বাদে নিজেরাই চুপ করে যাবে। আমি দিদিকে দেখবো। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি কোথাও যাবো না।
এইটুকু মেয়ের কথায় দেবরঞ্জন খুব লজ্জা পেলেন, কিন্তু নিশ্চিন্ত ও হলেন।
শ্রীজিতাকে অবলম্বন করেই যেন মনে জোর আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। যদিও তার শরীরেও ভাঙ্গন ধরতে শুরু করেছিল।
রাখীর অসুস্থতার সময় থেকেই ডাক্তার রমেন বসু তাদের সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।সব রকম অসুবিধে তেই তিনি দেবরঞ্জনের পাশে থেকেছেন। তাই সেদিন প্রীতমকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু একটা কাজের মেয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলাটা শোভনীয় হবে না মনে করেই কিছু বলেন নি।
আরতি বুঝতে পারলো ব্যাপারটা শুধু জানলা বন্ধেই থেমে থাকবে না।ফলে যা হবার তাই হলো, বরং প্রকাশ টা একটু বেশি হলো।
পরদিন একটু বেলায় শ্রীজিতার মেজজেঠি,শিবরঞ্জনের স্ত্রী বিনতা ভীষণ উদ্বিগ্ন মুখে এসে হাজির হলো।--- কি এমন হলো, ডাক্তার এসেছিল কেন,ঐ ছেলেটা কে ইত্যাদি প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। বুদ্ধিমতী আরতি যথাসম্ভব তৎপরতায় ব্যাপার টি তখনকার মতো সামাল দিলেও,বুঝতে পারছিলো এটা হবে শুরু।কারণ প্রীতম তো আজকেও আসবে।
কৌতুহল নিরসন হলে তখনকার মতো বিনতা চলে গেল।যাবার আগে অনেক দরদের প্রলেপ লাগিয়ে বলে গেল---- আমরা তো আছি,ওর আপনজন।কোনো দরকার হলে আমাদের বলবি।ও তো আমাদের ই মেয়ে।
আরতি প্রমাদ গুণলো।সে জানে শ্রীজিতা বিয়ে না করায় সবথেকে খুশি এই আপনার জনেরা।কারণ দেবরঞ্জনের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে এই মহলটা তাদের হাতে আসবে।যদি না শ্রীজিতা কোনো পাকাপোক্ত দলিল বানায়।এই কারণে শ্রীজিতা র প্রতি তাদের উদাসীন থাকা সম্ভব ছিল না।যে কোনো ভাবেই হোক শ্রীজিতার আপনজন হয়ে থাকতেই হবে।
পিসি শীলা তো ধরেই নিয়েছিল যে দুই দাদার দখলে যখন দুটো মহল আছে,এই মহলটা তার ই প্রাপ্য।
৭ম পর্ব
ঘরের কাজকর্ম সারতে সারতে আরতি এসব কথাই ভাবছিল। কিন্তু দেবরঞ্জন ছিলেন উকিল। তিনি তার বিশ্বস্ত উকিল বন্ধুকে বাড়ি সম্পর্কে সবকিছু লিখিত - পড়িত করে দিয়ে তাকেই ট্রাস্টি করে গেছেন। কাগজপত্র সব ই তার কাছে আছে।শ্রীজিতাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন সময়মতো।
প্রীতম সেদিন বাড়ি ফিরলো এক নতুন জীবনের আস্বাদ নিয়ে। এতদিন তার শ্রীজিতার প্রতি যে ধারণা ছিল তার জন্যে নিজে লজ্জিত বোধ করছিল। নিজের আচরণ বিশ্লেষণ করছিল নিজেই।
নিজেকে সে এতদিন যেভাবে জেনে এসেছে--- ঘরে তার আসক্তি নেই,বিশ্বাস নেই সমাজ- সংসার এ।মাঝে মধ্যে যে একা লাগেনা তা নয়,পুরুষের শরীর মাঝে মাঝেই অস্থির হয়ে ওঠে না,একথাও সত্যি নয়,তবু সংসারের দাবি বিনা লড়াইয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
সমাজ, সংসার, ভালোবাসার স্বরূপ সে নিজের চোখে দেখেছে। এককালীন নরম হৃদয়ে সেসব উপলব্ধিও করেছে। কিন্তু নরম মাটিতে যেমন পশুর ধারালো নখের আঁচড়ের দাগ একসময় শুকিয়ে কঠিন পাথর হয়ে যায়,পা ফেলে চলার অযোগ্য হয়ে ওঠে,তেমন তার হৃদয় ও এখন সেরকমই হয়েগেছে। ভালোবাসা দেবার ক্ষমতাও নেই, নেই গ্রহনের ক্ষমতা।হৃদয়ের নম্রতা হারিয়ে গেছে।
বড়ো অভিমানী ছিল একদিন। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে সে অভিমান ও হারিয়ে গেছে আজ।
তাই অনেক কাল বাদে যা পাওয়ার কথা কল্পনাও করেনি সেটা অনুভব করে চোখে জল এসে যাচ্ছিল তার। বারবার তার মনে ভেসে উঠছিল এক দৃঢ় অথচ লাবণ্যময়ী নারীর মুখ। কোথায় ভুল হলো তার ? অধীর আগ্রহে ভোর হবার অপেক্ষায় রাতটা প্রায় বিনিদ্র ই কেটে গেল।
পরদিন সন্ধ্যায় তার বাইক এসে দাঁড়ালো শ্রীজিতার বাড়ির গাড়ি বারান্দার নীচে। আরতি দরজা খুলে প্রীতম কে সোজা নিয়ে গেল লাইব্রেরী রুমে।শ্রীজিতা সেখানে খাতা ব ই এর মধ্যে ব্যস্ত ছিল,নাকি আগ্রহ নিয়ে সময় গুণছিল ?
প্রীতম ঘরে ঢুকে হাসিমুখে প্রশ্ন করলো
--- এখন শরীর কেমন ?
এই মুহূর্তে ' তুমি ' বলতে তার বাধো বাধো লাগছিল।
কয়েকটা কথা পরোক্ষে বলার পর শ্রীজিতা ই ওকে সরাসরি বলল,
--- আমাকে তুমি করেই বলো।সেটাই বোধ হয় ঠিক হবে।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনে নীরব ই ছিল,ভেবে পাচ্ছিল না কি বলবে।এই সময় আরতি চা নিয়ে এলো।শ্রীজিতা চা এর কাপটা প্রীতমের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলেই ফেললো
--- বহুদিন পরে আজ কারোর সাথে বসে চা খাচ্ছি।একা তো কিছুই ভালো লাগে না।তোমার তবু মা আছে ,ঘরে ফেরার আকর্ষণ আছে।
এতক্ষণে নীরবতা ভেঙে প্রীতম জিঞ্জাসা করলো,--- ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে কটা হয় ? রোজ তো এক ই রুটিন থাকে না।
--- সেটা থাকে না।তবে অন্য কাজ থাকে। তাছাড়া
ঘরের কাজকর্ম সারতে সারতে আরতি এসব কথাই ভাবছিল। কিন্তু দেবরঞ্জন ছিলেন উকিল। তিনি তার বিশ্বস্ত উকিল বন্ধুকে বাড়ি সম্পর্কে সবকিছু লিখিত - পড়িত করে দিয়ে তাকেই ট্রাস্টি করে গেছেন। কাগজপত্র সব ই তার কাছে আছে।শ্রীজিতাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন সময়মতো।
প্রীতম সেদিন বাড়ি ফিরলো এক নতুন জীবনের আস্বাদ নিয়ে। এতদিন তার শ্রীজিতার প্রতি যে ধারণা ছিল তার জন্যে নিজে লজ্জিত বোধ করছিল। নিজের আচরণ বিশ্লেষণ করছিল নিজেই।
নিজেকে সে এতদিন যেভাবে জেনে এসেছে--- ঘরে তার আসক্তি নেই,বিশ্বাস নেই সমাজ- সংসার এ।মাঝে মধ্যে যে একা লাগেনা তা নয়,পুরুষের শরীর মাঝে মাঝেই অস্থির হয়ে ওঠে না,একথাও সত্যি নয়,তবু সংসারের দাবি বিনা লড়াইয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
সমাজ, সংসার, ভালোবাসার স্বরূপ সে নিজের চোখে দেখেছে। এককালীন নরম হৃদয়ে সেসব উপলব্ধিও করেছে। কিন্তু নরম মাটিতে যেমন পশুর ধারালো নখের আঁচড়ের দাগ একসময় শুকিয়ে কঠিন পাথর হয়ে যায়,পা ফেলে চলার অযোগ্য হয়ে ওঠে,তেমন তার হৃদয় ও এখন সেরকমই হয়েগেছে। ভালোবাসা দেবার ক্ষমতাও নেই, নেই গ্রহনের ক্ষমতা।হৃদয়ের নম্রতা হারিয়ে গেছে।
বড়ো অভিমানী ছিল একদিন। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে সে অভিমান ও হারিয়ে গেছে আজ।
তাই অনেক কাল বাদে যা পাওয়ার কথা কল্পনাও করেনি সেটা অনুভব করে চোখে জল এসে যাচ্ছিল তার। বারবার তার মনে ভেসে উঠছিল এক দৃঢ় অথচ লাবণ্যময়ী নারীর মুখ। কোথায় ভুল হলো তার ? অধীর আগ্রহে ভোর হবার অপেক্ষায় রাতটা প্রায় বিনিদ্র ই কেটে গেল।
পরদিন সন্ধ্যায় তার বাইক এসে দাঁড়ালো শ্রীজিতার বাড়ির গাড়ি বারান্দার নীচে। আরতি দরজা খুলে প্রীতম কে সোজা নিয়ে গেল লাইব্রেরী রুমে।শ্রীজিতা সেখানে খাতা ব ই এর মধ্যে ব্যস্ত ছিল,নাকি আগ্রহ নিয়ে সময় গুণছিল ?
প্রীতম ঘরে ঢুকে হাসিমুখে প্রশ্ন করলো
--- এখন শরীর কেমন ?
এই মুহূর্তে ' তুমি ' বলতে তার বাধো বাধো লাগছিল।
কয়েকটা কথা পরোক্ষে বলার পর শ্রীজিতা ই ওকে সরাসরি বলল,
--- আমাকে তুমি করেই বলো।সেটাই বোধ হয় ঠিক হবে।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনে নীরব ই ছিল,ভেবে পাচ্ছিল না কি বলবে।এই সময় আরতি চা নিয়ে এলো।শ্রীজিতা চা এর কাপটা প্রীতমের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলেই ফেললো
--- বহুদিন পরে আজ কারোর সাথে বসে চা খাচ্ছি।একা তো কিছুই ভালো লাগে না।তোমার তবু মা আছে ,ঘরে ফেরার আকর্ষণ আছে।
এতক্ষণে নীরবতা ভেঙে প্রীতম জিঞ্জাসা করলো,--- ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে কটা হয় ? রোজ তো এক ই রুটিন থাকে না।
--- সেটা থাকে না।তবে অন্য কাজ থাকে। তাছাড়া
প্রায় ই লাইব্রেরী যেতে হয়। সবকিছু শেষ করে ফিরতে আটটা তো হয় ই। আমার বন্ধু বান্ধব ও তেমন নেই।
এমন সব আলাপচারিতায় দুজনের আড়ষ্টতা কেটে গেল।বাইরে শ্রাবণের বারিধারা।রাত প্রায় সাড়ে নটা।
প্রীতম এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললো
--- এবার যাবো। বৃষ্টি কমবে বলে মনে হচ্ছে না।আর তোমারো বিশ্রাম দরকার। কিছুদিন ছুটি নিলেই তো পারতে।
লাইব্রেরী রুম থেকে বেড়িয়ে, বৃষ্টির অবস্থা বুঝে শ্রীজিতা বললো---- এই বৃষ্টিতে বাইক নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে ? বাইকটা বরং এখানে থাক। আমি গাড়ি নিয়ে ছেড়ে আসি ?
প্রীতম প্রবলভাবে আপত্তি জানাতে, শ্রীজিতা বললো --- তাহলে আমার গাড়িটা নিয়ে যাও। আমি তো এখন কোথাও যাচ্ছি না। খানিক তর্ক বিতর্কের পর হার মেনে প্রীতম শ্রীজিতার গাড়িটা নিয়েই গেল।
এতসব দৃশ্যে র দর্শকরা চুপ করে বসে রইল না। পরবর্তী চালের ঘুটি সাজাতে বসলো। পরদিন বড়ো জেঠি এবং পিসি হাজির হয়ে খবর নিতে এলো।প্রতি কথায় উৎকণ্ঠা যেন ঝরে পড়ছে। আরতির কাছে চা এর আব্দার করলো। সবকিছুর পিছনে উদ্দেশ্য একটাই, দুদিন ধরে যে ছেলেটা আসছে,সে কে ? ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেও হাল ছাড়লো না।
এক নতুন উৎপাত শুরু হলো।
এর মাঝে একদিন দুই জেঠা এসে উপদেশের ছলে কিছু হুমকি ও দিয়ে গেল। পরিবারের সুনাম যাতে ক্ষুণ্ণ নাহয়,সেকথা মনে করিয়ে দিলো।
শ্রীজিতা এমনিতে শান্ত স্বভাব হলেও,জেদ আছে মনের দৃঢ়তা আছে। তাই সবকিছু বুঝেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়ে নি।
৮ম পর্ব
সেদিন প্রীতম শ্রীজিতা কে ফোন করে বলল আগামী রবিবার সে শ্রীজিতা কে তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে।
সেইমতো শ্রীজিতা প্রীতমের সাথে তাদের বাড়িতে গেল। বেশি দূর নয় যোধপুর পার্কে ফ্ল্যাট।মায়ের সাথে পরিচয় পর্বে শ্রীজিতা তার বাড়ির কথা,নিজের কথা সব ই খুলে বললো।আরো বললো-- কিভাবে তাদের আলাপ। প্রীতমের মা শুনলেন, জানলেন এবং অভিঞ্জ মানুষ হিসেবে যা বোঝার বুঝে গেলেন।
শ্রীজিতা চলে যাবার পর ,রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে ছেলের সাথে তার খোলামেলা কথা হলো। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন যে এবার তার ছেলেকে আর একা থাকতে হবেনা।তার খুব দুশ্চিন্তা ছিল এই ছন্নছাড়া স্বভাবের পুত্রকে নিয়ে।বয়সের ভারে নিজে অথর্ব হয়ে পড়ছেন। তিনি চলে গেলে ছেলের কি হবে ?
রাতে শ্রীজিতার সাথে প্রীতমের অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা হলো।
পরদিন এসে আরতির কাছে শুনে সরাসরি বেডরুমে এলো সে,এই প্রথম। দেখলো শ্রীজিতা তার ঠাকুমার আমলের মস্ত পালঙ্কের বাজুতে হেলান দিয়ে,মা- বাবার ছবির দিকে জলভরা চোখে তাকিয়ে আছে। লাবণ্যময়ী এক রমনী,যেন শিল্পীর হাতে আঁকা কোনো ছবি।
প্রীতমের আবেগ আর কোনো বাধা মানল না। বহুকালের জলাধারের ফাটল ভেঙ্গে যে জলোচ্ছ্বাস চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে যায়,তেমন ই শ্রীজিতাকে দু হাতের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে প্রবল উচ্ছাসে ভেসে গেল।
বড়ো আদরে,বড়ো সোহাগে,বড়ো যত্নে যত রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ ছিল,তার সবটুকুই শুষে নিতে চাইলো।
বয়সের হিসেবে সে যুবক হয়েছিল অনেক আগে, কিন্তু আজ এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় শ্রীজিতাকে বুকের মধ্যে নিয়ে সে প্রথম জানলো যৌবনের মানে কি ? যৌবনের পরিপূর্ণতা,পরিপ্লুতি কোথায় ?
সে যেন মনেমনে বললো_" ভাগ্যিস তুই ডাক দিয়েছিলি আমায়,না হলে আমার বালকত্ব কখনো ঘুচতো না।এই বর্ষনের সঙ্গীত,এই যৌবনের উপলব্ধি, কি করবো এত আনন্দ নিয়ে ! তুইযে আজ আমাকে রাজা বানিয়ে দিলি, আমার পুরুষ সত্ত্বা নিবেদিত হলো অনাদি কালের নারীর কাছে।
প্রীতমের হাতের মধ্যে শ্রীজিতা কাঁপছিল থরথর করে। কিন্তু তারা সংযত ছিল।এটাই সভ্যজগতের,সভ্যমানুষের শিক্ষা।
দুজনে এসে বসলো ড্রয়িং রুমে।আরতিকে চা দিতে বলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মন দিলো। ঠিক হলো পরদিন ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে নোটিশ দেবে।
খবরটা জানাজানি হতে সময় লাগলো না। বাড়ির অন্য লোকেরা যখন দেখলো তাদের এত দিনের লোভের উপাদান হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা হিংস্র প্রতিশোধ নিতে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। এমনকি প্রীতমের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। যদিও দৃঢ়চেতা মহিলাকে শ্রীজিতার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পেল না।তবু হাল ছাড়েনি।
এদিকে শ্রীজিতার ছাত্রছাত্রীরা খুব আনন্দিত শুধু হলো না,সবাই কোমড় বেঁধে নেমে পড়লো উৎসবকে রঙীন করে তুলতে।ছাত্রীরা মিলে সাদার ওপর কাজ করা একটা অপূর্ব সুন্দর বেনারসী উপহার দিল বিয়েতে পরার জন্যে। এভাবেই হৈ চৈ এ মেতে গেল সবাই। ভুলে গেল ছাত্রী শিক্ষিকার সম্পর্ক।এখন তারাই শ্রীজিতার বড়ো আপনজন।
একদিন প্রীতম শ্রীজিতা শপিং করতে গেল।শ্রীজিতা , প্রীতমের জন্যে একটা হীরের আংটি কিনলো।সবকিছুই চলতে লাগলো খুশির সাথে।
৯ম পর্ব
কিন্তু সর্বগ্রাসী আগুন ও জ্বলছিল কোথাও। তাদের লোভ, চাহিদা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় ছিল।
হঠাৎ করে তারা চুপচাপ হয়ে যাওয়াতে, আরতি দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়ল।প্রতিটা মুহূর্ত তার মনে শঙ্কা বেড়েই চললো।কারণ,তার মতো এতো ভালো করে এইসব ' আপনজন ' দের আর কে চেনে ?
অবশেষে রেজিস্ট্রির তিনদিন বাকি থাকতে, ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা টা ঘটেই গেলো।।যা কয়েকটা জীবনকে মানসিক ভাবে তছনছ করে দিল।
শ্রীজিতা গাড়ি নিয়ে সল্টলেকে এক ছাত্রীর বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল।রাত প্রায় দশটা থেকে তাকে আর সেলফোনে পায়নি প্রীতম বা আরতি কেউ।
প্রীতম সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে,নিজের গাড়িতে একজন বন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য থানায় প্রথমেই এফ- আই- আর করে অন্যান্য জায়গায় খোঁজ নিলো। কোনো হদিস না করতে পেরে, ভোরবেলা ভাঙ্গা মনে বাড়ি ফিরলো।তার মা ও অস্থির হয়ে পড়লেন।আর আরতির কথা না বলাই ভালো।
পরদিন বেলা এগারোটা নাগাদ বিধান নগর থানা থেকে প্রীতমের কাছে একটা ফোন এলো যে দমদম ষ্টেশনে র কাছে এক মহিলার দেহ উদ্ধার হয়েছে।
দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রীতমকে নিয়ে ছুটে গেল পুলিশ ষ্টেশনে। সেখানে ছবি দেখে প্রীতম হতচেতন হয়ে পড়লো। বন্ধুরা ওকে নিয়ে পুলিশ মর্গে পৌঁছে দেহ সনাক্ত করলো। মর্গের রিপোর্ট অনুযায়ী,রিভলবারের একটা গুলি হৃদপিণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তার আগে নরপশুরা শ্রীজিতা র শরীর টা ছিন্নভিন্ন করেছে।মুখ এবং মাথা অবিকৃত থাকায় চেনা সম্ভব হয়েছে।
প্রীতম যেন কেমন নির্বাক,নিস্তব্ধ হয়েগেলো। পুতুলের মত যা অফিসিয়াল কাজ ছিল শেষ করে কাঁচের গাড়িতে শ্রীজিতা কে ১৭ নম্বর দেবেন ঠাকুর রোডের বাড়িতে নিয়ে এলো।
সেখানে তার ছাত্র ছাত্রী রা অপেক্ষা করছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী রা উপস্থিত ছিল। সেই বিয়ের জন্যে রাখা বেনারসী পড়িয়ে,চন্দনে কুমকুমে তাকে কনে সাজিয়ে বিদায় দিল,সবাই চোখের জলে ভাসতে ভাসতে।প্রীতম এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। কিন্তু গাড়িটা স্টার্ট নেবার সাথে সাথেই একটা বোবা পশুর মতো বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলো।সে হাহাকার বড়ো মর্মভেদী ।
চলে গেল শ্রীজিতা, পিছনে ফেলে গেল এক স্বপ্নের ধ্বংস স্তুপ। সে একাকিত্বের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। এই মরজগৎ থেকেই তার চিরকালীন উত্তরণ হয়েগেল। একাকিত্বের বোঝাটা রেখে গেল প্রীতমের কাছে।যে বাকি জীবনটা একটা শূণ্যতার সাথে কাটাবে।
আজ ও এক উদভ্রান্ত পথিককে দেখা যায় পথে,পথে উদাসী মনে তার ' শ্রী ' কে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
উপসংহার
মাস খানেক বাদে দেবরঞ্জনের সেই উকিল বন্ধু,আনন্দ মোহন ব্যানার্জি এসে পরিবারের সবাই কে নিয়ে বসলেন।লোভে সবাই এর মুখ চকচক করে উঠলো।।
আনন্দবাবু দেবরঞ্জনের উইল পড়তে লাগলেন,যার ভাষ্য ছিল-----
শ্রীজিতা যদি অবিবাহিত মারা যায় তাহলে পুরো সম্পত্তি,দেবরঞ্জনের পিতা সুধীরঞ্জনের ব্যবস্থা পত্র অনুসারে সরকারি তত্বাবধানে কর্মরত মহিলা দের জন্যে হোস্টেলে তৈরি করার কাজে দান করে দেয়া হবে। এবং গয়না পত্র ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা আরতির নামে ব্যাংকে বন্দোবস্ত করে দিতে হবে
এই লিখিত উইল পড়ার দু মাসের মধ্যে বাড়ি খালি করে দিতে হবে।
এই সমস্ত কাজ সম্পাদন এর ব্যাপারটি শ্রী আনন্দ মোহন ব্যানার্জি র অধীনে সম্পন্ন হবে।
এমন সব আলাপচারিতায় দুজনের আড়ষ্টতা কেটে গেল।বাইরে শ্রাবণের বারিধারা।রাত প্রায় সাড়ে নটা।
প্রীতম এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললো
--- এবার যাবো। বৃষ্টি কমবে বলে মনে হচ্ছে না।আর তোমারো বিশ্রাম দরকার। কিছুদিন ছুটি নিলেই তো পারতে।
লাইব্রেরী রুম থেকে বেড়িয়ে, বৃষ্টির অবস্থা বুঝে শ্রীজিতা বললো---- এই বৃষ্টিতে বাইক নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে ? বাইকটা বরং এখানে থাক। আমি গাড়ি নিয়ে ছেড়ে আসি ?
প্রীতম প্রবলভাবে আপত্তি জানাতে, শ্রীজিতা বললো --- তাহলে আমার গাড়িটা নিয়ে যাও। আমি তো এখন কোথাও যাচ্ছি না। খানিক তর্ক বিতর্কের পর হার মেনে প্রীতম শ্রীজিতার গাড়িটা নিয়েই গেল।
এতসব দৃশ্যে র দর্শকরা চুপ করে বসে রইল না। পরবর্তী চালের ঘুটি সাজাতে বসলো। পরদিন বড়ো জেঠি এবং পিসি হাজির হয়ে খবর নিতে এলো।প্রতি কথায় উৎকণ্ঠা যেন ঝরে পড়ছে। আরতির কাছে চা এর আব্দার করলো। সবকিছুর পিছনে উদ্দেশ্য একটাই, দুদিন ধরে যে ছেলেটা আসছে,সে কে ? ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেও হাল ছাড়লো না।
এক নতুন উৎপাত শুরু হলো।
এর মাঝে একদিন দুই জেঠা এসে উপদেশের ছলে কিছু হুমকি ও দিয়ে গেল। পরিবারের সুনাম যাতে ক্ষুণ্ণ নাহয়,সেকথা মনে করিয়ে দিলো।
শ্রীজিতা এমনিতে শান্ত স্বভাব হলেও,জেদ আছে মনের দৃঢ়তা আছে। তাই সবকিছু বুঝেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়ে নি।
৮ম পর্ব
সেদিন প্রীতম শ্রীজিতা কে ফোন করে বলল আগামী রবিবার সে শ্রীজিতা কে তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে।
সেইমতো শ্রীজিতা প্রীতমের সাথে তাদের বাড়িতে গেল। বেশি দূর নয় যোধপুর পার্কে ফ্ল্যাট।মায়ের সাথে পরিচয় পর্বে শ্রীজিতা তার বাড়ির কথা,নিজের কথা সব ই খুলে বললো।আরো বললো-- কিভাবে তাদের আলাপ। প্রীতমের মা শুনলেন, জানলেন এবং অভিঞ্জ মানুষ হিসেবে যা বোঝার বুঝে গেলেন।
শ্রীজিতা চলে যাবার পর ,রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে ছেলের সাথে তার খোলামেলা কথা হলো। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন যে এবার তার ছেলেকে আর একা থাকতে হবেনা।তার খুব দুশ্চিন্তা ছিল এই ছন্নছাড়া স্বভাবের পুত্রকে নিয়ে।বয়সের ভারে নিজে অথর্ব হয়ে পড়ছেন। তিনি চলে গেলে ছেলের কি হবে ?
রাতে শ্রীজিতার সাথে প্রীতমের অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা হলো।
পরদিন এসে আরতির কাছে শুনে সরাসরি বেডরুমে এলো সে,এই প্রথম। দেখলো শ্রীজিতা তার ঠাকুমার আমলের মস্ত পালঙ্কের বাজুতে হেলান দিয়ে,মা- বাবার ছবির দিকে জলভরা চোখে তাকিয়ে আছে। লাবণ্যময়ী এক রমনী,যেন শিল্পীর হাতে আঁকা কোনো ছবি।
প্রীতমের আবেগ আর কোনো বাধা মানল না। বহুকালের জলাধারের ফাটল ভেঙ্গে যে জলোচ্ছ্বাস চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে যায়,তেমন ই শ্রীজিতাকে দু হাতের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে প্রবল উচ্ছাসে ভেসে গেল।
বড়ো আদরে,বড়ো সোহাগে,বড়ো যত্নে যত রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ ছিল,তার সবটুকুই শুষে নিতে চাইলো।
বয়সের হিসেবে সে যুবক হয়েছিল অনেক আগে, কিন্তু আজ এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় শ্রীজিতাকে বুকের মধ্যে নিয়ে সে প্রথম জানলো যৌবনের মানে কি ? যৌবনের পরিপূর্ণতা,পরিপ্লুতি কোথায় ?
সে যেন মনেমনে বললো_" ভাগ্যিস তুই ডাক দিয়েছিলি আমায়,না হলে আমার বালকত্ব কখনো ঘুচতো না।এই বর্ষনের সঙ্গীত,এই যৌবনের উপলব্ধি, কি করবো এত আনন্দ নিয়ে ! তুইযে আজ আমাকে রাজা বানিয়ে দিলি, আমার পুরুষ সত্ত্বা নিবেদিত হলো অনাদি কালের নারীর কাছে।
প্রীতমের হাতের মধ্যে শ্রীজিতা কাঁপছিল থরথর করে। কিন্তু তারা সংযত ছিল।এটাই সভ্যজগতের,সভ্যমানুষের শিক্ষা।
দুজনে এসে বসলো ড্রয়িং রুমে।আরতিকে চা দিতে বলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মন দিলো। ঠিক হলো পরদিন ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে নোটিশ দেবে।
খবরটা জানাজানি হতে সময় লাগলো না। বাড়ির অন্য লোকেরা যখন দেখলো তাদের এত দিনের লোভের উপাদান হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তারা হিংস্র প্রতিশোধ নিতে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। এমনকি প্রীতমের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। যদিও দৃঢ়চেতা মহিলাকে শ্রীজিতার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পেল না।তবু হাল ছাড়েনি।
এদিকে শ্রীজিতার ছাত্রছাত্রীরা খুব আনন্দিত শুধু হলো না,সবাই কোমড় বেঁধে নেমে পড়লো উৎসবকে রঙীন করে তুলতে।ছাত্রীরা মিলে সাদার ওপর কাজ করা একটা অপূর্ব সুন্দর বেনারসী উপহার দিল বিয়েতে পরার জন্যে। এভাবেই হৈ চৈ এ মেতে গেল সবাই। ভুলে গেল ছাত্রী শিক্ষিকার সম্পর্ক।এখন তারাই শ্রীজিতার বড়ো আপনজন।
একদিন প্রীতম শ্রীজিতা শপিং করতে গেল।শ্রীজিতা , প্রীতমের জন্যে একটা হীরের আংটি কিনলো।সবকিছুই চলতে লাগলো খুশির সাথে।
৯ম পর্ব
কিন্তু সর্বগ্রাসী আগুন ও জ্বলছিল কোথাও। তাদের লোভ, চাহিদা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় ছিল।
হঠাৎ করে তারা চুপচাপ হয়ে যাওয়াতে, আরতি দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়ল।প্রতিটা মুহূর্ত তার মনে শঙ্কা বেড়েই চললো।কারণ,তার মতো এতো ভালো করে এইসব ' আপনজন ' দের আর কে চেনে ?
অবশেষে রেজিস্ট্রির তিনদিন বাকি থাকতে, ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা টা ঘটেই গেলো।।যা কয়েকটা জীবনকে মানসিক ভাবে তছনছ করে দিল।
শ্রীজিতা গাড়ি নিয়ে সল্টলেকে এক ছাত্রীর বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল।রাত প্রায় দশটা থেকে তাকে আর সেলফোনে পায়নি প্রীতম বা আরতি কেউ।
প্রীতম সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে,নিজের গাড়িতে একজন বন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য থানায় প্রথমেই এফ- আই- আর করে অন্যান্য জায়গায় খোঁজ নিলো। কোনো হদিস না করতে পেরে, ভোরবেলা ভাঙ্গা মনে বাড়ি ফিরলো।তার মা ও অস্থির হয়ে পড়লেন।আর আরতির কথা না বলাই ভালো।
পরদিন বেলা এগারোটা নাগাদ বিধান নগর থানা থেকে প্রীতমের কাছে একটা ফোন এলো যে দমদম ষ্টেশনে র কাছে এক মহিলার দেহ উদ্ধার হয়েছে।
দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রীতমকে নিয়ে ছুটে গেল পুলিশ ষ্টেশনে। সেখানে ছবি দেখে প্রীতম হতচেতন হয়ে পড়লো। বন্ধুরা ওকে নিয়ে পুলিশ মর্গে পৌঁছে দেহ সনাক্ত করলো। মর্গের রিপোর্ট অনুযায়ী,রিভলবারের একটা গুলি হৃদপিণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তার আগে নরপশুরা শ্রীজিতা র শরীর টা ছিন্নভিন্ন করেছে।মুখ এবং মাথা অবিকৃত থাকায় চেনা সম্ভব হয়েছে।
প্রীতম যেন কেমন নির্বাক,নিস্তব্ধ হয়েগেলো। পুতুলের মত যা অফিসিয়াল কাজ ছিল শেষ করে কাঁচের গাড়িতে শ্রীজিতা কে ১৭ নম্বর দেবেন ঠাকুর রোডের বাড়িতে নিয়ে এলো।
সেখানে তার ছাত্র ছাত্রী রা অপেক্ষা করছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী রা উপস্থিত ছিল। সেই বিয়ের জন্যে রাখা বেনারসী পড়িয়ে,চন্দনে কুমকুমে তাকে কনে সাজিয়ে বিদায় দিল,সবাই চোখের জলে ভাসতে ভাসতে।প্রীতম এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। কিন্তু গাড়িটা স্টার্ট নেবার সাথে সাথেই একটা বোবা পশুর মতো বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলো।সে হাহাকার বড়ো মর্মভেদী ।
চলে গেল শ্রীজিতা, পিছনে ফেলে গেল এক স্বপ্নের ধ্বংস স্তুপ। সে একাকিত্বের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। এই মরজগৎ থেকেই তার চিরকালীন উত্তরণ হয়েগেল। একাকিত্বের বোঝাটা রেখে গেল প্রীতমের কাছে।যে বাকি জীবনটা একটা শূণ্যতার সাথে কাটাবে।
আজ ও এক উদভ্রান্ত পথিককে দেখা যায় পথে,পথে উদাসী মনে তার ' শ্রী ' কে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
উপসংহার
মাস খানেক বাদে দেবরঞ্জনের সেই উকিল বন্ধু,আনন্দ মোহন ব্যানার্জি এসে পরিবারের সবাই কে নিয়ে বসলেন।লোভে সবাই এর মুখ চকচক করে উঠলো।।
আনন্দবাবু দেবরঞ্জনের উইল পড়তে লাগলেন,যার ভাষ্য ছিল-----
শ্রীজিতা যদি অবিবাহিত মারা যায় তাহলে পুরো সম্পত্তি,দেবরঞ্জনের পিতা সুধীরঞ্জনের ব্যবস্থা পত্র অনুসারে সরকারি তত্বাবধানে কর্মরত মহিলা দের জন্যে হোস্টেলে তৈরি করার কাজে দান করে দেয়া হবে। এবং গয়না পত্র ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা আরতির নামে ব্যাংকে বন্দোবস্ত করে দিতে হবে
এই লিখিত উইল পড়ার দু মাসের মধ্যে বাড়ি খালি করে দিতে হবে।
এই সমস্ত কাজ সম্পাদন এর ব্যাপারটি শ্রী আনন্দ মোহন ব্যানার্জি র অধীনে সম্পন্ন হবে।



1 Comments
সমাজের অতি পরিচিত ঘৃণ্য রূপ তপতী বাসু বড় সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। খুব ভালো লাগল
উত্তরমুছুন