
হীরেমাখা অতীত
সকাল সাতটা বাজলেই দিবাকর দোতলার ব্যালকনিতে এসে বসেন। ছোট্ট সোফাটায় আরাম করে বসে খবরের কাগজ দেখেন। শরমা লিকার চা আর একটা ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট সামনে রেখে যান। দিবাকর মুখ তুলে তাকান না। যন্ত্রের মত বিস্কুটে কামড় বসান। তাঁর মন এখন খবরের পাতায়। শরমার দাঁড়ানোর জো নেই। তাঁর অনেক কাজ। কাজের মেয়েটা থালাবাসন মেজে ঘরগুলো মুছে যায়। রান্না, ঠাকুরপুজো,খাবার ব্যবস্থা করা সব তাঁকেই সারতে হয়। দুপুরে খাওয়ার পর কাগজ দেখেন।সন্ধ্যায় একটার পর একটা সিরিয়ালের এপিসোড শেষ করেন। দিবাকর দু'টো সিরিয়াল দেখেন। এ দু'টো তাঁর পছন্দ। পছন্দের সিরিয়াল শেষ হলে বই বা মোবাইলের পিছনে পড়ে থাকেন। সেই ডিনারের আগ পর্যন্ত। এগারোটায় বিছানায় যান।
অবসরের পর মাসছ'য়েক ধরে এটাই দিবাকরের প্রাত্যহিক রুটিন।
শীতকাল।এক'দিন শীতটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। পুবমুখো ব্যালকনিতে এখন নরম রোদের হুটোপুটি। মোলায়েম রোদ্দুরের ওম নিতে বেশ ভাললাগছে। দিবাকর চা শেষ করে নীচে গলিটার দিকে তাকান। চলমান মানুষকে দেখতে তাঁর ভাললাগে।জীবন তো খরস্রোতা নদী। থেমে গেলেই সব শেষ !দিবাকরের দোতলা বাড়িটা মেইনরাস্তা থেকে একটু ভেতরে। বাড়ির সামনের গলি দিয়ে সাইকেল,ভ্যানরিক্স আর বাইক চলে।অটো -টোটো -এসব চলে না। প্রায় বছর তিরিশ আগে দিবাকর দমদমের এই রায়পাড়ায় তিন কাঠা জায়গা কিনেছিলেন।তখন এখানে প্রায় সবটাই ফাঁকা জলজমি ছিল। দু'চারখানা টালির শেডের ঘর এদিক ওদিক মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। মেনরোড থেকে বেশ ভেতরে বলে, শরমা আপত্তি করেছিলেন। দিবাকর শোনেননি। আজ এখানে বড় বড় আবাসন আকাশ ছুঁয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। আগে ব্যালকনি থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত। এখন কংক্রিটের জঙ্গল সব ঢেকে দিয়েছে।গাড়ি-ঘোড়া কম চলে বলে এখানে ধুলোবালি কম। বেশ শান্ত নিরুপোদ্রব জায়গা। প্রমোটাররা দিবাকরের পিছনে পড়ে আছে ফ্ল্যাট বানাবে বলে। দিবাকর রাজি হননি।নিজের বাড়ির মর্যাদা আলাদা।তাছাড়া তিনি আদর্শ ও আভিজাত্যের অতীতকে আঁকড়ে বাঁচতে চান। একমাত্র ছেলে দিল্লিতে থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। একটা নামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভাল পোস্টে আছে।কালেভদ্রে কলকাতায় আসে।অর্ণব আর শরমা জেদ ধরেছে বাড়িটা ভেঙ্গে ফ্ল্যাট হোক।টাকা ও ঘর দু'টোই আসবে। দিবাকর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন,তাঁর জীবদ্দশায় বাড়িতে হাত দেওয়া চলবে না।
সকালটা দিবাকরের কাছে খুব প্রিয় সময়। হন্তদন্ত হয়ে লোকজন অফিস যাচ্ছে, বাজারে যাচ্ছে,বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে-- এসব দেখতে তাঁর খুব ভাললাগে। চলমান জীবনে তিনি তাঁর অতীতকে খুঁজে পান।এই ব্যালকনি তাকে তার অতীতটা ফিরিয়ে দেয়।
নীচের গলিটায় তাকাতে তাকাতে দিবাকর চলে যান তাঁর গ্ৰামের বাড়িতে। সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত গ্ৰামের ছেলে সে।ছোটবেলা কেটেছে অনাবিল আনন্দে। সহজ সরল জীবনে আনন্দ, হৈ হুল্লোড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না যেন।চারদিক দিগন্ত ছোঁয়া ধূ ধূ মাঠ, গ্ৰামকে ঘিরে রাখা কলাবতী নদী, বনবাদাড় আর সহজ সরল গ্ৰাম্য মানুষ --এদের নিয়েই জয়পুর গ্ৰাম। এই গ্ৰামের জলবায়ুতে পুষ্ট হয়েছে সে। সারল্যমাখা প্রিয় মানুষজনের ভালবাসায় বেড়ে উঠেছে। ডানা মেলা আনন্দের জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই তার পড়াশুনো।চাকরি।এখন জীবনে তেমন কোনো সমস্যা নেই।কলকাতা শহরে নিজের বাড়ি, ছেলের ভাল চাকরি, মোটা টাকার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স--মধ্যবিত্ত জীবনে আর কী চাই !
তবুও দিবাকর কেমন মনমরা হয়ে থাকেন। মাঝে মাঝো উদাস হয়ে যান।শহরের ব্যস্ত জটিল জীবন থেকে চলে যান গ্ৰামের অনাড়ম্বর সরল জীবনে।
মা বাবা অনেকদিন হল গত হয়েছেন।ভাই গ্ৰামে থাকে। চাষবাসের কাজ করে।বেশ ক'এক বছর হল, দিবাকর গ্ৰামের মুখ দেখেননি।মনটা আনচান করে। গ্ৰাম তাঁকে টানে।নদীর ভাটার টানের মত সে টান প্রবল। দিবাকর খুব মিস করেন গ্ৰামকে। তাঁর ছোটবেলাকে।
একটা হকারের চিলচিৎকারে দিবাকর সম্বিত ফিরে পেলেন।--"পুরোনো কাগজ--কাগজওয়ালা--" নীচের গলি দিয়ে একজন হেঁকে যাচ্ছে।লম্বা,তামাটে বর্ণের বয়স্ক মানুষ।কুঁজো হওয়া পিঠে ঢাউস একটা বস্তা।
সকালে অনেক হকার এ গলি দিয়ে যায়। দিবাকর প্রায় প্রত্যেককে চেনেন।ব্যালকনি দিয়ে সবাইকে তিনি দেখেন। কথাও বলেন।মাঝে মাঝে মাছ, সব্জি, এটা ওটা ওদের কাছ থেকে কেনেন।তিনমাস পর পর জমানো খবরের কাগজগুলো কাগজওয়ালা ডেকে বেচে দেন।
দিবাকর কাগজওয়ালা লোকটাকে মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।মনে করতে পারছেন না লোকটাকে আগে কখনো দেখেছেন কিনা।হঠাৎ দিবাকরের বুকটা ধক করে নেচে উঠল।বুক উজলে এক ঝলক রক্ত মুখে চলে এল যেন !কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। খুব পরিচিত চেনা মুখ।কিন্তু ঘটনার তাৎপর্য ঠিক মেলাতে পারছেন না।ত়াঁর বিশ্বাস এমনটা হওয়ার নয়। তিনি কোথাও গুলিয়ে ফেলছেন বিষয়টাকে।একে একে দুই ঠিক মেলাতে পারছেন না।
ঠিক দরকারে নয়,তবু লোকটাকে ডাকলেন তিনি। হয়তো নিজের ভাবনাকে ঝালিয়ে নিয়তে যাচাই করার জন্য। "এই যে ভাই শুনছেন--এই যে--এদিকে- ও কাগজওয়ালা--।"
কাগজওয়ালা লোকটা এতক্ষণে শব্দের উৎস সন্ধানে ফিরে তাকিয়েছে।
মাথা তুলে চোখ উপরে করে বলল, "কাগজ দেবেন বাবু।দশটাকা কিলো। ওজন ঠিক পাবেন।"
দিবাকর অনেকক্ষণ অপলকে উর্দ্ধমুখো লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলেন।শরমা কিচেনে রান্নার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের শব্দ শুনে বেরিয়ে এলেন।"হল কি মানুষটার ! কি এমন দেখল যে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে হচ্ছে !"
মেন গেটের কল্যাপসিবল দরজাটা খুলে রাস্তায় চলে এলেন দিবাকর।কাগজওয়ালা পিঠের বস্তা নামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছে।দিবাকর কাগজওয়ালার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। "তোমার নাম কি সুধন্য ?"
লোকটা মাথা নাড়ল। "আমাকে চিনতে পারছিস ? দিবাকর গুপ্তধন আবিষ্কারের বিস্ময়ান্বিত চোখে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন।কাগজওয়ালা যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দে হতবাক হয়ে গিয়ে বলল,--"মানে -তুমি--তুই কি দিবাকর !আমাদের দিবা !" --" চিনতে পেরেছিস তাহলে !আয়, ভিতরে আয়, ঘরে বসে গল্প করা যাবে।"দিবাকর সুধন্যকে ডাকলেন।সুধন্য সিঁড়িঘরে বস্তাটা রেখে দিবাকরকে অনুসরণ করল।
শরমা ড্রয়িংরুমে ছিলেন।কাগজওয়ালা ঘরে ঢুকতে দেখে হা হা করে উঠলেন।দিবাকর হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, "ও কাগজওয়ালা নয়,ও সুধন্য। আমার বলাইমামার ছেলে।আমার ভাই ,আমার বন্ধু, আমার বাল্যসাথী।তুমি তাড়াতাড়ি চা আর টোস্ট করে আন।"সুধন্য জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দিবাকর তাকে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে বললেন। সুধন্যকে পেয়ে দিবাকর বেজায় খুশি।অতীতকে ফিরে পেয়ে তিনি হাওয়ায় ভাসছেন।তিনি তাঁর ছোটবেলা, জয়পু্রের আকাশ বাতাস ,তাঁর আবেগ, তাঁর স্বপ্নকে ফিরে পেয়েছেন।
শরমা এখন কিচেনে।দিবাকর সুধন্যর গা ঘেঁসে বসলেন।"তোকে এই ভাবে দেখব, ভাবতে পারিনি। এরকম অবস্থা কি করে হল ?"সুধন্যের চোখ ছল ছল করছে।ধরা গলায় বলল,"তুই দমদমে থাকিস জানতাম।এখানে এইভাবে দেখা পাব স্বপ্নেও ভাবিনি, তুই ভাল আছিস এটা আমার পরম তৃপ্তি।তুই তো জানিস,বাবা সারাজীবন পায়ের উপর পা রেখে পৈতৃক জমিজমা বেচে খেয়ে পরে উড়িয়ে গেছে। বাবার মৃত্যুর পর জানতে পারলাম, অনেক লোকের কাছে ঋণ করে গেছে।অবশিষ্ট জমিজমা বেচে দিয়ে বাবার করা সব ঋণ শোধ করেছি।এখন আমাদের চার ভাইয়ের ভিটেবাড়িটুকু আছে।ছেলেপুলে নিয়ে বাঁচতে হবে তো।এখন এই বয়সে ভারী কাজ করতে পারি না। একজন এই কাজে ঢুকিয়ে দিল।যা উপার্জন হয় তাতেই না মরে বেঁচে আছি।"
সুধন্য একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে হাঁপিয়ে পড়েছে। দিবাকর জিজ্ঞাসা করলেন, "এখানে থাকিস কোথায়?
"শামবাজার ঝুপড়িতে।"
"সব্জি, মাছ বা অন্য কিছুর ব্যবসা করা যায় না ? একটু বসে জিরিয়ে ছোটখাট ব্যবসা।"
এত টাকা কোথায় পাব ?"
টাকার চিন্তা আমার উপর ছাড়।"
সুধন্য ফ্যাল ফ্যাল করে দিবাকরের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
শরমা চা টোস্ট নিয়ে এসেছেন।তিনি একদৃষ্টে সুধন্যকে দেখছেন।
দিবাকর,পরিবেশকে স্বাভাবিক করার জন্য বললেন, "জান শরমা, তোমাকে তো অনেকবার এই সুধন্যর কথা বলেছি।আমরা একসঙ্গে গ্ৰামের প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। দিন রাত দাপিয়ে বেড়িয়েছি পাড়া বেপাড়া। আমরা একে অপরের খেলার সাথী ছিলাম। কত নাটক নভেল এক সঙ্গে মঞ্চস্থ করেছি তার হিসেব নেই। ও আমার শুধু মামাতো ভাই নয়,আমার বাল্যবন্ধু। আমার জীবনসখা। আমরা একে অপরকে একদিন না দেখে থাকতে পারতাম না।"
সুধন্য ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে যাচ্ছে। দিবাকর রাস্তায় গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালেন।সুধন্যের কাঁধে হাত রেখে বললেন,"সামনের সপ্তাহ থেকে দমদম বাজারে সব্জি নিয়ে বোস। আমি কাউন্সিলরকে বলে সব ব্যবস্থা করে রাখছি। দিনদুই বাদে এসে হাজারদশেক টাকা নিয়ে যাস। পরে যা লাগবে চিন্তা করবি না। আমি আছি। ব্যবসা করে তোকে দাঁড়াতে হবে। আমার ভালো থাকার জন্য তোকে ভাল থাকতে হবে।"
সুধন্যের দু'চোখ ছাপিয়ে বুক ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে।সে হাতজোড় করে দিবাকরকে বলল,"তুই মানুষ নোস দিবা,তুই দেবতা। তুই সেই আগের মত আমার দিবা আছিস।
ছল ছল চোখে দিবাকর বললেন,আমি শেকড় আঁকড়ে, অতীতের পথ ধরে, লালিত স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখে আজীবন বাঁচতে চাই।তোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ, তুই আমার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখলি।"
শীতের সোনালী রোদ্দুর চরাচর ঢেকে দিয়ে সুধন্য ও দিবাকরের মুখে এসে পড়েছে।হাজার হীরের ঔজ্জ্বল্যে উজ্জ্বল দু'টো মুখ মাথার উপর সূর্যকেও ম্লান করে দিচ্ছে আজ !



0 Comments