হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুচ্ছ কবিতা


মনপাখি

ইড়া ও পিঙ্গলার মাঝখানে
একটি পাখি বসে আছে
বৃষ্টি থেমে গেছে
ভূতের মতন একা,তার উত্থান পতন
নেশা কেটে যাওয়া এক মাতাল দেখছে
জ‍্যোৎস্নার আভাষ, মেঘেদের খেলা
এক নিষিদ্ধ উড়ানের ডাকটিকিট
আজ কি মহালয়া
দূর থেকে ভেসে আসে চন্ডীপাঠ
মুহূর্তের হাওয়া ছুয়ে চলে যায়
অপ্রাকৃত ধ্বনি, প্রায়ান্ধ প্রপঞ্চ বুঝি এই
ভয় পাওয়া দেবশিশুর মতো
মন পাখি ডেকে ওঠে মানুষের ভাষায়
তোমার ও বুঝি নিস্তার নেই
একা ফেলে গেছে কেউ...

সঙ্গীত পরিক্রমা

আমি আজ গানের ভেলায় ভেসে বেড়াবো
'ওগো কমলিকা তুমি বুঝিলে না কেন হায়'
অখিলবন্ধু গাইছেন, তোমার ভুবনে ফুলের মালা
আমি কাঁদি সাহারায় ....
এখন রাত্রি অনুসরণ করছে দিনকে
একটি যন্ত্রণার ধুমকেতু
অবিরাম বর্ষণে ভেসে যাচ্ছে ভোর ও সন্ধ‍্যা
নি:সঙ্গতার মধ্যে একে একে শিল্পী উঠে আসছেন মঞ্চে, শ‍্যামলমিত্র থেকে মানবেন্দ্র
মান্না থেকে শচীনদেব ,বিশাল শূন্যতার মাঝে
এসে ধরা দিচ্ছেন কিশোরকুমার থেকে হেমন্ত
বিসর্জনের বর্ণমালা ,স্বর্গ যা এনে দেয় তার চেয়ে
একটুখানি বেশী, ক্রমশ পৃথিবীর মানচিত্রটি 
বদলে যাচ্ছে,রাস্তা নেই যাওয়ার
গানের সুর পুরো আকাশ জুড়ে
এমন সব বাজনা বাজবে আজ আমার জানা ছিল না
স্মরণীয় হয়ে থাকলো ,অদৃশ্য এই ছায়া পরিক্রমা...

অস্পষ্ট সংলাপ

গোধূলি আর সন্ধ্যার মাঝখানে একটি উড়োজাহাজ নেমে এসেছিল আমার বারান্দায়
যা যা নেওয়ার তা এক্ষুনি নিন 
আমাকে আবার উড়ে যেতে হবে,বলেই
তার চোখের তারা চঞ্চল হয়ে ওঠে
আমি তার গাল বেয়ে নেমে আসা অভিমানগুলি
মুছে দিতে দিতে বলি:বিশ্বাস অবিশ্বাস অশরীরী
প্রতিশ্রুতি শব্দটি বড়ো ক্লিশে,ব‍্যাক্তিগত
রাত্রি গুলি জমে যায় মেঘে
কাগজের জমিতে কবিতার বপন
আজও অনিশ্চিত...
বিরাজিত স্তব্ধতায় বিদ্যুতের মতো ক্ষণস্থায়ী
এবং ধ্বনিহীন প্রতিধ্বনির মতো সে চলে গেছে
রাত্রিকে শুভরাত্রি জানিয়ে
খুব আবছাভাবে মনে পড়ছে সব কিছু
স্বপ্ন ও জাগরণের মাঝখানে
যে প্রায়ান্ধকার তার গোপন অভিঘাত
ছলকে উঠছে এখনো
আর আমি অস্পষ্ট ধূসর সংলাপগুলির কাছে নত হয়ে বসে আছি...

একদিন প্রতিদিন

একদিন এরকমই হবে ,গাছের উপর আছড়ে পড়বে গাছ পশুর মুখ
মানুষের মুখের সঙ্গে বদলাবদলি হবে
সব হানাহানি আর প্রতিযোগিতা পিছনে ফেলে
বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসের নীচে
হুড়মুড় করে চাপা পড়ে যাবে
পৃথিবীর মাধ‍্যাকর্ষন 
সমস্ত দিগন্ত লাল করে যে সূর্য উঠতো
পূব আকাশে, আলো ফেলে দিয়ে তারো
অন্ধকারের দিকে সে কি নিশিপালানো দৌড়
মানুষ আর কিছু ভাবতে পারবে না
অথচ একদিন এরকমই হবে
প্রতিদিনের অতৃপ্তি থেকে অব‍্যাহতি চাইবে বিছানা, চাদর পাল্টে যাবে অনায়াসে
পুরুষ নারী তখন হা হা উন্মাদনা
চৈতালি ঘূর্ণিঝড়ে তলিয়ে যাবার
সেই সন্ধিক্ষণের কথা
ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যাই...

কালপুরুষের নিচে

কালপুরুষের নিচে তুমিও মাথা তুলে দাঁড়াও
যেন কিছু ই হয় নি এই ভেবে,সার্কাসের বামনটির মতোই যে পোশাক তুমি পরে আছো
আসছে শীতে তাও থাকবে না
ভাতের থালায় বসলে এখনো কি গা গোলায় তোমার,  লোভ আর লুন্ঠন দেখতে দেখতে
নি:শব্দে ফুরিয়ে যায় কথারা
হারিয়ে যায় শূন্য ক্ষিতি বায়ু জল
তবু এই ভয় ও আসলে ভয় নয়
সমুদ্রের বালিতে তুমিও লিখে রাখো জীবনলিপি
কালপুরুষের নিচে এই ভালোবাসা ও
নুন লঙ্কা মাখা ...

কবি হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়
   মালঞ্চ , দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান








0 Comments