পার্থ সারথি চক্রবর্তী'র গল্প


দেশপ্রেম  

সকালে মোগলসরাই স্টেশন থেকে বাইরে এসে বাসে করে বেনারস পৌছতে প্রায় একঘন্টা লাগল। বাস থেকে নেমে অটোতে ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের গেটে পৌছতে আরো ১৫ মিনিট।১৯ পেরোন শরীরটা ততক্ষণে ঝাঁঝরা।উফ্।আগের দিন সেই দুপুরে ট্রেনে চাপা। এবং অবশ্যই নিম্ন মধ্যবিত্তের স্লিপার ক্লাস। ছাপোষা মাস্টারমশাইয়ের ছেলের চোখে যে তখন ফৌজি হবার চরম বাসনা।পদার্থবিদ্যার পড়া ফেলে মাঠে কাটে দুপুর-বিকেল।দৌড়-ঝাঁপ-কসরত।রোগা শরীরটা কিন্তু ধকল কম নিচ্ছে না। গুয়াহাটির লিখিত পরীক্ষা দিয়েই আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর।যাক্!মনে মনে সার্ভিস সিলেকশন বোর্ডের অপেক্ষা ।
প্রতি সপ্তাহে এমপ্লয়মেন্ট নিউজের প্রতীক্ষা। মনে বিশ্বাস,ডাক আসবেই। ঠিক ৬৭ দিনের মধ্যে ডাক এল বাড়িতে।সে দুপুরে কি উন্মাদনা।এক সাধারণ ছেলের ফৌজি হবার,আকাশে ওড়ার স্বপ্নের প্রথম সিঁড়ি পার করা। অসামান্য অনুভূতি! 

ভাবতে ভাবতেই অটোটা বেনারস ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের সামনে।নেমেই দেখা গেল এক কোণে একটি টেবিল পেতে কয়েকজন বসে আছেন ।যাদের আকাশী পোশাক পরিচয় বলে দিচ্ছে । বুক ঢিপ ঢিপ। চিঠিটা দেখাতেই একটা ঘরে নিয়ে গেল দুই উর্দিধারী। রিফ্রেসমেন্ট! একটি খাবারের প্যাকেট আর জলের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বললেন,১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হতে। ওখানে আরো গোটা কয়েক উপস্থিতি ।সবাই সবাইকে দেখছে।  

এয়ারফোর্সের বাসটা টিপটপ। কিছুটা যাবার পর ক্লান্ত শরীরটা তন্দ্রাচ্ছন্ন।

অনেক উপর দিয়ে যাচ্ছে ফাইটারটা। সামনে শত্রুবিমান। ক্রমাগত গুলি ছুড়ছে। সেই আঘাত বাঁচিয়ে,সুকৌশলে প্রতিপক্ষের বিমানকে ধ্বংস করে দিল মুহূর্তে!

হঠাৎ ডাকে জেগে ওঠে দেখে ৪, সার্ভিস সিলেকশন বোর্ড,বারাণসী। আজ থেকে আগামী সাতদিন এখানেই ডেরা।শোনা যায়, অনেকগুলো ধাপে কঠিন সব পরীক্ষা। একের পর এক।পারবে তো,সি.ডি.এসের এই ব্যাচে সিলেক্ট হতে!যাই হোক,চেষ্টা করা যাবে!জান লড়িয়ে তো দেওয়া যাবে!  বাকিটা বাবা বিশ্বনাথ দেখবেন!  আসার সময় মা পইপই করে বলেছে একবার বিশ্বনাথ মন্দির অবশ্যই যাস্। আর নিজের ও, এই বাঘছাল পড়া,ভষ্মমাখা লোকটার উপরেই  ভরসা। ছোট থেকে এত কাছের বোধ করে যে রক্ত- মাংসের মানুষই মনে হয় তার! বেশি কাছের মনে করলে যা হয়! 

বাস থেকে নেমে সব ফর্মালিটি সেরে ঘরে ঢোকা। ব্যারাক! অদ্ভুত এক অনুভূতি।এক ঘন্টা পর লান্চে সামনের ৬ দিনের কর্মসূচী বুঝিয়ে দেওয়া হল। সব সুশৃঙ্খল ভাবে। পেশাদার ফৌজি কায়দায় ।তবে আজ বিকেলে ইনডাকসন ট্যুর। তিনটেয় রওনা!  ততক্ষণে দু'একজনের সাথে অল্পবিস্তর আলাপ। বাসে চেপে সেটা আরেকটু গাঢ় হল। কয়েকজন আবার আপাত-গম্ভীর। মিশতে চায় না বড়। একা একাই থাকে।

একের পর এক বিভিন্ন সেশন চলতে থাকল।শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা,বিভিন্ন লিখিত পরীক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। চতুর্থদিনে পরীক্ষার ফল বেরোবে। চাপা টেনশন। কারও মুখে এও শোনা,ফৌজি ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া সিলেক্ট হওয়া অসম্ভব!গ্রুপ ডিসকাশনে কারো কারো আচরণে সেটা প্রকাশও পেয়েছিল। যদিও পার্সোনাল ইন্টারভিউতে তেমন কিছু কখনো কিন্তু মনে হয় নি!

৫২ জনের ব্যাচে ১১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এই শর্মাও আছে তার মধ্যে!সত্যিই খুব উত্তেজিত লাগছে।

আগামীকাল  পি.এ.বি.টি। অর্থাৎ পাইলট এপ্টিচিউড ব্যাটারি টেস্ট ।এ এমন একটা পরীক্ষা,যা জীবনে একবারই দেওয়া যায়! উত্তীর্ণ হলে পরবর্তী ধাপ। নাহলে এয়ারফোর্সে নির্বাচিত হওয়ার রাস্তা  চিরতরে বন্ধ। এতে একটা ভার্চুয়াল ফাইটার প্লেন চালানোর ও তা নিয়ন্ত্রণ করার পরীক্ষা হয়। সেটা  মনিটরে। একটা অন্ধকার ঘরে একা। ককপিটের ফিলিংস্। রোমহর্ষক! বিশ্বনাথের কৃপায় চারজন এই পরীক্ষায় পাশ! চকচক্ করছে বাকি ৩ জনের সাথে নিজেরও নাম।

আর বাকি ফাইনাল পার্সোনালিটি টেস্ট। সারারাত উত্তেজনায় চোখে ঘুম নেই! এমনিতেই মাত্র ১১ জন অবশিষ্ট ।তারমধ্যে বাকি ৭ জন অন্য স্টিমে!বাকিরা তো দু'দিন আগেই ফিরে গেছে।নতুন বন্ধুদের সাথে এত তাড়াতাড়ি বিচ্ছেদেও মন ভারাক্রান্ত! 

Dream comes true!  আজ শেষদিন এস.এস.বি'র। লিস্ট আউট! তিনজন এয়ারফোর্সে সিলেক্টড। তার মধ্যে এই সাধারণ,গেঁয়ো তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছেলেটিও আছে।

কিন্তু ওই যে অদৃষ্ট!মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য দিল্লি রওনা হতে হবে! বাড়িতে ফোন করে খবর দিতেই মায়ের অঝোরে কান্না। কোন অজানা ভয়! আর যাওয়া হয় না।

আজ সাত বছর অতিক্রান্ত। কার্গিল সেক্টরে পাকিস্তানের হামলার জবাব দিচ্ছে দেশ। হামলাকারীরা কার্গিল ও দ্রাস সেক্টরে দুটি স্ট্র্যাটেজিক পজিশন দখল করেছে। এ অবস্থায় গতকাল এয়ারফোর্সের ১৪ নং কমান্ডকে পাঠানো হয়েছে । সকাল থেকে কিছু খেতে পারেনি উত্তেজনায়!অফিসেও চুড়ান্ত ছটফটানি। আসলে মন পড়ে আছে ফ্রন্টে। সেখানে এখন অভিযানে যে তার বন্ধু,ব্যাচমেট মণীশ সিং।খুব মনে পড়ে ওর কথা। টায়ারের ভিতর দিয়ে লাফানোর সময় প্রথমবার ব্যথা পেয়ে পড়ে গিয়ে মনে হয়েছিল রণে ভঙ্গ দিতে। তখন তো মণীশই এগিয়ে এসে সাহস দিয়েছিল । পিঠ চাপড়ে বলেছিল 'ফ্রেন্ড,ইউ ক্যান ডু ইট '। কাজেই কিছুতেই শান্ত হতে পারে নি। এভাবে ঘন্টা,  দিন কাটে। বেশ বুঝে , সেও পৌছে গেছে ফ্রন্টে! যুদ্ধ করছে! শুধু শত্রুর সাথে নয়! নিজের সাথেও।

অবশেষে কার্গিল বিজয় এল  ২৬ তারিখে।  কিন্তু হারিয়ে গেল প্রিয় বন্ধু। চিরতরে।আর শোনা যাবে না সেই দৃপ্ত কন্ঠস্বর!নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলল!
কার্গিলে !
(মণীশ হতে না পারা এক দেশপ্রেমিকের ডায়েরি থেকে ।নাম,তারিখ ইত্যাদি পরিবর্তিত)

     গল্পকার পার্থ সারথি চক্রবর্তী 
কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ














1 Comments