বিকাশরঞ্জন হালদারের স্মৃতি আলেখ্য


অতিক্রমের পথ

কটু পেছন ফিরে তাকালেই চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় - এক ধূ ধূ জীবনের খড় -মাটি -ঘাস।
গ্রাম-  নালুয়া কাঁকপুকুর। দঃ ২৪ পরগনা। যার মাটিতে মাথা তোলা তুচ্ছ এক জীবন,পাঁচুগোপাল হালদার।কাঙালি বাবা-মা'র বড়ো ছেলে।কচুশাক সেদ্ধ খুদ আটাঘন্টো খেয়ে বেড়ে ওঠা এক মানুষ।অনেক কষ্টে লোকের বাড়িতে,রাখালের বারোমেসে বালকবেলা পার করে,এখন ভাগ চাষি।পরের জমিতে শ্রম ঢেলে, গতর কাটিয়ে কোনো  ক্রমে...আমাদের  জ্ঞাতি। সম্পর্কে দাদা। আমারা বড়দা বলেই ডাকি। সেই ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি,বড়দা সারা দিন  বাদায় খাটে।সামান্য ক'টা ধানের জন্যে,খড়ের জন্যে। 

জীবনের ওপর দিয়ে  কতো কতো হেমন্ত - বসন্ত বয়ে যায়। কমে বাড়ে চাঁদ! কখনও চাঁদিনী ঘোর!বড়দায়  কোনো ধারনাকে এতোটুকুও না ছুঁয়ে! দুটো গোরু  থাকে গোয়ালে। দাদার গো-হাল জীবনে। চাষের সময়  হাল বিক্রি করে একটু এগিয়ে যায় চলার পথে।বৌদিতো দেখেছি অসুখ বিসুখ নিয়ে থাকে। তবুও  প্রচুর খাটতে হয়! বড়দা নিজেই গোয়াল পরিষ্কার করে সযত্ন হাতে।গোবর তোলে,ছাই ছড়ায়,চেঁচকো কাটে নোনা গাঁয়ের বাদায়।গোরুর জন্যে খড় কোচে  খড়কাটা বঁটিতে। খুব ছোটো ছোটো করে,আর খোল ভুসি দিয়ে কোনোরকম জাবনা করে দেয়। আধুনিক সুষম খাবার- মুগচুনি মুশুরচুনি এসব দিতে পারেনা।বড়দার জীবন শুধু হাড়বাটা খাটুনি দিয়ে টেনে নিয়ে চলা। 

দেখেছি কাদাসারা,দাওয়াসারা,খামারে পলমাড়া,যা কিছু সবই ঐ অন্যের জন্যে।অন্যের হয়ে!ধানকাটা  শেষ হলে, কুজি বেঁধে এই সোজা মনের মানুষটাকে ধানবাদার মাঝে,নিথর দুপুরে কিংবা নিশুতি রাতে, পাহারা দিতেও দেখেছি। যাতে ধান চুরি না হয়।এক আধটা কাঁথা বালিশ নিয়ে,বড়দা পড়ে থাকে ঐ  তালপাতা চ্যাড়া ঘেরা কুজিতে !দিনের পর দিন,  রাতের পর রাত ! 

পরিবারে আটজন। চার মেয়ে,দুই ছেলে।নোনা ঘাম  ঝরিয়ে,নোনা মাটির বুকে এক নুয়ে পড়া জীবন ! বড়দা একটু অবসরও বাঁচিয়ে রাখেনা।ফাঁক পেলেই  লোকের ধান ভেনে দেয় ঢেঁকিতে। দ-মুঠো চাল পায়, তুষ - গুঁড়ো পায়।ক'টা হাঁস মুরগী আছে ঘরে। তাদের  পেলে পুষে রাখতে পারে। তবে এভাবে জীবন আর যেনো চলতেই চায় না !জীবন বোঝা হয় !ভার লাগে !  সীমাহীন ক্লান্তি এসে বুক জুড়ে বসে !সুখ কখন যে  উবে  যায় ! একমুঠো পান্তা আমানি খেয়ে,পাড়ায় পাড়ায় এলোআমদা ঘরে বেড়ায় কচি কচি বাচ্চা গুলো ! বীরে - ভজা - ঘড়িরা...

এ- গাঁয়েই আমাদের কিছুটা হলেও সাচ্ছন্দের জীবন। আমাদের বাড়িতেও বড়দাকে প্রচুর খাটতে দেখেছি।  বাঁশ চ্যালা করে দেওয়া,জাল ফেলে মাছ ধরে  দেওয়া,কোদাল কুপিয়ে পুকুর পাড়ে বাগান করে  দেওয়া...এইসব ! বড়দা আমাদের ছোটো ভাই বলে খুব ভালোবাসে।হালের পর মই দেওয়ার সময়,দাদার  কোমর জড়িয়ে ধরে,মই- এর ওপর উঠে,গাড়ি চড়ার আনন্দ উপভোগ করেছি দিনের পর দিন।পলমাড়ার  সময়, একপাল গোরুর পেছনে পেছনে ঘুরেছি ! ধানঝাড়ার সময় একটা বিচুলি নিয়ে,আগড়ে আছড়ে আছড়ে,দাদার সঙ্গে দাদা হয়ে উঠেছি !এসব তো  আমাদের খেলা। খেয়াল-খুশি আনন্দ। কিন্তু বড়দার  ঘরে জমে থাকে নিকষ অন্ধকার ! অনটনের পাথর  হয়ে !

একবার এলাকার বেশ কিছু বাদা নিয়ে,ফিশারি হল। ধান চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো।এই গাঁয়ে।একটু আধটু এখানে ওখানে পড়ে থাকলো ধেনো জমি। আগাম টাকায় জমি চাষে ভাটা পড়লো।বড়দার তখন চরম দুর্দশা ! আমার বাবা,দশ কাঠা জায়গা দিলো বড়দাকে। মানুষটা বিনয়ী,কথার বাধ্য,ডাকতে হাঁকতে সহযোগী তাই। বড়দা আমাদের কাছে যেন একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠলো ! নিবু সলতে একফোঁটা তেল পেয়ে  যেমন জ্বলে ওঠার বাসনায়...

এখন ছেলেরা বড়ো  হয়েছে। তবে লেখাপড়া শিখতে  পারেনি।শেখানো সম্ভবত হয়নি বড়দার পক্ষে,এই হতদরিদ্র চাষির ঘরে।মেয়ে কটাকে কাছাকাছি বিয়ে দিয়েছে দেখেশুনে। ঘাড়ে টেনে নিয়েছে এক বোঝা  দেনা ! খাটতে খাটতে দেনার বোঝা কমাতে গিয়ে, বেড়েছে ক্লান্তির বোঝা ! বেড়ে চলেছে বয়েস দিনের  পর দিন। ঘিরে ধরেছে অনড় যাতনা !চৈতালি বাতাস তীর্যক হেসে ফুরফুরে হয়েছে কতো বার।কতোরকম  ভাবে, কিন্তু বড়দার নিয়তি-নিঠুর জীবনে সেই ঘুটঘুটে একঘেয়েমি ! 

আজ দাদা বয়েসের ভারে জীর্ণ।বড়ো ছেলে ছোটো ছেলে মাথায় মুরগীর ঝাঁকা নিয়ে,যে যার বৌ-ছেলেপুলে ঠেকানোর ঝুঁকিতে এ-পাড়া সে- পাড়া।  দাদা -বৌদি কে একমুঠো নুনভাত দেবার সামর্থ্য  কিংবা ইচ্ছেও তাদের নেই !অভাবে যেভাবে নষ্ট হয় স্বভাব মানুষের,ঠিক সেরকম!

বড়দা অসুস্থ। বুকে ব্যথা করে।পেটে ব্যথা করে। এর ওর থেকে পেলা ওষুধ এনে দেয় বৌদি।কি আর হবে! অসুখ বেড়েই চলে!বড়দার বিছানায় ময়লা কাঁথায় বালিশে নিঃশব্দে বৌদির চোখের জল পড়ে !বড়দার  শীর্ন মন আলো খোঁজে ! এখনও বাঁচার...

ঘুমের মাঝে দাদা স্বপ্ন দ্যাখে,কোথাকার কোন্  ফেরিডনের শিশি, ছিপি খোলা পড়ে আছে বাস্তু ভিটের উঠোনে ! দাদা হাসছে !পাগলের মতো উন্মত্ত  চিৎকারে,হাঃ হাঃ করে হাসছে !বড়ো বৌদির মুখে শুনেছি এরকম ঘুমের  মোড়কে,কতো স্বপ্ন কিংবা  দুঃস্বপ্নের কথা !তবে কি...

দীর্ঘ ভোগান্তির পর একদিন সেই দিন আসে।যেদিন  জীবন,দাদাকে ফেলে রেখে যায় ! হয়তো ঠিক  অবহেলায় নয়।যন্ত্রণার শিকল খুলে দিতে,হয়তো বা  বন্ধুর হাত বাড়িয়ে !

বড়দা নেই ! বিপুল শূন্যতা এখন ! দাদার সেই মাটির  ঘরের দরজায় জীবনের সুরক্ষার আগড়ে তালা ঝোলে! দাওয়ায় টিমটিম করে কুপি জ্বলে অন্যমনস্ক  মৃদু আন্দলনে ! মায়াচ্ছন্ন মাটিতে! আর ভরপুর  প্রাণের গন্ধ ভেসে আসে একজন খাঁটি কৃষকের !  আমার পরান যার দিকে আজও তাকিয়ে থাকে ঠায়... 

লেখক বিকাশরঞ্জন হালদার 
রঘুনাথপুর, বিরেশ্বরপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা














0 Comments