দোলনা ~ রিঙ্কি বোস সেনের ছোটগল্প


রিঙ্কি বোস সেনের ছোটগল্প 
দোলনা 

ঘরের দরজাটা আস্তে করে খুলে পা টিপেটিপে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো তিথি। শ্রাবণী বাঁ'হাতটা চোখদুটোর উপর রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে। জেগেই আছে, ঐ একটা ভাতঘুম চোখে লেগে থাকলে যা হয়। তিথি অবশ্য ঘুমোয়নি, সারাদুপুর ছাদে ছিল, প্রতীকের সাথে। কিছু একটা হচ্ছিল সেখানে। শ্রাবণী ঠিক জানে না কী হচ্ছিল, জানার চেষ্টাও করেনি। শ্রাবণীর ভালো লাগে না সবার সব ব্যাপারে নাক গলাতে। যে যেভাবে থাকতে চায় থাকুক। এক ছাদের তলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে হলে একে অপরের অনেককিছুর প্রতিই উদাসীন হতে হয়। শ্রাবণী অনেক আগেই এই স্বভাব রপ্ত করে নিয়েছে, পবিত্রের চলে যাবার পর তো আরও বেশি করে নিজেকে সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো থেকে সরিয়ে রেখেছে।
___ 'সংসার বড় জটিল জায়গা, তার চেয়েও বেশি জটিল সংসারের চৌহদ্দির মধ্যেকার সম্পর্কের সমীকরণগুলো।' __
 এটা পবিত্র প্রায়ই বলত শ্রাবণীকে, সাথে আরও বলত,
__'যত পারো আমার উপর ছড়ি ঘোরাও গিন্নী, দোষ নেই কিন্তু আমি গেলে এই অভ্যাস কিন্তু ছাড়তে হবে...ছড়ি সরিয়ে রেখে ওদেরকে লাঠি করে বাঁচতে হবে, মনে রেখো'।
শ্রাবণী মনে রেখেছে, ভোলেনি কিছুই। শুধু পবিত্রের কথাগুলোই নয় শ্রাবণী ওর বাবার কথাগুলোও মনে রেখেছে। 

গ্রামের মেয়ে শ্রাবণী, গ্রামেই পড়াশোনা, গ্রামেই বড় হওয়া। তাই ছোট থেকেই খুব সাদামাটা, অনাড়ম্বর কিন্তু অকৃত্রিম একটা প্রাকৃতিক আবহের মধ্যে শ্রাবণীর বেড়ে ওঠা। মাটির গন্ধে, ঘাসের স্পর্শে ওর ছেলেবেলা কেটেছে। দুই দাদা'র জন্মের প্রায় বারো বছর বাদ শ্রাবণীর জন্ম। আর তাই বাবার একেবারে আদরের দুলালী ছিল সে। বাবার কাছে পড়া, বাবার সাথে খেলা, গল্প শোনা এসব ছিল শ্রাবণীর নিত্যদিনের অভ্যাস। গরমের সন্ধ্যেবেলাগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের মায়াবী। লোডশেডিং হলেই ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে আকাশের তারা গুনতে গুনতে শ্রাবণী শুনতো, জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত কিন্তু হার না মানা ওর বাবার কথাগুলো ,
__' মনা, জীবনে যাই আসুক না কেন এই মাটির কথা মনে করবি, এই মাটির মত সহ্যশক্তি রাখবি। এই মাটি সবকিছুকে ধারণ করে রেখেছে, পরম যত্নে লালন করছে। পরিবর্তে কী চাইছে? কিছুই না। রোদে শুকিয়ে, জলে ভিজে...শুধুই দিয়ে চলেছে। তুইও এমন করেই তোর চারপাশ'টাকে লালন করবি, ধারণ করবি, নরম মনের কিন্তু শক্ত মানসিকতার মানুষ হবি ...বড় হবি, একদিন সংসার করবি, কর্তব্য পালন করবি অথচ দেখবি পরিবর্তে তেমন কিছুই পাচ্ছিস না, মন খারাপ করবি না, এই মাটির কথা মনে করবি আর নিজের কাজটুকু করে যাবি। দেখবি জীবনের গল্প কী সুন্দর তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে'।

কথাগুলো সেই তখন থেকেই শ্রাবণী মনের মধ্যে
সযত্নে লালন করে এসেছে কিন্তু তাতে গল্প যে তরতরিয়ে এগিয়ে গেছে তা নয়। জীবনের প্রথম ধাক্কাটা খায় এগারো -বারো বছর বয়সে যখন বাবা'টা ওর হঠাৎ করেই খুব অসময়ে চলে যায়, মাত্র চারদিনের জ্বরে। বাবা'কে হারিয়ে ছোট্ট শ্রাবণী তার পৃথিবীটাকেই হারিয়ে ফেলে। সংসারে যদিও অভাব ছিল কিন্তু তবুও এদিকওদিক করে হেসে-খেলেই চলে যাচ্ছিল। অভিযোগ বা অতৃপ্তি ছিল না কোথাও। কিন্তু বোধহয় স্বল্পে সন্তুষ্ট থাকা মানুষদের সুখ স্বয়ং বিধাতারও সহ্য হয় না। আর তাই তো সুখী পরিবারে আছড়ে পড়লো বাঁধভাঙা দুঃখের ঢেউ। শ্রাবণীর দাদা'দের মাথা ভালো ছিল তাই মোটামুটি কাজকর্ম খুঁজে নিতে অসুবিধা হল না। শ্রাবণীও পড়াশোনায় খারাপ ছিল না কিন্তু সেইভাবে আর পড়াটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারলো না। রূপরং ছিল বেশ ভালো।আর তাই পবিত্রর পিসে-পিসী শ্রাবণীদের গ্রামে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে শ্রাবণীকে দেখা মাত্রই উঠেপড়ে লাগে, শ্রাবণীকে এক কাপড়ে নিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। শ্রাবণীর মা আর দাদা'রাও আর দেরি করল না। মাত্র ঊনিশেই সে ঢুকে পড়ল সংসার রাজ্যে। শ্রাবণীর মনে পড়ে গ্রামসুদ্ধু লোকের মুখে তখন একটাই কথা,
__ 'এমন সম্ভ্রান্ত পরিবার, সরকারি চাকুরে পাত্র! সুবোধ দাঁড়িয়ে থেকেও এমন সম্বন্ধ করতে পারতো কিনা সন্দেহ,  মেয়েটা সত্যি কপাল করে এসেছে,'। 

শ্রাবণী সত্যি কপাল করে এসেছে কিনা জানে না, এই নিয়ে কোনোদিনই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেনি সে। মাত্র এগারো-বারো বছরের কাঁচা বয়সে জীবনের মস্ত বড় খুঁটিটাকে হারিয়ে যে অপূরনীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল শ্রাবণীর মনে তারপর আর ভাগ্য - সৌভাগ্য নিয়ে ভাবার মত কোনো বিলাসিতা কারোর থাকে না। তবে এটা ঠিক খুব ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত ভাবে নিজের ক্ষতস্থান লুকিয়ে রাখতে শিখে যায় সে। বাবা'কে সদ্য হারিয়ে খুব যখন কষ্ট হত, কান্না পেতো তখন মাটির দিকে তাকিয়ে বাবার মুখটা আর বাবার কথাগুলো মনে করত শ্রাবণী...। আজও তাই করে, যখনই বুকের ভিতরে একটা চাপ লাগে, চোখদুটো বুজে, মাথা ঝুঁকিয়ে বাবার মুখটা মনে করে, মনে করে সেই কথাগুলো, 
__'সংসারে কাজটুকু করে যা... ঐ কাজটুকুর জন্যই তো আসা, সংসারের ছন্দ-তালে নিজেকে ঢেলে দিবি, দেখবি সুখ আপনা-আপনিই তোর কাছে এসে ধরা দিয়েছে।' 
এইভাবেই একটা অদ্ভুত সুন্দর জীবন দর্শন তৈরি হয়ে যায় শ্রাবণীর। আজ জীবনের শেষ ধাপে এসেও সেই দর্শনই শ্রাবণীর অন্যতম সম্বল। এই দর্শনের উপর ভর করেই প্রতীক-মৌমীর সংসারে সে আপন সুরে টিকে থাকতে পারে, তানাহলে তো চোখের সামনে অনেককেই দেখলো বৃদ্ধাশ্রমের দিকে ঝুঁকতে বা হয়তো পৃথিবীর এক কোণে একচিলতে জমিতে একাকীত্বের ঘেরাটোপে শেষ প্রহরের অপেক্ষা করতে। 
__' ঠাম্মি, ঘুমচ্ছো?' 
বিছানায় শ্রাবণীর পা'য়ের কাছে এসে বসল তিথি।মাথার উপর থেকে হাত'টা সরিয়ে শ্রাবণী তিথির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, 
__' নাহ দিদিভাই! ঘুম আর কই, ঐ একটু তন্দ্রা...কেন বল, কী বলবে তুমি?' 
___' তোমাকে একটা জিনিস দ্যাখাবো'
___' কী দ্যাখাবে?'
__' ও তুমি চল, নিজেই দেখবে'
শ্রাবণী ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে আলগোছে চুলটা খোপা করে, 
__' যাবো, পম্পাদি আসুক, চা'টা খাই, তারপর না হয় যাবো, কেমন?' 
তিথি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে শ্রাবণীকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় পা'য়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। শ্রাবণী কয়েক সেকেন্ড সেদিকেই চেয়ে বসে রইল। মনে পড়ে গেল বছর নয়-দশের সেই মনা'কে, তিথির মতই এইরকম চনমনে, উচ্ছ্বাসে ভরা বাবার আদরের দুলালী ছিল সে। মুখ খুললেই তার বাবা বুঝে যেতো সে কী চাইছে। ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো কত ছবি।

___' কী করছিস রে মনা?' 
পিছনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সুবোধ। মনা এক মনে প্লাস্টিকের বালতির বড় ঢাকনাটার দু'পাশে উলের কাঁটা দিকে দুটো ফুটো করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কোনো উত্তর দিল না। সুবোধ এবার লুঙ্গিটাকে জড়ো করে মনার পাশে এসে বসল, তারপর ফিসফিস করে, 
__' কী বানাচ্ছিস, আমায় বলবি না?' 
__' দোলনা', 
দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে গায়ের সব জোর দিয়ে ঢাকনায় ফুটো করার চেষ্টা তখনও অব্যাহত। সুবোধ একটু মুচকি হেসে, মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে, 
__' দোলনা চড়তে ইচ্ছে হয়েছে বুঝি?'
__' হুম'
__' তা কোথায় বাঁধবি এই দোলনা? '
__' কেন ওই আম গাছ'টার ডালে!'
সুবোধ একবার চোখ তুলে আম গাছ'টা দেখে নিল।তারপর উঠে বাড়ির পিছন দিকে গেল,সেখানে রয়েছে যাবতীয় বাতিল জিনিসের স্তুপ, সাইকেলের পুরনো টায়ার থেকে শুরু করে পুরনো হ্যারিকেন, কৌটো, বালতি সব কিছুরই অংশবিশেষ। সুবোধ মিনিট পনেরো সন্ধান চালালো তারপর খাজানা জিতে ফেলার মত একটা আনন্দ নিয়ে মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়ে তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিকের ঢাকনার সাথে উলকাঁটা দিয়ে।
__' শোন মা, তুই বরং এই ঢাকনা'টা রেখেই দে কখন আবার তোর মা এইটার খোঁজ করবে, চেঁচামেচি করবে...দ্যাখ আমি কী পেয়েছি'।

 আড়াই বাই এক ফুটের কাঠের একটা পাটা। দেখা মাত্রই মনা'র চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো।একটা শক্তপোক্ত কাঠের পাটা, সামান্য একটু বাঁকা, কিন্তু তা হোক, দোলনা তো হবে...অনেকটা উঁচু করে দোলা তো যাবে। 
___' চল একটু দড়ি নিয়ে আসি তারপর আচ্ছা করে সেই দড়ি এই পাটায় জড়িয়ে  আম গাছের ঐ যে ডাল'টা দেখছিস ওইটায় বেঁধে ঝুলিয়ে দেবো...তারপর আমার মনা'মা মনের সুখে দোলনা ঝুলবে...ঠিক আছে?'
একমুখ হাসি নিয়ে ঘাড় নেড়ে দেয় মনা। তারপর বাপ-বেটি বেরিয়ে পড়ে পাশের মুদি থেকে শক্ত দড়ি কিনে আনতে। আম গাছের একটা ডালে বাঁধা হয় দোলনা, সারা দুপুর চলে সেই দোলনা পর্ব। বিকেল হলে দোলনা পুরো তৈরি। মনার তখন সে কী রোমাঞ্চ, ধীরে ধীরে দোলনায় চেপে বসল, সুবোধ পিছন থেকে হাল্কা করে দোলনা'টা ঠেলে দিতেই সেটা ধীরে ধীরে পেন্ডুলামের মত এগোতে পিছতে লাগলো। মনা'র বুকে সাহস বাড়তে লাগলো আর তার সাথে দোলনার গতি, ক্রমাগত পা'দুটো আগে-পিছে করে শরীরটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল সে। সুবোধের দুচোখে তখন জল, আবেগের জল... মেয়ে'টা যে তার বড্ড প্রিয়। এমন করেই মেয়েটা যেন হেসেখেলে থাকে, স্বপ্নের হাত ধরে এমন করেই যেন উপরে, আরও উপরে, সে উঠতে পারে, স্বপ্নের উড়ানে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। 

__' দিদিমা চা' 
পম্পা চা'য়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকে এসে দাঁড়ালো।নিমেষে শ্রাবণী ফিরে এলো তার স্মৃতির গলিপথ থেকে... যেন কত সহস্র যুগ পার করে সে এক রূপকথার রাজ্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে একসময় ছিল এক রাজা আর তার এক রাজকন্যা। খুব সাদামাটা রাজপাট ছিল তাদের, কিন্তু সুখ ছিল ঝুড়ি ঝুড়ি... তৃপ্তি ছিল আকণ্ঠ। সামান্য একটা বাঁকাচোরা কাঠের পাটা দিয়েই তারা কাটিয়ে দিতে পারতো কিছু সুখের প্রহর। রাজকন্যা পারতো তার স্বপ্নের আকাশ ছুঁয়ে দেখতে, আর সেই রাজকন্যের আকাশ-ছোঁয়া আনন্দ আর খিলখিল হাসির মধ্যে রাজা পেতো রাজ্য জয়ের সুখ, তৃপ্তি। আর এই নিদারুণ তৃপ্তির জোয়ারেই একদিন টুপ করে চোখ বুজে কালের অতলে হারিয়ে গেল সেই রাজা। সেইদিন থেকে রাজকন্যার স্বপ্নের দোলনাও যেন মাটিতে আছড়ে পড়লো। আর সেইভাবে আকাশ ছুঁয়ে দেখা হয়ে উঠলো না রাজকন্যার।
__' জানলাগুলো খুলে দিই দিদিমা?' 
শ্রাবণীর দুচোখে জল, আঁচল দিয়ে খানিক মুছে নিয়ে,
__' দিবি? দে তাহলে, দাদা- বৌদি চা খেলো?'
__' না, দাদা- বৌদি তো বেরোলো',
__' বেরোলো?  কোথায়?'
__ ' ঐ যে জন্মদিনের জন্য কীসব কেনাকাটা বাকি, আমায় বৌদি রাতের রান্না বলল আর বলল দরজাটা লাগিয়ে দিতে, তোমায় কিছু বলেনি?'
__' নাহ!'
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো শ্রাবণীর বুকের ভিতর থেকে। 
__' দাদারা কেমন গো? তোমায় কিছু বলেও যায় না?'__
শ্রাবণী এবার প্রকৃত অনুভূতিকে কাবু করে নিয়ে, 
__' বলে যেতেই হবে এমন কি কোনো কথা আছে? আমি ঘুমোচ্ছি ভেবে, হয়তো আমি ব্যতিব্যস্ত হব এই ভেবেই বলেনি...তিথি আছে তো? যা ওকে ডেকে দে, বল ঠাম্মি এখন রেডি...আর তুই যা বৌদি রান্না যা বলেছে দ্যাখগে'।
 শ্রাবণীর কথার ঝাঁঝ বুঝতে পম্পার অসুবিধা হল না। শ্রাবণীকে আড়াল করে ভালো রকম একটা ভেংচি কেটে জানলাগুলো খুলে ঘর থেকে পা' ঠুকে বেরিয়ে গেল সে। 

শ্রাবণী খাট থেকে উঠে জানলার ধারে এসে দাঁড়ালো। জানলার বাইরে এক ব্যস্ত পৃথিবী, কতকত মানুষ, কত গাড়ি...কত গতি আর ছুটোছুটি... শ্রাবণীর নিথর, নিস্তব্ধ পৃথিবীর মত নয়। পবিত্র চলে যাবার পর থেকে শ্রাবণীর জীবন প্রায় একেবারেই নিস্তরঙ্গ, হঠাৎ করেই যেন থমকে গেছে। প্রতীক-মৌমির সংসারে অভাব কিছুই নেই, আর তাই অভিযোগ করারও কিছু নেই। শুধু ওরা যেখানে খুব ব্যস্ত, শ্রাবণীর সেখানে শুধুই অবসর...অসামঞ্জস্যটা ঠিক এইখানেই। তিথি'টা অবশ্য তার সরল সাহচর্যে সেতুর মত দুই প্রান্তকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বড় মিষ্টি মেয়ে'টা, বড় মায়া। 
___' চলো ঠাম্মি'
তিথি পিছন থেকে এসে শ্রাবণীকে জাপটে ধরল।
__' কোথায় যাবো দিদিভাই?'
__' ছাদে'
__' ছাদে? কেন তোমার টবে নতুন গোলাপ এসেছে বুঝি?' 
__' উফ! অত বলতে পারবো না, যেতে বলেছি চল ব্যাস!' 

শ্রাবণীকে একপ্রকার হাত ধরে টেনে ছাদের দরজায় এনে দাঁড় করালো তিথি।
__' ঠাম্মি এবার তুমি চোখ বন্ধ কর'
__' একী! কেন?'
__' কর না!  আমি তোমাকে একটা দারুণ জিনিস দ্যাখাবো, তুমি চোখ বন্ধ কর...চোখ খুলতে বললে তবেই খুলবে, তার আগে খুলবে না কিন্তু!'__
শ্রাবণী অনুগত ছাত্রীর মত তিথির কথা শুনে চোখদুটো বন্ধ করল। তারপর তিথির হাত ধরে ধীরে ধীরে এক'পা দু'পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। 
__' ব্যাস, ব্যাস ঠাম্মি এইখানেই দাঁড়াও, কিন্তু চোখ খুলবে না'। 
শ্রাবণীকে দাঁড় করিয়ে তিথি হাত ছেড়ে এগিয়ে গেল। শ্রাবণী দাঁড়িয়ে, চোখ বুজে। শুনতে পেলো তিথির উচ্ছ্বসিত গলা, 
__'এইবার চোখ খোলো ঠাম্মি'।

শ্রাবণী এবার চোখ খুললো। তিথি দুলছে, চোখেমুখে তার সে কী আনন্দ, তৃপ্তি! খিলখিল করে হাসছে আর পা'দুটো আগেপিছু ছুঁড়ে জোরে জোরে দুলছে আর বলছে,
__' দ্যাখো ঠাম্মি, বাপি আমার জন্য অর্ডার দিয়ে আনিয়েছে,দুপুরবেলা লোক এসে ফিট করে দিয়েছে, আমার জন্মদিনের গিফট... ভালো হয়েছে? ...আমার খুব ইচ্ছে ছিল জানো, আমার একটা দোলনা থাকবে, আমি ভাবিইনি বাপি সারপ্রাইজ দেবে! এসো না ঠাম্মি, আমরা একসাথে দুলবো...আমার খুব খুব আনন্দ হচ্ছে, ঠাম্মি তোমার হচ্ছে?' __
শ্রাবণীর দুচোখ ভিজে এলো।হাঁটুদুটো কেমন যেন কেঁপে উঠল। ছাদের একপাশে রাখা বেতের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে,
__' হচ্ছে বৈকি, তোমার আনন্দ হচ্ছে দেখে আমারও খুব আনন্দ হচ্ছে! আনন্দ কর দিদিভাই, এইটাই তো আনন্দ করার বয়স তোমার,  খুব আনন্দ কর, তুমি তো তোমার বাপির রাজকন্যা, আদরের রাজকন্যা'।__
তিথি আরও একবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। পা'দুটো দিয়ে হাওয়া কেটে ভারি লোহার বাহারি দোলনা'টাকে সামনে পিছনে দোলাতে লাগল।দেখে মনে হচ্ছে যেন এক চনমনে প্রজাপতি, রঙিন ডানায় ভর করে আকাশ ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছে। শ্রাবণী দেখছে এক মনে, তিথিকে আর সাথে মনা'কেও। অদ্ভুত এই জীবনের গল্প! সময়ের সাথে কত কিছুই বদলে যায়, হারিয়ে যায় কিন্তু গল্প তবুও তরতরিয়ে এগিয়ে চলে, চলতেই থাকে...আর সেই গল্পের হাত ধরেই নতুন চেহারায় ফিরে ফিরে আসে সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে থাকে এক রাজা আর তার আদরের রাজকন্যা। বাবার মুখ'টা স্পষ্ট দেখতে পেলো শ্রাবণী, মনে পড়ে গেল সেই কথাগুলো, ' সংসারের ছন্দ-তালে নিজেকে ঢেলে দিবি, দেখবি সুখ আপনা-আপনিই তোর কাছে এসে ধরা দিয়েছে'। ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শ্রাবণী, আঁচলটা টেনে নিয়ে কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিল আর তারপর ধীরে ধীরে দোলনার দিকে পা বাড়ালো।

   সাহিত্যিক রিঙ্কি বোস সেন
রাধানগর পাড়া, পূর্ব বর্ধমান


প্রচ্ছদ- মৌটুসী ঘোষ 































1 Comments