
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়ের অণুগল্প
বিতর বিতর রবি হৃদয়ে হৃদয়ে
পরের দিন ভোট। প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে আগের রাতের কাজগুলো গুছিয়ে রেখে একটু বাইরে বেড়িয়ে এলাম। ছোট্ট ঘরে গলদঘর্ম সকলে। একমাত্র পাখার গতিও কম। ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা। বাইরে বেড়োতেই কানে এল গুনগুন। বেসুরো সুরে পরিচিত গান।সেই গান কি?
একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম স্কুলের গেটের পাশে চেয়ারে বসে 'গান' উঁচিয়ে গান গাইছে সি আর পি এফ জওয়ান মৃদু স্বরে। আমার পায়ের আওয়াজে ক্ষিপ্রগতিতে ঘুরে আমার দিকে গান উঁচিয়ে। দেখে মুখে মুচকি হাসি।পরিচয় দিল , মহারাষ্ট্র রেজিমেন্টের রাকেশ সিং। পাশের চেয়ারে বসতেই বলে উঠলো:" কিউ স্যার,শোয়া নেহি আভিতক?"আমার গলায় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে:"আপ গানা গা রহে থে? কোনসা গানা?" সাবলীল উত্তর :"রবি ঠাকুর কা গানা।কিউ স্যার, আচ্ছা নেহি লাগা? "আমার প্রশ্ন দিশার খোঁজে :"কোনসা গানা ঠিক সে বাতাইয়ে তো !"সুরে বেসুরে তার প্রয়াস অমলিন।কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশিল।মনে বড়ো দোলা। সারাদিনের ক্লান্তি উধাও। সামনের মাধবীলতা মাথা দুলিয়ে জানান দিল ভালোলাগার কথা।গানটার ইতিহাস ওর গলায় জানলাম --রাকেশ যখন ফোর্ট উইলিয়ামে পোস্টিং ছিল তখন পাশের ঘরে ছিল এক বাঙালি" দত্ত" পরিবার।ঐ বাড়ির বৌদির কাছেই রাকেশের স্ত্রী এই গানটা শেখে। এবার বাড়িতে গিয়ে মেয়ের মুখে গানটা শুনে রাকেশের ভালো লাগে।ও শিখে নেয় গানটা। গানটা নাকি ওকে একা থাকার ভরসা জোগায়। পরিবারের সাথে মিলিয়ে দেয় মনখারাপের সময়ে।
চমকে গেলাম। একজন অবাঙালীর হৃদয় সিংহাসনে আমার ঈশ্বরের আসন পাতা। চোখে জল এলো।দিই না, সিংহাসনটা ঠিক করে সাজিয়ে !গানটা ওকে শেখালাম।মানেও বুঝিয়ে দিলাম। তন্ময় হয়ে ও বাধ্য ছাত্রের মতো শিখল,বুঝলো। বাড়িতে শোনাবে বলে রেকর্ড ও করল গানটা।
পরদিন জমা দেবার কাউন্টারে ভোটের সব মাল ফেরত দিয়ে বসে আছি চুপচাপ একটা পাখার আশ্রয়ে।জমা নিতে এতো দেরি করে!রাতে আর বাড়ি ফেরা যাবে না।বসে বসে সকলের ব্যস্ততা দেখছি নিরুপায়।সকলেই বাড়ি ফিরতে চায়। একটা রাতও বাড়ির বাইরে নয় !
অথচ কালকের দেখা জওয়ান বুকে পরিবারের ছবি নিয়ে দিনের পর দিন বাড়ি থেকে দূরে !
রাকেশের মুখটা ভেসে উঠলো। হঠাৎ কানের কাছে সেই গান : "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে....."।একি টেলিপ্যাথি ! চমকে তাকাতেই দেখি হাতে দুটো বিরিয়ানির বাক্স নিয়ে রাকেশ দাঁড়িয়ে ।



0 Comments