জিপিদার ডায়েরি ~ প্রবীর দে'র রম্যরচনা


প্রবীর দে'র রম্যরচনা 
জিপিদার ডায়েরি

যুগলবন্দী

ছেলের পরীক্ষা গতকাল শেষ হয়েছে।গিন্নী আর ছেলে দুজনে এখন কদিন শ্বশুরালয়ে থাকবেন। এ-কদিন অফিস থেকে দেরী করে ফিরলেও কোন চাপ নেই।সেই ভেবে জিপিদাকে ইন্টারকামে ধরলাম।বললাম,'ছুটির পর গ্রাউন্ড ফ্লোরে লিফটের সামনে অপেক্ষা কোরো।অনেকদিন একসঙ্গে ফেরা হয় না,আজ তোমার সাথে হেঁটে শিয়ালদহ  যাব। তুমি শিয়ালদা থেকে বাস ধরে নিও।' 
জিপিদা তো এক পায়ে রাজি। বললেন,’না না গ্রাউন্ড ফ্লোরে লাগবে না,সাড়ে পাঁচটার আগেই তোদের ফ্লোরেই  চলে আসবখন,নো প্রবলেম।আমার তো দেরীতে বাড়ি ফিরলেই ভালো।'  
হাতের কাজ সেরে বেরোতে বেরোতে পৌনে ছটা হয়ে গেল। ব্রাবোর্ন রোড থেকে বেরিয়ে ক্যানিং স্ট্রীট ধরে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু,জিপিদা বললেন,’ না ওদিকে ভীড় বেশী,টী বোর্ডের পাশ দিয়ে পোদ্দার কোর্ট হয়ে চল।'

আমি সম্মত হয়ে বললাম,’ঠিক আছে তাই হবে,তবে তার আগে পারসি চার্চের পাশ দিয়ে চল,ওখানে ত্রিবেদীর দোকানের গরম ফুলুরি নিয়ে নেব,ভালই লাগবে ।অনেকদিন গরম ফুলুরি খাওয়া হচ্ছে না যে।‘
ত্রিবেদীর দোকানটাতে শুধু যে ফুলুরি পাওয়া যায় তা নয়।একটাই দোকান - একপাশে মোবাইল সারাই হয়, অন্যপাশে তেলেভাজা বিক্রয়।মোবাইল রিপেয়ারের জন্য তো বেশ কিছু  সময় লাগে,তার জন্য কাস্টোমারদের অপেক্ষা করতে হয়।আর এই অপেক্ষাতে তেলেভাজার আকর্ষণ বানিজ্যকে আর সমৃদ্ধ করবে সেই অভিলাষেই এই পরিকল্পনা।পরিকল্পনাটা ভালই লাগলো। ভাবলাম,জিপিদার থেকে বিষয়টির একটু ব্যাখ্যা শুনি,সময়টা ভালই কাটবে। 
উত্থাপন করতেই জিপিদা বেশ উচ্ছসিত হলেন,মনে হল। হয়ত উনি এমনই কোন টপিকসেরই  অপেক্ষায় ছিলেন। ব্যাস,শুরু হয়ে গেল...

এটা হল যুগলবন্দী কনসেপ্ট বুঝলি। এখন তো চারিদিকেই এই কনসেপ্টটা খুব খাচ্ছে। আগে এটা শুধু সাংস্কৃতিক জগতে ব্যবহৃত হত,তবে এখন বাণিজ্যিক জগত বল,শিক্ষা ক্ষেত্র বল কিম্বা চিকিৎসা ক্ষেত্র বল সব কিছুতেই এই যুগলবন্দী কনসেপ্ট চলছে।

বাণিজ্যিক জগতে এই যুগলবন্দী কনসেপ্ট এসেছে কোথা থেকে জানিস?এর স্রষ্টা হলেন সাহিত্যিক বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।তোর মনে আছে নিশ্চয়ই 'পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে প্রসন্ন গুরুমশাই একাধারে শিক্ষকতা,মুদিদোকান এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন।সেই থেকেই এই কনসেপ্ট এসেছে।এই কনসেপ্ট তো আজকের নয় রে ভাই,বহুদিনের। আর এই যে এত শপিং মলের রমরমা দেখছিস চারিদিকে, এর পিছনেও ঐ বিভূতিবাবু।
আমি বললাম,’শপিং মল তো হল বৃহদায়তন খুচরা কারবারের অধীন এক ধরনের অধিবিপনী বা বিভাগীয় বিপনী,যার সৃষ্টি ইউরোপ-এ।‘

এই তোর এক স্বভাব,সব কথাতেই ফোঁড়ন কাটা। আগে শোন ভালো করে আমি কি বলি,তারপর নয় ফোঁড়ন কেটো। 
জিপিদা আবার বলতে শুরু করলেন,’ইন্ডিয়াতে মানুষ এতদিন শুধু সঙ্গীত জগতেই এই যুগলবন্দী কনসেপ্টের ব্যবহার দেখে এসেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ অনেক পরে হয়েছে বুঝলি। 
আমরা যুগলবন্দী বলতে বুঝতাম পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর উস্তাদ আমজাদ আলীর যুগলবন্দী কিম্বা বাঁশীতে পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া আর সন্তুরে পণ্ডিত শিবকুমারের যুগলবন্দী।এখনও এ ধরনের যুগলবন্দী চালু আছে বটে,তবে বিবর্তনের পথে ইদানিং কত যে নতুন ধরনের আইটেমের যুগলবন্দী দেখছি সে বলতে গেলে এখন রাত কাবার হয়ে যাবে। 
তবে শোন,আগে আমরা এত বিচিত্র ধরনের যুগলবন্দী শুনে বড় হই নি।মার্কেটে যে নতুন আইটেম যুগলবন্দী গুলি এসেছে তারমধ্যে অন্যতম হল -'বাচিক'। শিল্পীর সঙ্গে সঙ্গীত শিল্পী’ কিম্বা ‘বাচিক শিল্পীর সঙ্গে যন্ত্রশিল্পী’,আবার  লঘু আধুনিক গানের শিল্পীর সঙ্গে রাগপ্রধান গানের শিল্পী,বাউলের সাথে রক শিল্পী,আরও কত কি।এখন আর কেউ একা একা প্রোগ্রাম করতে হয়ত সাহস পাচ্ছে না নতুবা পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহায়তা প্রদানও লক্ষ্য হতে পারে।হ্যা,তবে এর বিরোধিতা আমি করছি না,কারণ বিবর্তিত হতে গেলে সবকিছুরই ভেরিএশনের প্রয়োজন আছে। 

ফুলুরিগুলো শেষ হয়ে এসেছে। এবার চায়ের প্রয়োজন অনুভব করছি। কিন্তু জিপিদা দেখছি নাগাড়ে বলেই চলেছেন...
এই যুগলবন্দী কনসেপ্টটা আজকাল সব ক্ষেত্রেই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে,জানিস। ডাক্তার দের দিকে তাকিয়ে দেখ,এখন আর কেউ একা চেম্বার করে না।গায়নোকোলজিস্টের সাথে চাইল্ড স্পেশালিষ্ট,আবার মেডিসিনের ডাক্তারের সাথে রেডিওলজিস্ট ভায়া রেডিওলজি সেন্টার,ডেন্টিস্ট উইথ স্কিন স্পেশালিষ্ট।মূল থিম হল ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’র মাধ্যমে বাণিজ্যিক শ্রীবৃদ্ধির প্রচেষ্টা। আর রুগীদেরও আপত্তির কারন নেই যেহেতু  সম্পর্কিত বিষয়গুলি একজায়গায় পেয়ে যাচ্ছে তবে অপ্রয়োজনীয় ‘রেফার’ করার ফলে যে অযথা আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির  বিষয়টার উদ্ভব হয় সেটা মেনে নিতেই  হচ্ছে। 

এবিষয়ে আমি কিছু বলতে যাব ভেবেছিলাম,কিন্তু তার আগেই দেখি জিপিদা আবারও বলে চলেছেন ...
শিক্ষাক্ষেত্রেও দেখ একই অবস্থা।প্রাইভেট টিউশন তো এখন আর সেবা নয়,এটা পুরোপুরি বড় মাপের এক ব্যবসা।আর সেখানেও সেই  যুগলবন্দী। অংক স্যারের কাছে পড়তে যাও,উনি ইংরাজী কোথায় পড়তে হবে বলে দেবেন। আর সঙ্গে প্যাকেজ সিস্টেমে ছাড়ের গল্প শোনাবেন। সেখানেও ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ গল্প।

হাঁটতে হাঁটতে বউবাজার শিব মন্দিরের কাছে এসে পরেছি।এবার তো চা খাওয়া দরকার । চা পান করতে করতে জিপিদাকে বললাম,’তুমি তো যুগলবন্দী'  
কনসেপ্টের উপর বেশ পড়াশুনা করে ফেলেছ দেখছি। তা এবার বানিজ্যিক জগতে লেটেস্ট কি কি ধরনের যুগলবন্দীর প্রয়োগ দেখছো সেগুলো যদি একটু জানাও...।
জিপিদা আর উৎসাহ পেয়ে গেলেন বোধহয়। বলতে লাগলেন ...
শোন কারবারি জগতে এই কনসেপ্টের উপর এখন অনেক নতুন নতুন ডাইমেন্সন দেখতে পাচ্ছি,কিছুদিন আগে পর্যন্ত এসব ছিল না বুঝলি।যেমন লেডিস টেলার কাম বিউটি পার্লার অথবা ফিজিওথেরাপি উইথ ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি। তবে লেটেস্ট যুগলবন্দী যেটা সেদিন দেখলাম সেটা দেখার পর সত্যিই আমি একটু ঘাবড়ে আছি।
আগ্রহ প্রকাশ করতেই জিপিদা বললেন,
‘সেদিন বেলঘরিয়ার রাস্তা দিয়ে অটোতে যাচ্ছি...রাস্তার বাঁদিকে একটা দোকানের সাইনবোর্ড দেখলাম – “অর্থপেডিক সাইবার কাফে”। চশমাটা খুলে চোখ মুছে আবার ভালো করে দেখলাম।না ঠিকই দেখছি, একটুও ভুল হচ্ছে না। অটো থেকে নেমে পড়লাম।ভাবলাম বিষয়টা একটু জানা দরকার।নতুন আইটেম তো।
দোকানের সামনে দিয়ে দুবার ঘোরাঘুরি করলাম, ভিতরে ঢুকতে ঠিক সাহস পাচ্ছি না।কারন অর্থপেডিকের ট্রিটমেন্টের এখন আমার কোন দরকার নেই,আর সাইবার কাফেতে গিয়ে কি হবে কারণ  কম্পিউটারের জ্ঞান তো সীমিত। যাই হোক,দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে ভিতরে ঢুকেই পড়লাম।
ভিতরে গিয়ে  দেখি প্লাইউডের পার্টিশন।একপাশে ডাক্তার বসে আছেন অন্য পাশে সাইবার ক্যাফে।সামনে একজন বসে আছেন চেয়ারে।জিজ্ঞাসা করলাম ,” আচ্ছা অর্থপেডিকের সঙ্গে সাইবার ক্যাফের সম্পর্কটা  কি একটু বলবেন।“প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে এ বিষয়ে ভদ্রলোক যা বললেন তার মর্মার্থ হল –লোকেরা সাইবার ক্যাফেতে বসে ঘাড় গুঁজে কাজ করতে করতে স্পন্ডালাইটিস  অবশ্যম্ভাবী,আর তাই অর্থপেডিকের কাছে চিকিৎসার ব্যবস্থা।‘

এতক্ষণ ধরে জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হতে অবশেষে শিয়ালদাতে পৌঁছে গেছি। জিপিদা বাস ধরতে অন্যদিকে চলে গেলেন।স্টেশনের দিকে যেতে যেতে অনেক কিছুই ভাবছিলাম ...। ভাবনাতে চোখের সামনে কতগুলো সাইনবোর্ড দেখি জ্বলজ্বল করছে ... ‘এন্ডোকোলোনলজি মালটিকুইসিন রেস্টুরেন্ট’ (অর্থাৎ রেস্টুরেন্টে স্পাইসি খাবার খেতে খেতে পেটের রোগ হবেই,তাই ‘গ্যাসট্রোএন্টোলজিস্ট' ওখানে বসে আছেন কিম্বা "ইন্সটিটুশন ফর কম্পিটেটিভ এক্সামিনেসন উইথ ম্যাট্রিমনিয়াল''  অর্থাৎ (চাকরি পাবার পর বিবাহের যোগাযোগও করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা) ইত্যাদি ইত্যাদি...!!

সাহিত্যিক প্রবীর দে
তুলসীবাগান ,বিরাটী, কোলকাতা -৫১
















0 Comments