
দেবদাস কুণ্ডুর ছোটগল্প
ডানা
নবীন বুঝতে পারছে পাখি দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে। তাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র তিন বছর। এর মধ্যে সব আকর্ষন হারিয়ে ফেলল পাখি? এই কিছুদিন আগেও ঘন ঘন ফোন করত। নবীন বলত-এক ঘন্টা অপেক্ষা কর।পাখি অভিমানী গলায় বলত-রাত দশটা বেজে গেছে কখন। তুমি খেয়ে নিয়ে দোকানে শুয়ে পড়ে কেমন।
-আহা রাগ করছো কেন? দোকানে খরিদ্দার ফেলে যাই কি করে বলত?
-তাহলে সারারাত খরিদ্দার সামলাও। বিয়ে করে একটা মেয়েকে কষ্ট দিচ্ছো কেন?
-বাবাকে কি বলা যায় বউ ডাকছে আমি চলি?
-যে বাবা বোঝে না তাকে মুখের ওপর বলতে হয়।
-সে আমি পারব না।
-এটুকু সাহস নেই তো কেন বিয়ে করলে?
-ঠিক আছে বাবা,ঠিক আছ,আমি যাচ্ছি। তুমি রাগ করো না সোনা।
-আমি ঘড়ি দেখছি হাটতলা থেকে সাইকেলে পঁচিশ মিনিট লাগে।
নবীনের পা দ্রুত প্যাডেল করছে সাইকেলের। কামারশালা,ভাঁড়শালা, চালধূনিপাড়া,৩ নং ক্যানেল রোড পার হয়ে ঢুকে পড়ে নবীন হাসপাতাল পাড়ায়। বাঁদিকে হাসপাতাল ডান দিকে তাদের একতলা বাড়ি। তাদের বাড়ি ডান দিকে রেখে ঘাড় বেকিয়ে চলে গেছে রাস্তা নলহাটি। হাসপাতাল পাড়া জমজমাট। এখানে পর পর কত মেডিসিনের দোকান। এই রকম একটা দোকান এখানে থাকলে পাখি রাগ করতে পারত না। কাজের ফাঁকে বাড়ি গিয়ে ঘন ঘন পাখিকে আদর করে আসতে পারত। সাইকেল উঠোনে রাখতে ছাদ থেকে পাখি টর্চ মেরে বলল –পাঁচ মিনিট লেট।
-তোমার ঘড়ি ফাস্ট।
-মোটেও না। সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে আসে পাখি। বড় জা দেখে বলল –একদিন তুই পা ভাঙবি পাখি।বর কি তোর পালিয়ে যাচ্ছে? সারা রাত আদর খাবি। ধীরে ধীরে নাম না বাবা।
পাখি হাসে। নবীন আগে ঘরে ঢুকে পাখার নিচে বসেছে। তার গায়ে মুখে ঘাম। না ঘাম নয়,নোনা জল। হবেই না কেন। সাইকেল নিয়ে বাইকের মতো ছুটতে হলে - - -। এখন বড় সুখ হচ্ছে। বন্ধ ঘরে পাখি বুকের কাপড়ে সব ঘাম মুছে দিচ্ছে।
নবীন হাত বারাছিল। পাখি কড়া ।এখন নয়।এখন রাত বারোটা। বাড়ির পিছনের ধানি জমিতে জোনাকি জ্বলছে। পাখি দেখছে। অন্ধকারে জোনাকির আলো পাখির মনে হয় কালো আকাশে অসংখ্য তারা। এখন নবীনের বুকে মাথা রেখেছে পাখি।
নবীন বলে – তোমার গা থেকে অদ্ভুত গন্ধ পাই। কি সেন্ট গো?
- সেন্ট ব্যবহার করি না আমি।
-তবে কিসের গন্ধ?
-তুমি বলো না?
-বুঝতে পারছি না।
-তা কেন পারবে। সোনামুখি ডাল দু কেজি কত তা সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পার।
-তা পারি।
-শুধু ডালে জীবন চলে না। আমার বুকের ভিতর একটা গন্ধওয়ালা গাছ আছে।
-তাই বুঝি? আমাকে দেখাও।
-আমি কি রাম ভক্ত হনুমান।বোকা।সব মানুষের ভিতর ঐরকম গাছ আছে।
-কিন্ত আমি তো পেলাম না।
-মাঝে মাঝে গাছেদের কাছে গেলে পাবে।
নবীনের মনে হয়েছে সে ভাগ্যবান। তার বউ আর পাঁচটা বউ থেকে আলাদা।
-ও নবীনদা দশ কেজি বাসমতী দাও তো।
বউটা কেমন হয়ে গেল। এখন চুপচাপ। চাল মাপতে মাপতে নবীন ভাবে।
-আর কি লাগবে গনেশ?
-আজ আর কিছু লাগবে না।
গদীতে বসে বাবা টাকা নেয়।
একদিন দুপুরবেলা পাখির ফোন-তুমি এখনই চলে আস।
-কেন? শরীর খারাপ লাগছে?
-না।
-তাহলে?“
-বাড়িতে যাবো।
-বাড়ি থেকে কোন খবর এসেছে নাকি?
-না। ধলেসরি বাচ্চা দেবে। আমি কাছে থাকব।
-তুমি গিয়ে কি করবে? বাড়ির লোক তো আছে।
-বৌদি পারে না। ধলেসরি যখন ব্যাথা উঠবে আমি আদর করে দি।
-তাহলে বাবলুকে বল ও বাসে পৌঁছে দেবে।
-না না তুমি পৌঁছে দেবে। বাসে নয়। সাইকেলে।
সেদিন দুপুরে শ্বশুর বাড়ি রতনপুর গিয়ে ছিল নবীন বউকে সাইকেলের সামনের রডে বসিয়ে।
ছ’ ফুঁকোতলা দিয়ে ওরা পড়ল দুমকা রোডে। দু পাশে শাল সেগুন গাছ। মাঝে উঁচু নিচু রাস্তা। উঠতে কষ্ট। নামার সময় পাখির শরীরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে নবীনের শরীর। আবার সেই গন্ধ।পাখি গাইছে। বেশ ভালো লাগছে নবীনের।মনে আনন্দ হচ্ছে। আনন্দ। দুমকার দিক থেকে ছুটে আসছে ট্রাক।
জঙ্গলের আড়ালে ক্যাসার মেশিনের শব্দ। পাথর ভাঙছে। লড়িতে বোঝাই হচ্ছে।যাবে কলকাতা। বনের ছায়ায় সাইকেল চলছে হঠাৎ পাখি বলল-এখানে থামও তো।
-কেন?
-চা খাবো।
-এই রাস্তায়?দেরি হয়ে যাবে। আমাকে ফিরতে হবে।
-আজ ফিরতে পারবে না।
-বাবাকে বলা হয়নি।
-আমাকে আদর করো সে কি বাবাকে বলে কর নাকি? অদ্ভুত হাসল পাখি।
খাটিয়াতে বসে পড়ল পাখি।এমন স্বাচ্ছন্দ্যে
বসল,যেন আগে কতবার এসেছে এখানে।
ছোট্ট চায়ের দোকান সাঁওতাল দম্পতির। বউটি এসে হাসল-কিরে বেটি তু যে আর আসিস না।কেনে?
-বিয়ে হয়েছে আমার।
-এ মরদ বটে। বউ টি হাসে। -আজ হামি তুদের পেশাল চা দিব। টাকা লেব না।
-তা হয় নাকি?তোমরা গরীব মানুষ।
-তু বেটি আমার মাইয়া আছে।
জঙ্গলের ভিতর থেকে পাখি ডাকছে।পাখি বলল-বলত কি পাখি?
-আমি কি করে বলব? নবীন বলে- আমি কলকাতায় পড়াশুনা করেছি।
-সব মানুষের ভিতর একটা অচিন পাখি আছে।
-কই আমি তো বুঝতে পারিনি
-তুমি চাল ডাল বেচবে রোজ। কখনো জংগলের আসবে না, বুঝবে কি করে?
নবীন কোন উওর দেয় না। চুপচাপ। জায়গাটাও বড় শান্ত। মাঝে মাঝে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে দৈত্যের মতো ট্রাক ছুটে যাচ্ছে। নবীন দেখল একটা কাঠ বিড়াল তার পা ছুঁয়ে চলে গেল। যে পাখিটা ডাকছিল ওর নাম দোয়েল।
-আমি দোয়েল দেখিনি। নবীন বলল।
-মাঝে মাঝে জঙ্গলে আসব,তোমাকে অনেক পাখি দেখাব।
-দোকান?
-ছুটি নেবে।জঙ্গলে আসবে,দেখবে পাখিরা তোমার সঙ্গে কথা বলছে।
-পাখি কি মানুষের ভাষা বোঝে ?
-খুব বোঝে।
নবীন বলল – দারুন চা তো।
টাকা নিলনা। আবার আসার আমন্ত্রণ জানালো সাঁওতাল বউটি।
-ও নবীনদা খেজুর গুর হবে না কি?
ঘোর কাটে নবীনের। বলে – হবে।
রতন বলে – তুমি দোকানে বসে বউর কথা ভাবো নাকি?বেশ ক মাস ধরে দেখছি তুমি যেন কেমন হয়ে গেছ। বউর কি শরীর খারাপ।
নীচু গলায় বলার আগে নবীন দেখল,বাবা কাগজ পড়ছে। বলল-কি যে হয়েছে বউটার। বুঝতে পারি না। আগের মতো নেই পাখি।আগে নদী ভালো বাসত। বলত-সব মানুষের ভিতর নদী আছে। সেই বউ দিন দিন পাল্টে যাচ্ছ।
-ভালো ডাক্তার দেখাও।
-উকিল পাড়ার নাম করা ডাক্তার মাঝিকে দেখালাম। কিছু হল না। কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। মা বৌদি কারো সঙ্গে কথা বলে না।
-তুমি কলকাতায় নিয়ে যাও। বউর সঙ্গে কথা বল সে কি চাইছে।
আশ্চর্য। সেকথা জিজ্ঞেস করতে পাখি নবীনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
-কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার বল।
-আমার ভিতর গাছ আছে,নদী আছে, জংগল আছে,পাখি আছে,একটা শিশু কেন থাকবে না?
কথাটা তো সত্যি। এখানের ডাক্তার কিছু করতে পারল না। আর এখানে নয়। এবার কলকাতা।
কলকাতার পিজির ডাক্তার দেখিয়ে,খুব সাবধানে এক বছর নবীনের বন্ধু দেবতোষের বাড়িতে থেকে আজ সকালে ছোট্ট এক শিশু পুত্রর জন্ম দিয়েছে পাখি।
কেবিনে নবীন যেতে পাখি বলল-কেমন হয়েছে দেখ।
-অবিকল তুমি।
-একটা কথা বলবো?
-বল কি বলবে। তুমি যা চাইবে তাই হবে।
-দেখ আমরা ওর দুটো ডানা। ও পাখি হবে।
-তুমি তো একটা পাখি। আবার নতুন করে আর একটা পাখি কেন?
-আমার পাখি স্বাধীনতা পায়নি। এই পাখি মুক্ত বিহঙ্গর মতো নীল আকাশে উড়বে।



0 Comments