সিঁদুর খেলা ~ শুভ্র শোভন রায় অর্ক'র ছোটগল্প


শুভ্র শোভন রায় অর্ক'র ছোটগল্প 
সিঁদুর খেলা 

মন্দির জুড়ে ঝড়ো দমকা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। ঢাকের মুহুমুহ শব্দ যেনো আরো নাচের তাল তুলে দেয়। চারদিকে হই হই রব। নৃত্যের তাল পায়ে পায়ে ছন্দ তোলে। ধুপের ধোয়া এলোমেলো উড়ে বেড়ায় প্রাঙ্গনে। ধুনুচি নাচে মাতোয়ারা সকলে।  পাশের বয়ে চলা ছোট্ট নদীর বুকে স্রোতেরা ভেসে যায় ঢেউ তুলে। শত শত ঝরা পাতা সে স্রোতে গা ভাসায়। গা ভাসায় রং মাখা ছেলেপেলের দল।ডিঙ্গি নৌকায় মানুষের আনাগোনা চলে। চলে প্রস্তুতি "মায়ের ভাসানের"। 

পট থেকে নামানো প্রতিমায় সিঁদুর মাখিয়ে বিদায় প্রনাম জানানো হয়।ভিড় বাড়তে থাকে।দশমীর এক অন্য মহিমা ঘিরে ধরে৷ আনন্দ আসে,সুখ আসে,দুঃখ আসে,ভিজে যায় চোখ৷কখনো সেটা অতীতে হারানো স্বজনের স্মৃতির বেদনায়,কখনো বা বর্তমানে প্রিয়মুখ থেকে দূরে থাকার কিংবা বেঁচে থাকার সুখের স্মৃতিতেও চোখ ভিজে যায়৷ মাটির মৃন্ময়ী প্রতিমা শিখিয়ে যায় অনুভূতির শতকলা৷ 

একে অপরকে সিঁদুর খেলায় মাতে মহিলারা।ভারি অপূর্ব এ দৃশ্য৷ মাকে অর্পন করা সিঁদুর একে অপরের কপালে ফোঁটা দেয়,তারপর শাঁখায় ফোটা দিয়ে কপালে ছোঁয়;দুজন দুজনকে নমস্কার করে।ভাগ্যবতী থাকার শুভাশিষ মঙ্গল প্রার্থনা করে। 

দশমীর বিদায় বেলায় সিঁদুর ছোঁয়াতে এসে কমলিকার চোখ আটকে যায় ভিড়ের মাঝে।পরিচিত মনে হওয়া কারো দিকে?ওটা কে?নবনীতা না?  

আরো স্পষ্ট হওয়ার জন্য ভিড় ঠেলে এগিয়ে যান। সিঁদুর আর জড়িতে গালদুটো মাখামাখি,লাল টুকটুকে শাড়িতে সাক্ষাৎ দেবী দুর্গা যেনো উৎসবে মেতেছেন মানবী রূপে।চোখ ফেরানো দায়!  

পরক্ষনেই আঁতকে উঠেন কমলিকা!ভ্রঁ কুঁচকে যায় চিন্তায়।এবার সামনে এগিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ান নবনীতার৷ চোখে চোখ পড়তেই হাত টেনে ভিড় ঠেলে সোজা নদীর কিনারে এক সাইডে চলে আসেন দুজন।  

নবনীতার চোখে খুশির চমক ঝলকে ওঠে। ওহ কমলিকা "বলেই দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরেন "সখী"। দুজনে মুহুর্তকাল ঠাঁয় তাকিয়ে থাকেন নিজেদের দিকে৷কথা আটকে যায়। 

কমলিকা বুঝতে পারে না ওর কি ওকে সিঁদুর মাখানো ঠিক হবে? এতটা বছর পর দেখা? নবনীতা এখানে হঠাৎ ?ও কি অন্য বিয়ে করেছে আবারো?বহু প্রশ্ন একেরপর এক এসে ধাক্কা খায় হৃদয়ে।  

-কেমন আছিস?নবনীতাই প্রশ্ন করে। 

-ভালো আছি।তুই এখানে?

- এতটা বছর পর দেখা রে৷বিশ্বাসই হচ্ছে না।নবনীতা যত্ন সহকারে হাত রাখেন কমলিকার গালে।

-তুই তো দেশের বাইরে থাকিস তাই না? কবে এসেছিস দেশে ? 

প্রশ্নটা শুনেও যেনো না শোনার ভান করে নবনীতা;উল্টো প্রশ্ন করে -

-তোর সংসার কেমন চলছে রে৷কয়টা বাচ্চা কাচ্চা?

নবনীতার কথা এড়িয়ে যাওয়া ভীষন বিরক্ত লাগে কমলিকার,তবুও উত্তর দেন।

-দুটো। ছেলেটা ক্লাস সেভেন, মেয়েটা ফাইভে৷  

-বাহ রে। তুই ভাগ্যবতী৷ দেখাবি না আমাকে? 

- দেখাবো। তুই এখানে কার বাসায়?  

- এসেছি এক আত্মীয়ের বাড়িতে৷ ছাড় না, তোর কথা বল না।

নবনীতার নানান প্রশ্নের যৌক্তিকতা এ মুহুর্তে খুঁজে পান না কমলিকা।নবনীতা যে ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলো সে হঠাৎ তার সাজানো সংসার ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো অন্য ভূবনে।অথচ কি জন্য এই ছাড়াছাড়ি তার উত্তর কারো জানা নেই৷ যাকে ছেড়েছিলো সেই অনুপমদাও আমৃত্যু কারণটা জেনে যেতে পারেন নি! অপেক্ষায় ছিলেন জানার।তবে সে অপেক্ষার কোন লৌকিকতা নেই আজ! অনুপম দা - কমলিকার পিসতুতো ভাই,সে অর্থে নবনীতা ওর বৌদি। অথচ সে তো নামাক্ষরেই শুধু বৌদি ছিলো।অথচ দৈব চুক্তিতে সম্পর্ক শেষের এতবছর পর আজ ওর প্রতি বান্ধবী নয় ননদ সূচক অধিকারের অভিমান ভেসে উঠেছে কমলিকার ভিতরে৷ অস্বাভাবিক কিছু নয় অবশ্য সেটা। 

নবনীতাও কি সেই অনুযোগের আঁচ পাচ্ছিলো ভিতরে?ওকে দেখে তেমন যদিও মনে হচ্ছে না।কমলিকার মনটা কঠোর হয়ে ওঠে।এতটা সময়েও একটিবার শ্বশুর বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলো না।ওর সিঁথিতে সিঁদুর কেনো?নতুন বিয়ে করেছে নিশ্চয়? 

-নবনীতা তুই কি আবারো বিয়ে করেছিস? 

কমলিকা ওর চোখের দিকে দৃঢ়ভাবে তাকিয়ে থাকে।নবনীতা চুপ থাকে।ওর দৃষ্টি নদী ছাড়িয়ে তেপান্তরে মেলে ধরে। সে দৃষ্টিতে হাহাকার ছিলো নাকি কমলিকা বুঝে উঠতে পারে না।কমলিকা উত্তরের জন্য ব্যাকুল হয়। 

-মেয়েরা কয়বার বিয়ে করে বল তো? 

কমলিকার ফিরতি জবাবের অপেক্ষা না করে  নবনীতা আবারো বলে উঠে -না আমি আর বিয়ে করিনি।  

কমলিকার রাগ হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে বিষন্নতায় রূপ নেয়। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন। কি বলবে এখন?  

- তাহলে তুই সিঁদুর পড়েছিস কেনো?  

-কেনো?ফাঁকা ফাঁকা দৃষ্টিতে উল্টো প্রশ্ন করে নবনীতা।

-তুই কি জানিস না অনুপমদা গতবছর মারা গিয়েছেন?কমলিকার মাথা কাজ করে না।  

নবনীতা ও কোন উত্তর দেন না। চুপ থাকেন। 

সংসার এক আজব বিধান।তার মায়ার বাঁধন আষ্টেপৃষ্ঠে থাকে শিরা-উপশিরায়। চাইলেই এ বাঁধন ত্যাগ করা যায় না। তবুও সব ছেড়ে বৈরাগ্য নিতে পেরেছিলেন। কাউকে কোন জবাবদিহি করেন নি তবুও আজ হঠাৎ যেনো কিছু হারানোর শোক ছুঁয়ে গেলো। 

নবনীতা সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলেন। হাতের শাঁখাজোড়া খুলে জলে ফেলে দিলেন।জল নিয়ে মুছে দিলেন কপালের সিঁদুর।ফিরে তাকালেন না,ভিড় এড়িয়ে পূর্বদিকে নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটা শুরু করলেন।

সংসার উনি করেন নি,স্বামী সুখ কি তা উনি জানেন না,তবুও এ শাখা-সিঁদুর যেনো বিশেষ কিছু বহন করতো!আজ সেই দায়ভারও মুক্ত! 

কমলিকা বসে থাকলেন ঠাঁয়৷নবনীতাকে আর ডাকলেন না।ওর চলে যাওয়া দেখতে লাগলেন। 

নদীতে তখন প্রতিমা ভাসানো শুরু হয়েছে। কলা বউ,চালুন,বেল-ফুল-পাতা,প্রদীপ, কাপড়,মাটির থালাপত্র ভেসে যাচ্ছে অজানামুখে।একে একে বিসর্জন হচ্ছে কাঠামো।শঙ্খ,ঢাক,কাসর,উলুধ্বনির চতুর্মুখী ভাবাবেগ মিশে গেছে।  
"বলো দুগ্গা মাইকি,জয় "ধ্বনিতে প্রকম্পিত মেঘলা বাতাস। 

কমলিকা ব্যথিত মনে ভাবতে থাকে "যে চলে যায় সে কখনো ফিরে আসে না!মানুষ সিঁদুর মাখিয়ে খেলে কখনো,কখনো বা সিঁদুর মানুষকে রাঁঙিয়ে দেয় অথবা করে তোলে বর্ণহীন পাষানে...!!  

গল্পকার শুভ্র শোভন রায় অর্ক
থানাপাড়া, বাংলাদেশ




0 Comments