মানসী গাঙ্গুলী'র মুক্তগদ্য

ডাকবাক্স ও চিঠি

ইতিহাস বলে,সভ্যতার সূচনাতেই রাজারাজড়াদের মধ্যে একপ্রকার ডাক ব্যবস্থা চালু ছিল। উপমহাদেশে সকলের জন্য ডাক যোগাযোগের চিন্তাটি সম্ভবত প্রথম করেছিলেন দিল্লির সম্রাট শের শাহ। ষোড়শ শতকে তিনি ঘোড়ার পিঠে করে ডাকসামগ্রী স্থানান্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ব্যবস্থাকে বলা হত 'ঘোড়ার ডাক'। এছাড়া চিঠি পাঠানো হত দূতের মাধ্যমে। এরও আগে প্রচলন ছিল পায়রার পায়ে বেঁধে চিঠি পাঠানোর,আর পায়রা কিন্তু খুব ভালো ডাকপিয়ন। একটা জায়গা চিনে ফেললে ঠিকঠাক সেখানে নিয়ে চিঠি পৌঁছে দিতে পারত। চিঠির আদান-প্রদান সহজ করার জন্যই ডাকবিভাগ চালু করা হয়। রয়্যাল মেইল নামে প্রথম ডাক বা পোস্টাল সার্ভিস চালু হয়  ১৫১৬ সালে,চালু করেন হেনরি অষ্টম। এরপর ১৬৬০ সালে প্রথম সাধারণ ডাক বা জেনারেল পোস্ট অফিস চালু করেন চার্লস দ্বিতীয়।

বিশ্বের প্রথম সমুদ্র ডাক চালু করা হয় ১৬৩৩ সালে। ঘোড়াগাড়ির  ডাক চালু করা হয় ১৭৮৪ সালে। ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ডাকবিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। আর ১৬৫৩ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রথম ডাকবাক্স স্থাপন করা হয় বলে অনুমান। একটি ডাকবাক্স মূলত ওয়েকফিল্ড ডাক অফিসের দেওয়ালে ১৮০৯ সালে লাগানো হয় এবং ব্রিটেনের প্রাচীনতম উদাহরণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। এই ঢালা লোহার তৈরি ডাকবাক্সে আড়াআড়িভাবে একটা ফাঁক ছিল চিঠি ফেলার জন্য। ডাকবাক্সটি বর্তমানে নতুন ওয়েকফিল্ড মিউজিয়ামে প্রদর্শিত রয়েছে। এই ডাকবাক্স হল একটি ছোটখাটো বাক্স যা ডাকবিভাগ কর্তৃক চিঠিপত্র সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটিকে ইংরেজিতে পোস্টবক্স বলা হয়। এটি প্রকাশ্য স্থানে মাটিতে বা অন্য কিছুর সঙ্গে ঝুলিয়ে সংস্থাপন করা হয়। প্রতিটি পোস্ট অফিসের বাইরের দেওয়ালে একটি করে ডাকবাক্স ঝোলানো থাকে। পত্রপ্রেরক এর ছোট ফোকর দিয়ে চিঠির খাম ঢুকিয়ে দেয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ডাকবিভাগের লোক এসে ডাকবাক্সের তালা খুলে চিঠিপত্র সংগ্রহ করে ডাক অফিসের সর্টিং বিভাগে নিয়ে যায়।

ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে প্রথম লাল থাম ডাকবাক্স ১৮৫২ সালে জার্সির সেন্ট হিলারে স্থাপন করা হয়। প্রথমদিকে ভিক্টোরিয়ান ডাকবাক্সগুলোর রং ছিল সবুজ,১৮৬৬-১৮৭৯ সাল নাগাদ এগুলি লাল রং করা হয়। ১৮৭৪ সালে লন্ডনের ডাকবাক্সে প্রথম লাল রং করা হয়। ১৮৪৮ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রথম সার্বজনীন ডাকবাক্স স্থাপন করা হয়। সেগুলি কাঠ ও লোহা দিয়ে তৈরি করা হয়। হালকা ওজনের হওয়ায় চুরি করা সহজ ছিল। পরে বাক্সগুলো ঢালাই লোহা দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এগুলি প্রত্যেকটির ওজন ৪৫ কেজি পর্যন্ত।

প্রথমদিকে নানারকমের ডাকবাক্স ছিল। ডাকবাক্সের বৈচিত্রের মধ্যে ছিল বাতি বাক্স,স্তম্ভ বাক্স,দেওয়াল বাক্স ইত্যাদি। উন্মুক্ত স্থানে অবস্থিত ডাকবাক্সের চিঠিপত্র নিরাপদ এবং আবহাওয়া থেকে সুরক্ষিত রাখতে বাক্সের প্রবেশ ছেঁদা বিশেষভাবে তৈরি করা হত যাতে বাক্সের ভেতরে বৃষ্টি বা তুষার যেতে না পারে,চিঠিগুলি রক্ষা পায়। নিরাপত্তার জন্য তালা লাগানো হত এবং হয় তাই চিঠিপত্র শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের দ্বারাই সংগ্রহ করা যায় তালা খুলে। শহরাঞ্চলে এটা দিনে একবার কিংবা দুবার ফাঁকা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এই ডাকবাক্সগুলির অবস্থা খুবই শোচনীয়। বিলীন হয়ে যাচ্ছে চিঠি আদান-প্রদান,হারিয়ে যাচ্ছে ডাকসেবা। চিঠির জন্য অপেক্ষা,তবু চিঠি আসে না। কেউ চিঠি লেখে না। রাস্তার পাশে পড়ে থাকে ধূলো জমা বিবর্ণ ডাকবাক্স। সে ডাকবাক্সের তালা আজ খোলা হয় কিনা তাতেও সংশয় থেকে যায়। সাইকেলে চড়ে,খাঁকি পোশাক পরে,কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সময়মত চিঠি পৌঁছাতেও আসে না ডাকপিয়ন। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছে ডাকবিভাগের পোস্টাল সার্ভিস বা ডাকসেবা।

মানুষের মধ্যে চিঠি লেখার প্রবণতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পোস্টাল সার্ভিসের পরিসরও কমে যাচ্ছে। ডাকবিভাগ সূত্রে জানা গেছে বর্তমানে সারাদেশে প্রায় আটহাজারের ওপর ডাকবাক্স রয়েছে। অযত্ন,অবহেলা ও অব্যবহৃত হয়ে অকার্যকর হয়ে গেছে শতাধিক। এককালে এই ডাকবাক্সগুলির ছিল রমরমা অবস্থা,যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে ডাকবাক্সগুলি অনাদরে পড়ে পড়ে কাঁদছে।

'কত চিঠি লিখে লোকে,কত সুখে,প্রেমে,আবেগে,স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে'-গানের এই কথাগুলি বড্ড বেশি সত্যি। এই চিঠিতেই প্রেম,আবার বিচ্ছেদও এই চিঠিতেই। চিঠি নিয়ে গড়ে উঠেছে একএকটা সাহিত্য,যেমন,ছিন্নপত্র বাংলা সাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি। জেল থেকে স্নেহের ইন্দুকে লেখা জওহরলালের চিঠি,নিবেদিতাকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দর পত্রাবলী। কিন্তু ডিজিটাল সংযোগের যুগে হোয়াটসঅ্যাপ,টুইটার,ফেসবুক, ইমেইলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে চিঠির মাধ্যমে হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশ করা। হারিয়ে যাচ্ছে 'কালি কলম মন'এই তিনের যোগফলে চিঠি লেখার আর্ট।

সেই পুরনো অভ্যাস ফেরাতেই ডাকবিভাগ আয়োজন করেছে চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা। চিঠির শব্দে লুকিয়ে থাকত অনুরাগ,অভিমানের ছোঁয়াও। পশ্চিমবঙ্গের পোস্টমাস্টার জেনারেল অরুন্ধতী ঘোষের কথায় একালের ছেলেমেয়েরা জানেই না ডাকঘরের পোস্টবাক্সটা দেখতে কেমন। চিঠি লেখা ভুলে যাচ্ছে তারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে তাই ডাক বিভাগ দেশজুড়ে চিঠি লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। এছাড়া চিঠির পাঠ ফেরাতে স্থানীয়ভাবে পোস্টমাস্টারদের বিভিন্ন সময়ে স্কুলে গিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বলা হয়েছে। এজন্য ডামি ডাকবাক্স নিয়ে স্কুলগুলিতে গিয়ে প্রচার করতে বলা হয়েছে,যাতে নয়া প্রজন্ম এতে উৎসাহিত হয়।

জাপানের ওয়াকাইমার শহরে সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে রয়েছে একটি পোস্টবক্স। এটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম তুলেছে। সুসামি উপসাগরের ১০ মিটার গভীরে রয়েছে এই মেলবক্স। বছরে ১৫০০র ওপর চিঠি জমা পড়ে এই বক্সে। এই মেলবক্সের আইডিয়া প্রথম আসে ৭০ বছরে তশিকো মাৎসুমোতে নামে এক ব্যক্তির মাথায়। তিনিই ছিলেন তখন সুসামি শহরের পোস্টমাস্টার। ১৯৯৯ সালে তৈরি হয় এই মেলবক্স। ইয়ামাতানি ডাইভ শপের কোনো পেশাদার ডুবুরি গিয়ে চিঠিগুলি তুলে আনে। এখানেই বিক্রি হয় ওয়াটার রেজিস্যান্ট পোস্টকার্ড ও তেলের মার্কার। লোহার মেল বক্সটিতে জং ধরে যায় বলে দু'বছর পর পর এটি বদলানো হয়। এই হল ডাকবাক্সের গল্প। এই ডাকবাক্সে কত চিঠি জমা হয়েছে একদিন আর তা পৌঁছে গেছে দূর হতে দূরে প্রিয়জনের হাতে। চিঠি লেখা হত পোস্টকার্ড,ইনল্যান্ড লেটার বা খামে। বেশিরভাগ চিঠির আদান-প্রদানই হত এই পোস্টকার্ডের মাধ্যমে। গানের কথায়'সে আমার বুক ভরানো ছোট্ট একটা চিঠি'।

পোস্টকার্ডের দেখা আর যায় না পাওয়া,তার অস্তিত্ব এখন কেবল স্মৃতিতে,কত সুন্দর মূহুর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়,আর তার সাথে জড়িত যে মানুষগুলি,যাঁরা আজ আর নেই,মনের মাঝে ভিড় করে এসে দাঁড়ান। পোস্টকার্ডের সাথে আমার পরিচয় ভাল করে জ্ঞান হবার আগেই,বছর দুই কি আড়াই হবে বোধহয় বয়স তখন,সবে বোল ফুটেছে মুখে। পিঠোপিঠি তিন বোন হওয়ায় তৃতীয়জনের জন্মের সময় মামাবাড়ি গিয়ে বোনকে ক'মাসের নিয়ে আর দিদিকে নিয়ে মা ফিরে এলেন বাড়ী আর দুরন্ত আমাকে রেখে এলেন দিদিমা-মামা-মাসীদের আদরে বেড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু বাবাকে যে বড্ড ভালবাসতাম,আর তাই কোথাও পোস্টকার্ড পড়ে থাকতে দেখলে কুড়িয়ে নিয়ে বলতাম,"বাবা আমায় চিটি দিচে,আমায় বাবা নিচে না"। তখন যেহেতু খবর নেবার মাধ্যম ছিল চিঠি লেখা আর সেটা হত বেশিরভাগ পোস্টকার্ডেই,তাই বোধহয় ওইটুকু বয়সেই পোস্টকার্ড চিনতে শিখে গিয়েছিলাম আর চিঠি শব্দটার সাথেও পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম।

এরও বেশ কিছু পর,দুষ্টুমি না কমলেও বাড়ীতে আমার জায়গা হয়েছিল,কারণ ৪বছর বয়সে স্কুলে কেজিতে ভর্তি করা হল আমায়। এরপর দেখতাম বাড়ীতে পোস্টকার্ড আসতে,যার বেশিরভাগ মামারবাড়ী জামালপুর থেকে আর আসত কানপুর থেকে ন'দিদুর চিঠি। স্কুলে চিঠি লেখা শেখার আগেই দেখলাম দিদিমার চিঠি আমার ঠাকুমাকে লেখা যার শুরুটা আমার আজও চোখে ভাসে--পরম পূজনীয়া বেয়ান নিবেদন মিদং,মায়ের কাছে শিখলাম গুরুজনদের চিঠি লিখতে হলে কি কি সম্বোধন করে লিখতে হয়। দিদিমার একটা চিঠি আমি কখনও ভুলব না। আমার ছোট বোনের জন্মের পরে ঠাকুমা বোধহয় চিঠিতে লিখেছিলেন,ছোট-নাতনীর নাম কাজল রেখেছেন,দিদিমা তার উত্তরে লিখেছিলেন, "বেয়ান আপনি কাজল নাম রেখেছেন,আমি রেখা টেনে দিলাম",তাই ওর নাম হল 'কাজলরেখা'। আর ছিল ন'দিদুর চিঠি,প্রতিমাসে আসতই। বাংলা তখন ভালই পড়তে শিখে গেছি,ন'দিদুর সে চিঠি আমরা ভাইবোনেরাই কেউ পড়ে শোনাতাম কারণ উনি বোধহয় চিঠিতে রামায়ণ-মহাভারত লিখে ফেলতেন। এত্ত ক্ষুদি ক্ষুদি লেখা,ঠাকুমার সাধ্য কি তা উদ্ধার করার! উনি হলেন আমার বাবার কাকীমা,বিয়ে হয়ে ৯বছরের মেয়ে উঠেছিলেন এসে আমাদের বাড়ীতেই। তখন ওবাড়ীতেই সবাই একত্রে থাকতেন কিনা,পরে দূরে চলে গেলেও,বাড়ীর প্রতি সে টান তাঁর জীবনভর ছিল। তিনি জানতে চাইতেন কোন ঘরে কে শোয়,সেবারে খড়ের ঘরে সাপ বেরিয়েছিল,পরে আর বেরিয়েছে কিনা,রাধার মা এখনও কাজ করে কিনা,পাড়ার শিবমন্দিরটার কি অবস্থা,নীচে ভাড়াটে ক'ঘর আছে,আরো কত কি,সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঐ ছোট্ট পোস্টকার্ডটি ভরিয়ে ফেলতেন। ন'দিদুর চিঠি নিয়ে আমরা খুব মজা করতাম।

এরপর মায়ের হাত ধরে চিঠি লেখা শুরু বিজয়াদশমীতে,ওই ছোট্ট পোস্টকার্ডে সবাই একচিলতে করে জায়গা পেতাম মামাবাড়ি ও ন'দিদুকে প্রণাম জানাবার জন্য। সে ছিল বেশ মজার ব্যাপার,মা নিজে লেখার পর প্রথমে দিদি,তারপর আমি,এইভাবে সিরিয়ালি সবাই এক এক করে।আরো বড় হলাম যখন তখন বাণীপিসিমার(আমাদের বাড়ীর রান্নাঘরের দুধের ডিপার্টমেন্ট ছিল ওনার) চিঠি লিখে দিতে হত আমায়। ওনার মেয়ের দূরগ্রামে বিয়ে হয়েছিল,কি লিখতে হবে আমায় বুঝিয়ে দিতেন আর আমি তা সাজিয়ে বাণীপিসিমার বয়ানে লিখে দিতাম পোস্টকার্ডে। আর আমার সে লেখা ওনার এতই পছন্দ ছিল যে এটা আমার পাকাপোক্ত কাজ হয়ে গিয়েছিল। চিঠি লিখতে হলেই আমার কাছে পোস্টকার্ড নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন। আজ আর তিনি নেই,কত স্নেহ-ভালবাসা তাঁর কাছেও পেয়েছি। আর দেখেছি ঠাকুমাকে জোড়া পোস্টকার্ড পাঠাতে,গ্রামে আমাদের জমিজমা দেখাশুনো করতেন যিনি তাঁকে,ফসলের খবরাখবর নেবার জন্য। পাছে উত্তর দিতে গড়িমসি করেন তাই এই জোড়া পোস্টকার্ড,যার একদিকে ঠাকুমা লিখতেন আর একদিক খালি থাকত,কেবল আমাদের বাড়ীর ঠিকানা লেখা থাকত সেখানে। ঠাকুমার ফরমায়েসে সেই জোড়া পোস্টোকাড,পোস্টাপিস থেকে আমায় বহুবার এনে দিতে হয়েছে।

আর ছিল বিয়ের পর আমার শ্বশুরমশাইয়ের চিঠি,উত্তরবঙ্গের চা-বাগানে থাকতেন,আমরা এখানে,তখনও বাড়ীতে ফোন আসেনি আর চা-বাগান থেকে ফোন করাও দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। তা ওনার চিঠিও ছিল সেই পোস্টকার্ডে রামায়ণ-মহাভারত। যারা দেখেছে সবাই হেসেছে। আজও তার কিছু রাখা আছে আমার কাছে।

আমার শ্বশুরমশাইয়ের বাল্যবন্ধু থাকতেন দিল্লীতে,প্রতিবছর বিজয়ার পর প্রণাম জানাতাম চিঠিতে  আর কি যে খুশি হতেন তিনি,বলতেন শুধু বিজয়া আর নববর্ষের চিঠি না দিয়ে মাঝেমাঝেই যেন আমি তাঁদের চিঠি দিই। আমার চিঠিতে নাকি কাকু-কাকীমা খুব আন্তরিকতার ছোঁয়া পান। এমন কথায় স্বভাবতই আমারও প্রাণমন ভরে যেত। তবে সে চিঠি আমি ইনল্যান্ড লেটারের নীল খামে লিখতাম, পোস্টকার্ডে নয়।
আর আমার প্রেমিক,বর্তমানে স্বামী,তার সাথেও চলত মনের আদানপ্রদান এই চিঠির মাধ্যমে। কত রাত পার হয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠত,চিঠিতে আবেগ প্রকাশ করতে ও তার চিঠি বারবার পড়তে,সে এক অনন্য অনুভূতি। মানুষ মুখে যা প্রকাশ করতে পারে না,একটুকরো কাগজে অনায়াসে তা লিখে ফেলতে পারে,আর সেই কাগজের টুকরোটা যখন চিঠির আকারে সঠিক ঠিকানায় সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছায়,তখন মনের ভেতর যে অনুভূতির সৃষ্টি করে তা যারা একসময় চিঠির আদানপ্রদান করেছেন প্রত্যেকেই জানেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে,ফেসবুক,হোয়াটস অ্যাপ,ভিডিও কলে চিঠি আজ কেবল অফিসিয়াল কাজেই সীমাবদ্ধ।

তখন সবার বাড়ীতেই লেটার-বক্স থাকত,যার প্রয়োজন আজ ফুরিয়েছে। রোজ লেটারবক্স এ উঁকি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আজ আর নেই কিন্তু সেখানে একটা পোস্টকার্ড-এর উপস্থিতি যে কত আনন্দ দিত,তা আমরা যারা তা উপলব্ধি করেছি তারাই জানি,সে আনন্দ আজ হারিয়ে গেছে আমাদের সবার জীবন থেকে,বর্তমান প্রজন্ম সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত। সেই পোস্টকার্ডে থাকত কত আন্তরিকতার ছোঁয়া,যার জন্য আমরা হা-পিত্যেশে অপেক্ষা করে থাকতাম। আজও ইচ্ছে করে অমন হাতে লেখা একটা চিঠি পেতে,অবশ্যই প্রিয়জনের কাছ থেকে।

   গদ্যকার মানসী গাঙ্গুলী

রায়বাগান, বুড়োশিবতলা, চুঁচুড়া












0 Comments