মোনালিসা নায়েকের প্রবন্ধ

স্মৃতির কোলাজে বন্ধু 

বন্ধু–শব্দের সখ্যতা সকল হৃদয় ছুঁতে পারে না, অনুভবের নদীতে ডুব দিয়ে গভীরতা তুলে নিলে তা রত্নসম।আগেকার দিনে বাড়ির দরজায় ডাকপিয়ন যখন  টোকা দিত সবাই উদগ্রীব থাকতাম,কারণ যে সময়ের কথা বলছি কলিংবেলের চল তেমন ছিল না ,গ্রামের খুব কম বাড়িতেই থাকত।একবুক আকুতি নিয়ে বাড়ির প্রতিটা সদস্যই  শব্দকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে উচ্ছ্বাসে ভরে উঠত শুধুমাত্র শোক সংবাদ ছাড়া।পার্সোনাল শব্দের শৌখিনতা ঠাঁই পেত না মননে।পরিবার মানে ধারণা ছিল এক ছাদের নীচে  বহুজন মিলে থাকা এবং প্রত্যেক সদস্যই একে অপরের প্রতি সমান উদাসীন।

তখনকার দিনে মেয়েরা প্রথম শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার পর  থেকেই বন্ধু ভাবতে হত যৌথ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে খুদে সকল সদস্যকে। এর বাইরে বন্ধুর ব্যবহারিক প্রয়োগ বিলাসিতা হিসেবেই বিবেচ্য।ছোট থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা-সই,বকুল,ফাগ এরা শুধু স্মৃতির পাতায় সযত্নে রাখা এক অব্যক্ত যন্ত্রনা।তবে এই দূরত্ব মুছে জীবনে এক চিলতে রোদ্দুরের স্পর্শ  পাওয়া যেত 'রানার' এর ভূমিকার জন্য,যা আজকের প্রজন্মের কাছে অচেনা ও আবছা!

আজকে আমরা ভার্চুয়্যাল জগতে ভেসে বেড়াচ্ছি হাজারও বন্ধুর সাহচাৰ্য্যে ।প্রত্যেক জিনিসেরই ভালো -খারাপ থাকবে,ভালো -বিষয়কে  উপলদ্ধির মাধ্যমে গ্রহণ করাই–বিচক্ষণতা।নয়তো বহু ক্ষেত্রেই অধিক আবেগ আর ইগোর ঝড়ে আলগা হয় সম্পর্কের বাঁধন কিন্ত প্রিয় কিছু মুখকে  যখন মুঠোফোনের জন্যই সামনে দেখে কথা বলি,নয়তো কণ্ঠস্বরে দূরত্বের বব্যধানকে নৈকট্য ভেবে সময় গড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্ত টের থাকে না,এক অদ্ভূত ভালোলাগা থাকে সেখানে।একাকীত্বের যন্ত্রনায় প্রিয়জনের স্পর্শকাতর আলাপনে প্রাত্যহিক দিনযাপনের একঘেঁয়েমিতে বাঁচার রসদ পাওয়া যায়।আজকের দিনে অত্যাধুনিকতার দৌলতে যে মুহূর্ত উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছি তা অস্বীকার করার উপায় নেই।একটা বিষয় খুব ভাবায় অনলাইন বন্ধুত্বে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা আর হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি। এই সম্পর্ক ভাবনার উদারতায় , সহযোগিতা আর নির্ভরশীলতার দর্পণে দেখলে তা কখনও ম্লান হয় না ,যা আগেকার দিনে খামের মোড়কের ভিতর কালো অক্ষর মুছে দিত জীবনের আঁধার,কটা শব্দেই ভেসে উঠতো প্রিয়জনের মুখ,ফেলে আসা স্মৃতির কোলাজ।

    প্রবন্ধকার মোনালিসা নায়েক 

আরামবাগ, হুগলী 




0 Comments