ডাকবাক্স ও চিঠির কথা
আজ মমতা মাখানো চিঠিগুলোকে কপালে ঠেকিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার ছবি চোখের অন্তরালে চলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ছবিই হারিয়ে গেছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে। যে ছবিগুলি হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি তার জায়গায় অন্য ছবি স্থান দখল করেছে। হারিয়ে গেছে টেলিগ্রাফের টরেটক্কা মেশিন হারিয়ে গেছে ঘটাংঘট ছাপাখানা হারিয়ে গেছে ধোঁয়া ছাড়া কুঝিক্-ঝিক্ রেল গাড়ি। হারিয়ে গেছে গ্রামোফোনের বাক্স হারিয়ে গেছে কালো কালো রেকর্ড ডিস্ক প্লেয়ার। রানার চলেছে রানার- রানারের চলা কবেই থেমে গেছে। বিদেশে বিভূঁয়ে থাকা ছেলের পৌঁছানোর সংবাদ পাওয়ার জন্য মায়ের প্রতীক্ষা। পত্নীর ঘরবার- আজও তো একটা পোস্ট কার্ড এলোনা। পিয়ন ডাক বিলি করে চলে গেল। এখন শুধুই উৎকণ্ঠা আর উৎকণ্ঠা। খাকি পোশাকে খাকি ডাক ব্যাগও হারিয়ে গেছে। পোস্টকার্ড ইনল্যান্ড খাম - বর্তমান প্রজন্মের কাছে দর্শনীয় বস্তু। গ্রামে গ্রামে সাধারণ জায়গায় লাল রঙের ডাকবাক্স গুলি ধীরে ধীরে রংচটা হয়ে মরচে ধরে কখন যেন অজান্তেই চোখের আড়ালে চলে গেছে। বড় বড় রেল স্টেশনের লাল রঙের ডাকবাক্স গুলি এখনো স্বমহিমায় অবস্থান করছে -জানিনা আর কতদিন! আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম গান শুনে স্মৃতিমেদুর হতে হয়।
Letter writing বা চিঠি লেখার বিষয়টিই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি হতে বিদায় নিয়েছে। আবেগ-অনুভূতি ভেজা চিঠি লেখা ও প্রাপকের প্রাপ্তির আনন্দ অস্তগামী। বেগ এখন আবেগের স্থান দখল করেছে। মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে মুহুর্মুহু সংবাদ আদান-প্রদান হচ্ছে। আপডেট সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশিত - না জানলেই ব্যাকডেটেড। তুমি পিছনে থাকলে পড়ে বর্তমান এগিয়ে গেল।
এই অবস্থায় একবার পিছন ফিরে তাকাই ডাকবাক্স চিঠির অতীত কি বলে- একদিন রাজকন্যা পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে রাজপুত্র বা মনের মানুষের কাছে পাঠাতো। সেই পায়রা আবার মনের কথা লেখা চিঠি নিয়ে ফিরে আসতো। তারপর ধীরে ধীরে এল ডাক ব্যবস্থা। তার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হলো পোস্ট অফিস। তারই অঙ্গ ডাকবাক্স পিয়ন চিঠি লেখার উপকরণ।
গ্রেট ব্রিটেন এর নাম দিল পোস্ট বাক্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কানাডা ডাকলো কালেকশন বাক্স, মেইল বাক্স,ড্রপবক্স নামে। ১৬৫০ সালে ফ্রান্সের রাজধানীতে প্রথম ডাকবাক্সের জন্ম হল। ১৮২৯ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। ১৮০৯ সালে ওয়েকফিল্ড অফিসের দেওয়ালে ঢালাই লোহার যে ডাক বাক্সটি লাগানো হয়েছিল সেটি ওয়েকফিল্ড মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে।
১৮৫২ সালে লাল রঙের প্রথম ডাকবাক্স দেখা যায়। ১৮৫৭ সালে জার্সির সেন্ট হিলারে স্থাপিত হয় যা গ্রামীণ জেলাগুলিতেও ব্যবহার করা হতো। ১৮৫৬ সালে বিজ্ঞান ও শিল্প বিভাগের রিচার্ড গ্রেভ লন্ডন ও অন্যান্য শহরে ব্যবহারের জন্য সুসজ্জিত থাম বাক্স নির্মাণ করেন। ১৮৫৯ সালে এই নকশারও উন্নতি করা হয়। ভিক্টোরিয়ান ডাকবাক্স গুলির জন্য প্রথম মানের রং ব্যবহার করা হতো।
১৮৬৬-১৮৭৯ সালের মধ্যে প্রথম মানের রঙে রঞ্জিত হয়ে ষড়ভুজের ডাকবাক্স হয়ও স্তম্ভ ডাকবাক্সের রূপ নেয়। ১৮৭৪ সালের সমস্ত ডাকবাক্স গুলির রং লাল করা হয় যদিও এর দশ বছর আগেই লালরঙের প্রচলন হয়েছিল।
১৮৪৮ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রথম সার্বজনীন কাঠ ও লোহার তৈরি হালকা ডাকবাক্স দেখা যায়। এগুলি সহজে চুরি হয়ে যেত বলে ৪৫ কেজি ওজনের ঢালাই লোহার ডাকবাক্সের ব্যবহার দেখা যায়।
এশিয়া মহাদেশের ১৮৯০ এর দশকে ষড়ভুজ আকৃতির ধাতুর তৈরি থামবাক্স হংকংয়ে আবির্ভূত হয় যা ১৯৯০ এর দশকের শেষদিক পর্যন্ত ছিল।১৮৯০-৯৭ সাল পর্যন্ত লাল রঙই ছিল।১৯৯৭ সালে সবুজ রং হয়। আমাদের দেশেও শের শাহের রাজত্বকালে ডাক ব্যবস্থার উন্নতি হয়।
ডাকবাক্সের আকারের চারটি বৈচিত্র দেখা যায় -
১. বাতি বাক্স।
২. স্তম্ভ বাক্স
৩. দেয়াল বাক্স।
৪. লুদলো দেয়াল বাক্স।
এর মধ্যকার চিঠিগুলি নির্দিষ্ট সময়ে এক/ দুই/ তিন/চার বার সাফাই করে যথা পদ্ধতিতে যথাস্থানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ডাকবাক্সের বোবা শব্দ অনুভূতিগুলোকে এখনও বড্ড বেশি আবেগী এ দামি করে তোলে। রংচটা মরচে ধরা ডাকবাক্স বিলুপ্ত হলুদ রঙা, নীল রঙা খামগুলো আর হাতছানি দিয়ে ডাকে না। আমরা মোবাইলে মগ্ন মেসেজে ধ্যানস্থ। যুগের গর্ভেই ইতিহাসের জন্ম। একদিন এই গতিময় যোগাযোগও হয়তো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে- লেখা হবে এমনই এক স্মৃতিকাতর কাহিনী।
[ তথ্যঋন - উইকিপিডিয়া ]
প্রবন্ধকার লক্ষ্মণ দাস ঠাকুরা
সুকান্তপল্লী, কালনাগেট, পূর্ব বর্ধমান




0 Comments