ডাকবাক্স ও চিঠিদের কথা
মোড়ের মাথার রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিচ্ছে, ঠিক সেখানটার কোণটায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে ডাকবাক্সটা। কোন এক সময় গায়ের রংটা উজ্জ্বল লাল থাকলেও, বয়সের ছোঁয়ায় এখন তা অনেকটাই ফিকে, প্রায় বিবর্ণই বলা চলে, তার ওপর গোটা শরীর জুড়ে চাপ চাপ ধুলো। ডাকবাক্সটার পাদানি জুড়ে জন্মেছে আগাছার দল, আর নামহীন কটা সাদা ফুল। বোঝাই যায় সেখানে বহুদিন কোন মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। তবু আজো তার শরীর হাতড়ালেই মিলবে কয়েকটা চিঠি, যারা তাদের ঠিকানায় পৌঁছায়নি কোনদিন।
আর এরকমই আরো অনেক চিঠির অস্তিত্বকে নিজের বুকে যত্ন করে রেখে দিয়েছে ডাকবাক্সটা, যাদের কেউ কোনদিন খোঁজ করে নি, যাদের কেউ কোনদিন খোঁজ করে না। ফসিল হয়ে এরা কেবল অপেক্ষা করেই কবে মুক্তি ঘটবে ওদের, কিন্তু কোন আশার আলো ছুঁয়ে দেয় নি ওদের। দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে ভরে ওঠেছে চারদিক, তবু কারোর মুক্তি মেলে নি, না ডাকবাক্সটার, না চিঠিগুলোর।
সেখানে থেকে গেছে, বৃদ্ধাশ্রমে বসে এক বাবার, তার ছেলেকে লেখা চিঠি, যাতে তিনি লিখেছেন বেশিদিন নয়, আর বছর পঁচিশ, তারপর আমার নাতিও তোমাকে পৌঁছে দেবে এখানে, অপেক্ষা করব আমি সেদিনকার।
সেখানে থেকে গেছে, মানসিক হাসপাতালে বসে দীপের, অনার কিলিংয়ের শিকার প্রেমিকাকে লেখা চিঠি, জাতপাত শুধুমাত্র একটা শব্দ, ফর্ম পূরণের সময় যেটা কাজে লাগে। তুই দেখবি একদিন মানুষ এটা ঠিক বুঝতে পারবে ।
সেখানে থেকে গেছে, পণের আঁচে ঝলসে যাওয়ায় আগে এক কন্যার তার বাবাকে লেখা চিঠি, তুমি বলেছিলে মানিয়ে নিতে, আমিও চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখিনি, কিন্তু টাকার আঁচ যে বড় রাক্ষুসে বাবা, ও যে সব ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব, ঠিক-ভুল বিচারের ক্ষমতা সব গিলে নেয়, এমনকি মানুষকেও বাদ দেয় না।
সেখানে থেকে গেছে, এক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষটার আত্মহত্যার আগে তার মাকে লেখা আক্ষেপ মাখানো শেষ চিঠিখানা, সবার কথা ছেড়েই দিলাম, কিন্তু তুমিও বুঝলে না মা, তোমার ছেলে তোমার মতো হতে চেয়েছিল, একটা মেয়ে হতে চেয়েছিল।
সেখানে থেকে গেছে, এক ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়ের, হাসপাতালে শুয়ে, জীবনকে লেখা শেষ চিঠি, মা-বাবার চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে গেলে আমায়, ওরা যে খুব কষ্ট পাবে। দেখো না কটাদিন, আর কিছুটা সময় যদি দেওয়া যায়!
সেখানে থেকে গেছে, এক ব্যর্থ কবির, সমাজকে লেখা আর্তনাদে ভরা শেষ চিঠি, আপণজনেরা কেউই পাশে রইলো না শেষমেশ। গাছটা তাই অঙ্কুরেই মরে গেল। কবি এখন থেকে আর কবিতার পান্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে ছুটবেন না, বরং ব্যস্ত হবেন অফিসের ব্যালেন্সসীটে আর বাজারে গিয়ে দেখেশুনে সব্জী-মাছ আনতে।
সেখানে থেকে গেছে, একটা বাচ্চার স্কুলকে লেখা চিঠি, জানো তো, পিঠের ব্যাগটা না খুব ভারী, রোজ রোজ এটা স্কুলে বয়ে নিয়ে যেতে আমার বড্ড কষ্ট হয়। তার ওপর, রোজ রোজ, এতো এতো হোমটাক্স দেয় টিচারেরা? সেগুলো করতে গিয়ে, আমার আর খেলা হয় না।
১১ সেন্টার সিঁথি রোড, কলকাতা




0 Comments