মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র'র প্রবন্ধ


মন ও ঘুম 

বিষণ্নতার সাথে যেই বিষয়গুলি জড়িয়ে, আগে সেইগুলিকে একটু সহজ ভাষায় জেনেনি।

মন কি? মন হলো বুদ্ধি ও বিবেকবোধের এক সমষ্টিগতরূপ, যা চিন্তা ও, অনুভূতি, আবেগ ও ইচ্ছার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

আবেগ কি? আবেগ হলো মনের একটি বিশেষ কাজ, যার ফলে আমাদের মনের মধ্যে চলা দুঃখ, সুখের অনুভূতি গুলিকে বুঝতে পারি। কিন্তু, আবেগের ফলে আমাদের যা অনুভূতি হয়, তার জন্য আমাদের কোনো কর্মকান্ডই দায়ী। 

কিন্তু, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো কারণ ছাড়াই দুঃখ বা সুখের অনুভূতি হয়। 
মাথা থাকলে যেমন, মাথা ব্যথা হয়, তেমনি মন থাকলে মনের ব্যামো হয়।
বিষণ্নতা মানে কিন্তু আবার পাগলামি নয়। এটি একটি অসুখ মাত্র যা সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নির্মূল হয়। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদমই স্বাভাবিক ব্যবহার করে। তাঁদের ভিতরে কি চলছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না।  
কিন্তু বিশেষ কোনো মুহুর্তে, হঠাৎ এঁদের এই রোগটি প্রকাশ পায়। 

এবার বলি বিষণ্নতায় কারা ভোগেন:-
বাচ্চা থেকে বুড়ো, আজ কাল সবাই এই রোগের শিকার।

এবার আসি বিষণ্নতা কেন হয়।
বিষণ্নতার জন্য প্রধানত আমাদের সমাজ দায়ী। সভ্যতা যত উন্নত হয়েছে, সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে অবসাদ ততো বেড়েছে এবং বাড়ছে। 
 আবার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ব্যবধানের ফলে যেই হতাশা বা বিষণ্নতা সৃষ্টি হয় তার ফলে এই রোগে আক্রান্ত মানুষ নিজেদের শেষ করে দিতেও দ্বিধা বোধ করে না। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন-
"আমৃত্যু দুঃখের তপস্যাই হইলো এই জীবন"।

পাওয়া না পাওয়ায় ব্যাল্যান্স তৈরি করতে না পারলেই , বিষণ্নতা আসে।
আমরা অবচেতন মনেই আমাদের থেকে ইনফেরিওর লোকেদের সাথে বেশি মেলামেশা করি, কারণ, তার ফলে আমরা নিজেদের সুপিরিয়র ভাবতে পারি। কিন্তু ব্যাপারটি আত্মহননের পথ বাছতে সাহায্য করে, কারণ আশেপাশে কাউকে ওপরে উঠতে না দেখলে, নিজের মধ্যে ওপরে ওঠার বাসনা জাগে না। ফলে আমরাও নিচের দিকে নামতে থাকি।
আবার, অনেকে, খুব উচ্চবিত্ত ঘরের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে, নিজেকেও ধনী মনে করে, সেটিও আবার সুইসাইডাল। সেই ধনী বন্ধুর সাথে পাল্লা দিতে না পারলে, মানুষ একটা সময় নিজেকে শেষ করে দিতে চায়।
তাই বন্ধু বাছতে হয় সমানে সমানে।

বাচ্চা বা স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের মাথায় বড়োরা এটাই ঢোকায়ে যে বড়ো হতে গেলে বড়ো মানুষদের সাথে মিশতে হয়। তবে এটা বোধ হয় বোঝাইনা যে অর্থই শুধু মানুষের বড়ো বা ছোটো হওয়ার মাপকাঠি নয়।  তাই তাদের বন্ধু নির্বাচনটা গোড়া থেকেই ঠিক করা দরকার।

বিষণ্নতা বেশি কাজ করে, বিশেষ করে সফল পুরুষদের মধ্যে। তারা সমাজে নিজেদের হেরে যাওয়াটা প্রকাশ করতে পারেনা শুধুমাত্র একটি ভয়ে। তাঁরা ভাবে সমাজ তাদেরকে কাপুরুষ ভাববে।

এবার আসি মানুষ কেন এই আত্মহত্যাকেই বেছে নেয়:- 
আসলে বিষণ্নতা আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের হরমোনাল ইমব্যাল্যান্স সৃষ্টি করে, যা আমাদের মৃত্যুকে বেছে নিতে বাধ্য করে এবং সাহায্যও করে। 
বিশ্ব পরিসখ্যান দেখায় যে প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু আত্মহত্যা এই রোগ নিরাময় করতে পারে না, উল্টে আরো কিছু অবসাদগ্রস্ত মানুষ তৈরি করতে সাহায্য করে। যেমন যেই মায়ের একমাত্র সন্তান এই রোগের শিকার হয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়, আমরা কি করে আশা করি সেই মা তার গোটা জীবন খুব আনন্দে কাটবে?.

এবার আসি বিষণ্নতা লক্ষণ কি:-
রোজকার কাজ কর্মে অনীহা, এবং কর্মইচ্ছা একেবারে শূন্যে নেমে আসে ফলে আসে-পাশের ঘটনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চায়।
সবসময় মনের ভিতরে অপরাধ বোধ কাজ করবে ফলে মনের মধ্যে নিজের প্রতি কোনো প্রকার আস্থা কাজ করে  না।
নেগেটিভ চিন্তা কাজ করে, ফলে পড়াশোনা বা যে কোনো কাজে পিছিয়ে পড়ে, বা সেই কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চায়।
পরিস্থিতির থেকে পালাতে আত্মহত্যার চিন্তা এবং সেই বিষয় নানান তথ্য জোগাড় করার প্রবণতা বাড়ে।
সাধারণ এবং সুস্থ মানুষের জীবনে দুটি জিনিস সব থেকে প্রিয় হয়। এক খাওয়া, দুই ঘুম। 
কিন্তু এই বিষণ্নতার কারণে এই দুটি প্রিয় জিনিসের ওপর সব থেকে বেশি প্রভাব পড়ে।
বিষণ্নতার কারণে খিদে কমে যায় বা বেড়ে যায়। তার ফলে ওজনের ওঠা নামা হতে থাকে।
তার সাথে ঘুমের সমস্যা সব থেকে বেশি ভাবে দেখা দেয়। কারোর ঘুম বেশিও হতে পারে, কারোর কম ও হতে পারে, বা ওষুধের সাহায্যে সব সময় ঘুমোতে চাইতে পারে, বা একদমই না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারে।

এই সব কিছুর চিকিৎসা বা প্রতিকার আছে।

 তবে তার আগে একটু ঘুমের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
শরীরকে যেমন পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হয় তেমনি সঠিক পরিমানে এবং সঠিক সময় ঘুমও দিতে হয় না হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ধীরে ধীরে আমাদের অজান্তে অকেজো হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমই হলো প্রধান উপসর্গ যা থেকে বোঝা যায় যে, কোনো মানুষ অবসাদ বা বিষণ্নতায় ভুগছেন কি না।  এই ক্ষেত্রে কারোর ঘুম কমে যায়, বা কারোর ঘুম বেড়ে যায়, বা কারোর খাপছাড়া ঘুম হতে পারে বা, কেউ অনিদ্রায় ভুগতে পারেন রাতের পর রাত। পরিসংখ্যান এটিও বলে যে কারোর ঘুম হচ্ছে কিন্তু ঘুম থেকে শরীরে যে শক্তি আসার কথা তা একদমই আসছে না, উল্টে সেই মানুষটি সব সময় ক্লান্তি অনুভব করছে। এর ফলে ধীরে ধীরে শরীরের ভিতরে নানান সমস্যা বা উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।

আসুন একটু ঘুমের কিছু কথা জেনেনি:-
ঘুম সাধারণত দুই প্রকার হয়। 
রেম এবং নন রেম।
 রেম ঘুমে আমাদের মাংসপেশী শিথিল থাকলেও মস্তিষ্ক সজাগ থাকে।
নন রেম ঘুমে, মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে, এবং মাংসপেশি সক্রিয় থাকে এবং এই ঘুমে হরমোন নিঃসৃত হয়ে সারাদিনের ক্লান্তিকে দূর করে। রাত্রে এই রেম আর নন রেম ঘুম দুটোই ঘুরে ফিরে আসে। 
বাচ্চা থেকে বুড়ো, ঘুম সকলের জন্যই প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতের ঘুম ভীষণ ভাবে প্রয়োজন। বাচ্চাদের রাত্রে কমবেশি ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। এবং বড়োদের রাত্রে কমবেশি ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন।

যারা অবসাদে ভুগছেন তাঁরা হয়তো নিজের থেকে ঘুমের ওষুধ কিনে খেতে শুরু করেন। প্রথমে হয়তো অল্পতে ঘুম আসবে কিন্তু যত দিন যাবে, সেই ওষুধের পরিমান বাড়তে থাকে ফলে দেখা যায় যে ওষুধের পরিমান বাড়িয়েও ঘুম আসে না বরং শরীর আরো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেকে এই বিষণ্নতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় ঘুমকেই বেছে নেন, ফলে তাঁরা দিনের বেলাতেও এই ওষুধ খেতে শুরু করেন। কিন্তু এই ঘুমের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর কমবেশি ঘুম বা অনিদ্রা শরীরে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, হার্টের সমস্যা দেখা দেয়, ডায়াবেটিসের মতন মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, হজম ক্ষমতা কমায়, শরীরে অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এবার একটু জেনেনি, এই বিষণ্নতা এবং ঘুমের সমস্যার প্রতিকার কি বা কি এর চিকিৎসা।

আগে বাচ্চাদের বা স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে আসি:-
সন্তান যখন আপনার তখন তার প্রধান ও প্রথম চিকিৎসা আপনাকেই করতে। তার পড়াশোনা, স্কুলে বা কলেজে কতটা রেসপন্স করছে বা কোনো বিশেষ ঘটনা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে কিনা, তার বন্ধুমহল কেমন ইত্যাদি।
তাকে প্রথমেই সাকরিয়াটিস্ট বা সাইকোলজিস্টএর কাছে না নিয়ে গিয়ে আপনি চেষ্টা করুন তার মনের কাছাকাছি 
যেতে। যদি তার সমস্যা একবার জানতে পারেন, তাহলে মনে হয় না, মা-বাবা হিসেবে তাকে ঠিক পথে চালিত করতে  আপনার কোনো অসুবিধা হবে।

এবার আসা যাক, বড়োদের চিকিৎসায়:-
আজকাল সবাই বলে মনখারাপ হলেই কথা বলতে, তাতে সমস্যা দূর হবে। কিন্তু এই হাই স্পিড যুগে কার ওতো সময় আছে যে  বসে আপনার মনের কথা শুনে তার সমাধান বাতলে দেবে!! তাই সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সাকরিয়াটিস্ট এবং ভালো সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিতেই হবে।
যাঁরা এই অসুখ থেকে মুক্তির জন্য ঘুমের ওষুধ খান তাদের ভালো সাকরিয়াটিস্ট দেখালেই সমস্যার সমাধান হবে।
আর, যাঁরা, এই বিষণ্নতাকে কাটাতে আত্মহত্যাকেই একমাত্ৰ সমাধান মনে করেন তাঁদের কে বলি অনেক জন্ম পুন্য করলে মানব জনম লাভ হয়। সেটিকে হেলায় হারানো উচিত কি?
আপনার স্বেচ্ছা মৃত্যু আপনার প্রিয় জনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে তাঁদের সারাজীবনের মানসিক অসুস্থতার কারণে হতে পারে, তাই সেটি এক প্রকার পাপ। 
সব শেষে বলি এতো সুন্দর পৃথিবীকে কেনই বা ত্যাগ করবেন?
নিজে বাঁচুন, অপরকেও বাঁচতে দিন।

প্রবন্ধকার মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র
১৪০, অশোক গড়, কলকাতা





















0 Comments