অনামিকা দে রায়চৌধুরীর ছোটগল্প



বিষণ্ণতা ও ঘুম

মা'র ডাকে ঘুম চোখে বিছানা ছাড়ল রিভু। সোজা গিয়ে দাঁড়াল পুবের কোণে জানলার কাছে। তার এই জানলা থেকে সামনের রেলিং দিয়ে ঘেরা পার্কটাকে দেখা যায়। সেখানে বিছানো বিস্তীর্ণ ঘাস যেন তার নরম বুকের ওপর দিয়ে সমস্ত শিশুদের অত্যাচারকে হাসি মুখে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। যার একপাশে  দাঁড়িয়ে রাধাচূড়া আরেক পাশে কৃষ্ণচূড়া । বৈশাখের প্রচণ্ড তাপে সারা জায়গা থেকে বিকেলের এই সময়েই কত রকমের পাখি এসে বসে এই রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁক ফোঁকরে। তাদের কিচির মিচির শব্দ শুনলেই রিভুর বুকের ভেতর ধড়ফড়ানিটা বেড়ে যায়। রিভু দেখতে পারছে সেখানে এখন তার বয়সী কয়েকটা ছেলে প্রবল উদ্দামে ক্রিকেট খেলছে। এই সাত আটটা ছেলেকে রিভু প্রতিদিনই সেখানে খেলতে দেখে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা পাতলা করে যে ছেলেটি তার নাম সিদ্ধার্থ। এই তো এখন সে একটা ছয় মারল। খেলায় একটু চোরামি করলেও সিদ্ধার্থ খেলে ভালো। ওর সাথেই রিভু একসাথে ব্যাট করত।  সিদ্ধার্থ রিভুদের ফ্ল্যাটের পাশেই থাকে। রোজ বিকেলে খেলতে যাওয়ার আগে রিভুকে ডেকে নিয়ে যেত। এক বছর হয়ে গেল এখন সে আর ডাকতে আসে না। রিভুর  ভেতরে জমে থাকা শৈশবের আকুলি বিকুলি করা খেলার হাতছানি থেকে রিভুকে মুখ ফিরে ভবিষ্যতের সফলতার লক্ষ্যে দৌড়াতে হচ্ছে।  রিভুর মা আবিরার কড়া নির্দেশ এখন খেলাধূলো  করা চলবে না। ক্লাস এইট হয়ে গেছে। শুধু ভালো রেজাল্ট আর সফল  হওয়ার লক্ষ্যে দৌড়ানো। আচ্ছা এই ভালো রেজাল্ট করে আসলে কে সফল হবে রিভু না ওর মা? রিভু প্রতিবছরই ক্লাসে ফার্স্ট হয়। তাই স্কুলের সব টিচার, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের ওর ওপর প্রত্যাশাও বেশি। সবার প্রত্যাশা পূরণের বোঝা নিয়ে রিজু ফিরে এসে অংক কষতে বসল। আগামীকাল স্কুলে অংক পরীক্ষা। রিজু জটিল জটিল অংক গুলোর কষায় মন দিল। বাড়িতে মোটা টাকার মাইনে দিয়ে অংকের টিউশন স্যার রাখা হয়েছে। পরীক্ষায় একটা অংক কাটা করা মানে অংক স্যারের টিউশন ফিসের কদর নামতে থাকা। পরীক্ষার শেষে পাঁঠাকে বলিকাঠে দেওয়ার আগের মতো অবস্থা হয় রিভুর।  প্রশ্নপত্র নিয়ে রিভুকে প্রতিটি অংকের উত্তর জবাবদিহি করতে হয় তার বাবা অরুনাভের কাছে। 

 

পরীক্ষা শেষের ঘন্টা বেজে উঠল। রিভু হাত ঘড়িটা দেখে নিয়ে তাড়াতাড়ি অংক কষতে থাকে।  সময় শেষ। তিনটে অংক করা বাকি ছিল। স্কুলের মিস্ এসে রিভুর খাতাটা টান মেরে ছিনিয়ে নেয়।  হতাশ   রিভু বসে থাকে। বুকের ভিতরে এক ধুক্ পুকানি শুরু হয়ে যায়। স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই উৎকণ্ঠা মুখ নিয়ে মাকে দাঁড়াতে দেখে। আবিরা সবার সামনে রিভুকে পরীক্ষা নিয়ে কিছু প্রশ্ন  করেনা।  সকল মায়েদের এই এক অদ্ভুত মানসিকতা। তারা মনে করে সবার সামনে পরীক্ষা কেমন হয়েছে সন্তানকে জিজ্ঞেস করা মানে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য মায়েদের অযথা কৌতূহল বাড়িয়ে তোলা। সকলের অলক্ষ্যে রিভুকে ফাঁকা জায়গায় টেনে এনে আবিরা বলে "কি মনে হচ্ছে, সব অংক ঠিক হবে তো?"

রিভু কোন উত্তর না দিয়ে মায়ের পাশে পাশে মাথা নীচু করে হেঁটে যাচ্ছে। ছেলের মৌনতা আবিরার মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলল। এবার আবিরা একটু কর্কশ গলায় বলে ওঠে কি রে, আমি কি জিজ্ঞেস করছি? এবারও রিজু চুপ। 

আজ অরুনাভের অফিস ছুটি নিয়েছে। বাড়িতে রিভুকে ঢুকতে দেখেই অরুনাভ বলে ওঠে রিভু অংকের প্রশ্ন পত্রটা নিয়ে সামনে আয়। রিভু অংকের প্রশ্নপত্র অরুনাভের হাতে তুলে দেয়। অরুনাভ প্রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে তিনটে! তুই তিনটে অংক ছেড়ে এসেছিস? প্রতিটি অংকে পাঁচ নম্বর করে ছিল। পনেরো নম্বর বাদ চলে গেল?  দেখা যাবে ভেতরেও আরো কত ভুল করেছিস। পাশে আবিরা ঝংকার দিয়ে বলে ওঠে, আমি জানতাম। ঠিক জানতাম তুই অংক পরীক্ষা ভালো দিবি না। এতো যার সবসময় অন্যমনস্কতা তার যে এই পরিণতি হবে আমি ঠিক জানতাম।

আবিরা অরুনাভের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলে দেখবে এবার অর্কজিত ঠিক ফার্স্ট হয়ে যাবে। আমি লজ্জায় ওর মায়ের কাছে মুখ দেখাতে পারবো না।


বাবা, মায়ের তীব্র ভৎসনার মধ্যে দিয়ে রিভু ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে এগিয়ে চলে। বাথরুমের সাওয়ার ছেড়ে তার ভেতর জমে থাকা বিষণ্ণতাকে অনেক্ষণ ধরে সিক্ত করে। এরপর খাবার টেবিলে মাথা নীচু করে  মাছের ঝোল দিয়ে পুরো ভাত মেখে পেট ভরে খায়। আজ খাবার টেবিলে মা, বাবা তার সাথে একটাও কথা বলেনি। পাহাড় প্রমাণ অপরাধের বোঝা কাঁধে নিয়ে রিভু তার ঘরে ঢোকে। তীর্যক তলোয়ারের মতো ঘরের ভেতরে এসে পড়া রোদ্দুরকে ঢাকতে জানলার পর্দা টেনে দেয়। সারা ঘর জুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। রিভু তার ক্লান্ত, অবসন্ন, বিষণ্ণ শরীরটাকে টেনে এনে বিছানায় এলিয়ে দেয়। শরীর জুড়ে ধেয়ে আসছে এক নৈরাশ্যের দৈত্য। চোখের পাতা দুটো ভারি হয়ে আসে।  ক্লান্ত রিভু নিষ্পাপ মুখে ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে পাড়ি দিচ্ছে। রিভু দেখতে পাচ্ছে সে নরম কচি ঘাসের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে চলেছে। সিদ্ধার্থ পেছন থেকে জোরে জোরে তার নাম ধরে ডেকে চলেছে রি ই ই ইভু, রি ই ই ভু। রিভু খিল খিল করে হাসছে। আর দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ সিদ্ধার্থ রিভুর হাতটা ধরে ফেলে তার সাথে রিভুকে ব্যাট করতে নিয়ে যাচ্ছে। রিভু আর সিদ্ধার্থ ব্যাটিং করছে। আরো সাতটা ছেলে তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবার চোখেই শকুনের দৃষ্টি। একটা ছেলে দৌড়ে এসে বল ছুঁড়ল। তার মুখটা অস্পষ্ট। রিভু জোরে একটা ছয় মারল। সিদ্ধার্থ ছুটে এসে রিভুকে কোলে তুলে নিল। এক আরামের সুখ নিদ্রায় রিভু ঘুমের অতল তলে তলিয়ে গেল।


      সাহিত্যিক অনামিকা দে রায়চৌধুরী
গল্ফ গ্রীণ, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 

















0 Comments