সুমিতা চক্রবর্তীর মুক্তগদ্য


বিষণ্ণতার কথা

মন খারাপের অভিজ্ঞতা সকলের জীবনেই আছে। কতো কারণেইতো মন খারাপ হয় - আত্মীয় বিচ্ছেদে, স্বপ্ন পুরণ না হলে, কাছের মানুষের সাথে মনোমালিন্য হলে, ভবিষ্যতের হতাশা বা অনিশ্চয়তায়,একাকিত্ব অনুভবে। কিংবা নিছক শীতের কোনো এক বিকেলে ঘুম থেকে উঠে, প্রবল বর্ষণের কোনো এক রাতে - জন্ম নেয় এক অজানা মন খারাপ। এই মন খারাপ থেকে সৃষ্টি হয় বিষণ্ণতার। বিষণ্ণতা ছড়িয়ে আছে সাহিত্যে, সঙ্গীতে, আকাশে, বাতাসে সর্বত্র। কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের "হাট" কবিতার লাইনটা মনে পড়ে - " ছায়া ছায়া কতো ব্যথা ঘোরে ধরাধামে।"                   
                              
                               বেশিরভাগ কালজয়ী সাহিত্য বিষণ্ণতার কথাই বলে। আর পাঠক সেখানে বিষণ্ণতাকে উপভোগ করে। তাই পাশ্চাত্য কবি শেলির উক্তি  " Our sweetest songs are those that tell  of saddest thought." বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পথের পাঁচালী" উপন্যাসে দুর্গার মৃত্যুর পর অপুর মনের বিষণ্ণতা খুঁজে পাই এখানে - " চড়কটা যেন এবার কেমন ফাঁকা ঠেকিতে লাগিল। আর বছরও চড়কের বাজারে দিদি নতুন পট কিনিয়া কত আনন্দ করিয়াছে।•••• তাহাদের বেড়ার গায়ে রাংচিতা ফুল লাল হইয়া ফুটিলে, তাহার মুখ মনে পড়ে, পাখির ডাকে, সদ্য ফোটা ওড়কলমীর ফুলের দুলুনিতে - দিদির জন্য মন কেমন করে। মনে হয় যাহার কাছে ছুটিয়া গিয়া বলিলে খুশি হইত, সে কোথায় চলিয়া গিয়াছে - কতদূর ! •••• আর কখনো, কখনো - সে এসব লইয়া খেলা করিতে আসিবেনা।"•••
                                      আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন ফরাসি কবি বদলেয়রের তন্ময় পাঠক। বদলেয়র  spleen ও ennui - নামক জীবনের দুই অদ্ভুত আধি ব্যাধির কথা বলেছেন। spleen হচ্ছে একধরনের শারীরিক বৈকল্য ও তার থেকে জাত বিষাদ, নিরুৎসাহ, খেদ প্রভৃতি। ennui হচ্ছে মানসিক ক্লান্তি - নির্বেদ, একঘেয়েমি প্রভৃতি। এই দুই ব্যধি কবির। এই দুই মিলে তৈরী হয়েছে এক ভয়াবহ অবয়বহীন যন্ত্রণা। কবিতার উদ্গতিও এই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে। জীবনানন্দের " আট বছর আগের একদিন" কবিতায় এই যন্ত্রণার প্রতিফলন পাই -
" বধূ শুয়েছিল পাশে - শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল, আশা ছিল - জ্যোৎস্নায় - তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।
এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি।"
                  
এই বিষণ্ণতা মুছে ফেলতে মানুষ বারবার আশ্রয় নিতে চেয়েছে চির শান্তির ঘুমে। কাঙ্ক্ষিত এই চির নিদ্রার ছবি সাহিত্যে প্রচুর দেখতে পাই। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথের " কঙ্কাল" গল্পটি। বিধবা কুসুম তার অপূর্ণ ভালবাসার ব্যর্থতায় খুঁজে নেয় চির ঘুমের পথ - " •••••  বাঁশি বাজিতে লাগিল। আমি একটি বারানসী শাড়ি পরিলাম; যতগুলি গহনা সিন্দুকে তোলা ছিল সবগুলি বাহির করিয়া পরিলাম; সিঁথিতে বড়ো করিয়া সিঁদুর দিলাম।আমার সেই বকুলতলায় বিছানা পাতিলাম ।
বড়ো সুন্দর রাত্রি। ফুটফুটে জ্যোৎস্না। সুপ্ত জগতের ক্লান্তি হরণ করিয়া দক্ষিণে বাতাস বহিতেছে। জুই আর বেল ফুলের গন্ধে সমস্ত বাগান আমোদ করিয়াছে।
বাঁশির শব্দ যখন ক্রমে দূরে চলিয়া গেল, জ্যোৎস্না  যখন অন্ধকার হইয়া আসিতে লাগিল, এই তরুপল্লব এবং আকাশ এবং আজন্মকালের ঘরদুয়ার লইয়া পৃথিবী যখন আমার চারিদিক হইতে মায়ার মতো মিলাইয়া যাইতে লাগিল, তখন আমি নেত্র নিমীলন করিয়া হাসিলাম।" এভাবেই চির ঘুমে বিদায় নিয়েছিল কুসুম।
           শেষে বলি - এইভাবেই স্থায়ী বিষণ্ণতা থেকে আসে অবসাদ। অবসাদ থেকে মানুষের মধ্যে অনেক সময় আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। তখন কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয়।

     গদ্যকার সুমিতা চক্রবর্তী 
                     বেলুড়, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ














0 Comments