বিকাশ বরের অণুগল্প


যে ঘুমে স্বপ্ন নেই

গত একমাস ধরে এমনটা হচ্ছে। আগে কখনোও এরকম হয়েছে কিনা সুমন মনে করতে পারে না। নিজের অজান্তেই কথাগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে! কেউ ধরিয়ে দিলে তখন বুঝতে পারছে তার অকারণ বিড়বিড়ানিটা। মাথা গরম হলে কী এমনটা হয়!  ব্যাপারটা সুমনকে ভাবাচ্ছে। ক'একদিন হল বিড়বিড়ানিটা বেড়েছে।সকালে বাজারে বেরোনোর সময় পাগলামিটা আবার চেপে বসেছে। --"সব মরবে। কেউ বাঁচবে না। সব শেষ হয়ে যাবে। কেউ বাঁচবে না। সব মরবে---।" কমলা রান্নাঘরে বসে সব্জি কাটছিল। কথাগুলো তার কানে গেল। সে চিৎকার করে উঠল, " আবার শুরু করলে! কী সব আবোলতাবোল বকছ? পাগলামির একটা সীমা আছে। কী কী আনতে হবে সব মনে আছে তো!" সুমন কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।  একটু সংকোচও হয়। বলল,"সব মনে আছে। তোমাকে আর অত মনে করিয়ে দিতে হবে না।"কমলা আর কথা বাড়াল না। এসব কথা তুলে ব্যাপারটা সে আর জটিল করতে চায় না।গত চারমাস ধরে মানুষটা ঘরে বসে আছে। কাজের মানুষ নিষ্কম্মা হয়ে ঘরে বসে থাকলে এমনটাতো হওয়ার কথা!জমানো টাকা খরচ করতে করতে এখন ভাঁড়ার প্রায় শূন্য। ক'দিন পর সংসার হয়তো অচল হয়ে যাবে। ভাগ্যিস র‍্যাশনের চালটা আছে!  টুকাইয়ের স্কুলের মাইনে এমাসে দিতে হবে। হোমলোনের ই এম আই আছে--কার না মাথা খারাপ হয়! পুরুষ মানুষের পকেটে পয়সা না থাকলে মাথা খারাপ তো হবেই!
কমলার ভয় হয়,সুমন সত্যি,সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাতো!

চারমাস টানা লকডাউনে বাড়িতে বসে থেকে গত সপ্তাহে সুমন ডিউটিতে গিয়েছিল।লেকটাউন বাইপাসের কাছে একটা তিনতারা হোটেলের হাউসকিপার সে।হোটেল থেকে তাকে এখন কাজে যেতে নিষেধ ক‍রেছে।পুরোপুরি অপারেশনাল মোডে না এলে একরকম  হোটেলের সব কাজ বন্ধ।  মার্চমাসের পুরো বেতন পেয়েছিল সুমন। এপ্রিলে অনেক বলেকয়ে হাফ সেলারি পেয়েছিল। এ ক'মাস বেতনহীন। নো ওয়ার্ক, নো পে। কবে যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে!  সুমন ভেতরে ভেতরে ছটপট করতে থাকে।  কবে যে আবার কাজ শুরু হবে সে আন্দাজ করতে পারে না।  মাস্কের মধ‍্যে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। মাথার মধ্যে বিড়বিড়ানির পোকাটা আবার কিলবিল করছে।"সব মরবে,সব শেষ হয়ে যাবে---"
সুমন বাজারে ঢুকে কিছুই মনে করতে পারে না। তার হঠাৎ মনে হল সে শুধু শুধু বাজারে ঘুরছে কেন!

সন্ধ্যায় হোটেলের কেয়ারটেকার অতনুদার ফোন পেল সুমন। ধক্ করে বুকটা নেচে উঠল। শরীরটা একটু টালিয়ে গেল যেন। চাকরিটা আছে তো!  ফোনের ও প্রান্ত থেকে আশার বাণী ভেসে এল--" কোম্পানি সপ্তাহে তিনদিন কাজের রোস্টার করেছে।  নেক্সট উইক থেকে চলে এস।  নো ওয়ার্ক নো পে পলিসিতে কাজ হবে।"  সুমন হাতে চাঁদ পেল যেন।  "যাই হোক না কেন, নেইমামার থেকে কানামামা ভাল।" সুমন মনে মনে বিড়বিড়িয়ে ওঠে।

গত একমাস ভালকরে ঘুমোতে পারেনি সুমন। মাথার মধ্যে সবসময় ঝিঁঝিঁপোকা বিকট চিৎকার করে ডেকে চলেছে।  রাতে শোবার সময় আওয়াজটা আরো বেড়ে যায়। শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করে কখন ঝুপ ক‍রে ঘুমটা নামবে।  ঘুমের বুড়ী ডানায় ভর ক‍রে নামে না।  নেমে আসে অজস্র চিন্তার জট। সুমন অন্ধকারে চোখ জ্বেলে শুয়ে থাকে। চিন্তাগুলো সুতোর মত সুক্ষ শরীরে ঘরময় ছড়িয়ে যায়। গিট পাকাতে পাকাতে জাল তৈরি করে ঘরের সিলিং, জানালা, দরজা--সর্বত্র! অস্থির সুমন এক এক করে জালের ফাঁস খুলতে মরিয়া চেষ্টা করে--। তারপর ঝুপ করে অন্ধকার গাঢ় হয়। শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। প্রশান্তির ঘুম। তখন সে আর সুতোর জালটা দেখতে পায় না। রোজ, রোজ এভাবেই--

আজ সুখবরটা পাওয়ার পর অনেক হাল্কা লাগছে।  ভারী মাথাটা অনেকটা হাল্কা হয়ে গেছে। আজ সে একটু ঘুমোবে। কতদিন ভাল করে ঘুম হয়নি তার।  রাতে ঘুমোতে গিয়ে দেখল সাদা সুতো হাওয়ায় ভাসছে।  সুমন জানে একটু পরে সুতোগুলো গিট পাকাতে শুরু করবে। তারপর দুর্ভেদ্য জাল তৈরি হবে।  সে সুতোগুলো দু'হাতদিয়ে প্রাণপণে কাটতে শুরু করে। আজ সে কিছুতেই জাল তৈরি হতে দেবে না।  ঘুমটা এসে গেলেই সব জাল নিমিষে মিলিয়ে যাবে। সুমন জেনে গেছে সব দুশ্চিন্তার নিরসন ঘুমের মধ্যে।  এক পরম প্রশান্তি লুকিয়ে আছে গভীর ঘুমে। তার যত বিড়বিড়ানি, যত বিষাদ এই ঘুমেই মিলিয়ে যায়। সুমন বুক ভরে শ্বাস নেয়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে শরীর নিংড়ে।  আজ সে ঘুমোতে চায়। প্রশান্তির ঘুম। যেখানে থাকবেনা দুশ্চিন্তার সুতো, দুর্ভেদ্য জাল আর তার অজান্তে বেড়ে ওঠা বিড়বিড়ানি।সুমন আজ ঘুমোবে।যে ঘুমে কোনো স্বপ্ন নেই।

     গল্পকার বিকাশ বর
সিঁথি (দমদম), রায়পাড়া বাইলেন, কলকাতা
















0 Comments