প্রনব রুদ্র'র ছোটগল্প


স্মৃতিচারণে বা স্মৃতির চরণে

এবারে কিছু বলবেন আমাদের স্কুলের প্রিয় প্রবীণ শিক্ষক, সমরেশবাবু।

                মাইকে ঘোষণ হতেই সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং সহকর্মীরা হাততালির মাধ্যমে স্বাগত জানালেন। এরই মধ্যে পাঞ্জাবী ধূতি পরিহিত একজন সৌম্যদর্শন পুরুষ ধীর পায়ে মাউথপিচের দিকে এগিয়ে এলেন।

              পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে চশমা ঠিক করে শান্ত গলায় বললেন- আজ ৫ই সেপ্টেম্বর, বিশেষ দিন। সে বিষয়ে প্রিয় ছাত্রছাত্রীসহ সবাই অনেক কথা শুনলে। আজ আমার জীবনেরও বিশেষ একটি দিন। শিক্ষকতা জীবনের শেষদিন, আজ। এখানের প্রায় সবাই জানো সে কথা। যে কথা জানো না, যে কথা আগে কোনদিন বলিনি, আজ সে কথা বলবো ভাবছি। কার প্রেরণায় এ পেশায় এলাম বা আমাদের সময়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এসব নিয়ে অল্পকিছু কথা। তবে সবই তো সময়ের স্রোতে পরিবর্তনশীল। সেদিনের অনেক কিছুই আজ পরম্পরাগতভাবে তেমন আর প্রচলিত নেই। আর নতুন এলে তো পুরাতনকে জায়গা ছেড়ে দিতেই হয়, এ আর কে না জানে! এটাই প্রকৃতিগত সত্য। যা হোক।

             ছোটবেলায় যাঁর কাছে আমার হাতেখড়ি, আমার শৈশবের শিক্ষক, তিনি হলেন শ্রদ্ধেয় শ্রী বঁরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ডাকনাম ছিলো লালু। মজার ব্যাপার যেটা, বড়ো হয়ে জানতে পারি। উনার কাছে আমার বাবা, মাও পড়েছেন। আমার দুই দাদুর বাড়ী পাশাপাশি গ্রামে, পাশাপাশিই ছিলো। মাঝখানে ছিলো শুধু একটা নদী। মাষ্টারমশাই খুব কম বয়েস থেকেই পড়াতেন বলে শুনেছি। পরর্বতীতে আমি ও আমার একমাত্র ছোট ভাইও তাঁর কাছেই পড়ি। ৫/৬ মাইল সাইকেল চালিয়ে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা প্রতিদিন দু'বেলা আসতেন পড়াতে। একটা ব্যাচ করে কারো বাড়ীর উঠানে বা বারান্দায় চেয়ারে বসতেন আর আমরা বসতাম মাটিতে মাদুর পেতে। সাপ্তাহিক ছুটি বলে কিছু ছিলো না। তবে সপ্তাহে একটা দিন শুধু একবেলা আসতেন। ওই একদিনই ছিলো আমাদের কাছে যা আনন্দের সোনার হরিণসম। তবে অন্য একটা সুবিধা ছিলো এই যে, কেউ যদি একবেলাতেই সব পড়া দিয়ে দিতে পারতো তবে তাকে আর বিকেলে পড়তে আসতে হতো না। আমার কপালে তেমন সুযোগ কোনদিন হয়নি বটে। তবে বিকেলে তাড়াতাড়ি পড়া দিয়ে সন্ধ্যার আগে অনেক দিন ছুটি পেয়েছি। মাঠেঘাটে ফুটবল, আর থাক্ ওসব খেলার নাম আর বলছি না, তোমরা অনেকই হয়তো নামই শুনোনি তার বা শুনলেও খেলার নিয়ম জানো না, ওসব খেলার সময়টাও পেয়েছি। সকালে উনার কাছে পড়ে বাড়ী এসে স্নান, খেয়ে স্কুল যেতাম আর ফিরে এসে বেশিরভাগ দিনই দেখতাম উনি চলে এসেছেন। সে সময় খুব রাগ হতো। ভাবতাম ভগবান কেন উনার অসুখ বিসুখ দ্যান না! নিদেনপক্ষে সাইকেলটা তো লিক্ হতে পারে! যাতে দু'চারদিন পড়তে না হয়! সে আশায় হতো সর্বদাই গুড়েবালি। বর্ষাকালে গ্রামের কাঁচারাস্তায় খুব কাদা হয়ে যেত। তখন সাইকেল চালানো যেতো না, তবু উনি ছুটি দিতেন না। ছাতা মাথায় দিয়ে পাজামা গুটিয়ে, যাওয়া আসা মিলে প্রায় ১০/১২ মাইল হেঁটে আসতেন। উনাকে সর্বদাই সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা ঢোল্লা পাজামায় দেখেছি। আজকে যখন নিজে স্কুলে আসার কথা ভাবি তখন উনার অমন, কি বলি, পাগলামি, জেদ বা ভালোবাসার কথা মনে হতেই শ্রদ্ধায়, সন্মানে মাথা নত হয়ে যায়। নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা বাড়ে। অবশ্য আগামীকাল থেকে আমার ছুটি আর আসতে হবে না, তোমাদেরও আর আমার বকাঝকা শুনতে হবে না। একটু থামলেন। একটা ঢোক গিললেন মনে হলো। চশমা খুলে রুমালে মুছে নিলেন। তারপর আবার শুরু করলেন।
              যা বলছিলাম, সে সময়ে কম্পিউটার বা জেরক্স মেশিন আমাদের গ্রামে ছিলো না বলে, মাষ্টারমশাই নিজহাতে লিখে বার্ষিক পরীক্ষার আগে মডেল প্রশ্নপত্র বানাতেন। চমৎকার ছিলো হাতের লেখা। দোয়াত কলমে লিখতেন। আমরা প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী একটা করে "তা" দিতাম। "তা" মানে হলো বড়ো পাতা। বর্তমানে জেরক্স পেপার এ ফোর সাইজের চারটে মিলেও বোধ হয় একটু ছোটই হবে "তা" থেকে। উনি ব্রাহ্মণ ছিলেন তথাপি কোন কুসংস্কার ছিলো না। সবার হাতেই জল খেতেন। বসার চেয়ারের পাশে গ্লাস থাকতো। মাঝেমাঝে উনি কারো নাম ধরে বলতেন যাতো রে হাতের কাজটা করে আয়। উনার এই কথার  মানে আমরা বুঝে যেতাম। মানে ছিলো গ্লাস নিয়ে টিপকল থেকে ঠান্ডা জল এনে দিতে হবে। যে কথাটা না বললে হবেই না আসল কথা বলা, তা হলো উনার মারের কথা। যে একবার খেয়েছে সে সারা জীবন ভুলবে না। এবং যারা পড়েছে সবাই অমন মার খেয়েছে। আমার বাবা মাও খেয়েছে পরে শুনেছি উনাদের মুখে। আর আমার ভাইকে তো দেখেছি মার খাবার ভয়ে বারবার বাড়ী চলে আসতো জল খাবার বা টয়লেটের নাম করে, হে হে হে। কান মুলে, চুল টেনে, চিপ ধরে, পিঠের উপর একটা রাম চাপড় দিতেন আর সেটা চেএএপে রাখতেন। আহঃ এখনই যেন খেলাম একটা! যদিও আজ আর সেই মারের ব্যথা মনে লাগেনা তবে ওই সব ধরণগুলো মনে হলে হাসি লাগে, তখন তো কান্না পেতো, রাগ হতো। আজ বুঝি তখন তা কতোটা জরুরী ছিলো! ওসব পেয়েছিলাম বলেই না আজ এতোটা বছর করে কম্মে খেলো এই কালু। যাহ্, বলেই দিলাম। আমার ডাক নাম ছিলো ওটা। বড়ো হয়ে আর কেউ কোনদিন ওই নামে ডাকেনি। কতোবার শুনতে ইচ্ছে হয়েছে ওই নাম!
                   বার্ষিক পরীক্ষার আগে হতো আরো বিপত্তি! তখন থাকতো মারের জন্য কঞ্চি। বেশিরভাগ বাবা মা-ই এসে বলে যেতেন, সবার সামনেই বলতেন, চামড়া-মাংস আপনার শুধু হাড়গুলো বাড়ী পাঠালেই হবে মাষ্টারমশাই। এমন কথা শোনার পর পড়াশোনা হবে না মানে! তড়তড়িয়ে সবারই কমবেশি ফল ভালো হতো। আমার এই দীর্ঘ কর্মজীবনে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র অভিভাবক পেয়েছি যাঁরা এমন কথা বর্তমানেও বলেছেন। আসলে আমরাও তো মানুষ। ছাত্রছাত্রীদের ভালোই তো আমাদের একমাত্র কাম্য। কোন শিক্ষক কোন ছাত্রের খারাপ কখনোই চান না। তবে হ্যাঁ অনেক সময় ছাত্রের দুষ্টুমিতে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখনও যাতে অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে তার আত্মশিক্ষা সংযম নিয়েই তো এই পেশায় আসা। তবে আমাদের মাষ্টারমশাইদের মতো এখনকার শিক্ষকরা "পিটন" দিলে, বর্তমানে শিক্ষকের চাকরী তো যাবেই সাথে বোনাস হিসেবে জেলও হবে, নিশ্চিত! কতো কথা মনে পড়ছে আজ। মনে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা বলে যাই উনাকে নিয়ে, উনার ওই সময়েও অমন দূরদর্শী সব ভাবনার প্রয়োগ নিয়ে। পরে জেনেছি খুব যে বেতন পেতেন, তা নয়। গ্রামের ব্যাপার ছিলো, যে যেমন পারতেন দিতেন। পাশাপাশি উনি পুরোহিতও ছিলেন। পুজাঅর্চনা করতেন। তা দিয়েও হয়তো তাঁর সংসার চলতো। তবে কাজটাকে যে ভীষণ ভালোবাসতেন সেটা এখন নিজে শিক্ষক হয়ে বুঝি। এটা আসলে একটা নেশা।
                    বড়ো হয়ে যখন গ্রামে যেতাম, তখনো দেখা হলে স্যারকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতাম। গ্রামের অনেকেই তখন প্রতিষ্ঠিত। এবং যারা উনার কাছে পড়েছে গ্রামে এলেই খোঁজ নিতো স্যারের। সবাইকে স্যার একবারে চিনতে পারতেন না, তবে বাবার নাম, বাড়ী কোথায় বললে কিছুটা হয়তো মনে পড়তো। কথার প্রসঙ্গে উনি মারের কথা বলতেন, মনে হতো যেন অপরাধে ভুগচ্ছেন। আমরা বলতাম, স্যার ওটা পেয়েছিলাম বলেই তো আজ জীবনে কিছু হতে পেরেছি। শুনে যেন বড়ো তৃপ্তি পেতেন। একটা গর্বিত মুখ আমরা দেখতাম। একটা আশ্চর্য আভা যেন তা থেকে বের হতো! 
                      অবশ্য ছোটোবেলায় যখন আমরা স্কুলের গন্ডি পার করিনি তখনো রাস্তাঘাটে, যে শিক্ষকের সাথেই দেখা হতো যদি সাইকলেও থাকতাম তা থেকে নেমে নমস্কার, আদাব দিতাম আর ওই রাস্তাটুকু হেঁটে পার হতাম। আমাদের সময় যে সবই ভালো ছিলো তা নয়। বদমাসী কি ছিলো না? ছিলো। অনেকেই দেখতাম স্যার আসছে দেখলে দূর থেকেই অন্য পথ ধরে নিতো। শ্রদ্ধেয় লালুস্যারকেও দেরী করে পড়া দিতো। জানতো সন্ধ্যা হলে অন্ধকার নামলে উনি এমনিই ছেড়ে দেবেন বাড়ী যাবার জন্য। আর সকালে স্কুলের আগেও ছেড়ে দিতেন। অবশ্য উনিও চালাক ছিলেন কাউকে কাউকে ছাড়তেন একেবারে সবার শেষে বা সাথে করে বাড়ী রেখে বাবা মাকে পড়া ফাঁকির কথা বলেও আসতেন। সেই দু'একজনার ওষুধে বাকীদেরও কাজ হয়ে যেতে। চালাকী বন্ধ হতো। এর মধ্য আমরা ক'জন ভয়েটয়ে তাড়াতাড়ি পড়া দিয়ে বিকেলে খেলার সময় বের করে নিতাম। তারপরও কতো রকমের মার খেয়েছি- নীলডাউন, মুরগি হওয়া, আঙুলে কলমের চাপ, একহাতে কান ধরে নীলডাউন নীচে কখনো কখনো ছোট পাথরের টুকরো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়া মুখস্ত করে না দেওয়া পর্যন্ত চলতো আরো কতো রকম শাস্তি! থাক্ আর বলবো না। আজ যেন মনের বাঁধ ভেঙ্গেছে। থামতেই চাইছে না। শেষকথাটুকু বলে শেষ করছি। যেখানেই আছেন গুরুদের প্রণাম নেবেন। হয়তো খুব শীঘ্রই আপনার সাথে দেখা হবে। তখন এসময়ের অনেক গল্প ওপরে বসে আপনাকে শোনাবো, আপনি হয়তো বিশ্বাসই করবেন না! এতোটুকু বলে আরো একবার চশমা খুলে রুমালে মুছলেন। তারপর ধরাগলায় বললেন, প্রিয় ছাত্রছাত্রী সবাই মন দিয়ে পড়াশোনা কোরো। বাবা মা, গুরুজনদের সন্মান কোরো। ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুন। বলেই সমরেশবাবু নিজের চেয়ারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন।

                    তখনো আমাদের উনার মুখ থেকে আরো অনেক অনেক কথা শুনতে ইচ্ছে করছিলো। এরমধ্যেই হাততালির শব্দ ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।  আমরা কেউ কেউ ভাবতে লাগলাম, স্কুলের শিক্ষকতা জীবনের শেষ ভাষণে উনি কোন্ আলো জ্বালাতে চাইলেন!

গল্পকার প্রনব রুদ্র
বিবেকানন্দপল্লী (পালমাঠ),গাজোল, মালদা
























0 Comments