সুনন্দ মণ্ডলের অণুগল্প



আদর্শ শিক্ষক

সুবল বাবুর টানাটানির সংসার। একই বাড়িতে চারজনকে পড়িয়ে মোটে হাজার চারেক মাইনে পান মাস গেলে। আরও দু'একটা মিলিয়ে মোট সাতহাজার মতো রোজগার করেন এই বয়সেও। রাশভারী চেহারার লোক। আজকালকার ছেলেমেয়েরা উনার কাছে পড়তেই চায় না! তবে এককালে অনেক ছাত্রছাত্রী পিটিয়ে মানুষ করেছেন। ওদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষক, ডাক্তার, উকিল। 
            ‎সুবল বাবু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন। তবুও তাঁর শিক্ষার দাপটে অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু এখনকার যে কজন ছেলেমেয়ে পড়ে তারা কোনরকমে ফেল করতে করতে পাশ করে যায়। এই মাষ্টারমশাই ভালো পড়াতে পারেন না, ছেলেমেয়েরা ভালো ফল করতে পারে না, তাই অনেকসময় অভিভাবকদের কাছে কটুকথাও শুনতে হয়।
            ‎একদিন তো এক অভিভাবক বললেন, "মাষ্টারমশাই, এবারে তিন্নি ভালো রেজাল্ট করতে না পারলে, আপনি আউট! আমরা অন্য মাষ্টার দেব।" মাষ্টারমশাই কষ্ট পেলেন সে কথায়। চুপ থাকলেন। বাড়ি ফিরে অনেক ভাবলেন। তারপরের দিন পড়াতে গিয়ে বললেন, "আমার শরীরটা ভেঙেছে, আর হয়তো পড়াতে আসতে পারব না। তোমরা অন্য শিক্ষক খুঁজে নাও।"
            ‎ছেলেমেয়েরা এই মাষ্টারমশাইকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। তাই কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আমরা আপনার কাছেই পড়তে চায়, মাষ্টারমশাই।" ওদের কান্নায় ভিজে গেল মাষ্টারমশায়ের হৃদয়। কারণ দীর্ঘ সাতবছর ধরে পড়াতে পড়াতে ভালোবেসে ফেলেছিলেন ওদের। অনেকটা আপন করে নিয়েছিলেন। নিজের নাতি-নাতনিরা অনেক দূরে থাকে, এদের মাঝে ওদেরকে খুঁজতেন। তাই আরও কিছুদিন পড়ালেন। পরীক্ষা হয়ে গেল। তারপর কিছুদিনের ছুটি। মাষ্টারমশাই তখন বেশ অসুস্থ। 
            ‎একদিন হঠাৎ তিন্নির বাবা মাষ্টারমশায়ের বাড়ি হাজির। বললেন, "তিন্নি এবারেও ভালো রেজাল্ট পাইনি। এখন বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?" মাষ্টারমশাই বললেন, "আসলে তিন্নির পড়ায় আগ্রহ নেই। অনেকদিন পড়াচ্ছি, দেখেছি ও ছবি আঁকতে ভালোবাসে। আপনাকে আগেও বলেছি। কোনোদিন শোনেননি আমার কথা। তাছাড়া অন্য তিনজনকে দেখুন, ওরা তো ভালোই ফল পেয়েছে।" "আমি জানি, ওরা ভালো ফল করতই। আর তিন্নির জন্যই আমি আপনাকে রেখেছি, আপনাকে আর পড়াতে যেতে হবে না মাষ্টারমশাই।", এই বলে অনেক রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন তিন্নির বাবা।
            ‎নতুন বছর, নতুন শ্রেণী পেয়ে খুশি চারজনই। কিন্তু নতুন শিক্ষক! মানতে পারল না তিন্নি। যত দিন এগিয়ে যেতে থাকল, পড়াশোনার প্রতি নজরও হারিয়ে গেল তত তিন্নির। এমনকি পরের বছর তিন্নির পাশাপাশি অন্য তিনজনও খারাপ রেজাল্ট করল। কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলল, "আমরা সুবল স্যারের কাছেই পড়তে চায়! এই স্যার খুব মারে, পড়া ভালো করে বোঝায় না, শুধু ফোনে পাবজি খেলে, আমাদের সব পড়া মুখস্থ করতে বলে।"
            ‎এতসব শুনে মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা তিন্নির বাবার। মাসের শেষে আগের মাষ্টারমশায়ের চেয়ে দু'হাজার বেশি দিতেন। কিন্তু তার ফল এই! ছিঃ, মুখ দেখাবো কী করে? চার চারটে সন্তানের বাবা হয়েও একজনকে ভালোভাবে শিক্ষিত করতে পারব না? এই সমাজে মানটা থাকল কোথায়! তিনি বুঝতে পারলেন, সুবল বাবুই এদের জন্য আদর্শ শিক্ষক। তখন ছুটলেন পুরোনো মাষ্টারমশায়ের বাড়ি। গিয়ে দেখলেন, এক মস্ত তালা ঝোলানো দরজায়। পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকটির মারফত জানলেন, গতবছর যেদিন তিনি এসেছিলেন মাষ্টারমশায়ের বাড়ি, তার পরদিনই ভোরে কাশীর উদ্দেশ্য যাত্রা করেছেন সুবল বাবু। তারপর হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন তিন্নির বাবা।

          গল্পকার সুনন্দ মণ্ডল 
কাঠিয়া, মুরারই, বীরভূম





























0 Comments