স্বপঞ্জয় চৌধুরীর মুক্তগদ্য



প্রিয় শিক্ষাগুরুর করকমলে 

জন্ম থেকে মৃত্যু অবদি আমরা একটা শিক্ষার জালের ভেতর দিয়ে আবর্তিত হচ্ছি। আমাদের শিক্ষক মা, বাবা, ভাই,বোন, আত্মীয় পরিজন কিংবা প্রকৃতি। সব শিক্ষার উর্ধ্বে থাকে শিক্ষাগুরুর শিক্ষা। জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক অনেক শিক্ষককে আমি পেয়েছি। আমার আজকের এই পথচলা, চিন্তা, চেতনা সবকিছুর মূলে রয়েছে এক একজন শিক্ষক। অবচেতন মনে শিক্ষককে বসিয়ে দিয়েছি সুপার হিরোর আসনে। তাদের কথাবলা, হাঁটাচলা, ব্যক্তিত্ব সবকিছুই আমার শিশুমনে দাগ কেটেছে। তাদের হাতের লেখার স্টাইল, পড়ার স্টাইল, তাদের পেশার প্রতি একাগ্রতা আমাকে শিক্ষক হতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

প্রিয় শিক্ষকের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় আমার স্কুলজীবনের বেশকিছু শিক্ষকের নাম। কারো নাম বাদ দিলে নিজের কাছে অপরাধ বোধ হবে। প্রথমেই বলতে হয় কমল বাবু স্যারের কথা স্যারের ব্যক্তিত্ব আমাকে ভাবাতো। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। ক্লাসে মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলতেন। আমাকে শাসন করতেন যেমন ঠিক স্নেহও করতেন। আমার হাতের লেখা খারাপ থাকার দরুন আমাকে একবার খুব বেত্রাঘাত করলেন এবং বললেন আমি তোকে এক সপ্তাহ সময় দিলাম এরমধ্যে হাতের লেখা সুন্দর করে আনবি। আমি দিন রাত লিখেতে লিখতে আমার হাতের লেখা সুন্দর করতে সমর্থ হই। মোদাচ্ছির স্যারের ইংলিশ গ্রামার শেখানোটা আমার মাথায় আজও ঢুকে আছে। তার সাথে এখনও মাঝে মাঝে দেখা হয়। ঠিক আগের মতো চাপদাড়ি ভর্তি মুখের ভেতর থেকে তার শুভ্র হাসি দেখতে পাই। খুবই অমায়িক অনেক বছর পর দেখা হলো চুল কাটার সেলুনে আমি দেখেই চিনে ফেলি স্যারকে কদমবুছি করি। অবাক হলেন আমার বিনয়ী ভাব দেখে। বললেন এ যুগে এমন ছেলেও আছে শিক্ষককে দেখে এভাবে সম্মান করে। আমি হেসে বললাম কাদের ছাত্র স্যার দেখতে হবে। স্যার হো হো করে হেসে উঠেলেন। আমি নিজেও শিক্ষক হয়েছি শুনে খুব খুশি হলেন। তাজরিয়া ম্যাডাম বাংলা পড়াতেন। খুবই কোমল তার মন। খেপে গেলে খুব মারতেন। তারপরও তার প্রতি রাগ হইনি কখনো। স্কুল থেকে বিদায় নেয়া আগে আমাকে বলেছিলেন- একদিন তুমি হোমওয়ার্ক করনি তাই তোমাকে মেরেছিলাম। তুমি কী খুব ব্যথা পেয়েছিলে এ কথা বলেই তার চোখদুটো ছল ছল হয়ে উঠলো। আমার চোখেও মনের অজান্তে জল চলে আসলো। আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হলো। আমি চাপা কণ্ঠে বললাম। শিক্ষকতো মা কিংবা বাবার মতো তার আঘাত আমার জন্য আশির্বাদ। উনি এরপর সত্যিই কেঁদে দিয়েছিলেন। আমি সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনা।

ঢাকা কলেজে  হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর পেলাম একজন সাদা মনের শিক্ষককে যার সাথে আজও আমার যোগাযোগ আছে। দীপক কুমার নাগ স্যার। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তিনিই। তার ব্যক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করে। ছাত্রদেরকে খুব সহজেই আপন করে নেয়ার ক্ষমতাটা তার মধ্যে ছিল আজও আছে। কোন সমস্যা হলে এখনও স্যারকে ফোন দেই। যত ব্যস্তই থাকুক না কেন আমার প্রশ্নের উত্তর দেন ধৈর্য্য নিয়ে। স্যারের  একটি কথা কানে বাজে সবসময় ভালো থেকো বৎস। প্রতিটি শিক্ষকের শিক্ষা আমার জীবনে পাথেয় হয়ে থাকবে। এরই মাঝে অনেক শিক্ষককে হারিয়েছি। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

শিক্ষক শুধু শিক্ষক নয় মা, বাবা কিংবা ভগবানের মতো। তাদের আদর্শই একজন ছাত্রকে ভবিষ্যত জীবনে সুতিকাগার গড়ে দেয়। একজন ভালো শিক্ষক একটি লাইব্রেরির সমান কিংবা তার কাছে আছে স্বর্গ লাভের গোপন মন্ত্র।

    গদ্যকার স্বপঞ্জয় চৌধুরী     
ঢাকা, বাংলাদেশ





















0 Comments