
দ্বিতীয় জন্মের অধিশ্বরী
আঁতুড়ঘরের জন্মের ভেতর বেড়ে ওঠে আর একটা জন্ম চারাগাছের মতো ধীরে ধীরে।সে জন্মের মাটি হয়ে কোল পেতেছ তুমি---একটা লালপেড়ে শাড়ী,শাঁখা-পলা হাত আর সূর্যসিঁদুর টিপ।নিরন্তর তোমার প্রাণরসে আমার বেড়ে ওঠা---শরীরে,মনে।ভাত ফোটার গন্ধে নবান্নের মমতা,বৃষ্টির নুপূরে জলের বহমানতা আর উনুনের গনগনে আগুনে শক্তির নিত্যতা সূত্র তুমিই শিখিয়েছিলে আমায় হাতে ধরে।তোমার কাছেই শিখেছি কিভাবে একটা আস্ত নদী হয়ে ওঠে খোলা বই আর সোনালী বালির তীর হয়ে ওঠে ভাঙা শ্লেট।মনকে চকখড়ি করে আমার ছোট্ট হাত ধরে দাগা বুলাতে তুমি--অ,আ,ই,ঈ--আমি অবাক হয়ে দেখতাম, কিভাবে বর্ণমালাও ঈশ্বর হয়ে যায় ভোরের আলোয়।আকাশের কাছে উদারতা,কোমল ঘাসের কাছে তিতিক্ষা আর বাজ পড়া গাছের কাছে সহিষ্ণুতার শিক্ষাও তোমারই হাত ধরে।সূর্যস্তবের আলোয় চেয়ে নেওয়া তেজের উত্তাপকে চাঁদজলের স্নিগ্ধ ভালবাসায় প্রশমিত করার কৌশলও তোমারই কাছে শেখা।আশীর্বাদী ফুল-বেলপাতা আর ধান-দুব্বোর মাঙ্গলিক হলুদে তুমিই রাঙিয়ে দিয়েছিলে আমার মনের সবকটি সহজ সুতো।
তাই এখনও মনের একতারায় লালন গান,এখনও চোখের নরম মায়ায় শুকতারা হয়ে জেগে থাকে দিনরাত।আমি রোজ নিজেকে কাঠ করে পোড়াই উনুনের আগুনে,আবার ফুল কুড়িয়ে অঞ্জলি দিই কথামৃতের পাতায়।বুকের বেদনকে আগুন করে জ্বেলে দিই ছোট্ট প্রদীপের ঘিয়ের দহনে।
তুমি বার বার বলতে নিজেকে গাছ করে তোলার কথা।নিজেকে গাছ করে তুলতে পারি নি এখনও।তবে জল আর মাটি হয়ে ধারণ করে আছি একটা ছোট্ট ফুলবাগান।রোজ জল দেই,মাটি খুঁড়ি,আগাছা তুলি খুঁটে খুঁটে।বাগানটা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে প্রায় ঋতুতে।ফুল হাতে তোমার কথা ভাবি আমি একমনে।অবাক হয়ে দেখি,কখন যেন তুমি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে গেছ আকাশ-মাটি-জল আর শিকড়ের একান্ত গভীরতায়।দুচোখের মন্দাকিনীতে ডুবস্নান সেরে ভিজে কাপড়ে ফুল হাতে বন্দনা করে চলি আমার দ্বিতীয় জন্মের অধিশ্বরীকে অপার্থিব পবিত্রতায়।



0 Comments