সুকুমার হালদারের খোলা চিঠি



ভুলে থাকা ছায়াপথ 

সুপ্রিয় পাগলু,

আজ বিকালে তোর চিঠি পেলাম।এখন মধ্যরাত।তোর চিঠি নিয়ে বসেছি।ঘুমের নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে বিকট নাক ডাকার আওয়াজ।যার সংগে থাকতে বাধ্য হয়েছি তার।এ কিন্তু যা তা নাসিকা গর্জন নয়,এ করপোরেট নাসিকা গর্জন ! তারপর তোর খবর কি ? আবার চিঠি লিখেছিস।কি দরকার বল। দু-চারটে কবিতার লাইন লিখে পোষ্ট করে দিয়েছিস ! আচ্ছা যাকগে বল তুই কি পেলি ? তোর হৃদয় খোঁড়া চলছে? তারপর পেলি কি? তোর নারী। তুই বলেছিলিস, সঠিক নারী পেলে তোর নাড়ি সঞ্চালনের স্থিতিস্থাপকতা চলে আসবে।হ্যাঁরে এখন নাড়ি সঞ্চালন বৃদ্ধি হলেও কি মায়ের কথা মনে পড়ে? যে মা তোকে বলেছিল সঠিক নারী খোঁজা মানে ইলিউশনের মধ্যে থাকা।যেটা পাবি সেটাকে সঠিক বলে মনে করবি,তাহলে আর কোনো গোল থাকবে না খোকা।আসলে তোকে আমি বলেছিলাম রিয়েলিটি এবং ইলিউশন নিয়ে মানুষ থাকে।ইলিউশনের মাত্রা বেশি সাইকোলজিস্টদের মাথা ব্যাথার কারণ।তোকে বলেছিলাম -"ম্যান এন্ড হিস সিম্বলস" যেটা ইয়ুঙ স্বপ্ন প্রতীক হিসাবে বঙ্গানুবাদ করেছিল পড়ে নিতে।স্রেফ পাত্তা দিলি না।বললি স্বপ্ন আপনা থেকে আসে না।স্বপ্ন বুনতে হয়।তা শেষ পর্যন্ত কি হল আমার হাঁদুরাম।যে স্বপ্ন বুনেছিলি তারা সব বড় হয়েছে !

হনুমানের মত আত্মজ্ঞানী হয়ে সমুদ্র পার হবি বলেছিলি।পারলি ? সামনের ডোবাটা পার হতে পেরেছিস ? পারিসনি। কারণ কালী সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।এটা তো নতুন কথা নয়।রামকৃষ্ণ বলে ছিল-"কালী পথ না ছাড়লে ব্রম্ভজ্ঞান সম্ভব নয়।"এবার মানবি তো।স্বপ্নের পরিবর্তন ঘটে।উপায় থাকে না।কিরে হাঁদুরাম, ঘাবড়ে যাচ্ছিস না তো আমার মতো অতি রিয়েলিটিতে বিশ্বাসীর মুখ থেকে ভাবগম্ভীর কথা শুনে। আরে বাবা সংসারে সত্যিটাই আসল,তাছাড়া আর কিছু নেই।যাকগে তোর সেই স্লিপিং ডিসওর্ডার এর মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করে ভেদ বুদ্ধির লোকদের চিবিয়ে খাবার ব্যাপারটা কি কমেছে না এখনও চালিয়ে যাচ্ছিস।আর শোন না ,আচ্ছা এখনও কি মাঠের মাঝে একা হাঁ করে আকাশ দেখিস আর কাঁদিস ! তোর আর সঠিক নারী পাওয়া হল না।শোন ,মেঘের কোলে যে রৌদ্রছায়া খেলা করে সেটা ইমেজ দিয়ে ইমেজ প্রতিষ্ঠা ওহ,সরি! আবার সেই ভাবগম্ভীরে চলে যাচ্ছি।আসলে জানিস তো হাঁদুরাম গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও নদী আর মা'র বোধ থাকবে।এটা তো সত্যদ্রষ্টারা মানবে।কবিরা সত্যদ্রষ্টা হয় জানি।তুই আসলে কি চাস নিজে জানিস না।তুই গোটা মানুষটা একটা ভুল।কেন লিখিস শালা...আমার ঘুম মাটি কেন করিস।কেন বল, কেন আমাকে 
জ্বালাস? আমি তো তোর সাথে ঘুমোতে চেয়েছিলাম।সে তো হল না।আরে হাঁদু সেই অর্থে সঠিক নারী বলতে নদী আর মা কে বোঝায়।কারণ এদের কোনো বিনাশ হয় না।কি দরকার ছিল বলতো ,কি দরকার! রিয়েলিটিকে সরিয়ে কলম বাগিয়ে বসে অন্ধ জাবর কাটার।এখনও কি শব্দ নিয়ে কাটা ছেঁড়া করছিস। হাসি পায়।শালা তোর কথাগুলো এখনও কানে বাজে।কবিতার মধ্যে আলো আছে।শব্দগুলো যখন খাতায় পর পর লিখি সারা খাতা আলো হয়ে ওঠে।কবিতা তোকে ঘুম পাড়ায়।উঃ হাঁদু, আমার মিষ্টি হাঁদু।তোর কবিতার সেই লাইনটা এখনো মনে আছে-"প্রতিটি মৃতদেহ থেকে আলো বের হয়।" ছাড় কিছু মনে করিস না,তোর ইলিউশনের পিছনে একটু চিমটি কাটলাম বলে। 

অনেক চিমটি কাটাকাটি হল।এবার বল তোর আসল কাজটা কি আছে? ওহ তুইতো আবার ওটা কে আসল কাজ বলিস না ঠিক আছে বাবা বলি তোর চাকরিটা কি আছে? না ছেড়ে দিয়েছিস।কোনটা তে তোর দম বন্ধ হয় বুঝি না।একবার বলিস চাকরিতে,একবার বলিস এক নারীতে আটকে গেলে দম বন্ধ হয়ে মরবি।হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের বাড়িতে সব অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানো আছে! শালা! ফালতু বকছি।আরে বল চাকরিটা কি আছে? না চির ভিখারী কবিদের মতো হাত পেতে বেড়াচ্ছিস।একদিন বুঝবি,শালা একদিন ঠিক বুঝবি। ঐ হাতে শুধু অঙ্কের শূণ্য নামবে।গোটা হাতটা কাটা হাতের মতো রাস্তায় পড়ে ছটফট করতে করতে গোটা হাত ,তোর গোটা মুখ,তোর গোটা শরীরটা অন্ধকারে বিলীন হবে! আর ঐ অন্ধকার থেকে আলো আসবে না-যে আলো তুই দেখিস প্রতিটা মৃতের শরীরে,তা পাবি না।তোর সমস্ত কবিতাগুলো রাস্তা জ্যাম করে দাঁড়িয়ে দেখবে।একটাও কবিতা এগিয়ে আসবে না বাঁচাতে! কারণ কবিতারা জানে বিপদাপন্নভাবে মানুষ বাঁচে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ! শালা...!

যাকগে,বলি বটে চিঠি লিখিস না,কিন্তু মন বলে তোর চিঠি পেলে মন্দ লাগে না।হ্যাঁরে যা বলছিলাম।বলি যুগ যুগ ধরে ঝগড়া করে গেলি।একবার ভালো করে দেখলি না পর্যন্ত আমাকে।আর দেখ আমি তোর পাগলামো গুলো নিয়ে বেঁচে আছি।আমার আকাশ মসৃণ ছিলো।আর তোর আকাশ ঝাপসা ,ধোঁয়া ,ভিজে ভিজে।তুই বলতিস আমারটা মসৃণ তাই কর্মাশিয়াল আর তোরটা ফাইন আর্ট।আমি আজও বুঝলাম না, বুঝতে চাইও না।থাক তুই তোর মতো। হ্যাঁ শোন আমাকে কাটি করিস না।ও হ্যাঁ শোন বারবার ভুলে যাচ্ছি একটা কথা বলব ।শোন আমি না বছরে দুবার ওদের কাছে যেতাম।এখন বছরে চারবার যাই।বুঝলিতো ওরা অনেক বুড়ো হয়ে গেছে।ওদের গোড়ার মাটি অনেক আলগা হয়ে গেছে নোনা জোয়ারের ধাক্কায়।খুব কষ্টের কি জানিস হাঁদু ,ওরা না আমার জন্য একটাও পাতা ঝরায় না ! অথচ তোর মনে আছে আমরা প্রতি মাসে দুজনে যখন যেতাম ওদের কাছে।ঠিক দুজনের জন্য দুটো পাতা ঝরাতো।কোনো মাসে নিরাশ করে নি।মনে আছে দুটো পাতাতে আমরা টু লাইনার থ্রি লাইনার লিখে নদিতে ভাসিয়ে দিতাম।কষ্ট পাস না হাঁদু ,তোকে একটা খবর দিই । জানিস তো বুড়ো মারা গেছে ! ওর কেউ সৎকার করে নি ! গোটা শরীরটা নিয়ে ওখানেই পড়ে আছে।গাছ মরে গেলে সৎকার হয়না না! আসলে মানুষের সৎকারে গাছেদের লাগে।বুঝলি বুড়ি খুব আমার মতো একা হয়ে গেছে।তাই বছরে দুবারের বদলে এখন চারবার যাই।আর হ্যাঁ আমি কিন্তু এখনও এক বোতল বিয়ার  আর তোর প্রিয় এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে যাই।নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে চলে আসি। এসব অবশ্য আমার ড্রাইভারকে দিয়ে কেনাই।মজার ব্যাপার হল প্রথম প্রথম ড্রাইভার অবাক হতো।এখন ও জেনে গেছে ম্যাডাম বছরে চারবার নদীর ধারে বুড়ো বট গাছটার কাছে বিয়ার আর সিগারেট খায় আর খুব কাঁদে।হ্যাঁ বছরে চারবার আমার কাঁদবার দিন ! তবে হ্যাঁ এখনও যখন যাই তোর কবিতাটা জরে জোরে আওড়াই--

"অবশেষে দ্যাখা হল
ভাঙা সমুদ্র কিনারে
বালির বিছানায় একা জাগরী

সমুদ্রের এক একটা গর্জন
ছিঁড়ে দিচ্ছে সমস্ত জল
ভেঙে দিচ্ছে তোমার স্বপ্ন মিছিল
নোনা হাওয়ায় বুকের হাড় আর
চোখের পালক ক্ষয়ে যাচ্ছে।তবুও
হাসছো অপলোক !"

কবিতা শেষ করে বুড়িকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ কাঁদি।তোকে আর কি বলব বলতো।তোর কাছ থেকে কান্না শিখেছিলাম।তখন দুজনে একসঙ্গে কবিতাটা বলতাম।শেষ হলে তুই গাছ জড়িয়ে ধরে কাঁদতিস।প্রথম প্রথম বুঝতে পারতাম না।কেন গাছ জড়িয়ে কাঁদছিস।পরে আমিও কাঁদতাম না বুঝে,হয়ত কান্না সংক্রামক বলে।তারপর থেকে প্রতি মাসে ভাঙা নদীর ঘাটে বুড়বুড়িকে জড়িয়ে কান্নার সঙ্গী হলাম।
আমরা থাকতাম ডায়মন্ড হারবার শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে নদীর ভাঙা পাড়ে। তোর মনে পড়ছে নদীর উলটো দিকে হলদিয়ার তৈল শোধনাগারের আলো গুলো যখন জ্বলে উঠত।সেই আলো নদীতে পড়ে আমাদের বুড়োবুড়িকে আলো করত।আর ঐ আলো আঁধারির তলায় আমরা দুজন।কিন্তু অবাক কান্ড ! তুই কিন্তু একদিনও আমাকে জড়িয়ে ধরিস নি।ফাঁকা,নিরিবিলি আলো আঁধারি।আমিও পারি নি।এখন মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কেন পারিনি ! আসলে সাহস হয়নি।তোর ঐ অদ্ভুত শান্ত চোখ অথচ কেমন উদভ্রান্ত, চোখের দিকে তাকিয়ে পারিনি।কিন্তু তুইতো পারতিস হাঁদু। তাহলে আর করপোরেট নাসিকা গর্জনের কাছে ঘুমোতে হতোনা।অবশ্য তোর যা দাঁত কিড়মিড় ঘুমের মধ্যে । ও সর্‌ আমি না একেবারে যা তা।অনেক বকবক করলাম।শোন আমি কিন্তু তোর দেওয়া "পাগলী তোমার সঙ্গে ",আর  নীরা সিরিজ এগুলো এখনো আমার সাথে থাকে যখন বুড়বুড়ির কাছে যাই।মনে পড়ে সব, তুই ব্যাগ ভরে কবিতার বই আনতিস আর আমি তোর জন্য চুরি করে বিয়ার আর সিগারেট আনতাম।গিয়ে না বসতে বসতে তুই হাত বাড়িয়ে দিতিস।যাক অনেক হয়েছে।ভোর হয়ে এল।আমি কোনো উত্তর দিতে পারব না। চিঠি লিখিস না।তুই একটা হাঁদা,ইঁদুর,বাঁদর,চামচিকে,উচ্ছে পটল,বেগুন একেবারে যা তা।এটাই আমার শেষ গালি।তোকে না খুব মারতে ইচ্ছা করছে।তুই আগে একবারও বুঝতে পারলি না ! বিয়ের এক বছর পর আমাকে জানালি  তুই হারিয়েছিস। বাহ বাহ ! বিয়ের এক বছর পর আমাকে হারিয়েছিস।ভালো ,খুব ভালো! আর হারাস না হাঁদু, আমি যে তোর পাগলামো নিয়ে বেঁচে আছি।আমার পেন বন্ধ করলাম। মাঝে মধ্যে ... চিঠি... খোঁজার চেষ্টা...

                                                          ইতি 
                                                   তোর রঞ্জনা 
                                                না না তোর যা তা  

সাহিত্যিক সুকুমার হালদার
যাদবগড়, হালটু, কলকাতা 




 





















                                                                               
                                                                               



 

0 Comments