দীপক বেরার ছোটগল্প



কৃষ্ণ স্যার

এলাকায় কৃষ্ণ মাস্টার, আর আমাদের কাছে, অর্থাৎ ছাত্রদের কাছে কৃষ্ণ স্যার। পুরো নাম কৃষ্ণপ্রসাদ মাইতি, আদতে মেদিনীপুরের মানুষ, নিপাট ভদ্র একজন সৎ মানুষ। উনি ছিলেন বর্ধমানের শ্যামসায়র গ্রামের আমাদের "রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়" - এর হেড স্যার, ডবল্ এম. এ., বাংলা এবং ইংরেজিতে। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ডিসিপ্লিনড্। স্কুলে এলেই আমরা ছাত্ররা ছাড়াও অন্যান্য এ্যাসিস্ট্যান্ট স্যারেরাও, এমনকি স্কুলের সমস্ত কর্মচারীরা পর্যন্ত থর থর করে কাঁপতো। পান থেকে চুন খসলেই কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না।
ইংরাজি গ্রামারের ক্লাসে টেনস্ পড়ানোর সময় বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রানস্লেশন ধরতেন। একটু ভুল হলেই বেতের ঘা খেতে হত। সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম। কিন্তু, কী সহজ করে উনি বুঝিয়ে দিতেন, কত সহজ ভাবে মনে রাখা যায়, তার পদ্ধতি উনি উদাহরণ সহ শিখিয়ে দিতেন। আবার, সাদা ধূতি-পাঞ্জাবি পরিহিত রাশভারী মানুষটির আড়ালে আর একটা শান্ত সৌম্য মানুষের স্নেহের স্পর্শও পেয়েছি বহুবার। আমাদেরকে জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার পাঠ দান করেছেন। ছাত্রদের জীবনের ঝড়বাদলে কীভাবে নিরন্তর ঝাড়লন্ঠন হয়ে তিনি আলো ফেরি করে বেড়িয়েছেন, তা আজও আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে।

বাবার বদলির চাকরি। আমরা তখন বর্ধমানে। শহরের বড় স্কুলে ভর্তি না করে বাবা শ্যামসায়র গ্রামের এই মিশন বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তখন বাবার উপর কিছুটা রাগও হয়েছিল আমার। বাবা বলেছিলেন, "কৃষ্ণপ্রসাদ বাবু একাধারে একজন জ্ঞানী শিক্ষক, দক্ষ প্রশাসক এবং একজন দরদী অভিভাবক"। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষ্ণপ্রসাদ বাবু নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। অকৃতদার কৃষ্ণপ্রসাদ বাবু ছিলেন সকলের থেকে আলাদা। সত্যিকারের একজন আদর্শ মানুষ। আর আমরাও আদর্শ মানুষ হওয়ার শিক্ষা তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। 

আজ ৫ই সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস এর দিনে কৃষ্ণ স্যারের কথা খুব মনে পড়ছে। 

আজ, আমি আই.পি.এস অফিসার রণজয় সেন, বর্ধমান রেঞ্জের ডি.এস.পি, আইনের রক্ষক। চেষ্টা করি আইন মাফিক কাজ করতে। কিন্তু, আজকাল চারদিকে চলছে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন! রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে কাজের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে যখন প্রতিবন্ধকতা আসে, কখনও কখনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে যখন বাধ্য হতে হয় উপরমহলের চাপে, তখনই জীবনের এই শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ হৃদয়কে নাড়া দেয়, কুরে কুরে খায়। হৃদয়ের গভীরে এক অন্তর্দহন চলে রাত্রিদিন! 

আজকেও, দুপুর ৩টে নাগাদ বর্ধমানের শ্যামসায়র এলাকায় বি.জে.পি. দলের মিটিং কে ঘিরে এক রাজনৈতিক ঝামেলা হয়েছে। বি.জে.পি আর তৃণমূল দলের মধ্যে মারামারি, ব্যাপক বোমাবাজি! উভয় দলের কয়েকজন মারাত্মক ভাবে জখম হয়েছে। স্থানীয় থানা থেকে স্পেশাল ফোর্স পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সন্ধ্যের পর থেকে এলাকায় কারফিউ জারি হয়েছে। রাস্তাঘাট সুনসান। পথে কোনওরকম গাড়ি-ঘোড়া নেই। 
এম.এল.এ, থানার ও.সি এবং দুই পার্টির লোকজনদের নিয়ে মিটিং সেরে জিপে করে নিজের কোয়ার্টারে ফিরছি। এমন সময় স্টেশন বাজারের কাছে দেখি, এক বৃদ্ধের সঙ্গে দুটো চ্যাংড়া ছেলের ধস্তাধস্তি হচ্ছে। গাড়ির আলো দেখেই বৃদ্ধের হাত থেকে ব্যাগটা ছিনতাই করে দে দৌড়। এই দেখেই ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামিয়ে এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ি। সঙ্গে থাকা দু'জন কনস্টেবল কে নির্দেশ দিতেই ওরা মুহূর্তে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুটো চ্যাংড়া ছেলেকে ধরে ফেলে। দুটোর ঘাড়ে দুটো জবরদস্ত কিল বসিয়ে দুটোকে ধরে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ জিপে তুলে দেয় দুই কনস্টেবল। তারপর আমি ওদের কাছ থেকে ব্যাগটি নিয়ে বৃদ্ধের কাছে এসে ফেরত দিতে যাই। বৃদ্ধ ঘটনার আকস্মিকতায় প্রচন্ড ভয় পেয়ে এবং ধস্তাধস্তিতে একটু আঘাত পেয়ে মাটিতে তখনও পড়ে আছেন। উনার কাছে গিয়ে হাত ধরে তুলে উঠিয়ে বসাই পাশের দোকানের একটি বেঞ্চে। জলের বোতল এনে জল খেতে দিই। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই! উনি যে আমার কৃষ্ণ স্যার! স্যার আপনি? এখানে এত রাতে কোথা থেকে আসছেন? আমাকে চিনতে পেরেছেন স্যার? একনাগাড়ে প্রশ্নগুলো করে চলি। তারপর স্যার কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি। থাক থাক বলে, স্যার জিজ্ঞেস করেন, "কিন্তু, তুমি কে বাবা?" আমি বলি, আমি রণজয়, স্যার! রণজয় সেন। স্যার বলেন, "ও, রণজয়"! স্যার ভাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন। "হ্যাঁ হ্যাঁ রণজয়! ঠিক,.. ঠিক চিনতে পেরেছি। শুনেছি তুমি তো এখন মস্তবড় পুলিশ অফিসার হয়েছ। কিন্তু কী আশ্চর্য! তুমিই বা কীভাবে এমন সময় এখানে আমার এই বিপদে নাটকীয় ভাবে এসে উপস্থিত হলে"? হ্যাঁ স্যার, নাটকীয়ই বটে! আমি তো স্যার মাসখানেক হল এই বর্ধমান জেলার ডি.এস.পি পদে জয়েন করেছি। আজকে বিকেলে একটা পলিটিক্যাল ঝুট-ঝামেলা, গন্ডগোল হয়েছে। তার থেকে মারপিট, বোমাবাজি হয়েছে, কিছু লোক বেশ ভালরকম জখম হয়েছে, কয়েকজনের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক! ঘন ঘন সি.এম এর ফোন আসছে। সেই কারণেই খুব ব্যস্ততায় আছি। এলাকায় পুরো কারফিউ জারি হয়ে গেছে। গাড়ি-ঘোড়া কিচ্ছু নেই। আপনি বাড়ি যাবেন কীভাবে? স্যার বলেন, "ও তাই! সেইজন্যে স্টেশনে নেমেই আমি দেখছি স্টেশন চত্বর, বাজার এলাকায় কোনও লোকজন নেই, চারদিক কেমন সুনসান! তারপর তো আচমকা দুটো ছিনতাই বাজের কবলে পড়েছিলাম। তুমি না এসে পড়লে কী যে হত কে জানে! ব্যাগের মধ্যে কিছু টাকা পয়সাও ছিল। আমি তো সকালের দিকে কোলকাতায় গিয়েছিলাম একটা বিশেষ কাজে। কাজে মানে, তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই। আমি বছর খানেক হল রিটায়ার করেছি। কিন্তু, এখনও পেনশন টা চালু হয় নি। তাই আর কি, কিছুদিন অন্তর অন্তর যাই, তাগাদা দিয়ে আসি। কিন্তু, অনেক দিন হয়ে গেল, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।"  আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। চলুন আর দেরি না করে গাড়িতে উঠুন, আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিই। বলেই স্যার কে হাত ধরে গাড়ি তে তুলে নিলাম। তারপরে সোজা থানায় গিয়ে চ্যাংড়া দুটোকে থানায় হ্যান্ড ওভার করলাম। 

তারপর স্যার এর বাড়ির পথে রওনা দিলাম। এর মধ্যেই আমার কনস্টেবলেরা স্যারের আঘাতের জায়গায় আমাদের First aid kit থেকে ডেটল, মলম সব লাগিয়ে দিয়েছে। স্যার এতক্ষণে অনেকটা থিতু হয়েছেন। যেতে যেতে স্যারের সাথে ছাত্রজীবনের কত স্মৃতিচারণ চলতে লাগল। স্যার মনে আছে? কতবার আপনার বাড়িতে আমাকে আর মনীশ কে রবিবার করে বাংলা, ইংরেজি পড়তে একপ্রকার জোর করে ডেকে নিয়ে যেতেন। সত্যি বলতে কি, তখন আমাদের যেতে একদমই ভাল লাগত না। কিন্তু, আপনার চাপে যেতে বাধ্য হতাম। কিন্তু, এখন ভাবি, তখন আপনার কাছে গিয়েছিলাম বলেই বাংলা বা ইংরেজিটা ভাল ভাবে শিখতে পেরেছি। স্যার বলেন, "মনে নেই আবার! তোমরা ছিলে আমার এক একটা সব রত্ন, নক্ষত্র! মনীশ তো এখন একটা কলেজের প্রফেসর। তোমাদেরকে যত দেখি বুকটা আমার গর্বে ভরে ওঠে। মাস্টার মশাইদের হল এটাই একটা এ্যাডভানটেজ, জানো? যেখানেই যাইনা কেন, সেখানেই একজন না একজন ছাত্র ঠিক পেয়েই যাই। তোমরা তো তাও আসতে আমার কাছে পড়তে। এখন তো আমি রিটায়ার করেছি, হাতে অফুরন্ত সময়। এখন অনেক কে ডাকি পড়াব বলে। কিন্তু, কেউ আর আসেনা! সেইসব দিন আর সেই মানসিকতার মানুষ আজ আর নেই। এই সমাজটা অনেকটাই বদলে গেছে! চারিদিকে কেবল অধঃপতন, সামাজিক অবক্ষয়! শুধুই দলাদলি, রাজনৈতিক হানাহানি, খুন, জখম, ধর্ষণ লেগেই আছে। এসব তো নিউজ পেপার এর নিত্যদিনের খবর। এখন তো আর ছোটরা বড়দের কিংবা গুরুজনদের প্রণাম করেনা, একটুখানি সম্মান পর্যন্ত করেনা। অশিক্ষিতরাই সর্বত্র বিরাজমান। ওরাই আজ দেশটাকে চালাচ্ছে।
তোমার মনে আছে, রণজয়? সিলেবাসে ছিল না। তবুও একটা কবিতা তোমাদের সকল কে আমি পড়িয়েছি, জীবনানন্দের কবিতা"।
বলেই স্যার কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেন,.... 'অদ্ভুত আঁধার এক'... 
                    
"অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই - প্রীতি নেই - করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহত সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।"
 
স্যার বলতে থাকেন, "বুঝলে রণজয়, এই কবিতাটির মর্মার্থ তোমাদের প্রত্যেকটা ব্যাচে আমি বুঝিয়েছি। ভেবে দেখো, আজ এই কবিতাটি কতখানি প্রাসঙ্গিক! তাই না রণজয়?" 
বলতে বলতে লক্ষ্য করি, স্যারের চোখে জল! 

ততক্ষণে আমরাও স্যারের বাড়ি পৌঁছে গিয়েছি। স্যার কে হাতে ধরে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম। আবার স্যারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। বললাম, স্যার, আজকে 5th September, 'শিক্ষক দিবস'। আজকের দিনে আপনার দেখা পেয়ে, আপনার মূল্যবান কথা শুনে, আর আমার প্রিয় শিক্ষক গুরুকে প্রণাম করে দিনটি সত্যিই সার্থক হল। স্যার বললেন, "জানি, আমার কাছেও এই দিনটি সার্থক। কারণ, আমার সত্যিকারের একজন  প্রিয় ছাত্র, মূল্যবান রত্ন, উজ্জ্বল নক্ষত্রের দেখা পেলাম।" 
স্যারের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিলাম। বললাম, যখনই কোনও দরকার পড়বে, আমাকে একটা ফোন করবেন। কোনওরকম দ্বিধা করবেন না স্যার। আর একটা কথা, বলছিলাম কি স্যার, আপনার পেনশন এর কাগজপত্র, রেফারেন্স কিছু থাকলে আমাকে যদি দিতেন। মানে, আমি একটু চেষ্টা করে দেখতাম। কারণ, আমার অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে বিভিন্ন সরকারি ডিপার্টমেন্টে। স্যার তখন বড় চোখ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই বুঝতে পারি, স্যারের মত চির উন্নত শির আদর্শবান এই মানুষটিকে এই কথাটা বলা আমার খুব ভুল হয়ে গেছে, অন্যায় হয়ে গেছে। স্যার বললেন, "Thanks for your concern about me, Ranojoy. But, তুমি তো জানো, আমি এইসব Undue Advantage বা সুপারিশ টুপারিশ পছন্দ করি না।" Sorry Sir! কিছু মনে করবেন না, প্লিজ।  

সেদিন রাতের মত স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। 
স্যার বললেন, "Be honest. Always, try to be a Perfect Man. God bless you".

কথায় আছে, যক্ষের ধন অর্জন করতে হলে বিনিময়ে কিছু দিতে হয়। তেমনই সত্যিকারের শিক্ষা অর্জন করতে গেলে অহংকার ত্যাগ করতে হয়। তিনি ছিলেন নিরহংকারী একজন খাঁটি মানুষ। পর্বতের মত সুউচ্চ। যার অন্তর অজস্র সম্পদে ঋদ্ধ, মণিমানিক্যে ভরপুর। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন আদর্শ শিক্ষক, মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষার এই ভারসাম্যহীন সমাজে, এই অবক্ষয়ের যুগে তাঁর মত শিক্ষকদের আজ বড় বেশি প্রয়োজন। সত্যিই আমি ভাগ্যবান যে, তাঁর মত একজন অলোকসামান্য শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। আজ 'শিক্ষক দিবস' এর এই পুণ্য দিনে আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শ্রী কৃষ্ণপ্রসাদ মাইতির প্রতি রইল আমার এক আকাশ শ্রদ্ধা। তাঁর চরণে জানাই আমার শত সহস্র প্রণতি।

        সাহিত্যিক দীপক বেরা
                 হরিদেবপুর, টালিগঞ্জ, কলকাতা














0 Comments