
কালের সারণী বেয়ে
--"স্যার, ছেড়ে দিন স্যার.... আর হবে না স্যার "...
--" এই... এই.. কি বলছো?"..ঘুমন্ত স্বামীকে হাল্কা করে ধাক্কা মেরে শান্ত করার চেষ্টা করে মহুয়া।
--" কি যে রোগ বাবা, কে জানে? মাঝরাতে বকর বকর... ভালো লাগে না ".....
--" আর ভুল হবে না স্যার.... খুব মনে থাকবে স্যার "...ঘুমের ঘোরেই তখনও বকবক করে চলে সুমন্ত।
--" কি হল কি? চুপ করবে নাকি? "..বিরক্ত হয় মহুয়া।
এই এক রোগ মানুষটার, ঘুমের ঘোরে বকবক করা।
মহুয়ার ঠেলা খেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে সুমন্ত।
--" কি হল? আবার নিশ্চই কোন স্বপ্ন দেখেছো?".. মহুয়া জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে।
--" হ্যাঁ গো, আমাদের স্কুলের মহাদেববাবুকে স্বপ্ন দেখলাম... আমার দেখা সেরা শিক্ষক.. সেই প্রাইমারিতে আমাদের অংকের ক্লাস নিতেন। স্যার বলতেন জানো, "কাল বলে কিছু হয়না.. বুঝলি? যা করতে হব, আজ করতে হবে.. কাল বলে কাজ ফেলে রাখলে তা কালের গর্ভে চলে যায় "... তখন এসব কথার মানে বুঝতে পারিনি... আজও হয়ত ঠিক পারি না"...
--"হুম"... পাশ ফিরে শোয় মহুয়া।
--" সেদিন অতুলের সাথে দেখা হয়েছিল, বলছিল স্যারের সাথে দেখা হয়েছিল, স্যার নাকি আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছেন.. খুব ভালোবাসেন আমাকে এখনও... অনেকদিন থেকেই ভাবছি একবার স্যারের সাথে দেখা করতে যাবো, সে আর হচ্ছেই না... কালই যাবো, বুঝলে? "..
--" নিশ্চই যেও... এখন শুয়ে পড়ো "...
সুমন্ত শুয়ে শুয়ে মহাদেববাবুর কথা ভাবতে থাকে। সাদা ধবধবে ধুতি আর হাফশার্টে স্যারকে যেন নায়ক নায়ক মনে হত.. দীর্ঘ, ঋজু চেহারায় এক সৌম্যভাব...বাচ্চাদের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতেন। বাচ্চাদের শেখানোর একটা সহজাত ক্ষমতা ছিল ওনার। স্যারের ছেলে দেবজ্যোতিও ওদের ক্লাসেই পড়তো, এখন অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে।
সুমন্তও বরাবর ভালো রেজাল্ট করতো, দেবজ্যোতির সাথে বন্ধুত্বটাও রয়ে গিয়েছিল, এখন বহুদিন যোগাযোগ হয় না... সেই বন্ধুত্বের সূত্রেই স্যারের বাড়িতে আসা-যাওয়াও নিয়মিত ছিল। আজ যে সুমন্ত হাইস্কুলের নামকরা শিক্ষক হতে পেরেছে তার অনেকটাই স্যারের জন্য। স্যারকে দেখেই স্যারের মত শিক্ষক হবার ইচ্ছের চারাগাছকে নিজের মনে বপন করেছিল সে... যে চারাগাছ পরবর্তীতে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আজ সুমন্তস্যারকে সবাই একডাকে চেনে।
সুমন্ত নিজেও বরাবর চেষ্টা করে এসেছে পুঁথিগত বিদ্যা শেখাবার থেকে বাচ্চাদের মনে কিছু আদর্শের বীজবপন করতে..
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই আবার ঘুমের দেশে তলিয়ে যায় সে।
আজ সকাল সকাল বাজার সেরে স্নান,খাওয়া করে রেডি হয়ে যায় সুমন্ত। আজ ৫ই সেপ্টেম্বর, জাতীয় শিক্ষক দিবস, স্কুলে অনেক অনুষ্ঠান আছে।
আজ সারাটাদিন মনে যেন এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করে সুমন্ত। বাচ্চারা কতরকম অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষিকাদের তাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে....
সুমন্তর মনে পড়ে, তাদের শিক্ষকদিবস পালনের দিনগুলি...
স্কুলের অনুষ্ঠানে বসে বসেই সুমন্ত ঠিক করে আজ মহাদেববাবুর সাথে দেখা করে তবেই বাড়ি যাবে... "ভালোই হবে, আজকে শিক্ষকদিবসের দিনেই স্যারের সাথে দেখা হবে "...মনে মনে ভাবে সে।
ট্রেন থেকে নেমে স্কুটিটা নিয়ে স্যারের বাড়ির রাস্তা ধরে সুমন্ত। রাস্তায় 'ঘোষ সুইটস 'থেকে বড় একটা প্যাকেট কালাকাঁদ কিনে নেয়, স্যারের খুব প্রিয় যে...
স্যারের বাড়ির বাইরে স্কুটিটা রেখে ভিতরে ঢুকতেই গা'টা কেমন ছমছম করে ওঠে সুমন্তর। কলিংবেল বাজাতেই দেবজ্যোতির স্ত্রী এসে দরজা খোলে..
--"বৌদি, কেমন আছেন? কবে এলেন আপনারা? "..
--" এই তো, দিন কুড়ি হল.. আসুন, ভিতরে আসুন "..দেবজ্যোতির স্ত্রীকে কেমন যেন ম্রিয়মাণ মনে হচ্ছে...
দেবজ্যোতি তার ফ্যামিলি নিয়ে কলকাতায় থাকে শুনেছিল সুমন্ত।
--" স্যার কোথায় বৌদি? দেবজ্যোতি কি এখানেই আছে? "..সুমন্ত জিজ্ঞাসা করে।
--" মানে, আপনি কিছু জানেন না? "..
--" কি জানবো?"..অবাক হয় সুমন্ত।
--"কে এসেছে বৌমা? কার সাথে কথা বলছো? পর্দা সরিয়ে জ্যেঠিমা ঘরে ঢুকতেই চমকে ওঠে সুমন্ত... এ কি পোষাক জ্যেঠিমার!!
--" ওহ, সুমন্ত... এলি বাবা.. আর কিছুদিন আগে আসতে পারলি না? তোর স্যার ক'দিন থেকেই তোর কথা বলছিলেন... অনেকদিন আসিস না, তাই একটু অভিমানও করেছিলেন... বলতে বলতে ডুকরে ওঠেন জ্যেঠিমা।
--" কি বলছেন এসব... কবে হলো?.. আমি কিছুই জানতে পারলাম না"...ভেঙ্গে পড়ে সুমন্ত।
--" আজ সতেরদিন হলো..শরীরটা কদিন ধরেই ভালো ছিল না, তারপর হঠাৎ করেই হার্টফেল করলেন... আমরা তার দু'দিন আগেই এসেছি"..দেবজ্যোতির স্ত্রী বলে।
নিজেকে যেন হঠাৎ ভীষণ ছোট মনে হয় সুমন্তর। কতদিন ধরে ভেবেছে স্যারকে একবার দেখে যাবে, কিন্তু বাড়ি ফিরে ব্যাচ পড়ানোর জন্য সে সময় আর হয়নি। নিজের স্কুল, ছাত্রছাত্রী, সংসার নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে প্রিয় শিক্ষককে একবার দেখে যাওয়ার সময় হয়নি। আজ নিজেকে স্যারের ছাত্র ভাবতে খুব লজ্জা করছে.. সবকিছুই যেন মূল্যহীন মনে হচ্ছে....
ভারাক্রান্ত মনে কিছু সময় কাটিয়ে স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে সুমন্ত। বেরিয়েই গা'টা যেন আবার ছমছম করে ওঠে। বাইরের গেটটা বন্ধ করতে গিয়ে স্পষ্ট যেন শুনতে পেল, "কি রে, সময় হলো? বলেছিলাম না কাল বলে কিছু হয় না.... যা করার আজ করতে হয়... ভুলে গেলি?"
--"এবারের মত ক্ষমা করে দিন স্যার, যদিও জানি সে যোগ্য নই আমি... প্লিজ স্যার... আর কখনও এ ভুল হবে না "..
স্কুটিটা স্টার্ট দিয়ে পিছন ফিরে সুমন্ত পরিষ্কার দেখতে পেল সাদা ধবধবে ধুতি আর হাফশার্টে তার প্রিয় শিক্ষক হাত নেড়ে গেটের ভিতরে মিলিয়ে গেলেন...



1 Comments
চমৎকার
উত্তরমুছুন