অমিত কুমার জানার ছোটগল্প


স্মৃতিবিজড়িত শহর

চব্বিশে মার্চ রবিবার অলকেশের অফিস ছুটি। ছুটির দিনে তার পত্নী সুলেখা একটু দেরিতেই রান্না বসায়। সকাল সওয়া নটার সময় অলকেশ বাজার থেকে ফিরে এলো। ফিরে আসতেই সুলেখা অলকেশের দিকে এক অদ্ভুত প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো, যেমনটা প্রথম আলাপের সময় পরস্পরের দিকে ওরা তাকিয়ে থাকতো ঠিক সেইরকম। অলকেশ সুলেখাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বললো, "তুমি এত রোমান্টিক জানতাম না তো! আজ থেকে পাঁচ বছর আগে মার্চের চব্বিশ তারিখ আমরা প্রথম গোপগড়ের পার্কে গিয়ে দেখা করেছিলাম। তোমার ডায়েরির পাতা উল্টে জানতে পারলাম। " 
----"তুমিও ডাইরি পড়ো তাহলে?"
----"মোটেও না, এই বই খাতাগুলো ঝাড়ামোছা করতে গিয়ে তোমার নীল রঙের ডায়েরিটা পেলাম । তারপর পাতা উল্টে ওটা খুঁজে পেলাম।"
এরই মধ্যে ওদের ছয় বছরের ছেলে সুতনু অলকেশকে বললো, "বাবা, মাংস এনেছো?" প্রতি রবিবার ওদের বাড়িতে মাংস হয়। অলকেশ সুতনুর গাল টিপে আদর করে বললো, "হ্যাঁ সোনু, কেন আনবো না? শুধু তাই নয়, আজ বিকেলে আম‍রা ঘুরতে বেরবো।"  সুতনুর মুখে অম্লান হাসি ফুটে উঠলো।

ছোট্ট সুতনু আড়াল হতেই সুলেখা অলকেশকে প্রেমের আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে বললো, "চলো আজ আমরা সেই পার্ক (গোপগড়)-এ যাই যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। যাবে তো?"
অলকেশ স্বভাবজাত মুচকি হাসি হেসে বললো, " তুমিও যে এমন নস্টালজিক আগে জানতাম না। তুমি যখন বলছো যেতে তো হবেই, অন্যথায় কে তোমার বকবকানি শুনবে?"

মার্চের শেষ সপ্তাহ। দখিনা বাতাসের স্নিগ্ধ ছোঁয়া এবং কৃষ্ণচূড়ার রঙে বসন্ত যেন ভরাযৌবনা! এই রূপবতী বসন্তের রূপদর্শনে অলকেশ, সুলেখা এবং সুতনুকে মোটরবাইকে চড়িয়ে গোপগড়ের সেই ঐতিহ্যবাহী পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।যাওয়ার পথে বাইকের সামনের দিকে উপবিষ্ট সুতনু তার বাবাকে নানান ধরনের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলো। ওরা যখন অশোকনগরে পৌঁছালো তখন ছোট্ট সুতনু একটা বাড়ির দেওয়ালে 'নিগম মেস' লেখাটা দেখে বাবাকে প্রশ্ন করলো," বাবা মেস মানে কি? মেসে কি হয়? "
অলকেশ বললো, "মেসে ছেলে মেয়েরা থাকে,পড়াশোনা করে, আমিও একসময় মেসে থাকতাম। ছেলেদের মেস এবং মেয়েদের মেস আলাদা আলাদা হয়।"
এতক্ষণে ওরা অশোকনগর ছাড়িয়ে তাঁতিগেড়িয়া পৌঁছে গেছে। অলকেশের হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে গেল, সে মেন রোড থেকে ডানদিকে বেঁকে একটা একটা মেসের আঙিনায় উপস্থিত হলো। সুলেখা এই মেসটা ভালোই চেনে। এই মেসের নাম 'সাকসেস মেস'। যখনই খুব ইচ্ছে হতো সে অলকেশের সাথে দেখা করতে এখানে আসতো।
অলকেশের চেয় কনিষ্ঠ কয়েকজন ছেলে এখানে এখনো থাকে। সে মেসে প্রবেশ করতেই ওরা অলকেশকে 'অলকেশদা' বলে সম্বোধন করে বসতে বললো। অলকেশ তার ছেলেকে বললো, ''দেখ, এরাই মেসে থাকে, পড়াশোনা করে। বড় হলে তোকেও হয়তো মেসে থেকে পড়াশোনা ক‍রতে হতে পারে।"

মেসের গেট খুলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অলকেশের দৃষ্টি পড়লো ডানদিকের সাইকেল রুমে থাকা একটা পুরানো নীল রঙের সাইকেলের উপর। সে দ্রুত গিয়ে সাইকেল রুমে প্রবেশ করে সেই সাইকেলটায় হাত রেখে সুতনুকে বললো "এই এই সাইকেলটাই আমার ছিল একদিন। এখন এই মেসের ছেলেরা হয়তো ব্যবহার করে। এই সাইকেলের সঙ্গে যে কত রঙবেরঙের সুখ দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে তা শুধু আমিই জানি রে।একসময় পুরো শহর ঘুরেছি এই সাইকেলে। কখনো টিউশন পড়তে গিয়েছি,আবার কখনো পড়াতে গিয়েছি। এই সাইকেলে চড়েই বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে টিউশন পড়িয়ে কলেজে পড়ার খরচ জোগাড় করেছি। এতে চড়েই পাঁচ কিলোমিটার দূরে সিনেমা দেখতে গিয়েছি বন্ধুদের সাথে। এতে চড়েই গিয়েছি বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন কত জায়গা।"
সুলেখা লক্ষ্য করলো অলকেশের চোখ স্মৃতিবেদনার আবেগে ছলছল করছে।সে অলকেশকে বললো, "ঠিক আছে,এবার চলো যেখানে যাওয়ার কথা ছিল।" 

অলকেশরা ভি.ইউ রোড ধরে পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল গোপগড়ের পার্কে। পার্কে প্রবেশ করার আগে ডানদিকের টিকিট কাউন্টারে টিকিট কেটে ওরা ভেতরে প্রবেশ করলো। পার্কের ভেতরের বেশিরভাগ জায়গাটা সারি সারি শাল এবং কাজুবাদাম গাছে ভরা। কোথাও কোথাও আবার ঘন জঙ্গল। সুলেখা অলকেশকে ইশারা করে দেখালো যেখানে কয়েকজন কপোত কপোতী ঝোপের আড়ালে বসে প্রেমের রসাস্বাদন করছে।
অতঃপর অলকেশ সুলেখাকে উঁচু পাথর বেষ্টিত একটা বড় শালগাছের কাছে নিয়ে গেল। সুলেখা সেই শালগাছটায় দেখতে পেল এখনো তাদের নাম অক্ষয় হয়ে আছে। যেদিন প্রথম তারা পার্কে এসেছিল সেইদিনই অলকেশ পেরেক দিয়ে দুজনের নাম লিখেছিল। দু জনের নাম একসাথে দেখে সুলেখাও যেন অতীতের ফেলে আসা কোন এক মনোরম মুহূর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেললো। অলকেশ সুলেখার দিকে তাকিয়ে বললো, "কি, সেই দিনগুলোতে ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে খুব? এটাই স্বাভাবিক।" 
হারিয়ে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না। তবে কিছু মধুর স্মৃতি সারাজীবন স্মৃতিপটে বেঁচে থাকে।

গল্পকার অমিত কুমার জানা
খুঁটিয়া, বাড়গোকুলপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর


















0 Comments