নীতা বিশ্বাসের রম্যরচনা


দূর্গতিনাশিনী লাইভ

মিটিং শেষ করে চপলদা ঘোষণা করে দিল,এবার পুজোয় আমদের কিশোর সঙ্ঘ ক্লাবের থিম হচ্ছে ‘দুর্গতিনাশিনী লাইভ’। চপলদা ক্লাবের জন্য খাটে খুব। মহালয়ার দিন থেকেই তার নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না। ছ’মাস আগে থেকেই প্রত্যেক মাসে কমিটি মিটিং, ডাকে। চা-শিঙাড়ার খরচ চপলদার নিজের। কালচারাল প্রোগ্রামের জন্য ছোটাছুটি, স্যুভেনিয়রের জন্য বিজ্ঞাপন জোগাড়, আরো হ্যানো ত্যানো নিয়ে বলতে  গেলে চপলদার সারাবছরই পুজো। বলতে গেলে কিশোর সঙ্ঘ ক্লাবের প্রাণপুরুষ হচ্ছে চপল কুমার ঢ্যাং। এর  পেছনে অবশ্য একটা দু;খজণক কাহিনী আছে। চপলদা কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা থেকে বেশি ইনটারেস্ট  ছিল ওড়ায়। প্রায়ই তাকে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সাথে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কলেজ-ক্যানটিনে বা ক্যাম্পাসের বকুল-চাঁপাগাছের তলায় দেখা যেত। কিন্তু দুদিন যেতেই সে মেয়ে কোনো এক অজ্ঞাত কারনে আর তার  কাছে ঘেঁসত না।(চপলদা যাত্রাপালা খুব পছন্দ করতো। ফ্রেন্ডদের সঙ্গে বাক্যালাপে সেই উচ্চারণের প্রভাব পড়ত কি?) অপমানিত হয়ে দুত্তোর বলে কলেজ ছেড়ে দিয়ে চপলদা এই ক্লাবকেই সর্বান্তকরণে ভালবেসে ফেলে।
                              
জোরকদমে রিহারস্যাল চলছে। চপলদার কড়া নির্দেশে কেউ একফোঁটাও ফাঁকি দিতে পারে না। পাড়ার মিষ্টির দোকানদার নারায়ণ ময়রার ছেলে নাদাপেটা সমর হয়েছে গণেশ। কার্তিকের ভূমিকায় বলিউডের স্বপ্ন-বিভোর ঋত্ত্বিক কুমার। পাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনি সরস্বতী। স্বয়ং চিনি  মাদূর্গার ভূমিকায়। মুখচোরা লাজুক শ্রীময়ীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছে মালক্ষ্মী সাজতে। ওর মা বলেছেন, লক্ষ্মীর ভূমিকায় বলেই রাজি হলুম মেয়েকে দিতে। কি জানি, উনি বোধহয় সরস্বতীকে ততটা বিশ্বাস করেন না।মহিষাসুর ওদের ক্লাবের গর্ব সিক্সপ্যাক ইউসুফ মস্তান। এ পর্যন্ত সব ঠিক। একেবারে খাপে খাপ। ইঁদুর প্যাঁচা হাঁস ময়ুরকে ট্রেনিং দিয়ে দিয়ে পোস মানানো চলছে। মুশকিল হচ্ছিলো মহিশ নিয়ে। যা ত্যাঁদড় পিস হয় এরা একেকখানা! পাড়ার একচেটিয়া গোয়ালা বাণ্টি শুনে একগাল হেঁসে বললো, কোনো অসুবিধে নেই চপলদা। আমার কালো গাই শ্যামলী খুব শান্ত শিষ্ট। ওকে মেকাপ করে ভঁইসা বানিয়ে নাও। কোনো ভাড়া নেব না শ্যামলীর দরুন তোমাদের  কাছ থেকে, মা কসম। কেবল সিংহ পাওয়া যায়নি। তারা লোকসমাজে ভদ্রতা করতে কোনোদিন শিখবে না তাই হার্ড ফাইবারের একটা সিংহ বানাবার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। বিচারকরা সিংহ বিষয়ে এই ছাড় দিতে রাজি হয়েছেন, বণ্যপ্রাণীলাভার গ্রুপের ঝামেলা এড়াতে।                                                             
পূজোর আগের দিন ফাইনাল রিহারস্যাল হলো। স্টেজ রিহারস্যালে ভালভাবে উতরে ওরা প্রত্যেকটি চরিত্র  দারুণ আত্মবিশ্বাসী। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সকলে নিজেদের পোজিসন নিয়ে নিতে পারছে। চপলদার সব দিকে নজর। ওদের বলে দিয়েছে, দিন রাত্তির মিলিয়ে পাঁচবার লাইভ-মঞ্চের সামনে মিনিট দশেকের জন্য একটা পর্দা মানে স্ক্রীন দেওয়া হবে, সেখানে দর্শকরা নিজেদের ছবি দেখবে আর লাইভ মূর্তির পারফরমেন্স নিয়ে  নিজেদের বক্তব্য  জানাবে। এতে দর্শকরা খুশ আর সেই ফাঁকে দূর্গা সহ তার পুরো পরিবার ফ্রেসিং রুমে গিয়ে কাজ টাজ সেরে ফের এসে পজিসন নেবে। কেউ তো এদিকটা ভেবে দেখেনি! চপলদার বুদ্ধির গভীরতায় সবাই মুগ্ধ। সত্যিই তো। প্রকৃতির ডাক বলে তো একটা ব্যাপার আছে! তার কাছে সবাই পরাস্ত। কি সুন্দর ম্যানেজ করেছ  চপলদা। রিহারস্যাল শেষে ‘চপলদা জিন্দাবাদ’ নারাবাজিতে হল মুখরিত হয়ে উঠছে প্রত্যেকদিন।                      
 
                                                              
তিনদিনের পারফরমেন্স খুব ভাল হয়েছে। দর্শকের উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে কিশোর সংঘ ক্লাব। এবার এই থিম ফার্স্ট প্রাইজ পাবে, এ নিয়ে ফাটকাবাজিও চলছে পাবলিকের মধ্যে। বাকি শুধু দশমীর আধ বেলা।  বেলা বারোটার আগেই ঠাকুর ট্রাকে ওঠাতে হবে। সরকারের আদেশ।
বিসর্জনের ঢাক বাজতেই সবাই একটু নার্ভাস ফিল করছে। চিনি মিনি দুজনেই সুইমিং জানে। ওদের কোনো ভয় নেই। অন্যরা জলে নামবে কিনা সে বিষয়ে কেউ মুখ খুলছে না। ইউসুফের ওপর চিনির অনেক দিনের  রাগ। রাস্তাঘাটে ওকে একা পেলে ‘মেরি জান’ ‘মেরি জান’ বলে জ্বালাতন করে। এখন পায়ের তলায় অসুর সেজে বসে বসে কতবার যে চোখ মেরেছে চিনিকে! চিনি ভেবে রেখেছে বিসর্জনের সময় ওটাকে দেখে নেব।
ওদিকে ট্রাক এসে গেছে, এদিকে স্টেজের ওপর সিঁদুরখেলার ঝামেলা। বেচারি চিনিমিনিকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে সিঁদুর পার্টি। শ্রীময়ী সরস্বতীও সিঁদুর থেকে বাদ যায়নি।  বিয়ের আগেই সিঁদুর পরে লজ্জা পাচ্ছে ওরা। চপলদা বলে দিয়েছে, সিঁদুর দানের সময় একদম নড়বি না। তাহলেই নম্বর কাটা যাবে। সব পরিশ্রম ব্যার্থ হবে তোদের। ফার্স্ট প্রাইজ জলে যাবে। সিঁদুরদানের হুটোপাটিকে দিব্যু কাজে লাগিয়েছে ইউসুফ অসুর। চিনির নজর এড়ায়নি ইউসুফের এই বদমাশি। ট্রাকে তোলার সময় তো এদিক-ওদিক একটু হবেই! মাটির মুর্তিই নড়েচড়ে যায়! এরা তো জ্যান্ত! ইউসুফটা ভাবছে এই ফাঁকে চিনিকে একটু জড়িয়ে ধরবে। উদ্দাম ঢাকের সাথে সিদ্ধিখাওয়া ছেলেদের উদ্দাম নাচ চলছে। সেই ফাঁকে চিনি ইউসুফের বুকে ঠেকিয়ে রাখা বর্শাটাতে খানিক চাপ দিয়েছে ওকে ভয় দেখাতে। বর্শায় যে সত্যিকারের ধার ছিল বুঝতে পারেনি। রক্ত  দেখে মহিষ-সাজা শান্ত কালো গরু তড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে অসুরকে মেরেছে ঢূঁসো। সঙ্গে সঙ্গে চারদিনের লাইভ দূর্গা পার্টি ধুড়ুম ধাড়াম ছিটকে পড়ে একেবারে কেলেঙ্কারীয়াস কান্ড। গোটা তিরিশেক ছেলে মিলেও সামলাতে নাজেহাল কালো গাই শ্যামলী আর ইউসুফের যুদ্ধ। সবাই অবাক হয়ে দেখছে রিয়াল যুদ্ধ। এ তো ভারচুয়াল লাইভ নয়। এ তো রিয়েল লাইভ। হাতে পায়ে যুদ্ধ দেখতে পেয়ে মুগ্ধ সকলে। ভুলে গেছে যুদ্ধটা আসলে মাদূর্গা আর অসুরের। এদিকে পোষমানা ইঁদুর-পেঁচা-রাজহাঁস ভয়ে ট্রাকের ডালার গায়ে সেঁটে রয়েছে। কার্তিকের ময়ুরটা রেগে ডানা ঝাপটে বিকট ক্রেঙ্কার শুরু করেছে। পারলে কার্তিককে নিয়েই উড়ে যায়। ভয়ে ময়ুরের পিঠ থেকে নামতে গিয়ে কার্তিকের একপাটি নাগরা ছিটকে একেবারে চটাস করে সরস্বতীর গালে। তবে রে,বলে সরস্বতী মিনি তেড়ে আসতেই গনেশ রাবারের শুঁড় দিয়ে ওকে পেঁচিয়ে ধরে সস্নেহে বলে, ইচ্ছে করে মারিনি রে বোন। রাগ করে আর কেলেঙ্কারী বাড়াস না। চারদিন ধরে ষাট কে.জি. ওজনের চিনিকে পিঠে নিয়ে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল ফাইবারের সিংহ। এদের দাপাদাপির চোটে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিনি ছৌনাচের স্টাইলে লাফদিয়ে নামলো, যেন কিচ্ছু হয়নি। কিশোর সঙ্ঘ ক্লাবের সেক্রেটারি চপল ঢ্যাং সঙ্গে সঙ্গে  ঢাকিদের স্তব্ধ করে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে—‘বন্ধুগণ আর মা-বোন-বৌদিসকল, দশমীর এই লাইভ শো  দেখানোর পরিকল্পনা আমাদের সার্থক হয়েছে। ভারচুয়াল নয়, আমাদের এই পুরোপুরি রিয়াল লাইভ শো আজ সকলের প্রশংসা পেয়েছে। ইসকে লিয়ে জোরদার তালিয়াঁ…’  চপলদা এই ফিনিশিং টাচটা দিতে দিতেই বিচারক আর রিপোর্টার এবং মুগ্ধ জনগণের হাততালির ফোয়ারার মধ্যে ট্রাক থেকে নিচে নেমে লাইভ দূর্গতিনাশিনী আবার পোজ নিয়ে টিয়ে একেবারে সত্যি দূর্গা! কেবল প্যাঁচা-ইঁদুর-রাজহাঁস আর ময়ুরকে সে তল্লাটে আর দেখা যায়নি।

লেখিকা নীতা বিশ্বাস
বারিধ, জামশেদপুর, ঝারখণ্ড 




























0 Comments