সুষ্মিতা রায়চৌধুরীর গল্প

নো ফিল্টার ভিনটেজ

(১)

ন্দিরাদেবীর আজকাল ছেলেমানুষী আব্দার করতে খুব ভালো লাগে।এই কদিন আগেই ধুমধাম করে পালন হয়েছে তাঁর পঁচাত্তরতম জন্মদিন।দুই ছেলে মিলে এমন সব আয়োজন করেছে,যা দেখেই মন একেবারে খুশী ইন্দিরাদেবীর।শুধু একটা স্লিভলেস রেট্রোস্টাইল ব্লাউজ পড়ার খুব সখ হয়েছিলো,সেটি হয়নি নাতনির জ্বালায়।ধুমসো একটা সাদা গাউন পড়তে হয়েছিলো তাকে।এই বয়সে নাকি এমনই সুন্দর।এককালিন ডাইসাইটে সুন্দরীর এসব একেবারেই নাপসন্দ।গাউন জিনিষটাই তার দু’চক্ষের বিষ।তাঁদের সময়ে পাশ্চাত্যের অনুকরণে যখন অনেকেই গাউন পড়তো,তিনি যেতেন একটা কালো ভি’কাট স্লিভলেস ব্লাউজ আর ফিনফিনে শিফন অরগান্জা শাড়ীতে।তাঁকে বলা হতো রিয়েল মিসেস সেন।কতো যে হৃদয় পুঁড়িয়েছেন আজ ভাবলে বেশ লাগে।একবার তো বিয়ের সম্বন্ধের ছবি তুলতে গেছিলেন যার কাছে,সেই ছোকড়াই তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এক সপ্তাহ পর।পয়েন্টেড হিলে যেনো দুঃখকে পদদোলিত করে আপন ভালোলাগায় উড়ে যেতে ভালোবাসতেন ইন্দিরাদেবী।তা এহেন ইন্দিরাদেবীর আজকাল খুব দুঃখ।আসলে আজ অব্দি কোনওদিন অন্যের মুখাপেক্ষি হয়ে চলেননি,কিন্তু এই “হাঁসত্যাগ” তাকে নাস্তানবুদ করে ছাড়ছে আজকাল।

ভবানীপুরের পেল্লাই তিনতলা বাড়ির একমাত্র রাণী তিনি।বাড়িতে রাখা ইন্দিরাদেবীর হাতের কাজ আর পেন্টিং প্রত্যেকটা ঘরের সৌন্দর্য যেনো আরো বাড়ায়।অরুণ,ইন্দিরাদেবীর স্বামী কাজ করতেন জাহাজে।যেখানেই যেতেন নিয়ে আসতেন দুর্লভ সব জিনিস।দু’বছর হলো অরুণবাবু মারা গেছেন।ওনার মারা যাওয়ার আগে অব্দিও ইন্দিরাদেবীর পেন্টিং বিক্রী হতো বেশ চড়া দামে।এখন সেটি বন্ধ আছে।দুই ছেলেই এতো বড়ো বাড়িতে স্বাধীনতা পায়নি তাই বেছে নিয়েছে রাজারহাটের ফ্ল্যাট।কিভাবছেন তাতে ইন্দিরাদেবীর দুঃখ?কদাপি নয়,এই বয়সেও বাংলা মেগাসিরিয়ালের ধার ধারেন না তিনি।ছেলেদের ঠিক করা পরিচারিকা গুঞ্জন,তাঁর সারাক্ষণের সঙ্গী।কিন্তু ইন্দিরাদেবীর খাওয়া আর রান্নার সময়টুকু ছাড়া,আসলে ইন্দিরাদেবী খেয়াল রাখে গুঞ্জনের।তিরিশ ছুইছুই গুঞ্জনের পড়াশুনার দ্বায়িত্ব তাঁর।অবশ্য শুধু পড়াশুনা কেনো এখন তুলির টানেও বেশ পটু সে।এই তো ক’দিন আগে,ইন্দিরাদেবী তাকে বসিয়ে চোখে একে দিলেন “উইংঙ্গড আইলাইলার”। 

“চোখের মেকাপ একটা শিল্প বুঝলি”,বলেন ইন্দিরাদেবী।

একবারই গুঞ্জন ভুল করে দিদাকে প্রশ্ন করে ফেলেছিলো, “তুমি আমায় খুব ভালোবাসো না?”।সটান উত্তর পেয়েছে, “নিজেকে ভালোবাস,এতো অন্যের ভালোবাসার দরকার কি?শোন তুই হলি আমার আয়না,বয়সকে সাজিয়ে রাখি আমি তোর মধ্যে”।

কিন্তু দুঃখের কথা হলো “হাঁসত্যাগ”-এর কোনও সমাধান ইন্দিরাদেবী পাচ্ছেন না।বারবার ছেলে বউ, নাতনিদের জিজ্ঞেস করলে শুধু উত্তর এসছে, “উচ্চারণটাই তো ঠিক জানোনা”।ঠিক ঠাউরেছেন বুদ্ধিমতি ইন্দিরাদেবী,একটা কোথাও বুঝতে ভুল হচ্ছে তাঁর।হাঁস ত্যাগ করে কি আর রাজত্ব পাওয়া যায়,ত্যাগ করে কোনওদিন কেউ লাভ করেনি।শব্দটি হ্যাসট্যাগ।ফেসবুক আছে ইন্দিরাদেবীর।কিন্তু তাতে তাঁর মন বসেনা।সেখানে তার বয়সী মানুষরা নয় ভগবানের ছবি শেয়ার করুন ফল পাবেন নয় স্মৃতির বেদনায় মুসড়ে থাকেন।কয়েকজন যদি বা মনের মতন পেলেন তাদের কমেন্টের বানান দেখে স্বয়ং সরস্বতীর হার্ট আ্যটাক হওয়ার যোগাড়।একদিন নাতনিকে দেখেছিলেন, লোকাল বিজনেস নিয়ে কি সব ট্রেন্ড করতে ইন্সটাগ্রামে,দেখেছিলেন নতুন ফ্যাশন,এমনকি ওই নতুন ছোকড়াটা যে বাংলা সিনেমা করে আর  যার বিয়ে হলো সম্প্রতি,তারও ব্যক্তিগত ইনস্টা আক্যাউন্ট আছে।বেশ পরিপাটি গোছানো একটা প্ল্যাটফর্ম।ভেবেছিলেন,বয়সের তোয়াক্কা না করে,এবার রিয়েল লাইফ ছেড়ে “রিলেও” তৈরি করবেন তাঁর ফলোয়ার নিজের শৈল্পিক গুণ দিয়ে।থাকবে তাঁর সাজের টিপস।প্রমাণ করবেন রেট্রো ফিরে আসে না,রেট্রোরাই নতুন পথ দেখায় আজীবন।কিন্তু কিছুতেই কেউ সাহায্য করছে না তাঁকে।নাতনি তো সেদিন বললো, “ঠাম্মার ফোমো হয়েছে”।সেটা কি বস্তু গুগল করতেই ইন্দিরাদেবী দেখলেন “ফিয়ার ওফ মিসিং আউট”।এসব নাকি মিলেনিয়ালদের জন্য, ইউথদের প্ল্যাটফর্ম এসব।চুপচাপ শোনা ছাড়া কোনও উপায় নেই এইবার।তাই মন ভালো করতে সেদিনই স্থির করেছিলেন “বড়োদিন”কে বেছে নেবেন তাঁর মতন বড়োদের ইচ্ছে প্রকাশের দিন হিসেবে।

(২)

বড়োদিনের পর কেটে গেছে দু’মাস।ইন্দিরাদেবীর ইন্সটাগ্রাম একাউন্টে এখন প্রায় কুড়িহাজার ফলোয়ার।রোজই প্রায় বাড়ছে সংখ্যাটা।বড়োদিনের একমাস আগে ইন্দিরাদেবী তাঁর বাড়িটার নিচের দুটো তলাকে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন একটি বৃদ্ধাশ্রমে।শুধু গুঞ্জন জানতো এই প্ল্যান প্রথম থেকে।বাড়ির একদম ওপরের তলায় সাজিয়ে রাখা আছে ইন্দিরাদেবীর সমস্ত হাতের কাজ,শাড়ী,গয়না এমনকি সাজার জিনিষগুলিও।কিন্তু শুধু এই করে কি মন ভরে ইন্দিরাদেবীর!বড়োদিনের দিন প্রায় একশো বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে নিয়ে ইন্দিরাদেবী আয়োজন করলেন ফ্যাশন-শো।পোশাক হোয়াইট,আর মেকআপে থাকলো সবুজ আর লালের ছোয়া।কলকাতার বুকে প্রথমবার নেমে এলো হোয়াইট ক্রিসমাস।বাংলার একটি বেশ নামীদামী ফ্যাশন হাউসের নাম শুনেছিলেন ইন্দিরাদেবী, ছেলের বউয়ের কাছ থেকে।ছেলের বউকে শাড়ী উপহার দেওয়ার ছলে নিয়ে নিয়েছিলেন সেই ফ্যাশন হাউসের কর্ণধার সূর্যতপা চ্যাটার্জির নম্বর।জহুরির চোখ ঠিক চিনে নিয়েছিলো আসল মানুষকে অনেক বাজার চলতি বুটিকের মাঝখান থেকে।বুদ্ধিদীপ্ত চটপটে সূর্যতপার প্রত্যেকটি সৃষ্টিতে যেনো কলকাতাকে বিশ্বায়ন করার শিল্পকলা।শাড়ী থেকে ঘর সাজানো সবকিছুতেই নান্দনিক রুচির পরিচয় এই মেয়ের। 

“তুমি হবে আমার নতুন কালেকশনের মডেল”বলেছিলো সূর্যতপা তাঁকে।সপ্তাহের অনেকটাই কাটতো সূর্যতপার সাথে।তাই সেই ব্যতিক্রমী বড়োদিনে সূর্যতপার সৃষ্টিতেই সেজেছিলো “বড়ো”রা।তার প্রয়াসেই এসেছিলো মিডিয়া।ইন্দিরাদেবীর ব্যতিক্রমী প্রয়াসকে “ফলো” করবে না মানুষ,তা অসম্ভব।এই প্রথম কলকাতাকে রেট্রো হয়ে যাওয়া মানুষরা দেখিয়ে দেয়,বয়সের অভিজ্ঞতায়,সাদা থানেও মিশে থাকে আত্মবিশ্বাস।শুধু ছেলেমানুষিগুলোয় যেনো বাঁধা থাকে শৈশবের জেদ।কোনও একটি মিডিয়া ইন্দিরাদেবীকে এসে অনুরোধ করে কিছু বলতে।তারা লাইভ করে ইন্দিরাদেবীর বক্তব্য তাদের ইনস্টাগ্রাম পেজে।ইন্দিরাদেবী হেসে বলেন “ইনস্ট্যান্ট বেঁচে থাকার কারণ খুঁজতে ত্যাগ না ট্যাগ করুন আনন্দ।”

ভাইরাল হয় “বড়োদিন”।হ্যাসটাগ “লিভ লাইফ কুইন সাইজ”কে প্রতিস্থাপিত করে হ্যাসটাগ “ইন্দিরাদেবী”।প্রায় একশোজন বয়স্ক মানুষ প্রথমবার পান সান্তার উপহার।এক ঝুলি আত্মবিশ্বাস আর আত্মবিশ্লেষণ ক্ষমতা।

ইন্দিরাদেবীর অফিসিয়াল পেজ তৈরি হয় ইন্সটাগ্রামে।সূর্যতপা দেখিয়ে দিয়েছে গুঞ্জনকে তা দেখাশোনা করতে।তিনতলার ঘরটায় মাঝেমাঝে বসে সৌখিন জলসা।লাল হৃদয়ে ভরে যায় সেই সব ছবি।লাইক আসে সেই সিনেমা করা ছেলেটারও।লাইক আসে আরও অনেক বিদ্দজনের।স্থাবর অস্থাবর অনেককিছু গুঞ্জনের নামে করে দিয়ে রাণীর মতন চলে গেছিলেন ইন্দিরাদেবী বড়োদিনের এক সপ্তাহ পর।হঠাৎ থেমে যায় হৃদয়ের চাবিকাঠি অন্য অনেক হৃদয়ে আশার আলো দেখিয়ে কিন্তু এখনও যখন তিনতলার ঘরটা দেওয়া হয় কোনও ফটোশুটে বা বিদ্দজনের আড্ডায়,গুঞ্জন অনুভব করে “লাইভ” হয় “ভিনটেজ” ইন্দিরাদেবী তাঁর সখের পেন্টিং আর এন্টিকের মধ্য দিয়ে।ক্যানভাসে তুলি ছোঁয়ায় গুঞ্জন...নো ফিল্টার পোট্রেট তৈরি হচ্ছে তার ভিনটেজের!

লেখিকা সুষ্মিতা রায়চৌধুরী 
নিউ জার্সি, আমেরিকা


















0 Comments