টেলিফোন ~ ডা: অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প


ডা: অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প 
টেলিফোন 

টেলিফোনটা প্রায় মিনিট পনের আগে এসেছে। সোফায় বসে হাতের ম্যাগাজিনটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বিরক্ত ভাবে হাতঘড়িটা দেখে বুঝল উৎপল। বিরক্ত ভাবে এই জন্যেই কারণ এখন রাত বারটা বেজে গেছে। বিছানায় বসে শ্রাবন্তীর জন্যে অপেক্ষা করছিল। ইতিমধ্যে হাই-ও উঠেছে ক’টা বেশ বড় বড়।কিন্তু বউ ফেরেনি বিছানায়।

বাধ্য হয়ে সোফায় গিয়ে বসেছে।সোফায় বসলে ঘুমটা অনেক কম পায়।অর্ধেক রাত তো কেটেই গেল।এখনও বিছানায় বউকে না পেলে বিরক্ত ধরে না? শ্রাবন্তী অবশ্য বিছানায় যাওয়ার আগে বাথরুমে যায় নিত্য। এটা একটা ভাল অভ্যাস বলে উৎপল মনে করে।এতে নিজের শরীর মন যেমন সাফা হয় তেমনি তার শরীরের এই ধোয়া ধোয়া গন্ধটা খুব প্রীত করে উৎপলকে। ঠিক মনে হয় যেন একটা টাটকা গোলাপ এসে হাজির তার হাতের নাগালে।মাত্র একটা ঘন্টার এই আনন্দ উপভোগ তার অবশিষ্ট রাতটাকে ভরিয়ে রাখবে মাতিয়ে রাখবে সুগন্ধে।

শ্রাবন্তী বাথরুমে ফ্রেশ হতে যায় রোজ যেমন যায়। টিভির টেবিলের ড্রয়ারে ওর মোবাইলটা বেজে উঠল।এত রাতের বেজে ওঠা মোবাইলের আওয়াজ শুধু বিরক্তি উৎপাদন করে তাই নয়,কৌতূহল এমন কি আশংকাও আনতে পারে মনে। বিশেষ কোনও আত্মীয় স্বজনের কোনও দুঃসংবাদ বহন করে আনল কিনা সে বিষয়ে চিন্তা থাকে।

রিং টোনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে আসছে।উৎপল কলটা রিসিভ করবে কি করবে না ভাবতে না ভাবতেই বাথরুম থেকে তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়েই দৌড়ে চলে এসেছে শ্রাবন্তী।প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছে মোবাইলটা।স্ক্রিনটা একবার দেখেই চলে গেল ঘরের বাইরে।

খুব নিচু গলায় ফোনালাপটা চলছিল। বেশির ভাগই মেয়েটি কথা। আর মাঝে মাঝে খিলিখিল আওয়াজটা টের পাচ্ছিল বেশ।এতদূর থেকে অবশ্য ফোনের ও প্রান্তের কথা কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।শোনা যাচ্ছিল না শ্রাবন্তীর কথাগুলোও। সে বেশ চাপা গলাতেই কথা বলছিল। তবে শ্রাবন্তীর একটা দোষ আছে। হাসে সে একেবারে লাগামছাড়া। অনবরত খিলখিল খিলখিল যেন দু-তিনটে ঝরণা একসঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে শ্রাবন্তীর গলায়। কখনও কখনও উৎপলের মনে হয় পাশ দিয়ে যেন একটা এক্সপ্রেস ট্রেন বয়ে যাচ্ছে। এ সবই গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে যেটা হয় নি সেটা হল রাতদুপুরে এই ফোন আসা আর মোবাইল হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে চাপা গলায় কথা বলা। যেটা মাত্র কদিন হল শুরু হয়েছে।

কুড়ি মিনিট পঁচিশ মিনিট। কথা বলার বিরতি নেই নেই তার শেষ।দরজার কাছ থেকে ততক্ষণে ডাইনিং-এ নেমে গেছে শ্রাবন্তী। এখন তাকে আর দেখা যাচ্ছে না।শোনা ও যাচ্ছে না তার কথাও।তবে মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে হাসির ওই ঝরণাধারা।

কি আপদ বল তো। ঘুম পেয়ে দরকচা হতে চলল। উৎপল ভেবে দেখল এতক্ষণে শ্রাবন্তীকে তার অর্ধেকটা আদর করা হয়ে যেত। মনটা ভরে উঠত উত্তেজনা আর উন্মাদনায়। ক্রমে সেগুলো ছুটে যেত পরিতৃপ্তির চরম লক্ষের দিকে। বদলে অপেক্ষার বিরক্তি,ঘুম আর আনন্দ দুই নষ্ট।

দরকারী ফোন নিশ্চয় নয়। হলে কথাতেই ব্যস্ত থাকত শ্রাবন্তী। এত খিলখিলে হাসি আর বেরোত না। অথবা দুএকবার হাসির ধ্বনির পরেই শোনা যেত ‘গুড বাই বা গুড নাইট’ জাতীয় শব্দ সমষ্টি।

দুই

বিরক্ত উৎপল দরজার পাশে এসে দাঁড়াল।একটু আড়ালে। এখান থেকে শ্রাবন্তীকে দেখা যাচ্ছে না বটে কারণ সে আছে একটা থামের আড়ালে। তবে শোনা যাচ্ছে তার কথা কিছু কিছু। তবে সতর্ক রইল সে। চুরি করে তার কথা শোনা হচ্ছে বলে মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারে।বোধ করতে পারে অসম্মানিতও।

কিন্তু শ্রাবন্তীর তখনও কোনও হুঁশ নেই। সে বলেই চলেছে,বাবা তোমার এত কথা মনে আছে? চোখে চোখ হাতে হাত?

বলেই খিলখিল করে হাসি। হাসতে হাসতেই এদিকে একবার তাকাল সে। হয়ত খেয়াল হল যে একজন তার কাছে অসময়ে আসা এই ফোন কলে বিরক্তি বোধ করতে পারে। চোখে তার সন্দেহ যদি স্বামী এদিকে হঠাৎ চলে আসে? ডাইনিং-এ আলো এখন নেভানো। ঘরের খোলা একটা দরজা দিয়ে যে আলো আসছে তার আভাতেই আলোছায়াতে মোড়া।এই আধা আলো আধা ছায়াতে ফিসফিসে গলাতে মোবাইলে কথা আবার সেই সঙ্গে ফিসফিসে হাসি- স্বামীর সন্দেহ আসতেই পারে।

পেছন ফিরে দেখে নিশ্চিন্ত হল এই ভেবে যে উৎপল এখনও ঘরেই রয়েছে।হয়ত বিরক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অথবা কোনও টিভি চ্যানেল খুলেছে। খেলার চ্যানেল কি ডিসকভারি।

ফোনে নিজের বলা কথাগুলো নিজের কানেই যেন সন্দেহ উদ্রেগ করছে।স্বামী এসে যদি শোনে তাহলে কি ভাববে? আসলে বলার আগে তার খেয়াল থাকে না।খেয়াল হয় বলার পরে।    

উৎপলও ভাবল শ্রাবন্তী ফিরে এসে তাকে এখানে দেখে কিছু একটা ভাবতে পারে।তাই সে ঘরে ঢুকে গেল। বিছানায় উঠে মটকা মেরে পড়ে রইল। কথা বলা সেরে ফিরে এল শ্রাবন্তীও।প্রয়োজনীয় কাজ সেরে টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে জল খেয়ে নিল ধক ঢক করে।তারপরে শুয়ে পড়ল।

উৎপলের জোর ঘুম পেয়ে গিয়েছিল। সে চোখ খুলতে পারছিল না।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। মাঝরাতে একবার ঘুম ভেঙ্গে দেখল তাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে শ্রাবন্তী।  

তিন

শ্রাবন্তীর আগেই ওঠার রেওয়াজ উৎপলের।এটা তার বহুদিনের অভ্যাস।পরের দিন অবশ্য অস্বাভাবিক কারণে উঠতে একটু দেরি হল। শ্রাবন্তী উঠে উৎপলের গায়ে ঠেলা দিতে কয়েকবার হুঁ হুঁ করে বলল, গা-টা একটু ম্যাজম্যাজ করছে।একটু পরে উঠব।

শ্রাবন্তী আর সময় নষ্ট করতে পারে না।তার হাতে অনেক কাজ। স্বামীর অফিসের তাড়া আছে। তার পরে তার নিজেরও অফিস।স্কুল মিসট্রেস বলে সময়টা অবশ্য একটু পরে।স্বামীকে খাইয়ে বিন্তিকে তৈরি করতে হবে।স্কুলের গাড়ি আসবে সাড়ে নটায়। 

আন্দাজে বোঝা গেল শ্রাবন্তী এখন বাথরুমে। বিন্তিকে ফ্রেশ করে সে নিজে ফ্রেশ হবে। আজ অসুস্থতার বাহানায় অফিস কামাই করবে উৎপল। তাই বিছানাতেই পড়ে আছে। শ্রাবন্তী তার চা বিস্কুট দিয়ে গেছে। খাবার ঢাকা দেওয়া থাকবে। আজ জ্বর দেখে তার জন্যে আর ভাত করে নি। রুটি করে রেখে দিয়েছে ক্যাসারলে। আর অন্য ক্যাসারলে রয়েছে চিকেন। চা বা কফি যদি দরকার হয় তো পারলে উৎপল করে নেবে।

এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকার ছেলে তো তার স্বামী নয়। সন্দেহবশে চা দেবার সময় হাত ঢুকে গেছে উৎপলের গেঞ্জির ভেতরে।নাঃ গা যেন একটু গরমই ঠেকল। মনে হচ্ছে আজ আর অফিস যাবে না সে। কৌটোয় প্যারাসিটামল আছে। জ্বর বাড়লে নিজেই খেয়ে নেবে।

বিছানায় বসে বসে বালিশের নিচে হাত গলাল উৎপল। বেরোল তার বউয়ের মোবাইল। কল হিস্ট্রিতে রিসিভ কলের লিস্ট নিয়ে পড়ল। একি সর্বশেষ কল কাল দুপুর আড়াইটায়। তাও করেছে তার মেয়ে বিন্তি। বাড়ি থেকে বোধহয় স্কুলে যেতে দেরি হয়ে থাকবে যে মেয়েটা তাকে স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে তার। তাই চিন্তায় ফোন করেছিল মাকে।

কিন্তু কাল রাতের কলটা গেল কোথায়? যেটা কাল রাত সাড়ে এগারটায় এসেছিল।শ্রাবন্তী মুছে দিয়েছে নাকি? নাকি সেটা এসেছিল তার অন্য কোনও মোবাইলে? কিন্তু শ্রাবন্তীর তো আর কোনও মোবাইল নেই?

কালকের সেই ‘হাতে হাত চোখে চোখ’ কথাটা মনে পড়ে গেল উৎপলের।তার সঙ্গে মেলাল এই কল মুছে দেবার ব্যাপারটা। খুব রহস্যজনক।জটায়ুর ভাষায় ‘হাইলি সাসপিসাস!’।ভেবেছিল আজ একটু বিশ্রাম নেবে। শ্রাবন্তীর কালকের সেই টেলিফোন আসা আর তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার মনকে খুব ক্লান্ত করে দিয়েছে।

ডাইনিং টেবিলে বিন্তির সঙ্গে খেতে বসেছে শ্রাবন্তী। একসঙ্গে বেরোবে। বিন্তিকে অবশ্য অন্য একজন তার স্কুলে পৌঁছে দেবে।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামান্য একটু চেঁচিয়ে উৎপল বলল,কাল রাতে তোমার একটা ফোন এসেছিল? ওঃ বাবা আমি তো অপেক্ষা করতে করতে একেবারে ঘুমিয়েই পড়লাম।

খাওয়া সামান্য ক্ষণের জন্যে থামাল শ্রাবন্তী। তারপর বলল,হ্যাঁ আমার এক বন্ধু।তুমি চিনবে না।

-খুব ঘনিষ্ট বান্ধবী? অত রাত্রে ফোন করল তাই বলছি আর কি।

বান্ধবী কথাটার ওপর জোর দিয়ে উৎপল জেনে নিতে চাইল যে ফোন করেছিল সে সত্যি বান্ধবী কিনা। অথবা বন্ধু কিনা।

আর কোনও কথা হল না। খাওয়া শেষ করে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেল শ্রাবন্তী। কিন্তু হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে পড়ল উৎপল। চান করে অফিস যাওয়াই ভাল। কালকের ব্যাপারটা নিয়ে মনটা খুব খচ খচ করছে। প্রথমে ভেবেছিল সারাদিন শুধু ঘুমোবে আর তাহলেই সে চিন্তা মাথা থেকে পালাবে।কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে অফিসে যাওয়াই ভাল।সেখানে কাজ আর অফিসে নানা লোকের আনাগোনায় চিন্তার বোঝা কমবে।

বউ কি সব শুকনো খাবার করে রেখে গেছে। সেগুলোই খেয়ে নিল। লাঞ্চ যা হয় অফিসে বসেই করে নেওয়া যাবে। আজ ওদের মেনু বোধহয় চিকেন আর তন্দুরি।মনটা ভাল করার পক্ষে যথেষ্ঠ।

চার

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় বাড়ি ফিরল উৎপল।বিন্তি পড়ার ঘরে বসে পড়ছে। ওর মিস এসেছে। শ্রাবন্তী এখনও এসে পৌঁছয় নি।কাজের মেয়েটা এক কাপ চা আর জলখাবার এনে দিল। অন্যদিন এই কাজ শ্রাবন্তী করে। তাই অবাক চোখে তার দিকে তাকাতেই সে তাড়াতাড়ি বলল,দিদিমণি তো এখনও আসে নি। আমার কাজ সারা হয়ে গেছে। দিদিমনি বলল তার নাকি দেরি হবে।তাই আমি আপনার চা জলখাবার করে দিলুম। আর যদি কিছু লাগে টাগে তো বলবেন।  

-তোমার দিদিমনির সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল?

-না না। আপনার মেয়েকে যে ইস্কুল থেকে আনতে যায় তাকে ফোন করে এ কথা বলেছে দিদিমনি আর আমায় বলতে বলেছে আমি যেন আপনার আসার পরে চা-টা এসব দিই। যে ইস্কুলে আপনার মেয়েকে দিতে যায় তার পাশের বাড়িতে আমি কাজে যাই। তখন সে বলেছে আমাকে দাদা।

-আচ্ছা বেশ। আমার এখন কিছু লাগবে না। তোমার কাজ হয়ে গেলে তুমি যেতে পার।

তাকে এটা জানিয়ে উৎপল ভাবতে লাগল। শ্রাবন্তীর স্কুল তো চারটে পর্যন্ত। আসতে আসতে বড় জোর সাড়ে চারটে হতে পারে তার বেশি নয়। এত দেরি হয় না কখনও।দেরি হলেও সে ফোন করে উৎপলকে জানিয়ে দেয়। নেট-ওয়ার্কের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এর মধ্যে অনেক কল ঢুকেছে তার মোবাইলে। বাড়ি আসার পরও।অতএব ফোন একবারের জন্যেও করে নি শ্রাবন্তী। তবে কি তার এই দেরির ঘটনাও জুড়ে দিতে হবে কাল রাতের ফোন আসার ঘটনার সঙ্গে?

নটার একটু পরে এল শ্রাবন্তী। কৈফিয়তের সুরে বলল,একটু দেরি হয়ে গেল জান?

কেন দেরি হল সেটা জানতে চাইল না উৎপল। তার বড় বিরক্তি লাগছে। যেন তার এই না জানার ইচ্ছার মধ্যে দিয়েই সে তার বিরক্তিটা প্রকাশ করতে চায়।

-আসলে মিলেনিয়াম পার্কে আজ বড় ভিড়। তাই দেরি হয়ে গেল।

মিলেনিয়াম পার্কে!কেন? একা শ্রাবন্তী না সঙ্গে অন্য কেউ?প্রশ্নগুলো মনে এলেও মুখে এল না উৎপলের।

বেশ তৃপ্তির সঙ্গে হাসল শ্রাবন্তী। যেন খুশিতে বেশ ডগমগ।

-কি করব বল? বন্ধুর একটা ইচ্ছে তো পূরণ করতেই হবে?

-বন্ধু! নিজের অজান্তেই অস্ফুটে নিজের মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল উৎপলের।সামলে নিয়ে গলা বিশেষ কায়দায় গম্ভীর করে নিয়ে বলল,তা কথাটা ফোনে জানালে কি হত শুনি?

-আরে দূর। বন্ধুই তো কথাটা কাউকে জানাতে বারণ করেছিল। কি করব বল এতদিন পরে তার সঙ্গে দেখা। তার ইচ্ছের একটা মর্যাদা দেব না?

এতদূর! নিজের স্বামীর অধিকারের থেকেও পুরোন এক বন্ধুর ইচ্ছেই বড় হয়ে দাঁড়াল শ্রাবন্তীর কাছে? নিজের বউ-এর দেরি হওয়ার উদ্বেগ কি স্বামীর অধিকারের মধ্যে পড়ে না?

এই বন্ধু কি সেই বন্ধু যে কাল অত রাতে ফোন করেছিল? আর কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসির জলতরঙ্গ বইয়েছিল? আবার ‘হাতে হাত চোখে চোখ রেখে’ কথাটা মনে করিয়ে দেবার জন্যে ধন্যবাদ দিয়েছিল। এ বান্ধবী নাকি বন্ধু যার ফোন কল হিস্ট্রি থেকে সাত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলতে হয়?

প্রশ্নগুলো উত্তর পাওয়ার জন্যে বড় আঁকুপাঁকু করছিল উৎপলের মনের মধ্যে।এত সাহস লোকটার যে সে শ্রাবন্তীর স্বামীকে মিথ্যে কথা বলতে প্ররোচিত করে?

আর কিছু বলল না উৎপল। ভেতরে চলে গেল শ্রাবন্তী। সে ভীষণ অন্যমনস্ক।খুব চিন্তাচ্ছন্ন। তার যেন মনে অন্য এক ঝড় চলছে। উৎপলের প্রতি বর্তমানে সে তেমন আগ্রহী নয় বলেই মনে হল।

আজ রাতে আর কোনও ফোন এল না।যদিও সেটার জন্যে অধীর আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছিল উৎপল।ঠিক সময়েই ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এল শ্রাবন্তী। উৎপল ভাবল বলতে যখন চায় না বউ তখন চাপাচাপি করার কি দরকার? সে স্ত্রী হলেও মানুষ হিসেবে তার অধিকার তো আর অস্বীকার করা যায় না? তার চেয়ে ব্যাপারটার একটা মধুরেয় সমাপয়েত হলে ভাল হয় না?

খাটেই মাথার কাছে আলো নেভানো জ্বালার সুইচ। উঠতে হয় না বিছানা ছেড়ে।তখনও নাইট ল্যাম্প জ্বালা হয় নি। সবে এসে শুয়েছে শ্রাবন্তী। কিন্তু অন্যদিন যেমন সঙ্গে সঙ্গে উৎপলের দিকে চেয়ে মধুর হাসি হাসে তেমন হাসল না সে। তাকিয়ে রইল অন্যদিকে অন্যমনস্ক ভাবে। তবু ভাব বজায় রাখতে আগ্রহী উৎপল। কিন্তু কৌতূহল যাবে কোথায়? হালকা হেসে বলল, কি ব্যাপার বল তো,তোমার সেই বন্ধু আজ তো ফোন করল না?

ওপাশ ফিরে শুয়ে শ্রাবন্তী বলল,দরকার নেই তাই করে নি। হলে আবার করবে।

গলা শুনে মনে হচ্ছে সে বেশ একটু অসন্তুষ্ট।

ছাড়ল না উৎপল। বলল, ঠিক মত বাড়ি পৌঁছল কিনা সেটা অন্তত সে ফোন করে জানাতে তো পারত?

সামান্য চুপ করে রইল শ্রাবন্তী। তারপর ঝাঁঝ যেন একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল, তার কি উচিৎ আর কি উচিৎ নয় এ জ্ঞান তাকে দেবার আমি কে? সে তো যথেষ্ট বড় নাকি?

উৎপল ভেবেছিল বউ বলবে সে তো সাবালক বা সাবালিকা নাকি? এই কথাতেই ধরা যেত বন্ধু নাকি বান্ধবী। কিন্তু এই জেন্ডারের ব্যাপারটা উহ্য থাকার ফলে তার কৌতূহল সমান ভাবেই জিইয়ে রইল। মনের মধ্যে তীব্র অশান্তি আর অস্বস্তির ঘূর্ণি পাক খেতেই লাগল।

পাঁচ

দিন দুয়েক পরে আবার ফোন এল শ্রাবন্তীর মোবাইলে। ঠিক রাত সাড়ে এগারটার পর।আবার তার সেই বাথরুম থেকে ছুটে এসে মোবাইল নিয়ে তার বাইরে বেরিয়ে যাওয়া।আবার সেই দীর্ঘ বিরক্তিকর আলাপচারিতা আর শ্রাবন্তীর খিলখিলে হাসি।

শরীরটা তেমন ভাল না লাগায় আজ দুপুর তিনটের মধ্যে ফিরে এসেছে উৎপল। শ্রাবন্তী তো এ সময় স্কুলে থাকে।ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে শ্রাবন্তীর নিজের শোকেসের চাবি থাকে। শো-কেসটা তার একেবারে নিজের। তার নিজস্ব সাজগোজের জিনিস আছে তাই উৎপলকে একেবারে ঘাঁটতে দেয় না। তবে মেয়ে বলে বিন্তি একটু অতিরিক্ত সুযোগ পায়। উৎপল অবশ্য এ ব্যাপারে বেশি আগ্রহী নয়।

আজ হঠাৎ আগ্রহী হল। একটা ছোট্ট চাবি জোগাড় হল এদিক সেদিক মানে এ ড্রয়ার সে ড্রয়ার হাতড়ে হাতড়ে। খুলল শো-কেসটা। সব সাজগোজের জিনিস একেবারে পাহাড় প্রমাণ।সে হয়ত অন্য কিছু পাবে এই আশায় আলমারিটা খুলেছিল।কিছু ছবি কি হাতের লেখার ক’টা ছত্র। মানে প্রেমপত্র টত্র।

ধুস ওসব কিছুই নেই। পেল একটা পাসবই।একটা ব্যাংকের।একাউন্টটা শ্রাবন্তীর একার নামে। কিন্তু উৎপলকে নমিনি করা আছে।আলাদা একাউন্ট খুলে টাকা জমিয়েছিল তার বৌ?কবে জমাল?অবাক কান্ড সে এর বিন্দু বিসর্গ জানে না।

পাসবই ঘেঁটে তো চক্ষু একেবারে চড়কগাছ।প্রায় পৌনে দু’লাখ টাকা। কিন্তু এত টাকা সেভিংসে কেন? ফিক্সড করে নি কেন? তারপর ভাবল হয়ত শ্রাবন্তী ভেবেছিল পুরো দু’লাখ টাকা হলে করবে।এসব নিয়ে অতটা মাথা ঘামাল না সে। যেটা নিয়ে ঘামানোর সেটা কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। এই মাসখানেকের মধ্যে প্রায় দেড়লাখ টাকা এর থেকে তুলে নিয়েছে।তার মানে প্রথম ব্যালেন্স অনেক বেশি ছিল।

সব টাকা নিজে তুলেছে। সব উইথড্রয়াল বাই সেলফ করা আছে। কিন্তু এত টাকা জমালোই বা কি করে আর তুললোই বা কার জন্যে? সবচেয়ে অবাক কান্ড হচ্ছে এর ছিটেফোঁটাও জানতে পারে নি উৎপল।কি জানি কার জন্যে খরচা করেচে বিশ্বাসঘাতিনী।সঙ্গে সঙ্গে মনে এসে গেল ফোনে বলা সেই ‘হাতে হাত আর চোখে চোখ রেখে’ কথাগুলো।ঘেন্না হতে লাগল নিজের বৌয়ের জন্যে। মনটা ক্লেদাক্ত হয়ে উঠল।বিষাক্ত হয়ে উঠল।

যা দেখার তা দেখা হয়ে গেছে তার। সব কিছু আগের মত পরিপাটি করে চাবি দিয়ে রাখল। ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিল সোফায়।একটু পরে বিন্তিকে নিয়ে মেয়েটা আসবে।তারপর-না শ্রাবন্তী এখন আর ঠিক সময় মত আসে না। কেন আসে না তার কোনও পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যায় না তার কাছ থেকে। ডিভোর্স করবে বৌকে? কিন্তু কোন গ্রাউন্ডে? প্রমাণ তো কিছু নেই সে বিশ্বাসঘাতিনী বা ব্যাভিচারিনী। শুধু সন্দেহের বশে কিছু হয় না। হ্যাঁ এ কথা ঠিক যে সে এখন ভাল করে বিছানায় তার সঙ্গ দিতে পারছে না। সেটা তো কোনও অপরাধ নয়? তাছাড়া নিজের মাইনে থেকে নিজের নামে আলাদা একাউন্ট খুলে টাকা জমান বা সেই জমান টাকা থেকে উইথড্র করাটা তো কোনও দোষের কিছু নয়। শ্রাবন্তী চাকরি না করলেও নাহয় কথাটা তুলতে পারত। বৌ তো তার স্বাবলম্বী।নিজের টাকা সে জমাবে বা তুলবে সে তো তার নিজের ইচ্ছে আর হিসেব। অন্য কারোর কিছু বলার থাকতে পারে না তাতে। এটা কোনও অভিযোগ হতে পারে না স্ত্রীর বিরুদ্ধে।  

না না ডিভোর্স কোনও সমাধান নয়। সে যথেষ্ঠ ভালবাসে তার বৌকে আর যতদূর সে জানে তার বৌও তাকে বাসে। কোনও অজানা কারণ হয়ত ব্যক্তিগত রুটিন এলোমেলো করে দিয়েছে। হয়ত ব্যাপারটা সত্যি গোপনীয় তাই সে বলতে পারছে না।

আর ডিভোর্স করলে মেয়েটার কি হবে? তখন কোর্টের চত্বরে তার দখল নিয়ে বিশ্রী চাপান-উতোর চলবে। ওইটুকু মেয়ের জীবন বরবাদ হয়ে যাবে।ওই মেয়েটা তো নিজে নিজে এই পৃথিবীতে আসে নি। তাকে যে বাবা-মা যারা এনেছে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে কি করে নিজেদের ডিভোর্সের বর্মের মধ্যে পুরে ফেলে?এদের নিয়ে হওয়া সিনেমা সিরিয়ালের তো আর অভাব নেই? ডিভোর্স একটা আপাত সমাধান। স্থায়ী নয়।

একটু পরেই আবার ভাবতে বসল সে একটু হিসেবের বাইরে ভেবে ফেলছে না তো?

সাড়ে আটটার আগেই এসে পড়ল শ্রাবন্তী।এখন মুখ তার বেশ গম্ভীর থাকে।আগের মত অত কথা বলেও না সে আগের মত।এমন কি বলে না মেয়ের সঙ্গেও।কেমন যেন পালটে যাচ্ছে তার দুষ্টু-মিষ্টি বৌটা।

ছয়

আজ বেশ একটু আগে মানে দশটার সময় ফোনটা এল। বিরক্ত হলেও কৌতূহলী উৎপল কান খাড়া করল।
ও পাশের কথা তেমন কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এপাশ থেকে অদ্ভুত চাপা হলেও তার খুশির ভাবটা ছাড়াতে পারছে না।
খুশি তো হবেই। খুশির রসদ মিলছে যে রোজ। ভাবল উৎপল। গায়ের সেই জ্বালার ভাবটা যেন আবার এসে হাজির।
-যাক বাবা একটু ভাল আছ। বাঁচলাম। ঘাম দিয়ে গা থেকে জ্বর ছাড়ল।আরে বাবা ঠিক আছে ঠিক আছে আমি যাব বলছি তো নাকি?

এরপর মেঝেতে হালকা একটা খসখসে আওয়াজ পেয়ে গলা আরও নামাল শ্রাবন্তী।আওয়াজটা উৎপলের পায়ের। তার গায়ের জ্বালাটা ডাইনিং-এর বাতাসে যদি একটু কমে সেই প্রচেষ্টা।

এরপর সামান্য কটা কথা। আরও নিচু গলায়। উৎপলের শোনা হল না।ফোন রেখে ঘরে ঢুকল শ্রাবন্তী। তারপর আবার বেরিয়ে গেল। সবাইকে খেতে দেওয়া বাকি আছে।এবার সে খাবার সাজাবে ডাইনিং টেবিলে।মেয়ের পড়া শেষ হবে আধঘন্টা পরে।রান্নাটাও কিছু বাকি আছে। ততক্ষণে সেটা সেরে নেওয়া যাবে।   

-ফোনটা সেই বন্ধুর বুঝি?খাওয়ার টেবিলেই প্রশ্নটা করল উৎপল। তার গলায় সামান্য শ্লেষের আভাষ।

শ্রাবন্তী উত্তর না দিয়ে খাবার সার্ভ করতে লাগল। আর কোনও প্রশ্ন করল না উৎপলও। বিন্তিও খেতে বসেছে। তার সামনে অস্বস্তিকর কিছুর আলোচনা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সে খাওয়ার পর নিজের ঘরে ঢুকে গেল। আর ঢুকে গেল উৎপলও তাদের বেডরুমে। বাইরে একটু সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্রাবন্তীর মোবাইলটা হাতে নিল। সে এখন বাসন পত্র গোছাবে তার অনেক কাজ। আধঘন্টার আগে মিটবে না মনে হয়।

রিসিভ কল থেকে লিস্ট বার করল।যে কলটা এল সেটা নিশ্চয় মোছার সময় এখনও পায় নি। মনে খুব আনন্দ হল তার।সত্যি সেটা মোছা হয়ে ওঠে নি শ্রাবন্তীর।

কিন্তু একি? নামটা সেভ করা রয়েছে শুধু ‘গ্রেট ফ্রেন্ড’ নামে। এই ফ্রেন্ড ছেলে কি মেয়ে এর থেকে কোনও কিছুই বোঝার উপায় নেই। ত্রস্ত হাতে নম্বরটায় রিং ব্যাক করল সে। শ্রাবন্তী ঘরে ঢুকে পড়লেই মুশকিল। কি কৈফিয়ত দেবে সেটাও আগে থেকে ভেবে ঠিক করে রাখতে হবে।আসলে এটা তো একটা বিশ্বাসঘাতকতাই।

কিন্তু ভাগ্য খারাপ উৎপলের।সুইচ অফ।মানে শ্রাবন্তীকে ফোন করার পরই হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে ওপারের লোকটা। কিন্তু রাত তো এখন এমন বেশি কিছু নয়। একটা পুরুষ মানুষ এত তাড়াতাড়ি ঘুমোয়? অসুস্থ মানুষ নাকি? হতেও পারে। সে অসুস্থ বলেই শ্রাবন্তীকে অমন মরা মরা মেজাজের লেগেছে তার। পরক্ষণেই মনে মনে হেসে উঠল সে। ওপারের মানুষটাকে ‘লোক’ বলে ভাবছে সে। মহিলাও তো হতে পারে। লোক এ প্রমাণ তো এখনও পাওয়া যায় নি। মানব চরিত্র বড় বিচিত্র।

সাত 

পরের দিন সন্ধে সাড়ে সাতটায় বাড়ি ফিরে বন্তির কাছে শুনল তার মা স্কুল থেকে ফিরে আবার কোথায় যেন বেরিয়েছে। কিন্তু এমন অসময়ে আবার কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর নেই মেয়ের কাছে। বিন্তি বলল, জানি না। তবে পাঁচটার সময় ল্যান্ড ফোনে একটা কল এল বাবা। মা ধরে কথা বলে ছেড়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল এখুনি যেতে হবে।

ল্যান্ড ফোনে? অবাক হল উৎপল।ল্যান্ডফোনে কল করেও আজকাল অভিসার হচ্ছে তবে? সাহস এত বেড়েছে? সাপের পাঁচ পা দেখেছে নাকি?

-ওই যে কি যেন আরোগ্য ভবন নাকি নাম বলছিল মা। ঠিক মনে নেই তবে ঠিকানাটা মা কাগজে লিখে দিয়ে গেছে।

কাগজটা এনে দিল মেয়ে। অফিসের পোশাক আর ছাড়ল না উৎপল। বেরিয়ে পড়ল সাঁ করে। মেয়ে পেছন থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি মাকে আনতে যাচ্ছ নাকি বাবা?

সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নষ্ট করার মত সময় হাতে নেই উৎপলের। সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

বিশেষ খুঁজতে হল না। আরোগ্য ভবন।খাশা নাম বটে। এমন বাড়ি না হলে কি আর অভিসার জমে? গলির মোড় থেকে একটু এগিয়েই দেখতে পেল বাড়িটা। কিন্তু একি? আরে এ তো একটা নার্সিং হোম। আচ্ছা বোকা হচ্ছে সে যেন দিনদিন। আরোগ্য ভবন মানে মানুষ যেখানে আরোগ্য মানে রোগমুক্তির জন্যে আসে। সে তো হাসপাতাল মা নার্সিং হোম বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়া আর কি হতে পারে?

একেবারে নিচেই অন্য অনেকের মত দাঁড়িয়ে আছে শ্রাবন্তী। মুখে হাসি নেই কিন্তু চোখে কান্না আছে পুরোমাত্রায়। সজল চোখে সে তাকিয়ে আছে মাটিতে পাতা খাটের ওপর শোয়ান একটা দেহের দিকে।

বেডে একটা কাউকে শোয়ান আছে সাদা কাপড় জড়িয়ে। একপাশে ফুল আর ফুলের মালা জড় করা। ফুল আর ধূপের গন্ধ চলেছে যেন একটা নির্দিষ্ট লক্ষের দিকে।গেট দিয়ে মৃদু শব্দ করে ধরতে গেলে প্রায় নিঃশব্দে ঢুকল হিন্দু সৎকার সমিতির গাড়ি। এরা শব্দ করে না। এরা পৌঁছে দেয় শব্দ শেষ হয়ে যাওয়া মানুষদের শব্দহীনতার দেশে।

শ্রাবন্তীর কাছে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল উৎপল। তার কাঁধে রাখল একটা হাত। সে হাতে একটা সহানুভূতি আর সমবেদনার ছোঁয়া। সে ছোঁয়ায় এদিকে ফিরল শ্রাবন্তী।চোখে তার জলের ফোঁটাগুলো ক্রমশ বড় হওয়ার পথে। আর স্বামীকে দেখে সে জলের ফোঁটাগুলো নেমে এল যেন বাঁধ ভেঙ্গে।

-পারলাম না গো। পারলাম না। আজ দুপুরে আমি তখন স্কুলে ক্লাস নিচ্ছি। এমন সময় খবর এল অবস্থা খুব গুরুতর। মনে অস্থিরতা থাকলেও আসার পথটা বড় দীর্ঘ ছিল। আসতে আসতে সব শেষ। শেষ দেখাটাও হল না।

স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্রাবন্তী। পিঠে হাত বোলাতে বোলাতেও উৎপল ভাবছে কিন্তু অন্য কথা। সে যে তিমিরে ছিল রয়ে গেল সেই তিমিরেই। হোক না শ্রাবন্তীর পুরোন প্রেমিক। কিন্তু মৃত্যু তো মৃত্যুই।

খাটের দিকে এগিয়ে গেল শ্রাবন্তী।অনেকটাই যেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে।ডেডবডির মুখের দিকে নজর পড়ল 
উৎপলের। চারশ চল্লিশ কিংবা তার চেয়ে বহুগুন শক খেয়ে ছিটকে গেল উৎপল।

আট

আহুতির অমন সুন্দর মুখখানা সে ভোলে কি করে? হোক না উৎপল তাকে বিয়ে করতে অসম্মত ছিল এককালে। মাত্র তিন বছরের বড় হলেও শ্রাবন্তীর মাসি। নিজের অবশ্য নয়। মায়ের এক দূর সম্পর্কের বোন।দেখতে ছিল সুন্দরী।খুব গরীব। তার মা মানে শ্রাবন্তীর মায়ের জেঠিমা মারা গিয়েছিল। জ্যাঠামশাইকে নিয়ে রিষড়ায় একটা ভাঙ্গা বাড়িতে বাস করত আহুতি।গরীব স্কুল মাস্টার বাবা রিটায়ার করেছিল।তার সামান্য পেনশনের ওপর ভরসা। আরও তিন তিনটে ভাইবোনকে নিয়ে সংসার।

গরীব আর সুন্দরী বলেই উৎপলের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ করেছিল শ্রাবন্তীর মা। অর্থই তো সব নয়। রূপও তো মানুষের একটা মূলধন। দিন এগিয়ে যায় কিন্তু ধ্যানধারণা কি অতটা বদলে যায়? রূপে মজে গিয়ে অর্থের কথাটা অন্তত যদি ভুলে যায় উৎপল এ ব্যাপারে শ্রাবন্তীর মা খুবই আশাবাদী ছিল।

উৎপল বলেছিল,স্ট্যাটাস ম্যাচ করছে না।আসলে বিয়েতে পাওনা কড়ি কিছু তেমন মিলবে না তাই।অর্থের সঙ্গে স্ট্যাটাসের যে একেবারে সমানুপাতিক সম্পর্ক।

রাজি যখন হলই না তখন নিজের মেয়ের সঙ্গেই সম্বন্ধ করল শ্রাবন্তীর মা।নিজের জাঠতুতো বোনকে বারবার সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল,কিছু মনে করিস নি বোন। আমি কিন্তু তোর হবু বরকে কেড়ে নিয়ে জিজের জামাই করছি না। সে যখন নিতান্ত নারাজ তা কি করি বল?

শ্রাবন্তীর বাবা বেশ বড়লোক। সুতরাং স্ট্যাটাসের রথ আটকাল না। গড় গড় করে গড়িয়ে গেল সেই ছাঁদনাতলা থেকে মধুচন্দ্রিমা পর্যন্ত।আর এখনও অবধি গড়িয়েই যাচ্ছে। আহুতি শ্রাবন্তীর মাসি ছিল বটে, তবে মাত্র তিন বছরের হওয়ায় তার সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গতা ছিল। এটা অবশ্য আগে জানত না উৎপল। বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙ্গে দেওয়ার পর সে আর আগ্রহী হয় নি আহুতির প্রতি। আর আহুতিও আসে নি কখনও উৎপলের সামনে।

শ্রাবন্তীও তেমন খুশি যে ছিল উৎপলের প্রতি তা নয়। আহুতিকে সে ভালবাসত।তার সম্বন্ধকে নাকচ করে দিয়েছে যে লোক সামান্য গরীব বলে তাকেই বিয়ে করতে প্রথমে বেশ মনে বেজেছিল।

-কিন্তু মা কি দেখে উৎপলকে তুমি আমার জন্যে বাছলে বল তো? আমার মাসি অমন সুন্দরী তবু গরীব বলে তাকে বিয়ে করল না যে তাকেই উপযুক্ত বাছলে?এ কিন্তু ঠিক হল না।

-খুব ঠিক হল। সব মানুষের মানসিকতা সমান হয় না মুনু। গরীবকে বৌ না করার পুরো অধিকার তার আছে বৈকি। তাছাড়া তুই চাকরি করিস। চাকুরে বৌ অনেক স্বামীই চাইতে পারে। এতে দোষের কি?  

কিন্তু কি আর করবে মায়ের ওপর তো আর কথা চলে না। সেও ভাবল হয়ত বৌয়ের থেকে বৌয়ের চাকরি বেশি পছন্দ উৎপলের। আহুতি তো চাকরিও করে না।

নয়

আহুতির বাবা মানে শ্রাবন্তীর দাদু মারা যাবার আগে তাকে অনেক করে যেতে বলেছিলেন। বিন্তি তখনও হয় নি। বিয়ে সবে এক বছর হয়েছে। শ্রাবন্তীর মা এসে মেয়েকে নিয়ে গেল নিজের জ্যাঠামশায়ের কাছে। উৎপল আপত্তি করল না। নিজেও গেল না। তার মনের কোণে একটা ভয় বাসা বেঁধেছিল এই ভেবে যে যদি আহুতিকে দেখে তার কোনও বিকার উপস্থিত হয়? সুন্দরী মেয়ের রূপকে কোনও পুরুষ কখনোই উপেক্ষা করতে পারে না। শ্রাবন্তীর রূপ কম থাকলেও উপার্জন আছে।
অথবা তার আচরণে শ্রাবন্তী যদি নিজে থেকেই কোনও সন্দেহ করে বসে? মেয়েরা খুব সন্দেহ বাতিগ্রস্ত হয়। তার চেয়ে না যাওয়াই ভাল।
ডাক্তার আশা দেয় নি। শেষ শয্যায় শ্রাবন্তীর জ্যাঠামশাই তার হাত ধরে বলেছিলেন, তুই আমার মেয়ের বোন হলেও তার যে বড় বন্ধু মুনু। আমি চলে যেতে সে যে একা হয়ে যাবে।
আহুতি যেন পাথরের মত বসেছিল। যেন বড় একটা পাথরের চাঁই তার মাথায় ভেঙ্গে পড়েছে এমনি ভাবে নিথর হয়ে বসেছিল। শ্রাবন্তী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, দাদু তুমি কেন চিন্তা করছ? দরকার হলে মাসি আমার মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে।

-না মা। আমার মেয়ে কেন কারোর গলগ্রহ হয়ে থাকবে বল? তার চেয়ে বরং-

কথাগুলো খুব অস্পষ্ট হয়ে আসছে। শ্রাবন্তী জিজ্ঞেস করল,কি দাদু?

-ওর একটা বিয়ে দিয়ে দিস।

কথাটা বলেই অতীত হয়ে গেলেন শ্রাবন্তীর দাদু। তার উত্তরটা পর্যন্ত শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে পারলেন না।

দাদুকে দাহ করে পরের দিন ফিরে এল শ্রাবন্তী তার নিজের বাড়িতে। এসে শুধু খবরটা দিল। বিস্তারিত কিছু বলতে পারল না। সে শুধু আহুতির কথাই ভাবছিল। আর ভাবছিল মানুষের রূপ তার সম্পদ নয়।আসল সম্পদ হল তার ভাগ্য। বিস্তারিত কিছু জানতে অবশ্য উৎপলও চাইল না।আহুতির ব্যাপারে সে নিজেকে বেশি জড়াতে আগ্রহী নয়।   

দশ

সেই আহুতির আজ সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু প্রশ্নগুলোর তো সমাপ্তি ঘটল না? যে প্রশ্নগুলোও শ্রাবন্তী আর তার টেলিফোন ঘিরে কুহেলিকা বিস্তার করেছিল সে কুহেলিকার জাল তো হল না ছিন্নভিন্ন?

আহুতির দেহটা ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব শ্রাবন্তীর আর তার খরচেই করা হয়েছে সেটা বুঝেছে উৎপল। ধীরে ধীরে বৌয়ের হাত ধরে দেওয়ালের ধারে সরিয়ে এনেছে উৎপল। পাঁচিলের পাশে ফুলের বাগান রেলিং দিয়ে ঘেরা। মাঝে মাঝে একটু করে বসার জায়গা। নিজের পাশে শ্রাবন্তীকে বসিয়েছে সে। শোকে মুহ্যমান হয়েও পুরোন দিনের কথা সব বলে যাচ্ছে শ্রাবন্তী। এ তার যে না বলে উপায় নেই। এ যে এক হিসেবে তার বিগত দিনের অস্বাভাবিক আচরণের কৈফিয়ত দেওয়াও বটে। উৎপল না চাইলেও তাকে না জানালে শ্রাবন্তীর বড় কষ্ট হবে।  

শ্রাবন্তীর এখন মন খুব খারাপ। বেশ কিছুক্ষণ কোনও কথাই বলে নি। বোঝাই যাচ্ছে খুব ধাক্কা পেয়েছে মেয়েটা।আসলে মনের বন্ধন এতই সূক্ষ্ম যে সর্বদা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। এক সময় সে নিজেই বলতে শুরু করল,তোমার সঙ্গে বিয়ে হয় নি বটে তবু তোমাকে খুব ভালবেসেছিল মাসি। প্রথম দর্শনেই প্রেম।কিন্তু আবেগকে সে চেপে রেখেছিল বাস্তবতা আর অভিমান দিয়ে। স্বামীর দিকে ছলছলে চোখে তাকিয়ে বলল শ্রাবন্তী, যখনই আমার সঙ্গে দেখা হত মাসি শুধু বলত,আমার স্ট্যাটাস নেই বলে আমাকে বিয়ে করল না উৎপল। তার জন্যে তোকে আমি হিংসে করি না শ্রাবন্তী। কায় মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তোদের ভালবাসা যেন অক্ষয় হয়। শুধু তুই আমার সঙ্গে যোগাযোগটা রাখিস। আমার তো আর কেউ নেই। শেষ সম্বল বাবাটাও অকালে চলে গেল। তবে আমার মাথার দিব্বি উৎপলকে কোনোদিন কিছু বলিস নি।কোনোদিন জানতেও দিস নি এ কথা।তাহলে বড় লজ্জা হবে আমার।নারীত্বের অভিমানের লজ্জা।   

গলা রুদ্ধ হয়ে গেল শ্রাবন্তীর। এবার একটু জোরেই কেঁদে ফেলল,মাসির বাবা মানে আমার সেই দাদু মারা যাবার পর মাসি বড় একা হয়ে গেল। মাসি অবশ্য বিয়ে করে নি।একটা চাকরি পেয়েছিল। তবে বেশিদিন করতে পারল না।পেটে ক্যানসার ধরা পড়ল। ক্যানসারের চিকিৎসা তো জানই কত ব্যয়বহুল। আমাকে বড় ভালবাসত তো তাই লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন করত। আমার বিয়ের আগে মাসির সঙ্গে কত ভাব ছিল আমার। কত যে হাত ধরাধরি করে ঘুরেছি দুজনে। হাতে হাত রেখে চোখে চোখে রেখে আমরা গল্প করতাম দিনের পর দিন।মাসের পর মাস।

এখন যেন টেলিফোনে বলা শ্রাবন্তীর কথাগুলো টুং টাং করে বাজতে থাকছে উৎপলের কানের সামনে। সেই ‘হাতে হাত’ আর ‘চোখে চোখ’ রেখে কথাগুলো। এগুলো বলতে সে তার মাসি আর প্রাণের বন্ধু আহুতিকে। আর উৎপল ভাবত এ হল শ্রাবন্তীর গোপন প্রেমিক। চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল জল। যদিও সেই ঠেলে বেরোন জলকে সে প্রশ্রয় দিল না মোটেই তবু কে যেন তাকে বলতে লাগল সব মানুষের মধ্যে আসল যে মানুষটা আছে অনেক দুঃখের আগুনে বাইরের খোলস পুড়িয়ে সে বেরিয়ে আসে। উৎপল আজ যদি কিছুটাও মানুষ হতে পারে তবে তার অবদান আহুতির এই আত্মদান অথবা শ্রাবন্তীর এই কাহিনী পাঠ। অপমান বোধের আত্মগ্লানিতে ভুগতে হচ্ছে আজ উৎপলকে। আজ যদি সে আহুতিকে প্রত্যাখ্যান না করত তবে হয়ত তার এই ব্যাধি নাও হতে পারত। অথবা উৎপলের টাকায় তার চিকিৎসা হতে পারত।      

কে যেন আচমকা হাতুড়ি মেরে একেবারে বসিয়ে দিয়েছে উৎপলকে। কেড়ে নিয়েছে তার কথা বলার শক্তিও। শ্রাবন্তী আবার বলতে লাগল,ক্যানসারের মত রোগ কত খরচ। আমাকে শুধু বলত,আর বাঁচতে চাই না রে। গরীব বলে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবার থেকে মরণ ভাল। আমি বলতাম, মাসি তুমি ভেব না আমি যতদূর সম্ভব চেষ্টা করব তোমাকে বাঁচাতে। সে বলেছিল, আমাকে কথা দে তোর সাহায্যের কথা কিছুতেই যেন জানতে না পারে উৎপল। আর সাহায্যটা শুধু তুই তোর রোজগারের টাকা থেকেই করবি কখনও উৎপলের টাকা নিবি না।

চুপ করল শ্রাবন্তী। চোখ তো মুছতেই হবে।তারপর বলল,শেষদিকে যন্ত্রণা এত বেড়েছিল যে স্কুলের চাকরিটা আর করতে পারল না। স্কুলও কিছু সাহায্য করেছিল আরও কিছু লোক করেছিল। আমার বাবাও করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যে ছিল আমার। সে তো আমার মাসি ছিল না ছিল প্রাণের বন্ধু। তাই তিল তিল করে নিজের টাকা জমিয়েছি তার জন্যে। লক্ষ করে দেখবে এই কটা মাস আমি নিজের জন্যে কিছুই করি নি। তবু এই রোগের যা খরচ তা তো তুমি জানই। এই অল্প টাকায় আর কি ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি বল? সব শেষ হয়ে গেল।

হিন্দু সৎকার সমিতির গাড়িটা এসে গেছে। এবার খাট তোলা হবে গাড়িতে। শেষ দেখাটা দেখে নিল শ্রাবন্তী। গাড়ি ধীরে ধীরে তার পথ ধরল। নিজের পথ ধরল শ্রাবন্তীও।উৎপল তার পাশে পাশে।

-তবে আমার একটা সান্ত্বনা পূরণ হয়েছে এতেই আমি খুশি।

মহা সাহসী উৎপল আজ আর বেশি কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না যেন। অপরাধ বোধ তার মাথাটা আর সোজা করতেই দিচ্ছে না।নাহলে সেই শেষ ইচ্ছেটা কি সেটা জিজ্ঞেস করত।

নিজেই বলল শ্রাবন্তী। হয়ত সে নিজের তাগিদেই বলল। একটা অপরাধবোধ তারও কাজ করছিল। প্রানের প্রিয় কেউ না বাঁচলেও একটা অপরাধ বোধ কাজ করে। মনে হয় ইস আমি যদি আর একটু বেশি দাহায্য করতে পারতুম তাহলে হয়ত বেঁচে যেত।   

-মরার আগে আমার সঙ্গে মিলেনিয়াম পার্কে আর ইকো পার্কে যাবার ইচ্ছে তার হয়েছিল। ইকো পার্কে যাবার আগেই তো নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হল আহুতিকে। তবে মিলেনিয়াম পার্কে সেদিন ঘুরে খুব খুশি।সেদিনও কত কথা বলেছি আমরা হাতে হাত আর চোখে চোখ রেখে। আমিও খুশি তার শেষ ইচ্ছেকে পূরণ করতে পেরে। আর তাই সেদিন আমার ফিরতে দেরি হয়েছিল। বিন্তির খেয়ালও আমি তেমন করে রাখতে পারি নি। আমার অবস্থা হয়েছিল শাঁখের করাতের মত। সব ঘটনা না জানতে পেরে তুমিও চিন্তায় ছিলে আবার তোমাকে জানাতে পারছি না কারণ আহুতির মানা। এক মৃত্যুপথযাত্রীর মানাকে আমি কেমন উপেক্ষা করতে পারি বল?

স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল শ্রাবন্তী।

লেখক ডা: অরুণ চট্টোপাধ্যায় 
বৈদ্যবাটি, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ 





 

1 Comments