
ড্রিবলিং
হেমন্ত সরখেল
মাঝমাঠ পার করে বলটা এসে পড়তেই কোণাকুণি দৌড়ে কন্ট্রোল নিল দেবেশ।শেষ মিনিটের লাস্ট চান্স এটা।গজ দশেক টেনে নিয়ে যেতে হবে মাত্র। সামনে শুধু গোলকিপার। একটা রব উঠেই ডুবে গেছে রুদ্ধশ্বাসের অতলে। টোকায় বলটা এগিয়ে দিয়ে স্প্রিন্ট টানলো,জানে,গোলকিপার বেরিয়ে এসে ছোট করে দিতে চাইবে গোলের মুখ। তার আগেই ওকে ডজ করে বেরিয়ে যেতে হবে। গোল ছেড়ে বের হতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে রক্ষক। একটা ছোট্ট চিপ-এ বলটা জালে জড়িয়ে দিতেই দুটো কাণ্ড একসাথে। মাঠের উল্লাসী গর্জন আর পেছন থেকে কারো সপাটে ক্লিয়ারেন্স ওর পা লক্ষ্য করে। চোখের সামনেটায় চাপ চাপ কালো।
-- লুক ম্যান! হমারা কান্ট্রি পুওর হ্যায়,সো উই আর হেয়ার,বাট উই আর নট ডিজঅনেস্ট। আই নিড মানি,বাট-বাট দিস ইজ নট দ্য রাইট ওয়ে।
-- অ্যাজ ইউ উইস।তুমি আমার কথা মানলে পরের সিজনে ক্লাব পঁচিশ লাখে তোমায় নেবে। টোয়েন্টি ফাইভ ল্যাক্স ইজ নট এ জোক! আর শর্ত না মেনে যদি তুমি এখনের কথাগুলো ফ্ল্যাসও করে দাও,আই ডোন্ট কেয়ার,বি'কজ ইট'স্ মাই কান্ট্রি,মাই টাউন, নো বডি ট্রাস্ট ইউ,বাট,দেন আই ক্যান ড্যামেজ ইয়োর ক্যেরিয়র,মাইণ্ড ইট। যাও, আর ভাবো। ভাবো ম্যান,থিঙ্ক অ্যাবাউট মাই প্রপোজাল।
অসহায় নাসের।ওকেও মাইগ্রেট হতে হবে সপরিবার ভেনেজুয়েলা থেকে মেক্সিকো।তার জন্যও টাকা চাই। সোসিও-ইকোনোমিকসের কোর্সের পর হয়তো একটা চাকরি নিজের দেশে জুটবে, তবু একসাথে এত টাকা হলে ওর সমস্যা নিতান্তই ছোট হয়ে আসবে। মেনে নিতে ক্ষতি নেই। যেখানে ব্রেড জেলি'র সমস্যা সেখানে কেউ জানতে চায় না বিদেশে টাকা ইনকাম করলে কিভাবে।
বাঁ পায়ে জখম নিয়ে নার্সিংহোমের বেডে শুয়েই দেবেশ গেমটা আউট অফ দ্য ফিল্ড রেডি করে ফেলতে উৎসুক।গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে একবার পড়ে যাওয়ার জন্য অপনেন্ট গোলকিপার পঞ্চাশ হাজার নিয়েছে। কিছুতেই তার কমে বিট করতে পারেনি কুত্তার বাচ্চাটাকে! ভাগ্যিস ম্যাচটা দেরাদুনে ছিল! বেঙ্গলে হলে এটাও রিস্কী হয়ে যেত। হয়তো অন্য কিছু করতে হতো। করতো ও। এসব এখন জলভাত হয়ে গেছে ওর কাছে। আগের মতো প্ল্যানিং নিয়ে বুক ধরফরও করে না। খেলতে খেলাতে আজ ময়দানের ফিগার ও। শত্রু বন্ধু'র ফিগারটাও তুল্যমূল্য রাখতে পেরেছে অদ্যাবধি। কিন্তু এ ফাইনালটা জিততেই হবে,নইলে ক্লাব তো পোঁদে লাথি মারবেই আর যে দর্প দেখিয়ে ছেড়ে এসেছিল জুলেভার্ন ক্লাব,সেটাও ফ্যানেরা ভালো চোখে নেবে না। সংকট! সামলাতেই হবে।
নাসের বিদেশি। সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছে।দু দিন দেখেই ওকে তুলে নিয়েছে অসিত'দা। জুলেভার্নে'র কৌটিল্য মাল'টা। একত্রে করা বহু গটআপ কেসে ওরা মানিকজোড়।এটাতে চেয়েছে আড়াই লাখ। তার থেকে সস্তায় নাসেরকে পেতে গত রাতেই কল করে ডাকিয়েছে আজ।টাকা দরকার নাসেরের। জুলেভার্নের কেয়ারটেকার মানিক খবরটা দিয়েছিল দেবেশকে। নাসের বেরিয়ে যেতেই ফোন করলো দেবেশ,
-- কিরে,কেমন আছিস? আমি দেবেশ'দা। শোন,বলছিলি,টাকা লাগবে,নিবি নাকি? তাহলে হেল্থকেয়ারে চলে আয়,পায়ে মোচ, এখানেই পড়ে আছি,বারো নম্বর কেবিন।
প্রথম দশ মিনিটেই পরিস্কার বুঝে নিল দর্শকাশন,জুলেভার্ন রৌরব'কে সহজে ছেড়ে দেবে না। ডিফেন্সে আজ নাসেরের সাথে কানাই।পঞ্চবটী অ্যাকাডেমির বিখ্যাত গোঁয়ার। রৌরবের স্ট্রাইকিং জোন থেকে একটু নেমে মিডফিল্ডে খেলাটা ধরলো দেবেশ। দুম দাম পাঞ্চে সতর্ক ডিফেন্সে ফাটল ধরানোর চেষ্টাটা অব্যাহত রাখলো। দুটো ভালো সেভ দিয়েছে গোলকিপার।
কাফ মাসলে রসুন তেল ডলছে মাধো। আকাশের গায়ে হঠাৎ অসিত'দার মুখ। চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল ও। উঠে বসলো। হাসছে অসিত'দা।
-- নাসের নয়,তোকে আটকাবে যে সে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার থেকে সবটা সেরে এসেছে।
ইশারা পেয়ে মাধো সরে গেল। উঠে দাঁড়ালো দেবেশ।
-- আর কেউ না জানুক,তুমি জানো,এই কাপটা না জিততে পারলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। গরিয়া'র ফ্ল্যাটটা হাতছাড়া হবে। তাপারিয়া ইনসেন্টিভের টাকাটা দেবে না। ক্লাবকে সুপার ডিভিশনে না নিতে পারলে আমি ফিনিশ। সবটা জেনেও এমন করছো?
-- আড়াই। তার নিচে নয়। এখনও সময় আছে,রাজি থাকলে মাঠ থেকেই সিগন্যাল দিস।
সেই বিচ্ছিরি হাসিটা ঠোঁটে টাঙিয়ে সরে গেল অসিত।
-- হারামি একটা,খিস্তিটা আলজিভেই থমকে রইল।
সেকেন্ড হাফে ছক বদলে চার-চার-দুই করলো ও। উইং থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর এক বল তুলে যা বক্সের মাথায়। জটলার সুযোগ তৈরি না করতে পারলে সুবিধা হচ্ছে না। নাসের, কানাই দুটোই মাথায় ভোঁতা।জমিনে খাপ খোলা যাচ্ছে না।
আটাত্তর মিনিটের মাথায় এল গোলটা। রাইট উইং থেকে ভাসানো বলটা নাসেরের তালু ছুঁয়ে হাইট নিতেই ফ্লাইট মিস করলো গোলকিপার।সেকেন্ডের ভগ্নাংশে দেবেশ সেকেন্ড বারপোস্টে। চেস্ট রিসিভ করে বাঁ পায়ে ঠেলে দিল বলটা গোলে। সাথে সাথে ঘটে গেল অঘটন! উড়ন্ত ঈগলের মতো সর্বশক্তি নিয়ে ওর বাঁ পায়ের অ্যাঙ্কেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কানাই। যন্ত্রণায় কাটা পাঁঠার মতো ছটফটিয়ে উঠলো দেবেশ। যখন স্ট্রেচারে শুয়ে মাঠ ছাড়ছে তখন একটা গলা এল কানে,
-- শালা,ফুটবল খেলবি নাকি দালালি করবি,এবার সারাজীবন শুয়ে শুয়ে সেটা ঠিক কর্!
গলাটা চিনলো ও। অসিত। কানাইকে নিকুম্ভিলার পাঠ পড়িয়ে এনেছে। মনে মনে হাসলো। বাকি সময়টুকু ঠেকানোর ক্ষমতা রৌরবের ডিফেন্সের আছে। নাসের দেড় আর গোলকিপার নৃপেন কুড়ি,আড়াই-এর থেকে অনেকটা কম। বেচারা অসিত! ময়দানে ট্রাম্প-ওভারট্রাম্পে যে নজর রাখতে হয় সেটা ভুলেই মেরে দিয়েছিল।ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট নিয়েছে। চোখ বুজতেই ওর মনে পড়লো, ক্লাস এইটে প্রথম বাবলু'দার জুতোর স্পাইক তুলে কীভাবে ঢিলে করে আবার বসিয়ে রেখেছিল ফাইনালের আগে। ভাগ্যিস করেছিল!নইলে আজ ও কোথায় থাকতো! হয়তো কানুদার ফাই-ফরমাশ খাটতো নইলে হয়তো কোন নামি ফুটবলারের বুটে ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে রাখতো সুখতলা,রেডি করে দিত ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে।



0 Comments