লক্ষ্মণ দাস ঠাকুরার প্রবন্ধ

বিপন্নতা ও প্রিয় ঘুম

'ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে?'- এই ঘুম পাড়ানি ছড়া গান আজ আর বড় একটা শোনা যায় না। তবে মায়েরা এখনো তার আদরের শিশুটিকে আলতো চাপড়ে চাপড়ে ঘুমপারায় এবং ঘুমিয়েও যায়। ঘুমের মাঝে শিশুর মুচকি মুচকি হাসি দেখে আনন্দ পায়, উৎফুল্ল হয়। মা আনন্দে আটখানা হয়ে বলে ওঠে -দেখো! দেখো! আমার সোনা মনিকে কি সুন্দর মা ষষ্ঠী হাসাচ্ছে। এতো একটি আনন্দদায়ক উপভোগ্য দৃশ্য। কিন্তু বড়দের মধ্যে নানা পদ্ধতির সাহায্যে নিয়েও যখন ঘুমের দেবদেবী চোখের পাতায় নেমে আসে না তখনই তার কারণ গুলি খুঁজে বার করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়তে হয়। যে ব্যক্তিটি কর্মক্ষেত্রে অবসাদগ্রস্ত হয়ে অবসন্নতায় ভুগছে ঠিকমত ঘুমাতে পারছে না, তার কারণ পারিবারিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে কিন্তু যে ব্যক্তিটি বিষাদগ্রস্ত হয়ে বিষন্নতায় ভুগছে ঘুমোতে পারছেনা,তার কারণ শরীর অতিক্রম করে মনের ঘরে বাসা বেঁধেছে। সেই ব্যক্তিটি মনের ঘর হতে কারণটিকে দূর করতে না পারলে ধীরে ধীরে বিপদের দিকে আগায় এবং চরম বিপন্নতা বোধ করতে থাকে। কোনো কোনো সময়ে আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ায়। 


সভ্যতার প্রাককাল হতে আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে এবং স্পুটনিক গতিতে হয়ে চলেছে। এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার জন্য বিশ্বের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটা অংশ ২০৩০ সালের মধ্যে এক গভীর সংকটের মধ্যে পড়বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে এই সময়কালের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনকে কোনো  না কোনো সময় বিপদ থেকেবিষণ্নতায় ভুগতে হবে এবং বিষন্নতার কারণে ১৫% আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়বে। মনের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আবেগগত ধারণাগুলির পরিবর্তন ঘটে এবং সেগুলি হল বিষণ্ণতার লক্ষণ। যেমন- দিনের বেশিরভাগ সময় মন খারাপ করে থাকা। কাজে আনন্দ ও আগ্রহ কমে যাওয়া। ঘুম অস্বাভাবিক কমে অথবা বেড়ে যাওয়া। খাবারের প্রতি অস্বাভাবিক রুচি অথবা অরুচি বেড়ে যাওয়া। ওজন কমে যাওয়া। কাজে ও চিন্তায় ধীরগতি হওয়া এবং নিজেকেই দায়ী মনে করা। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা এবং মনোযোগ কমে যাওয়া। আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি। 

মাথা থাকলে মাথাব্যথা যেমন থাকবে তেমনি মন থাকলে মানসিক সমস্যাও থাকবে। সভ্যতা যেমন আমাদের অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ দিয়েছে কিন্তু আনন্দও অনেক খানি কেড়ে নিয়েছে। বেগ যেমন আমাদের আবেগ অনেকখানি স্তব্ধ করে দিয়েছে তার ফলে অবসাদ বিষাদ বেড়েছে। যার থেকে জন্ম নিয়েছে বিষন্নতা এবং তার থেকে বিপন্নতা। বিপন্নতার পরবর্তী ধাপই হলো আত্মহত্যা। আশাহীনতা ধীরে ধীরে বাসা বাঁধে এবং আত্মহত্যাকে ত্বরান্বিত করে -দেখা দেয় বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রোনিয়া, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং মাদকাসক্তি। এগুলি থেকে মুক্তি পেতেই জীবন বিসর্জন দেয়। পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। গত ৫০ বছরে ৬০শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরুষদের হার মহিলাদের তুলনায় চারগুণ বেশি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে হয় 'অমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন।'

আমাদের জীবনটা অনেকটাই পিরামিডের মতো - যত উপরে যাবে তত নিঃসঙ্গ হতে থাকবে। এখানে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলেই বিষণ্ণতায় পেয়ে বসে। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কৃতকার্য মানুষদের মধ্যেই বেশি বিষন্নতা দেখা যায়। বিষন্নতা আসলে কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স থেকে হয়। এটা আসলে মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত সমস্যা। এটি একটি জীনগত কারণও বটে। আবার অনেক সময় দেখা যায় চারপাশে সব ঠিকঠাক আছে কিন্তু তারপরেও জৈবিক বা অন্তর্গত কারণে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। 

মেয়েদের বিষন্নতার কারণ গুলিকে পৃথকীকরণ করা যায়। কোন কণ্যা শৈশবে কোন রকম যৌন নির্যাতন বা মানসিক আঘাত প্রাপ্ত হয়ে থাকলে সেই স্মৃতি তার বিষন্নতার কারণ হতে পারে। পিরিয়ডের আগে পরে। মিসক্যারেজ। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ। সহবাস সঙ্গীর সাথে খারাপ সম্পর্ক। পারিবারিক কলহ এবং শারীরিক মানসিক অত্যাচার। গর্ভকালীন অথবা প্রসবোত্তর কালে মানসিক অবসন্নতা গ্রাস করতে পারে। বিবাহ বিচ্ছেদ। চাকরি- সংসার- সন্তান দেখাশোনার ভারসাম্য রক্ষা করার সমস্যা। বৃদ্ধ মা-বাবা অথবা পেশাগত সমস্যা ইত্যাদি। 

এই সমস্যা থেকে নারী-পুরুষ সর্বজনীন ভাবে বেরিয়ে আসার সাধারণ উপায় গুলো বলা যায়- সামাজিক মেলামেশা বাড়ান। শরীরচর্চা অর্থাৎ নিয়মিত যোগ প্রাণায়াম ব্যায়াম করা ও হাঁটাহাঁটি করা। সুষম খাদ্য তালিকা অনুসারে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। বাচ্চাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে সময় কাটানো। মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়াতে যাওয়া। রুটিনমাফিক রাতের ঘুম সুনিশ্চিত করা কিন্তু এই ঘুম যদি কোনো কারণে বেড়ে যায় বা কমে যায় বা ছাড়া ছাড়া হয় অর্থাৎ শক্তি বৃদ্ধির পরিবর্তে ক্লান্তি নিয়ে আসে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। 

এই মারাত্মক বিষণ্ণতা মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো চিন্তাকে পাক খাওয়ায় যা প্রিয় ঘুমটিকে হত্যা করে। ওই চিন্তাকে ঘুমের মধ্যে নিমজ্জিত করে মেরে ফেলতে পারেনা। অনিদ্রায় রাত কাটাতে হয়। আমরা দু'রকম অনিদ্রা দেখতে পাই -১.হঠাৎ করে অনিদ্রা  ২.দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা। 

হঠাৎ করে অনিদ্রা হওয়া বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এগুলি হয় সাধারণত স্থান পরিবর্তন অথবা শোক ও দুঃখের ঘটনা শোনার কারণে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকে যথা যান্ত্রিক যুগের মানসিক চাপ। কাজকর্ম না পাওয়া অথবা চাকরি চলে যাওয়া। বিবাহযোগ্য মেয়ের বিয়ে দিতে না পারা। শারীরিক অসুস্থতা। সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব অথচ রাতে ঘুম না আসা। কারোর উপস্থিতি বা কথাবার্তা সহ্য না হওয়া। মনঃপুত কাজ না পাওয়ার দরুণ মানসিক অসন্তুষ্টি ইত্যাদি।তাছাড়া অনেক রাত পর্যন্ত গেম খেললে অথবা উত্তেজক মারামারি ছবি দেখলে ঘুম আসবে না। তাহলে জানতে হয় এই মহামূল্যবান ঘুম কি? জীবনের এটি একটি স্বাভাবিক অংশ যা অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য।দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুম হচ্ছে সেই সময় যখন আমরা আমাদের চারপাশের সম্বন্ধে অবহিত থাকি না। অনিদ্রা যেমন দু'ধরনের ঘুমও দুধরনের- ১. রেম ২. ননরেম।

রেম- এই ঘুম ছাড়া রাতের ১/৫ সময় হয়ে থাকে। মস্তিষ্ক সজাগ থাকে। মাংসপেশি শিথিল থাকে। আমাদের চোখ এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। আমরা স্বপ্ন দেখি। 

ননরেম- মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে। শরীর নড়াচড়া করে। হরমোন নিঃসৃত হয় এবং দিনের ক্লান্তি দূর করে। 

রাতের রেম বা ননরেম যেকোনো ঘুমের মধ্যেই থাকি না কেন তার চারটি স্তর পরিলক্ষিত হয়-

১. ঘুমের আগের ধাপ- মাংসপেশি শিথিল হয়, হৃদস্পন্দন কম ও শরীরের তাপমাত্রা কম হয়। 

২. হালকা ঘুমের স্তরে সহজে ঘুম ভেঙে যায়। চারপাশ  সম্বন্ধে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে। 

৩. স্লো ওয়েভ ঘুম - ব্লাড প্রেসার কমে যায়। এই স্তরে লোকে ঘুমের ঘোরে হাঁটে ও কথা বলে। 

৪. গাঢ় স্লো ওয়েভ ঘুম- এই স্তরে ঘুম সহজে ভাঙতে চায় না। ঘুমভেঙে গেলেও  স্বাভাবিক সচেতনতা থাকেনা। 

রাতে ঘুমের মাঝে পাঁচবার এই স্তরগুলি ঘুরে ফিরে আসে। সকালের দিকে আমরা বেশি স্বপ্ন দেখি। রাতে আমাদের ঘন্টা দুয়েক বাদে বাদে মিনিট খানেকের জন্য ঘুম ভাঙ্গে। আমাদের সময় মনে থাকেনা। যদি আমরা চিন্তায় থাকি তবেই আমাদের মনে থাকে।

প্রিয় ঘুম আমাদের মধ্যে কতখানি সময় বিরাজ করবে সেটিও জেনে রাখা ভালো তা না হলে তার জন্য কি ধরনের সাধনা করতে হবে সেটিও আয়ত্ত করা দরকার। শিশুদের জন্য অর্থাৎ সদ্যোজাত শিশুদের জন্য ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা। একটু বড় হলে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৭ঘন্টা। বেশি বয়স্কদের জন্য ৭-৮ ঘন্টা। প্রথম রাতে তিন-চার ঘণ্টার পর ঘুম ভেঙে যায়। বয়স্ক লোকেরা স্বপ্ন দেখে তুলনামূলক কম। আবার অনেক সময় দেখা যায় সব বয়সী ছেলেমেয়েদের ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে এবং ভীতিপ্রদ স্বপ্ন দেখে ভয়ঙ্কর চিৎকার করতে। এই অসুবিধা গুলি দূর করার জন্য বিশেষজ্ঞ  ডাক্তারের পরামর্শের প্রয়োজন। তার সাথে সাথে মানসিক চাপ কমাতে হবে। ঘুমের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে খেতে হবে। বিছানাকে ঘুমানোর মত সুন্দর ভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। মেজাজ শিথিল করতে হবে। হালকা বই পড়া ও হালকা গান শোনা যেতে পারে। শোয়ার আগে পেশী শিথিল করতে হবে। গভীর বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হলে ডাক্তারের পরামর্শমতো ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। 

ঘুম আমাদের অতি প্রিয়। অনিদ্রা ও বিষণ্নতা দুটি যমজ ভাই। এরা হাত ধরাধরি করে চলে। জীবন থেকে একটি কে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলে অপরটি দূরে থাকবে। একটি জীবনে বাসা বাঁধলে অপরটি ঘর-সংসার পাতবে। উভয়ে আপনাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে। তাই বলি বিষণ্ণতাকে দূরে ঠেলে দিয়েপ্রিয় ঘুমের সঙ্গে প্রেম করি। আর বলি- তুই আমার পরাণ পাখি। তুই ছাড়া আমি মরা,এক্কেবারে মরা। তোকে আমি বড্ড ভালোবাসি রে ।তুই আমাকে ছেড়ে যাস না রে।


    প্রবন্ধকার লক্ষ্মণ দাস ঠাকুরা
সুকান্তপল্লী, কালনাগেট, পূর্ব বর্ধমান
















0 Comments