দেবদাস কুণ্ডুর মুক্তগদ্য


হারানো শহর, স্মৃতির শহর

একটা শহর শুধু ইট কাঠ সিমেন্টর হয় না। তারও একটা হৃদয় থাকে। আমার কাছে শহরটা ছিল প্রেমিকার মতো।
তখন আমাদের বয়স কতো হবে।১৮ বা ২০।আমরা বন্ধুরা রোজ বিকেলে যেতাম ভিআইপি রোডে হাওয়া খেতে। তখন ভিআই পি রোড আজকের মতো ব্যস্ত রাস্ত ছিল না। রোডের পাশে ছিল একটা বিশাল সবুজ মাঠ। আমরা বন্ধুরা সেই মাঠে শুয়ে বসে আড্ডা গল্প করতাম। বাচ্চরা খেলতো। অনেক ফুল গাছ ছিল।মাঠের এক কোনে বড় বড় মানুষ সমান পাইপ ছিল। গংগায় পলি জমে গেছে সেই পলি এনে হ্রদের বুক ভরাট হচ্ছে। যার নাম এখন স্লট লেক। আমরা সেই হ্রদে মাছ ধরতাম।
         
আমরা তখন খুচখাচ প্রেম করতাম। প্রেমিকাকে নিয়ে চলে যেতাম ভিআই পি রোডে। তারপর ঢুকে যেতাম পাইপের ভিতর। জড়িয়ে ধরা চুমু খাওয়া এই ছিল বর্ডার লাইন।ভি আই পি রোড দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য বড় বড় রাজনৈকিত নেতারা দম দম এয়ারপোর্ট নেমে এই রাস্তা দিয়ে যেত। তাই এর নাম ভিআই পি রোড। 
          
এখন যেটা  উল্টোডাঙা মোড়। পিয়ারলেস বীজ। সেখানে তার নিচে ছিল এক টুকরো সবুজ মাঠ। সেই মাঠে বসতাম। আর গাড়ি ঘোড়ার শহর দেখতাম।
          
হাতিবাগানে ছিল অনেক সিনেমা হল। আমরা ৭৫র লাইন দিতাম। খুব ভিড় হতো মারামারি করে টিকিট কাটতাম। ওপেনিং ডে ওপেনিং শো দেখতাম। কয়লা আনতে দিয়েছে দশ কেজি। আট কেজি এনে দু কেজির টাকা দিয়ে সিনেমা দেখা। কখনো বাজার থেকে ঝারতাম। অমিতাভ বচ্চনের ছবি আসলে ছাড়া নেই। তখন দরকারে বাবার পকেটে চলে গেছে হাত। ছবি দেখেছি। বড় আনন্দ। বাড়ি এসে অপরাধের শাস্তি জুতোর মার। একটা হলে টিকিট না পেলে অন্য হলে। নিরাশ হতাম না।
        
হাতিবাগানে ছিল থিয়েটার পাড়া। বিশ্ব রূপায় দেখেছি আসামী হাজির। রঙগনায় দেখেছি শ্রীমতী ভযংকরী। ভানুর নাটক। হাসিতে পেট ব্যথা। স্টারে দেখেছি প্রসেনজিৎ এর নাটক। প্রথম দিকে প্রসেনজিৎ এর  সংগে তার মা আসতেন। শো শেষে মা ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যেতেন। তখন মিস শেফালির ড্যান্স ছিল বিখ্যাত। ক্যাবারে ড্যান্স। আসলে যৌন আবেদনের নাচ।
       
হাতিবাগানে পশুপাখির বড় হাট বসতো। আমি পায়রা কিনতাম।কিনতাম রঙিন মাছ। তার হাটটা বসতো বাজারের ভিতর। বিদূরশী বলে একটা হল ছিল। শুধু এ মার্ক ছবি টানতো। এক রকমের লোক দেখতে যেতো। তার পাশে ছিল একটা কচুরির দোকান। পাঁচ টাকায় দশটা কচুরি দিতো। তার স্বাদ ছিল অমৃত।
            
তখন এখানে দোতলা বাস চলতো। আমি সেই বাসে উঠে একেবারে দোতলায় উঠে যেতাম। ওপর থেকে দেখতাম এই শহরটা। তখন নিজেকে রাজা মনে হতো। 
           
পাড়ায় তখন শীতলা পূজো উপলক্ষে যাত্রা পালা হতো। পুরুষ নারী সাজতো। বিড়ি খেত। সারারাত পালা দেখতাম। দূর্গা পূজোয় বাবা হাত খরচ দিত দুটাকা। মাটির হাড়িতে সন্দেশ শনপাড়রি বেচতো। গ্যাস বেলুন ছিল। আমাদের পরিচয় সংঘের মাঠে সার্কাস আসতো। দেখতে যেতাম দাদার সংগে। ট্যাপিজের খেলা দেখতাম আর বুকটা ধর ফর করতো। কখন না পড়ে যায়। 
        
এখন আমার সেই শহরটা নেই। পুরনো কোন স্মৃতি চিহ্ন নেই। হারিয়ে গেছে আমার প্রিয় শহর। সত্যি কি হারিয়ে গেছে? তাহলে আমি লিখলাম কি করে? আসলে আমার বুকের গভীরে গোপন ঘরে প্রেমিকের মতো বেঁচে আছে বেঁচে থাকবে আমার প্রিয় শহর। 
স্মৃতির শহর।

 সাহিত্যিক দেবদাস কুণ্ডু 
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত




















0 Comments