অনিন্দ্য দত্ত'র মুক্তগদ্য


জীবনানন্দ, সত্যজিৎ আর শিক কাবাব

কিছু, কিছু  কথা আজ মনে পড়ে,ভেতরে  অন্তরে শিহরন জাগায়। আমার ছোট বেলায় কলকাতা শহরটা বেশ সাধাসিধা ছিলো, চকমকে, ঝকঝকে  ভাবটা ছিলো কম,কিন্তু ছিলো উজ্জ্বলতা ও উষ্ণতা।রাস্তাঘাটে এত গাড়িঘোড়ার ভীড় ছিলোনা,ধূলো ধোঁয়াও ছিলো নগণ্য। মানুষ জন ধীরে,ধীরে চলতো,ধীরে ধীরে বলতো, আরাম আর স্নেহ দিয়ে ঘেরা ছিলো, প্রতিবেশ,পরিবেশ।শহরে অনেক পাখির ডাক তখন শোনা যেত, গাছ পালাও অনেক  বেশি দেখা যেত। গড়িয়া, মহেশতলা এগুলো ছিল  পিকনিকের যায়গা। দুপুরে, দূর থেকে ট্রামের ট্যাং,ট্যাং, ট্যাং চলন কান পাতলেই শোনা যেত।
পাড়ার আবহাওয়া,পাড়ার জ্যেঠু,পাড়ার লেবুদি, পাড়ার দ্বিজেন দা'র মুদির দোকান,পাড়ার খেলার মাঠে বিকেলে ফুটবল পেটানো,হাবিব,আকবর,শ্যাম থাপা, সুভাষ,সুকল্যান ঘোষ দস্তিদার,তরুণ বোস,প্রসূন  ব্যানার্জি,সুরজিত সেনগুপ্ত,মিহির বোস এসব নাম পথে ঘাটে শোনা যেত। অজয় বসু রেডিওতে বলতেন" গুড লেংথ বল,আস্তে ফরোয়ার্ড খেলেছেন গাভাসকার, পরের বল, ফুলটস, সপাটে ড্রাইভ করেছেন, বল চলে গেল সীমানার বাইরে,চার, সোজা চার।"সে রিলে শোনার মজাই আলাদা।
পার্কসার্কাস ময়দানে "জেমিনি সার্কাস" আসতো। অত বাঘ,সিংহ সব রিং মাস্টারের কথায় উঠবোস করছে দেখে, মন রিং মাস্টারের প্রতি শ্রদ্ধ্যায়  বুক ভরে উঠতো। চিড়িয়াখানায় বিজলী গ্রিল এর ফিস ফ্রাই এর স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।
তারপর, কত কিছুই না হলো,বাংলাদেশের যুদ্ধ,  নকশালি মারকাট,জরুরী অবস্থা জারি,ইন্দিরা গান্ধী  হত্যা,আর আমিও এসব দেখতে দেখতেই কখন যেন পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হয়ে গেলাম।

আমি যে কলকাতায় থাকতে পারবো না,সেটা২০০৭ থেকেই টের পেয়েছিলাম। কারণ,অনুভব করেছিলাম যে শহরটার সংস্কৃতির ব্যারোমিটার পাল্টে যাচ্ছে। আমার চেনা দুঃখ,চেনা সুখ,চেনা আলো,চেনা অন্ধকার  তার মর্মমূলে নিজেকে পরিবর্তন করছে। আমার আবাল্যের পরিচিত নগরে এমন  সব নাগরিক  নাগরিকাদের দেখা যাচ্ছে,যে তাঁদের দেখে,ভয়ে বুক কাঁপতে থাকে। আমি বুঝতে  পেরেছিলাম,হেথা নয়,হেথা নয়, অন্য কোন খানে, তাই ২০০৯ এ মুম্বাইয়ে এসে নতুন করে জীবনের খেলা শুরু  করি। আমার আশংকা সত্য করে এলো, পরিবর্তন এর ভয়ংকর ২০১১,চারিদিকে পশুদের বিকট নাচা-গানায় ভরে গেল।আমি বুঝতে পারলাম আমার জন্মভূমিতে ফিরে যাবার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু,ততদিনে, আমি মুম্বাইয়ের প্রেমে পড়ে গেছি। তাই যে প্রেমিকা আমাকে ত্যাগ করে গেছে৷ তার প্রতি ভালোবাসা কমে গিয়ে,ঘেন্না বাড়তে লাগলো। আমি খুব  স্বচ্ছ ধরনের মানুষ।যা বলি, বলি। আর শুনতেও চাই সুস্পষ্ট  কথা। আধো,আধো ঠোঁট, বাধো বাধো বোল, আমার অতি বিরক্তিকর লাগে। আমার তথাকথিত অনেক প্রাক্তন বন্ধুর মুখে এই নয়া বুলিচালি শুনতে পেয়ে, আমি বুঝলাম,"চলো রাহি, বাঁধো গাঁটুরিয়া"...এই শহর আমার যুবক জীবনের  লীলাভূমি হতে পারে, কিন্তু বার্ধক্যের বারানসী আর কিছুতেই হবেনা।চিরতরে তার দরজা আমার কাছে বন্ধ হয়ে গেল।এই কথাটা বুঝে ফেলার পর, সবই তো পাল্টে যায়।পশ্চিমবাংলার প্রতি আমার আবাল্য মুগ্ধতা ফেটে চুরমার হয়ে গেল।সকালের গরম চায়ের কাপে,মাকড়সা পড়ে গেল। 
আর এবিষয়ে কিছু  বলা উচিত হবেনা। বরঞ্চ,এবার নস্টালজিয়ার কথাটাই বলি।
কলকাতাই সেই  শহর, যা আমাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, নাট্য ও সংগীতের সাথে পরিচয় করিয়েছে। এ শহরে বড় হয়ে না উঠলে গোটা ভূবণটাই আমার অধরা থেকে  যেত। এই শহরই আমার প্রথম প্রেম দিয়েছে,দীক্ষা দিয়েছে সচেতনতা। একটা  চিন্তিত, সচেতন,বিদ্রোহী শহর যে আজ কিকরে এই দশায় উপনীত হয়েছে, সেটা ভাবলে আমার বিস্ময়কর লাগে। তাই আজ যখন, অন্য এক শহরে বসে অবিরাম নামতায় বাদলের ধারাপাত বাইরে শুনি,তখন জীবনানন্দ,সত্যজিৎ আর শিক কাবাবের ফেলে আসা স্বাদ,আর আমার প্রথম ভালোবাসার নারীটির জন্য মন কেমন করে।" মন কেমন করে, আমার মন কেমন করে,কি জানি, কি জানি,কাহার লাগি, মন কেমন  করে।"

গদ্যকার অনিন্দ্য দত্ত
আন্ধেরী পূর্ব, মুম্বাই, ভারত






















0 Comments