
বারিদ বরন গুপ্ত'র ছোটগল্প
কেউ কথা রাখেনি
বর্তমান গতিশীল জীবনে পেছনে ফেলে আসা সময় গুলো যেন দ্রুত ঝাপসা হয়ে আসে,এটা সময়ের দোষ নয়,গতিশীল জীবনধারার দোষ,গতিশীল জীবন যেন পিছনে তাকাতে, সুখ দুঃখের মুহূর্তগুলোকে নিয়ে খেলা করতে দেয় না, কিন্তু মন যে মানে না,খেলা করার ইচ্ছা মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে,গতিশীল জীবনধারাকে একটু থামতে বলি,আর তখনই ভেসে আসে মনের আয়নায় হারিয়ে যাওয়া শত শত মুখ।
এই সেদিন কালনা কলেজের প্রাক্তনীদের পুঃনমিলন অনুষ্ঠানে গিয়ে হঠাৎ একজনের কথা মনে পড়ে গেল, অনেক চেষ্টার পর নামটা ভেসে এলো মনের আয়নায়, রাতুল ঘোষ, কালনা কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের ল্যাবরেটরি এটেনডেন্ট। অকৃতদার এই মানুষটি কথা আমি জীবনে কোনদিন ভুলতে পারবোনা, ভুলতে পারবো না তার সাহায্যের কথা।এই কলেজজীবনের কেমিস্ট্রি ল্যাবে কাটানো সেই সুখের মুহূর্তগুলো আজকে যেন মনের গহনে বারবার ভেসে আসছে, ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সেই সোনালী দিনগুলোতে।
কালনা কলেজে পড়ার সময় আমি মন্তেশ্বর থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতাম,প্রত্যেকদিন কলেজ যাওয়া সম্ভব হতো না, তাই একটু সাহায্যের জন্য এই রাতুলদাই ছিল আমার অন্যতম সাহায্য দাতা, কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যালে তার সাহায্যের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। লেখাপড়া বেশিদূর করেননি রাতুলদা, কোনরকমে মেট্রিকের গণ্ডি পেরিয়ে ছিলেন বোধহয়, কিন্তু কেমিস্ট্রি, বিশেষ করে অর্গানিক কেমিস্ট্রির প্রায় সমস্ত বিষয়ে তার তুখোড় জ্ঞান ছিল। অনেক সময় ল্যাবে রবীন্দ্রনাথ বাবু, সুনীল বাবু বা অবনীবাবুর সঙ্গে নানা বিষয়ে তর্ক করতে দেখেছি। আসলে নিষ্ঠাবান লোকেরা কাজকে খুব ভালোবাসে, যেটুকু করে মনপ্রাণ ঢেলে করে, আর সেই সূত্র ধরেই বোধহয় গন্ধ শুকেই বলে দিতো কোন ধাতু রয়েছে। তাঁর এই জ্ঞান, বোধ আমাদেরকে অবাক করে দিত। কলেজের কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যালে নির্ঘাত ফেলের হাত থেকে কতো ছাত্র-ছাত্রীকে বাঁচিয়েছেন তা বলে শেষ করা যাবেনা, আমিও ছিলাম সেই দলেরই একজন।
আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে যেদিন বিএসসি কেমিস্ট্রির ফাইনাল প্রাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমার স্যাম্পেল এ ছিলো বেরিয়াম ক্লোরাইড ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড এর মিশ্রণ। পরীক্ষা প্রায় এক ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়েছে, ঘড়িতে ঘন্টার কাঁটা এগারোটা পেরিয়ে গেছে, হাতে রয়েছে মাত্র 2 ঘন্টা, এখনো একটাও ধাতু বার করতে পারিনি, এটা,ওটা টেস্ট করেই যাচ্ছি, শেষে ক্লোরাইড এর টেস্ট করে সুনীল স্যারের নাকের কাছে গিয়ে ধরেছি, অমনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবনীবাবু কে লক্ষ্য করে বিরক্তির স্বরে বলে উঠলেন-"কিরকম বাজে ছেলে দেখুন ক্লোরিনের ঝাঁজালো গন্ধ নাকের সামনে ধরেছে!" যাইহোক সমাধান বেরিয়ে এলো, নিশ্চিত হলাম ক্লোরিন আছে, অ্যামোনিয়া নয়। এরপর গ্রুপ অ্যানালিসিস করার জন্য তৈরি হচ্ছি, এমন সময় দরাজ হাত নিয়ে রাতুলদা এসে হাজির,বলল-'তুমি নিডিল টেস্ট করো, মনে হচ্ছে তোমার ক্লোরাইড আছে!'রাতুল দার কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে যখন নিডিল টেস্ট করতে যাচ্ছি তখন নিডিলটা হঠাৎ নিচে পড়ে ভেঙ্গে গেল, মাথায় হাত! পকেটএ এক কানাকড়ি নাই, বারবার পকেটে হাতরাচ্ছি, রাতুলদ আমার পকেট এ অবস্থা দেখে, সঙ্গে সঙ্গে দশ টাকা দিয়ে বলল-'তুমি দোকান থেকে একটা নিডিল নিয়ে এসো?' যাই হোক নিডিল টেস্ট করে সবুজ শিখা দেখতে পেলাম, সঙ্গে সঙ্গে মনটাও সবুজে ভরে গেল, আর ফেল করতে হবে না, এরপর ঠান্ডা মাথায় গ্রুপ অ্যানালিসিস করতে শুরু করলাম, পরীক্ষা শেষে সাদা দইয়ের মতো অধঃক্ষেপ দেখতে পেলাম, নিশ্চিত হলাম আমার স্যাম্পেল বেরিয়াম ক্লোরাইড ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড মিশ্রন। এরপর প্রাক্টিকেল খাতায় লিখে, জমা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছ, দেখি দরজার সমনে রাতুলদা দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরলাম, বললাম -'তোমার এই সাহায্য আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না,'রাতুল দা আমায় আশীব্বার্দ করে বললেন-' ভুলে যাস না মাঝে মাঝে আসিস, একটু খোঁজখবর নিস,'অনেকেই ভুলে যায় একবারও দেখা করে না,'আমি বললাম-'অবশ্যই আসবো,তোমাকে ভোলা যায় না,উচিতও নয় !'সেদিন ভাদোরের পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় রাতুলদাকে একটু হতাশ দেখলাম, সেই কবে থেকে শুরু, ল্যাবে ঢোকার পর থেকে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে সাহায্য করেছেন, অনেকেই হয়তো তাকে ভুলে গেছে, সেই সূত্রেই আমার সাথে গল্প করতে করতে হাজার হাজার ছেলের নাম অনর্গল বলতে লাগলেন। আবার ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাতুল দার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
এরপর অনেক দিন কেটে গেছে,গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে,মধ্যবিত্তের টানাপোড়নে অনেক সময় হারিয়ে গেছেআজ কলেজে প্রাক্তনীদের এই পুনর্মিলন অনুষ্ঠান শেষে, ৪ নং ঘর পেরিয়ে, কেমিস্ট্রি ল্যাবে ঢুকলাম, দেখি টুলটা ফাঁকা পড়ে আছে, দুটো পায়রা আমার উপস্থিতি বুঝতে পেরে উড়ে চলে গেল, আটের দশকের সেই সোনা ঝরা দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগলো, মনে হচ্ছে যেন রাতুলদা আমায় ডাকছে, আর বলছে-"তুই এতদিন পরে এলি, অনেকে কথা দিয়ে আসিনি?'মনে এই কথাগুলো আলোড়ন খেলতে লাগলো, সামনে কালনা বাসস্ট্যান্ডে কালনা- মালডাঙ্গা রুটের বাসের হর্ন কানে এলো,ঘোর ভাঙলো, এদিকে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচটা ছুঁয়েছে, বাড়ি ফিরতে হবে।



0 Comments