মায়ের সাথে বাড়ি ফেরা ~ নিশিকান্ত রায়ের ছোটগল্প


নিশিকান্ত রায়ের ছোটগল্প 
মায়ের সাথে বাড়ি ফেরা 

যে যেভাবে পারে ছুটছে। গরু মোষের গাড়িতে কেউবা ঠ্যালা গাড়ি, কেউ কেউ মাথায়, কাঁধে পুটুলী নিয়ে শরনার্থী শিবির ছাড়ছে।দেশ এখন মুক্ত। দ্রুত ক্যাম্পগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।রত্নি বালারও গোছগাছ শেষ। ভোর না হতেই বেরিয়ে পড়বে। দেবর, ননদ,জা,ছেলে মেয়ে সবাইকে নিয়েই দেশ ছেড়েছিল।সবাই ফিরে যাবে এটাই বা কম কিসে। ভালোয় ভালোয় ফিরলেই শান্তি। 
সুরেন বাবু খু্ব কাকুতি মিনতি করলেন, বৌদি বিপিনকে রেখে যান। দুই ছেলে তো সাথে যাচ্ছেই।ভাল থাকবে, ভাল দেশ,ভাল স্কুল। মাঝে মধ্যে আসবেন। বিপিনও যাবে। দেশ স্বাধীন হলেই যে সব মিটে গেল তা তো নয়। ওখানে গিয়ে দেখবেন রাজাকার আলবদররা ওৎ পেতে বসে আছে। বিপিন এদেশে থেকে গেলে একটা প্লাস পয়েন্ট থাকবে আপনার।  
সুরেন বাবুর স্ত্রী চোখের জল মুছলেন শাড়ির আঁচলে। ওকে রেখে যান দিদি আবার যদি আসতে হয়!ডুকরে কেঁদে উঠে সুরেনের স্ত্রী। রত্নিবালার এক কথা -কোলার ছওয়া কোলাত মারিম তবু ছওয়াক পোষানি না দিম। জয় বাংলা যায়া না খায়া থাইকমো তাতে কি! যাক যাক ধরি আচ্চি তাকে তাকে ধরিয়ায় যামো। 
বারোটা গরু সুরেন বাবুদের গোয়ালেই ছিল যুদ্ধের কয় মাস। একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে।
হাজার কথার এক কথা রত্নিবালার। ডানে এক বেটা বাঁয়ে এক বেটা পিছনে এক বেটাকে নিয়ে সে যাত্রা করবে মুক্ত দেশে। এ যাত্রায় সে কাউকেই ছেড়ে যাবেনা। তিন ছেলেকে নিয়েই রত্নিবালা স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখে। মাটিকে প্রনাম জানায়।নীল আকাশে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহুর্ত। 
ঘর বাড়ি নিশ্চিহ্ন। ভিটেয় রসুন পিয়াজের চাষ। চারদিকে ঝোপঝাড়।রত্নিবালার মাথাটা ঝিম ধরে আসে।তাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। ছেলেদের নিয়েই তার বাঁচা মরা। 
ছেলেরা পড়তে বসে রাতে। রত্নিবালা উড়ুন গাইনে ধান ভানেন। ধান সিদ্ধ করেন। বড় ও মেজো ছেলে হাটে হাটে চাল ডাল বেঁচেন।কিছু বাড়তি আয় হয়। পড়াশুনার খরচও চলে। 
এমনও দিন গেছে ছেলেদের পড়ার হ্যারিকেন কেড়ে নিয়ে গেছে তার ছোট জা। লেখাপড়া করে কি জজ ব্যারিস্টার হবে?
ছেলেদের পড়াশুনা ব্যয়ের অজুহাতে ওদেরকে আলাদা করে দেন রত্নিবালার দেওড়। কিন্তু সে থেমে যায় নি। হ্যারিকেনের বদলে তেলের কুপি জ্বালিয়ে লেখাপড়া করেছে ছেলেরা।পুরান বই সংগ্রহ করেই পড়েছে। জমিতে ফসল ফলিয়েছে। টিউশনিতে  উপার্জন করেছে। হার মানেনি রত্নিবালা। তিন ছেলেই  মাস্টার্স। যার যার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করেছে ওরা। কোন আপত্তি করেনি রত্নিবালাও। বঁধুদের বরন করেছে হাসিমুখেই।ছেলেদের চাকরি হয়েছে ।যার যার সহধর্মিনীকে নিয়ে পোস্টিংকৃত কর্মস্থলে চলে গেছে ছেলেরা। 
রত্নিবালার ঝারা হাত পা।উঠোনের বেলি ফুলের গন্ধ কেমন যেন লাগে তার। বড্ড একা লাগে।বাড়ির চারদিকে চারটে ঘর। সবই শূণ্য। একটা ছবি ছিল বিপিনের বাবার। সেটাও পুড়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়।আঙিনা ভরা চাঁদের আলোয় আম কাঁঠালের গাছদুটো চিকচিক করে উঠে। 
ওই জোড়া গাছ তার বিয়ের পরপরই লাগানো হয়। রত্নি গোড়ায় জল ঢেলে দেয় নিজ হাতে। শ্বাশুড়ি মা বেঁচেছিল তার। বলেছিল বৌমা, একটা তুমি, একটা আমার বিপিন। এ দুটো চিহ্ন যেন নষ্ট না হয়। গাছ দুটোর পাতা ডাল কান্ড গড়িয়ে জোছ্না ধারা আঙিনায় লুটোপুটি খায়। সে আলোতে রত্নিবালার মুখমন্ডল আরও চকচক করে।শ্বাশুড়িও পরপারে।থাকগে ওসব। দীর্ঘ  নি:শ্বাস যেন গাছের দেহে গিয়ে পড়ে। চাঁদ হেলে যায় ধীরে ধীরে।মাটি ঘাস লতা পাতা ও জংলা ফুলের গন্ধে বাইরের খোলান মাখোমাখো। ছেলে ও বৌমাদের বড় দেখতে ইচ্ছে করে। বিয়ের বেশ ক'বছর হয়ে গেল। নাতি নাতনি যে কবে দেখবে কে জানে। দুই দুইটা দুর্গাপূজোতেই ওরা বাড়িমুখো হলো না। শ্বশুড় বাড়িও যায় নাই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ভেবে কি লাভ। ওরা থাকনা ওদের মতোই। ওদের সুখেই তো আমার সুখ।

দখিনের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে রত্নিবালা। জানালাটা খুলে দেয়।শরীরটা একটু এলিয়ে দেয়। হেসে ফেলে। একবার রত্নাই নদীতে ঘুরতে গেছিল নায়ে করে। বিপিনের বাবারই সখ। নৌকা চলছে। দুজনেই চেয়ে থাকে। রুপোলী ঢেউ দুলছে। নাও দুলছে।ওরাও দুলছে। বিপিন বলে কি চাও? তুমি কিগো! নদীতে কি চাব? ঠিক আছে। তোমার নাম রত্নি আর নদীর নাম রত্নাই। রত্নাই নদীটাই দিয়ে দিলাম। দাতা বটে! 
কয়েকদিন ধরেই মনটা কু ডাকছে রত্নির।দু দুটো পূজার শার্ট প্যান্টের কাপড়,বৌমাদের শাড়ি কিনে রেখেছে সেগুলো দেওয়া হয়ে উঠেনি।না নিজেই যাবে সে।কাউকে পাঠিয়ে টেনশন ভালো লাগে না তার। 
গোছগাছ সেরে বেরুতে কয়েকদিন লেগে যায়। ডে কোচে উঠে পড়ে। রত্নির পাশের সিটে একটা মেয়ে। ভারি মিষ্টি চেহারা। 
দুজনে আলাপে আলাপে পৌঁছে যায়।রত্নিবালার কাছে ছেলের ঠিকানা বলতে আছে একটা খাম। খামের উপরে তার ছেলের নাম অন্যপাশে নিয়োগকারী অফিসের ঠিকানা। মাসিমা অফিসতো ছুটি হয়ে যাবে। আজ আমার সাথেই থাকেন। 
কালকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া যাবে। তাছাড়া ওই অফিসে চেনা জানা লোক আছে আমার। নেমে রিকশা নেয়। বাসা একদম কাছেই। পঙ্গু হসপিটালের কাছে যেতেই রত্নিবালা বলে উঠে,খাড়া হন বাহে।খুব চিনা চিনা নাগে কেনে বাহে। মেয়েটিও অবাক। আসেনি কখনও। অথচ চিনে! মাসিমা এটাতো পঙ্গু হাসপাতাল। 
তা চিনা চিনা নাগে কেনে মা। মাসিমা যেন এক অন্য মানুষ।নেমে যায়।দ্রুত হেঁটে চলে। হসপিটালের দিকে।মেয়েটি পিছু পিছু যায়। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে এক মহিলার সাথে কথা বলে। চিনতে পারে সেও।  মাসিমাকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে থাকে বৌটি।

ইনি মাসিমার বড় পুত্রবধু। কয়েকদিন আগে এক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পান বড়ছেলে বিপিন। বড় ধরনের অস্ত্রপাচার হয় পায়ে। আজ রিলিজ। পুরো রেস্টে থাকতে হবে মাস ছয়েক। মাসিমা নির্বাক। তবে তার মুখমন্ডল খুব উজ্জ্বল এবং দৃঢ়। 
ফরমালিটিজ শেষে ক্রাচে ভর দিয়ে মায়ের সাথে নেমে এলেন বিপিন। দুচোখের লোনা জল গড়িয়ে পড়ছে মুখ মন্ডল বেয়ে। পড়ন্ত বিকালের রোদ এসে মা ও ছেলের শরীরে খেলছে যেন।                              রত্নিবালা জিজ্ঞেস করে,বাসটা কয়টায় ছাড়বে মা।নাড়ি ছেঁড়া ধনরে মা।রক্ত রসে উয়ার দেহা, হামরা বুঝবার নঁই তা কাঁয় বুঝবে।
গলাটা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে উঠে মেয়েটার 'চাইলেও কি এমন মায়ের সাথে ফেরা হয় সবার...!!! 

সাহিত্যিক নিশিকান্ত রায় 
লালমনিরহাট, বাংলাদেশ









0 Comments