সত্যিটা জানতেই হবে ~ সৌমিত্র চৌধুরীর ছোটগল্প


সৌমিত্র চৌধুরীর ছোটগল্প
সত্যিটা জানতেই হবে

প্রাণ বাঁচাতে পড়িমরি ছুট। তাড়া করেছে অনেক লোক। …এই এই ধরে নিল। লাথি কিল চড়। মরে যাবে তো চোখের সামনে। হুঙ্কার দিয়ে লাফ মারলেন। রণচণ্ডী মূর্তি। খোকাকে উদ্ধার করে জলের ঝাপটা দিলেন মুখে। কোলে শুইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তবে বেশীক্ষণ আদর করতে পারলেন না। ঘুমটা ভেঙে গেল তো!

বুকে জোর ধক ধক। ঠোঁট গলা শুকিয়ে কাঠ। মুখ হাঁ করে জলের বোতলটা গলায় উপুর করে দিলেন মালতীদেবী। ঘুম আসবে না। প্রশ্নটা চক্কর কাটছে মাথায়। তোমার ছেলে কী করে? চুরি না ডাকাতি। মুখপোড়া, জানিস আমার দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামী। খাদ্য আন্দোলনে জেল খেটেছে বাবা। আর আমার ছেলে চোর! নিজের কানে শুনবার পর থেকেই মাথায় আগুন। 

-দিন-রাত খালি রাজা-উজির মারা! কী এমন কাজ করে তোমার ছেলে? ব্যবসা, না চুরি-ডাকাতি? 
-নিজের দুই ছেলেই বেকার তো। তাই জ্বলন। আমি কি বুঝি না?’ 

কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ির পথ ধরলেন মালতীদেবী। ঝগড়া, কথা-কাটাকাটি জিনিষগুলো মগজে একদম লেপটে থাকে। কাজের মধ্যেও থেকে থেকে খোঁচা মারে। কথার পিঠে আরও কথা। এবার ভুস করে ঘাই মারল মগজের মধ্যিখানে,‘কিসের জোরে রাজা-উজির মারে তোমার খোকা?

মনের পাথারে ডুবছে আর উঠছে। মগজের গভীর থেকে কে যেন বলতে লাগলো, রাজা-টাজা আজকাল তো নেই। আছে মন্ত্রী, প্রধান মন্ত্রী, দেশ নেতা। ক্ষমতা অর্থ লোকবল পাইক বরকন্দাজ, সবই আছে। একদম রাজার মত। অনেক লড়াই করে ঘাম ঝরিয়ে ক্ষমতার কুর্সিটা বাগিয়ে তারা সেই রাজা। 

তবে রাজগঞ্জের রাজা অন্য রকম। না-লড়াই, না-মেহনত। ভাগ্যের ছোঁয়া খেয়ে হঠাৎ করেই  রাজা। মসনদে জাঁকিয়ে বসেছেন। রাজামশায় বলে কেউ ডাকে না অবশ্য। তবে গাঁয়ের মানুষের হিম্মত নেই যে ‘খোকা’ বলে ডাকে। বলে খোকাবাবু। অনেকে আবার ভুলে যাওয়া ভালো নামটা উদ্ধার করে ইদানীং ডাকে ‘খগেন বাবু’। 

‘খগেন নয়,খগেন্দ্র নারায়ন বাবু। আর চিঠিতে পরিস্কার করে লিখবেন খগেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী মহোদয়’। ওর দুই সাগরেদ ভজাই আর লাল্টু নরম-গরম গলায় সাবধান করে দেয়। লাল্টুকে খুব ভয় খায় গাঁয়ের লোক। অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। দিন সাতেক আগে সন্ধ্যা বেলা বাড়ির সামনে গাঁয়ের মাষ্টার পরাশর দাস ডাকছিলেন,‘খগেন্দ্র নারায়ন বাবু বাড়ি আাছেন নাকি?’

সদর দরজার বাইরে কয়েক বার এই ডাক শুনে ভিতর বাড়ি থেকে বাইরে এসে বলেই বসলেন,‘ও নামে তো এ বাড়িতে কেউ থাকে না’।

হঠাৎ করে তখন পাশের বাড়ির গগন 
উকিলের বৌ সৌদামনি ঝনঝন করে উঠলেন, ‘কেমন মা তুমি মালতী? ছেলের ভালো নামটাই ভুলে বসে আছো?’
থতমত মুখ মালতীদেবীর। এক হাত জিভ মুখের বাইরে। একটু থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘আমার খোকাকে ধরতে এলে সক্কাল সক্কাল আসবেন। এই নটা-দশটা।’ 

ঘাড় কাত করে ভদ্রলোক বললেন, ‘আচ্ছা’। মানুষটার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে মনে কথা বলছেন মালতীদেবী। সন্ধ্যেবেলা খোকাবাবু তো বাড়ি থাকে না। আড্ডা মারার সময়! ইয়ার দোস্ত নিয়ে মদ খায়। আরও কত কি করে! অবশ্য শোনা কথা সব। লোকে কত কি বলে। আমার ছেলে রাজা হয়েছে। গ্রামের লোকজন মান্য করে। দারুন নাকি খাতির! 

‘অত খাতিরের আবার কি আছে?’ সেদিন ঝগড়ার সময় কাঁপতে কাঁপতে মুখের উপর বলেই দিলেন সৌদামনি। বিকেলের ওই সময়টাতে কালীবাড়ীর পার্কের বেঞ্চিতে অনেক মেয়ে-বউ। আপন মনে পা দোলাচ্ছিলেন স্কুলের দিদিমণি রমা সেন। ঝগড়াটা জমে উঠতেই সৌদামিনির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন রমা, ‘ঠিকই তো।’ 

দপ করে মাথায় আগুন। বিকেলের আড্ডাটা ভেস্তে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মালতীদেবী। গলায় ঝাঁজ। এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন, ‘ছোট ছেলেটা দুটো পয়সা কামাচ্ছে। গাড়ি কিনবে। সহ্য হয় না তোমাদের। হিংসে,খালি হিংসে!’

‘আমাদের মনে হিংসা নেই। তবে... কী এমন কাজ করে ও? ব্যবসাপাতি না চুরি ডাকাতি?’ 

‘নিজের দুই ছেলে বেকার তো! তাই জ্বলন।’ কাঁপতে কাঁপতে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন মালতীদেবী। 

রাস্তাটা নির্জন তবে শর্টকাট। বর্ষার জলে মাটিতে রস ধরেছে। ঘাস গুলো বড় আর ঘন হয়ে পায়ে-চলা দাগ ঢেকে দিয়েছে। চটির ফাঁক দিয়ে সুরসুরি দিচ্ছে পায়ের পাতায়। গরম শরীরে ঠাণ্ডার ছোঁয়া। মনের তাপটা একটু নরম পড়ল। হেমন্তের বাতাসে আদো আদো ঠাণ্ডা। মাথায় রাগের তাত খানিক নামল। ভাল লাগছে এখন। বড় একটা শ্বাস ফেললেন মালতীদেবী। মুখ তুললেন। ঠিক তখনই সামনে মন্দিরের বৃদ্ধ পূজারী। ডান দিকের কাঁচা রাস্তার বাঁকটা পেরিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালেন। এই পথ ধরেই তাঁর মন্দির যাতায়াত।

রাস্তার ধারে একটা ঝাঁকড়া জামরুল গাছের পাশে দাঁড়লেন পুরোহিত। বললেন, ‘কেমন আছো মা। খুব চিন্তিত! কোন বিপদ হয় নি তো?’

প্রশ্নের মধ্যে কী একটা যেন ছিল। মালতীদেবী ঠাণ্ডা হয়ে বলে ফেললেন, ‘ছোট ছেলেটাকে গ্রামের লোক বড় হিংসা করে বাবা।’

-এমন তো উচিত নয়।’ 

মালতী ঘাড় নাড়লেন। ওর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে পুরোহিত বললেন,‘চিন্তা করো না মা। আচ্ছা,তোমার খোকা কী করে যেন এখন!’

ঢোঁক গিলে মালতীদেবী বললেন,‘পড়াশুনা তো তেমন করেনি। মাধ্যমিকটা পাশ দিয়েছে...।’

-তারপর?
-বেকার বসেছিল। এখন টুকটাক কামাই করে। বিয়ে করেছে তো। বসে থাকলে কি চলে,বলুন! 

-ঠিক কথা। কিসের ব্যবসা ওর?

-সব তো আমি জানি না। বাড়ির মধ্যেই থাকি। 

-একটু খোঁজ নিও। আমি চলি।’ কথাটা বলেই লম্বা পা ফেলে হাঁটা শুরু করলেন পুরোহিত। আর উল্টোদিকে শামুক গতিতে মালতীদেবী। মাথায় চিন্তা। পুরোহিত মশায় কী খোঁজ নিতে বললেন! 

সৌদামিনীর প্রশ্নটা আবার ঘাই মারছে, ‘কী এমন কাজ করে ও! ব্যবসাপাতি না চুরি ডাকাতি?’ 

সত্যিই তো,বড় ছেলে ইস্কুল মাস্টার। মেজটা বই-এর দোকানে কর্মচারী। মাইনাকরি মুখ ফুটে বলে না। তবে সংসারটা কষ্টে শিষ্টে চালিয়ে নেয়। ছোট ছেলে কী করে? ভাবেন নি তো আগে! দুটো মোটর সাইকেল। আবার গাড়ি কিনবে বলছে! মুখের উপর জিজ্ঞেস করবো,খোকা কী কারবার ধরেছিস তুই? কোন অন্যায় কাজ করছিস না তো!  

বলবে কখন? রাত্তিরে বাড়ি ফিরেই বউ-এর ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেয়। সে আবার তেমনি...। স্বামী সোহাগী। শুধু খাওয়া গয়না আর সাজগোজ। তবে পড়াশুনা করা মেয়ে। অন্য দুই বউ এর মত টুম্পা কখনও মিথ্যে কথা বলে না। টুম্পা কি সব জানে? ছেলের কারবারের কথা জিজ্ঞেস করে দেখবে নাকি! 

বাড়িতে ঢুকে তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বাললেন মালতীদেবী। প্রশ্নটা মাথায় কুটকুট কামড় দিচ্ছে। ছেলের কারবার নিয়ে আগে তো ভাবেন নি। আজকে ওই সৌদামনী,তারপর পুরোহিত মশায় মাথার মধ্যে খিঁচ ঢুকিয়ে দিল! তুলসী বেদীতে ফুল আর বাতাসা চাপিয়ে জোরে শাঁখ বাজালেন মালতীদেবী। ডানদিকে ঘুরে গঙ্গা জলের ঘটিটা তুলতে গেলেন। তখনই চোখে পড়ল। ছোট বউ টুম্পা একটু দূরে দাঁড়িয়ে দু’হাত জোড় করে প্রণাম ঠুকল। 

কী ব্যাপার আজ? অন্য দিন তো প্রণাম করতে আসে না। প্রশ্নটা উঠল বটে তবে কেন জানি মনটা ভাল হয়ে গেল। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। তারপর রান্না ঘরে ঢুকলেন। এ সময় চা বানিয়ে স্বামীর ঘরে পৌঁছে দিতে হয়। কাজটা সেরে নরম গলায় টুম্পাকে ডাকলেন, ‘এস বৌমা,চা খাবে।’

শান্ত সন্ধ্যা। হেমন্তের বাতাস। সাজগোজ করা শিক্ষিত বউমা সামনে বসে। এটাই তো সময়। বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে চায়ে একটা আলতো চুমুক দিলেন। স্বাদটা জিভের মধ্যে খেলিয়ে থেমে থেমে বললেন, ‘আমার খোকাটা পরিশ্রম করে খুব। ওর যত্ন নিও।’ 

মাথা নাড়ল টুম্পা। বারান্দার অল্প আলোয় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মালতীদেবী বললেন, ‘আচ্ছা,খোকার ব্যবসা ভালো চলছে তো?’ 

-ভালোই তো চলছে মা।

-আচ্ছা কিসের ব্যবসা করে ও?’ আসল প্রশ্নটা আলতো করে ভাসিয়ে দিলেন মালতীদেবী।

-আমি তো ঠিক জানি না মা। তবে মনে হয়...

-কী মনে হয়? 

মুখে কুলুপ। টুম্পার তেলতেলে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মালতীদেবী। বুকটা ধক ধক করছে। ছেলে চুরি ডাকাতি করে না তো! চেলাচামুণ্ডা গুলোতো রত্ন একেকটা। লাল্টুর দাদা ডাকাতি কেসে জেল খাটা আসামী। তিন মাস আগেই আবার লাহাবাবুর সোনার দোকানে চুরি হয়েছে। চোর যদিও ধরা পড়েনি। 

আগের প্রশ্নটাই আবার হালকা করে ছুড় দিলেন মালতিদেবী, ‘কিসের ব্যবসা করে ও?’

-জমি-জমার ব্যবসা বোধহয়,’ টুম্পার গলা খাদে। 

উত্তেজনা চেপে রাখতে পারলেন না মালতীদেবী।এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন, ‘জমি কেনা-বেচা করে? মানে দালাল? ইস্কুল-মাস্টারের ছেলে জমির দালাল?’  

-আমি তো জানি না মা। তবে একটু আধটু শুনি...

-কী শোন বউমা?

-এই টুক টাক কথা। ফসল,টাকা পাঠানো...।

-আর, আর কি...? 

-সানু চৌধুরীর জমি…!

-সানু চৌধুরী?’ কপালে ভাঁজ। মাথায় একঝাঁক প্রশ্নের খোঁচা। সানুবাবু, মানুবাবু। দু’ভায়ের তো মেলা জমি ছিল। মানুবাবু নিঃসন্তান। সানুবাবুর চার ছেলেই বিদ্বান। ডাক্তার,কেউ উকিল। ছোট একজন পুলিশের দারোগা। আরেকজন হাইস্কুলের মাস্টার। তারা তো জমির ভাগ নিতে আসে না। সে সব কি তাহলে ...!

-মা কিছু বলবেন?

ভাবনার সুতো কেটে গেল। বড় একটা শ্বাস ফেলে মালতীদেবী বললেন,‘না মা ঠিক আছে। তুমি বিশ্রাম নাও।’ 

একটু থেমে আবার,‘আচ্ছা তোমার শরীরটা কেমন যেন লাগছে!’ 

একটা ঢোঁক গিলল টুম্পা। মাথা নিচু। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘পেটটা একটু ভারী ভারী লাগছে মা…।’

‘খুব ভালো, কবে থেকে? লজ্জার কি আছে’ বলতে বলতে টুম্পার গাল টিপে আদর করলেন। হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। আমি আসছি।’ 

স্বামীর ঘরে ঢুকলেন মালতীদেবী। ‘তুমি জানো খোকা কী কাজ করে?’ পায়ের কাছে বসে বেশ উঁচু স্বরেই বললেন। 

বিছানায় উঠে বসলেন পরাশর ঘোষ। অবসর নেবার পর থেকে ভাঙা ঘরে শুয়েই থাকেন। একটা হাঁই তুলে মালতীদেবীর চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘খোকা? কী আর করবে। আমার পেনসনের টাকায় ফুটুনি…!’

-কি যে বল! ওই টাকায় মোটর সইকেল কিনেছে, গাড়ি কিনবে। কেউ বিশ্বাস করবে?’ ঝন ঝন করে উঠলেন মালতীদেবী। 

-কী বলছো তুমি? 

-যা বলছি সব ঠিক।  

-টাকা কোথায় পাচ্ছে! চুরি-ডাকাতি? 
ফিসফিস করলেন মালতীদেবী, ‘চুরি-ডাকাতি নয়। বোধহয় সানুবাবুদের জমির ফসল,বুজছ! জানাজানি হলে…?’ 
একটু থেমে স্বামীর চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার, ‘কোন বিপদ নেই তো?’

-ভালো করে খোঁজ নাও তো। ওদের জমির ফসল খোকা কেন নিতে যাবে? আর নিলেও তো অন্যায়। 

-আমার ভয় ভয় করছে। সানুবাবুর ছোট ছেলে মাস্টার। রাজনীতি করে। আরেক ছেলে পুলিশ। কোন দিন কী ঝামেলা করে বসবে!

(২)

মুখ নিচু করে কথা বলে ভজাই। ভজহরি দাস। লম্বা শক্তপোক্ত গড়ন। শ্যামলা রঙ। মুখে অল্প দাড়ি। সকালবেলা মালতীদেবীর বাড়িতে ঢুকে নরম স্বরে বলল, ‘জ্যেঠিমা, মোটর সাইকেলের চাবিটা দিন।’

বারান্দায় হাঁটু মুড়ে বসে বড় একটা বাঁধাকপি কাটছিলেন মালতীদেবী। ভজায়ের ডাকে দরজার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। স্বরে মধু ঢাললেন, ‘এস ভজাই, চেয়ারে বসো।’ 

এত খাতির কেন আজ? খোকাদার মোটর সাইকেল নিয়ে প্রায়ই কাজে যেতে হয়। কাজের মেয়েকে দিয়ে চাবিটা পৌঁছে দেয় জ্যেঠিমা। সকালে খোকাদার ঘুম ভাঙেনা। দূরে কোন কাজে যেতে হলে ওর মোটর সাইকেলটা নিতে আসে। বাড়ির বাইরে ঠেলে নিয়ে যায় দুচাকার ‘হিরো’। কেউ তাকিয়েও দেখে না। আর আজ! জ্যেঠিমা আদর করে কাছে ডাকছেন। কেনরে বাবা! থতমত খেল ভজাই। 

কাঠের টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটা খানিক দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে বসল ভজাই। তখনই আবার কানে ঢুকল মালতীদেবীর মোলায়েম স্বর, ‘ভজাই,কোথায় যাবিরে সাত সকালে?’

-এই একটু কাজ আছে’। মুখ বন্ধ করল ভজাই।  

-খুব তাড়া,না!

-একটু আর্জেন্ট আছে।

-ঠিক আছে বাবা। যাবিই তো। মুখটা বড় শুকনো লাগছে,একটু খেয়ে যা।  
প্লেটে রুটি তরকারি আর এক বাটি ডাল এনে টেবিলে রাখলেন মালতী দেবী। একগাল হেসে বাটিতে চুমুক দিল ভজাই। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মালতীদেবী বললেন, ‘কোথায় যাবে?’

-বর্ধমান।’ অসতর্ক ভজায়ের মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল কথা।

তিরের মত ধেয়ে এল সওয়াল, ‘ও, সমীরের বাড়ি যাবি? সনাতনদার ছেলে। কত বড় ডাক্তার!’
একটু থেমে আবার চোখা সওয়াল, ‘তুমি একাই যাবে না সঙ্গে লাল্টু…?’ 

-একাই যাচ্ছি। গ্রামের তিনজন আগেই রওনা দিয়েছে ট্রেনে। 

-আচ্ছা বাবা। সাবধানে যেও। অনেকটা পথ।

মাথা নাড়ল ভজাই। ওর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মালতীদেবী বললেন, ‘ওদের জমির ফসলের তো অনেক টাকা। তোমাদের হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেয় আমার খোকা।’ 

-অত জানি না জ্যেঠিমা। খোকাদা বন্ধ খামে যা দেয়,পৌঁছে দিই। 

-আর,আর কী করো?

-গ্রামের দু’পাচ জন রোগীকে ওনার কাছে দেখিয়ে নিয়ে আসি। 

-বাঃ,খুব ভালো। বাবা, আর কিছু খাবে?
দু’পাশে মাথা নেড়ে উঠে পড়ল ভজাই। একটু পরে স্বামীর ডাকে বারান্দা-লাগোয়া ঘরে ঢুকলেন। পরাশরবাবু বিছানায় উঠে বসেছেন তখন। বললেন, ‘শুনলাম। ফন্দি করে টাকা কামাচ্ছে আমাদের খোকাবাবু। খাটুনি নেই…।’

-আমি বুঝলাম না। ওদের ফসল-বেচা টাকা তো খোকা পাঠিয়ে দেয়। 

-বুঝতে পারবে না। অল্প কিছু পাঠিয়ে বাকিটা...

-কী করে? নিজের পকেটে ঢুকায়! 

-তাই তো মনে হচ্ছে। কেউ কি আর খোঁজ নিতে আসে? আরও অনেক কথা কানে আসে। 

-কি শুনেছো?

-মুদীর দোকানের পরেশ বলল, খোকা নাকি সানুবাবুদের জমিতে পোল্ট্রি ফার্ম বানিয়েছে। গনেশ দেখাশোনা করে। 

-তার মানে অনেক ভাবে কামাচ্ছে আমাদের খোকা। কোন বিপদ নেই তো?’, মালতীদেবীর স্বরে উদ্বেগ। 

-জানি না। তবে… ব্যাপারটা তো চুরি। ঘোর অন্যায়। 

-কেন,অন্যায় কেন? গ্রামে তো অনেকেই আসেনা। তাদের জমির ফসল তো লুট হয়ে যায়।

-অনেক খবর রাখো তুমি! শোন,অপরের টাকা পকেটে ঢুকানো অন্যায়। 

-তোমার সেই এক কথা। পাপ-ন্যায়-অন্যায়। এখন দিনকাল অন্য রকম!

-ঠিক কথা। তবে ধর্মের কলটা তো মরেনি।    
-সেই তো। আমি এখন কী করি! খোকাকে কিছু বললে তো তুলকালাম করবে। 

-এখনই কিছু বলতে যেও না। খোঁজ নাও। 

-কী খোঁজ নেব?

-কে খোকাকে ফসলের ভাগ তুলতে বলেছে? সানুবাবুর কোন্‌ ছেলে? ওদের ভায়ে ভায়ে তো আবার লাঠালাঠি। 

মালতীদেবী ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসলেন। শরীর স্থির। মনের মধ্যে অস্থির হাওয়ার দাপাদাপি। মাথায় এলোমেলো ভাবনা। ঘুম থেকে উঠলে ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেো, খোকা, কী কাজ করিস তুই? 

চিৎকার শুরু করবে খোকা। কিন্তু সব কথা জানতেই হবে। সৌদামিনির প্রশ্নটা যে বড্ড খোঁচা মারছে মাথায়, ‘কী কাজ করে তোমার খোকাবাবু? চুরি না ব্যবসা।’

উঠুক আজকে ছেলে। প্রশ্নবাণ চালাবে মালতী। কী কারবার ধরেছিস? চুরি না ডাকাতি। তুলকালাম করবে ছেলে। লাঠি হাতে নিয়ে সামনে দাঁড়াবে তখন। রণচণ্ডী মূর্তি। সত্যিটা জানতেই হবে।

সাহিত্যিক সৌমিত্র চৌধুরী
নিউটাউন, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ














0 Comments